রান্নাঘরের টিপস: সময় ও খরচ বাঁচানোর কাজের কিছু কৌশল
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
দুপুরের রান্না শেষ হতে না হতেই রাতের রান্নার চিন্তা। পেঁয়াজ কাটা, আদা-রসুন বাটা, মাছ কাটা, মসলা খোঁজা, সব মিলিয়ে দিনের বড় একটা সময় চলে যায় রান্নাঘরে। গ্যাসের খরচ আর বাজারের দামও প্রতি মাসে চিন্তা বাড়ায়।
বিজ্ঞাপন
একটু পরিকল্পনা করলে এই চাপ অনেক কমে। সপ্তাহের মেনু আগে ঠিক করা, ছুটির দিনে পেঁয়াজ-রসুন-আদার প্রস্তুতি সেরে রাখা, মাছ-মাংস ভাগ করে ফ্রিজে রাখা, ঢাকনা দিয়ে রান্না করা আর জিনিসপত্র হাতের কাছে গুছিয়ে রাখা, এই কয়েকটা অভ্যাসেই রোজকার রান্নার সময় ও খরচ চোখে পড়ার মতো কমে যায়।
এখানে অভিজ্ঞ গৃহিণী আর রাঁধুনিদের কাছ থেকে শেখা এমন কিছু কৌশল দেওয়া হলো, যেগুলো যেকোনো সাধারণ বাংলাদেশি রান্নাঘরে কাজে লাগবে।
সপ্তাহের প্রস্তুতি একদিনে
১. মেনু ঠিক করে বাজার: সপ্তাহে কোন দিন কী রান্না হবে, মোটামুটি একটা তালিকা করুন। সেই অনুযায়ী বাজারের ফর্দ লিখলে দরকারের বাইরের কেনাকাটা কমে, সবজিও নষ্ট হয় না।
বিজ্ঞাপন
২. আদা-রসুন বাটা: একসঙ্গে বেশি পরিমাণে আদা ও রসুন বেটে বা ব্লেন্ড করে নিন। ব্লেন্ড করার সময় অল্প লবণ ও এক চামচ তেল দিলে বেশি দিন ভালো থাকে। কাচের বয়ামে ফ্রিজে রাখলে এক-দুই সপ্তাহ চলে। বেশি পরিমাণ হলে আইস ট্রেতে জমিয়ে কিউব করে ডিপ ফ্রিজে রাখুন, প্রতিবার দরকারমতো এক-দুটি কিউব বের করে নিন।
৩. পেঁয়াজ বেরেস্তা: পাতলা করে কাটা পেঁয়াজ লালচে করে ভেজে টিস্যুতে তেল ঝরিয়ে ঠান্ডা করে বায়ুরোধী বয়ামে রাখুন। বিরিয়ানি, পোলাও, ডাল বা ভর্তায় তাৎক্ষণিক কাজে আসে।
৪. মাছ-মাংস ভাগ করে রাখা: বাজার থেকে এনে ধুয়ে, পানি ঝরিয়ে একবারের রান্নার পরিমাণ হিসাবে আলাদা প্যাকেটে ভাগ করে ফ্রিজে রাখুন। প্যাকেটে তারিখ লিখে দিন। প্রতিবার পুরো প্যাকেট বের করে আবার ঢোকানোর ঝামেলা থাকবে না।
৫. সবজি কেটে রাখা: পরের দুই দিনের সবজি কেটে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে জিপলক ব্যাগে বা ঢাকনাওয়ালা বাক্সে ফ্রিজে রাখতে পারেন। আলু ও বেগুনের মতো কাটার পর রং বদলানো সবজি আগে থেকে কাটবেন না।
বিজ্ঞাপন
রান্নার সহজ টিপস
ডাল দ্রুত সেদ্ধ: মসুর ছাড়া বাকি ডাল রান্নার কয়েক ঘণ্টা আগে ভিজিয়ে রাখুন। ছোলা ও রাজমা আগের রাতে ভেজাতে হয়। এতে সময় ও গ্যাস দুটোই বাঁচে।
ভাত ঝরঝরে রাখতে: চাল কয়েকবার ধুয়ে আধা ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন। পোলাওয়ের চালে কয়েক ফোঁটা লেবুর রস দিলে দানা আলাদা থাকে।
তরকারিতে লবণ বেশি হলে: আলু বড় টুকরা করে দিয়ে কিছুক্ষণ রান্না করলে কিছুটা লবণ টেনে নেয়, অথবা ঝোল একটু বাড়িয়ে দিন। পুরোপুরি ঠিক না হলেও স্বাদ অনেকটা সামলানো যায়।
বিজ্ঞাপন
মাছ ভাজার সময় তেল না ছিটাতে: মাছের গায়ের পানি ভালো করে ঝরিয়ে বা কাগজে মুছে নিন, তেলে অল্প লবণ ছিটিয়ে নিন এবং তেল ভালোভাবে গরম হলে মাছ দিন।
পেঁয়াজ কাটার সময় চোখে পানি: পেঁয়াজ কিছুক্ষণ ফ্রিজে ঠান্ডা করে নিলে বা ধারালো ছুরি ব্যবহার করলে চোখ কম জ্বালা করে।
দুধ উথলে পড়া রোধে: দুধের হাঁড়ির মুখে একটি কাঠের খুন্তি আড়াআড়ি রেখে দিন এবং জ্বাল দেওয়ার সময় আশপাশেই থাকুন।
গ্যাস ও খরচ বাঁচানোর কৌশল
বিজ্ঞাপন
রান্নার সময় হাঁড়িতে ঢাকনা দিলে তাপ ভেতরে থাকে, খাবার দ্রুত সেদ্ধ হয় এবং গ্যাস কম লাগে। চুলার আগুন পাত্রের তলার বাইরে যেন ছড়িয়ে না পড়ে, পাত্রের মাপ অনুযায়ী আগুন ঠিক করুন। ভেজা পাত্র চুলায় না বসিয়ে আগে মুছে নিন।
প্রেশার কুকার ব্যবহার করলে মাংস, ডাল ও ছোলা অনেক কম সময়ে রান্না হয়। ফ্রিজ থেকে মাছ-মাংস রান্নার কয়েক ঘণ্টা আগে বের করে নিচের তাকে রেখে বরফ গলিয়ে নিন, চুলায় বসিয়ে বরফ গলাতে গ্যাস বেশি খরচ হয়।
চুলার বার্নার মাঝেমধ্যে পরিষ্কার করুন। বার্নারের ছিদ্র আটকে গেলে আগুন হলুদ হয়ে যায়, তাপ কম হয় এবং হাঁড়ির তলায় কালি পড়ে।
খরচ কমাতে মৌসুমি সবজি ও মাছ কিনুন, এগুলো দামে সস্তা আর স্বাদেও ভালো। বেঁচে যাওয়া ভাত দিয়ে পরদিন ভাজা ভাত, ডাল দিয়ে ডালের বড়া বা তরকারি দিয়ে পরোটার পুর বানালে খাবার নষ্ট হয় না।
বিজ্ঞাপন
খাবার সংরক্ষণের নিয়ম
রান্না করা খাবার দুই ঘণ্টার বেশি বাইরে ফেলে রাখবেন না, একটু ঠান্ডা হলে ঢাকনা দিয়ে ফ্রিজে তুলে ফেলুন। বড় হাঁড়িভর্তি খাবার ছোট বাটিতে ভাগ করে রাখলে দ্রুত ঠান্ডা হয় এবং বারবার পুরোটা গরম করতে হয় না। একবার গরম করা খাবার বারবার গরম না করাই ভালো।
কাঁচা মাছ-মাংস ফ্রিজের নিচের তাকে রাখুন, যাতে এর রস রান্না করা খাবারে না পড়ে। কাঁচা মাংস ও সবজির জন্য আলাদা কাটিং বোর্ড রাখা নিরাপদ।
কাঁচামরিচ বোঁটা ছাড়িয়ে টিস্যুতে মুড়িয়ে বাক্সে রাখলে বেশি দিন তাজা থাকে। ধনেপাতার গোড়া কেটে টিস্যুতে মুড়ে বাক্সে রাখুন। আলু ও পেঁয়াজ ফ্রিজে নয়, শুকনো ও বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় আলাদা ঝুড়িতে রাখুন। চাল-ডালের পাত্রে কয়েকটি শুকনো মরিচ বা তেজপাতা রাখার প্রথা আছে, তবে পাত্রটা বায়ুরোধী হওয়াই বেশি জরুরি।
বিজ্ঞাপন
রান্নাঘর গোছানোর উপায়
যে জিনিস প্রতিদিন লাগে, তা চুলার সবচেয়ে কাছে রাখুন: লবণ, হলুদ, মরিচ, জিরা, তেল আর খুন্তি। কম ব্যবহৃত জিনিস, যেমন বড় ডেকচি বা উৎসবের থালা, ওপরের তাকে তুলে দিন।
মসলার বয়ামে নাম লিখে লেবেল লাগান, স্বচ্ছ বয়াম হলে কোনটা ফুরিয়ে আসছে তা সহজে চোখে পড়ে। সিংকের নিচে পরিষ্কারের জিনিসপত্র রাখলে খাবারের জিনিস থেকে দূরে রাখুন। দেয়ালে হুক লাগিয়ে খুন্তি, ছাঁকনি ও কাপড় ঝুলিয়ে রাখলে তাকে জায়গা বাঁচে।
রান্না শেষের পাঁচ মিনিটের নিয়ম করুন: চুলা মুছে ফেলা, ব্যবহৃত পাত্র সিংকে ভিজিয়ে রাখা আর মসলার বয়াম জায়গামতো তুলে রাখা।
বিজ্ঞাপন
নিরাপত্তা আগে
গ্যাসের গন্ধ পেলে কোনো সুইচ চালু বা বন্ধ করবেন না, দেশলাই বা লাইটার জ্বালাবেন না। সঙ্গে সঙ্গে চুলা ও সিলিন্ডারের রেগুলেটর বন্ধ করুন, সব দরজা-জানালা খুলে দিন এবং ঘর থেকে বের হয়ে গ্যাস সরবরাহকারী বা অভিজ্ঞ মিস্ত্রিকে খবর দিন।
রান্না শেষে চুলার নব আর সিলিন্ডারের রেগুলেটর বন্ধ করার অভ্যাস করুন। গ্যাসের পাইপ ফাটা বা পুরোনো হলে বদলে নিন। চুলার কাছে পর্দা, প্লাস্টিক বা কাগজ রাখবেন না। ভেজা কাপড় বা গামছা দিয়ে গরম পাত্র ধরবেন না, এতে ভাপে হাত পুড়ে যায়।
গরম তেলে আগুন ধরে গেলে কখনো পানি ঢালবেন না। চুলা বন্ধ করে পাত্রের ওপর বড় ঢাকনা বা ভেজা মোটা কাপড় চাপা দিন। রান্নাঘরে শিশুদের চুলার কাছ থেকে দূরে রাখুন, হাঁড়ির হাতল চুলার বাইরের দিকে বের করে রাখবেন না।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
আদা-রসুন বাটা কত দিন ফ্রিজে রাখা যায়?
সাধারণ ফ্রিজে ঢাকনাওয়ালা কাচের বয়ামে এক-দুই সপ্তাহ ভালো থাকে। ডিপ ফ্রিজে কিউব করে রাখলে এক-দুই মাস চলে। গন্ধ বা রং বদলালে ফেলে দিন।
রান্না করা ভাত কি ফ্রিজে রাখা নিরাপদ?
বিজ্ঞাপন
হ্যাঁ, তবে রান্নার পর বেশিক্ষণ বাইরে না রেখে ঠান্ডা হলে দ্রুত ফ্রিজে তুলুন এবং এক দিনের মধ্যে ভালোভাবে গরম করে খেয়ে ফেলুন।
তেলচিটে কড়াই কীভাবে পরিষ্কার করব?
কড়াইয়ে পানি ও দুই চামচ বেকিং সোডা দিয়ে কয়েক মিনিট ফুটিয়ে নিন। ঠান্ডা হলে স্ক্রাবার দিয়ে ঘষলে তেলচিটে ভাব সহজে ওঠে।
মসলার গুঁড়া কীভাবে বেশি দিন ভালো রাখব?
বিজ্ঞাপন
বায়ুরোধী বয়ামে, চুলার তাপ ও রোদ থেকে দূরে রাখুন। ভেজা চামচ দিয়ে মসলা তুলবেন না, এতে ছত্রাক ধরে।