নবজাতক শিশুর যত্ন: প্রথম মাসে মা-বাবার যা জানা দরকার
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
ঘরে নতুন অতিথি এলে আনন্দের সঙ্গে আসে একরাশ প্রশ্ন। শিশু কতবার খাবে, কতক্ষণ ঘুমাবে, নাভিতে কী লাগাতে হবে, কবে গোসল করানো যাবে, কান্না থামছে না কেন। চারপাশ থেকে নানা পরামর্শও আসে, যার সবগুলো ঠিক নয়।
বিজ্ঞাপন
নবজাতকের প্রথম মাসের যত্নের মূল কথাগুলো আসলে সহজ। জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ শুরু করা এবং ছয় মাস পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ খাওয়ানো, শিশুকে উষ্ণ ও পরিষ্কার রাখা, নাভিতে কিছু না লাগিয়ে শুকনো রাখা, শিশুকে ধরার আগে হাত ধোয়া, সময়মতো টিকা দেওয়া এবং বিপদের লক্ষণ চিনে রাখা। এগুলো ঠিকঠাক মানলে বেশির ভাগ নবজাতক সুস্থভাবে বেড়ে ওঠে।
প্রথম সপ্তাহগুলো মা-বাবা দুজনের জন্যই ক্লান্তিকর। তাই পরিবারের অন্যদের সাহায্য নিন এবং মায়ের বিশ্রাম ও খাবারের দিকেও নজর রাখুন। নিচে প্রতিটি বিষয় আলাদা করে বলা হলো।
বুকের দুধ: প্রথম ও প্রধান খাবার
জন্মের পর প্রথম কয়েক দিন মায়ের বুকে যে ঘন, হলদেটে দুধ আসে, তাকে শালদুধ বলে। পরিমাণে অল্প হলেও এটি নবজাতকের প্রথম টিকার মতো কাজ করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। এটি ফেলে দেওয়ার প্রচলিত ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
বিজ্ঞাপন
মধু, চিনির পানি, মিছরি বা অন্য কোনো কিছু মুখে দেবেন না। এক বছরের কম বয়সী শিশুকে মধু দিলে বিরল কিন্তু মারাত্মক সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। ছয় মাস পর্যন্ত শিশুর আলাদা পানিরও দরকার নেই, বুকের দুধেই পানির চাহিদা মেটে।
নবজাতক সাধারণত দিনে-রাতে মিলিয়ে আট থেকে বারোবার খায়। ঘড়ি ধরে নয়, শিশুর চাহিদা অনুযায়ী খাওয়ান। মুখ খোলা, হাত মুখে দেওয়া, ঠোঁট চোষা ও মাথা এদিক-ওদিক ঘোরানো খিদের লক্ষণ, কান্না শেষ পর্যায়ের লক্ষণ। প্রথম কয়েক সপ্তাহে শিশু তিন ঘণ্টার বেশি ঘুমিয়ে থাকলে আলতো করে জাগিয়ে খাওয়াতে পারেন।
সঠিক অবস্থান: শিশুর পুরো শরীর মায়ের দিকে ফেরানো থাকবে, মুখ স্তনের সামনে। শিশু যেন শুধু বোঁটা নয়, বোঁটার চারপাশের কালো অংশের বেশির ভাগ মুখে নেয়। ঠিকমতো মুখে নিলে মায়ের ব্যথা কম হয় এবং শিশু ভালোভাবে দুধ পায়। প্রতিবার খাওয়ানোর পর শিশুকে কাঁধে নিয়ে পিঠে আলতো চাপড় দিয়ে ঢেকুর তুলিয়ে নিন।
শিশু যথেষ্ট দুধ পাচ্ছে কি না বোঝার সহজ উপায় হলো প্রস্রাব। প্রথম সপ্তাহের পর দিনে ছয়বার বা তার বেশি ভেজা কাঁথা বা ডায়াপার এবং নিয়মিত ওজন বাড়া ভালো লক্ষণ। জন্মের পর প্রথম কয়েক দিনে ওজন সামান্য কমা স্বাভাবিক, সাধারণত দুই সপ্তাহের মধ্যে জন্মের ওজনে ফিরে আসে।
বিজ্ঞাপন
শিশুকে উষ্ণ রাখা
নবজাতক শরীরের তাপ ধরে রাখতে পারে না, দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যায়। জন্মের পর মায়ের বুকে ত্বকের সঙ্গে ত্বক লাগিয়ে রাখা, যাকে ক্যাঙারু পদ্ধতি বলে, শিশুকে উষ্ণ রাখার সবচেয়ে ভালো উপায়। কম ওজনের শিশুর জন্য এটি বিশেষভাবে উপকারী।
শিশুকে বড়দের চেয়ে এক স্তর বেশি কাপড় পরান, মাথায় পাতলা টুপি ও পায়ে মোজা দিন। তবে অতিরিক্ত কাপড়ে মুড়িয়ে ঘামিয়ে ফেলবেন না। শিশুর বুক বা পিঠে হাত দিয়ে দেখুন, হালকা উষ্ণ থাকলে ঠিক আছে। হাত-পা একটু ঠান্ডা থাকা স্বাভাবিক।
নাভির যত্ন
বিজ্ঞাপন
জন্মের পর নাভির যে অংশটুকু থাকে, তা সাধারণত এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে শুকিয়ে নিজে থেকেই পড়ে যায়। এ সময় নাভি শুকনো ও পরিষ্কার রাখাই মূল কাজ।
নাভিতে তেল, ছাই, গোবর, পাউডার বা কোনো ঘরোয়া প্রলেপ লাগাবেন না, এতে মারাত্মক সংক্রমণ হতে পারে। নাভির সংক্রমণ প্রতিরোধে চিকিৎসক কোনো ওষুধ লাগানোর পরামর্শ দিলে শুধু সেটিই লাগান। কাঁথা বা ডায়াপার নাভির নিচে ভাঁজ করে পরান, যাতে প্রস্রাবে ভিজে না যায়। নাভি নিজে থেকে না পড়া পর্যন্ত টেনে তোলার চেষ্টা করবেন না।
নাভির চারপাশ লাল হয়ে ফুলে গেলে, পুঁজ বা দুর্গন্ধ বের হলে কিংবা রক্ত পড়তে থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান।
গোসল, ত্বক ও পরিচ্ছন্নতা
বিজ্ঞাপন
জন্মের পরপরই গোসল করানো উচিত নয়। অন্তত প্রথম ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করুন, শীতকালে বা কম ওজনের শিশুর ক্ষেত্রে আরও দেরি করা যায়। নাভি না পড়া পর্যন্ত পুরো গোসলের বদলে কুসুম গরম পানিতে নরম কাপড় ভিজিয়ে শরীর মুছে দিন।
গোসলের সময় ঘর গরম রাখুন, পানি কনুই ডুবিয়ে দেখে নিন যেন সহনীয় উষ্ণ থাকে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে গোসল শেষ করে নরম তোয়ালেতে দ্রুত মুছে কাপড় পরান। প্রতিদিন গোসল দরকার নেই, সপ্তাহে কয়েকবারই যথেষ্ট।
নবজাতকের চোখ, নাক বা কানে তেল ঢালবেন না, কাজল বা সুরমা লাগাবেন না। চোখ পরিষ্কার করতে সেদ্ধ করে ঠান্ডা করা পানিতে তুলা ভিজিয়ে ভেতরের কোণ থেকে বাইরের দিকে মুছুন। প্রতিবার কাঁথা বা ডায়াপার বদলানোর সময় নিতম্ব পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে শুকিয়ে নিন, ভেজা কাঁথা দীর্ঘক্ষণ রাখবেন না।
শিশুকে কোলে নেওয়ার আগে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার নিয়ম পরিবারের সবার জন্য। সর্দি-কাশি আছে এমন কাউকে শিশুর কাছে আসতে দেবেন না, আর শিশুকে চুমু খাওয়ার অভ্যাস থেকে সবাইকে বিরত রাখুন।
বিজ্ঞাপন
ঘুম, টিকা ও নিয়মিত চেকআপ
নবজাতক দিনে মোট ১৪ থেকে ১৭ ঘণ্টা ঘুমায়, তবে টানা নয়, অল্প অল্প করে। শিশুকে সবসময় চিত করে, অর্থাৎ পিঠের ওপর শোয়ান। উপুড় করে শোয়ালে হঠাৎ শ্বাস বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। বিছানা সমতল ও শক্ত রাখুন, শিশুর আশপাশে নরম বালিশ, ভারী কাঁথা বা খেলনা রাখবেন না। শিশু মায়ের পাশে একই ঘরে ঘুমালে খাওয়ানো সহজ হয়, শিশুর কাছাকাছি কেউ ধূমপান করবেন না।
জন্মের পর যত দ্রুত সম্ভব যক্ষ্মার টিকা বিসিজি দিতে হয়। এরপর সরকারি টিকাদান কর্মসূচির সূচি অনুযায়ী দেড় মাস বয়স থেকে পরবর্তী টিকাগুলো শুরু হয়। টিকা কার্ডটি যত্ন করে রাখুন এবং প্রতিটি তারিখ মনে রাখুন। জন্মনিবন্ধনও দেরি না করে করিয়ে নিন।
জন্মের পর প্রথম সপ্তাহে এবং প্রথম মাসের মধ্যে অন্তত একবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শিশুর ওজন, জন্ডিস ও সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো ভালো। মায়েরও প্রসব-পরবর্তী চেকআপ জরুরি।
বিজ্ঞাপন
যে লক্ষণ দেখলে দেরি নয়
নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখলে সঙ্গে সঙ্গে শিশুকে হাসপাতালে নিন:
১. খেতে না পারা: শিশু বুকের দুধ টানছে না বা খাওয়ার পর সব বমি করে দিচ্ছে।
২. জ্বর বা শরীর ঠান্ডা: শরীর বেশি গরম বা অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়ে যাওয়া।
বিজ্ঞাপন
৩. দ্রুত বা কষ্টের শ্বাস: শ্বাস নেওয়ার সময় বুকের নিচের অংশ ভেতরে ঢুকে যাওয়া বা নাক ফুলে ওঠা।
৪. খিঁচুনি বা নিস্তেজ হয়ে পড়া: শিশু নড়াচড়া কম করছে, জাগানো যাচ্ছে না।
৫. জন্ডিস: প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হলুদ হয়ে যাওয়া, হাতের তালু ও পায়ের তলা পর্যন্ত হলুদ হওয়া, অথবা দুই সপ্তাহ পরেও হলুদ ভাব থাকা।
৬. নাভিতে সংক্রমণ, ত্বকে পুঁজভরা ফুসকুড়ি বা পায়খানায় রক্ত।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
নবজাতককে কি রোদে রাখলে জন্ডিস ভালো হয়?
রোদে রাখা জন্ডিসের চিকিৎসা নয়, এতে শিশুর ঠান্ডা লাগা বা রোদে পোড়ার ঝুঁকিও আছে। জন্ডিস বেশি মনে হলে রক্ত পরীক্ষা করে চিকিৎসকের পরামর্শে চিকিৎসা নিন।
শিশু অনেক কাঁদে, কী করব?
বিজ্ঞাপন
খিদে, ভেজা কাঁথা, গরম বা ঠান্ডা লাগা ও ঢেকুর না ওঠা কান্নার সাধারণ কারণ। এগুলো ঠিক করার পরও শিশু অস্বাভাবিকভাবে কাঁদতে থাকলে বা সঙ্গে জ্বর থাকলে চিকিৎসক দেখান।
নবজাতকের গায়ে তেল মালিশ করা যাবে?
নাভি শুকানোর পর অনেকে হালকা হাতে তেল মালিশ করেন। কোন তেল উপযুক্ত, তা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন। মালিশের সময় নাক, কান ও চোখে তেল দেবেন না।
মায়ের দুধ কম হলে কী করব?
বিজ্ঞাপন
ঘন ঘন খাওয়ানো এবং সঠিক অবস্থানে খাওয়ানো দুধ বাড়ানোর প্রধান উপায়। মায়ের পর্যাপ্ত খাবার, পানি ও বিশ্রামও দরকার। তারপরও সমস্যা থাকলে নিজে থেকে কৌটার দুধ শুরু না করে স্বাস্থ্যকর্মী বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।