বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের নেপথ্যে একটি গাছ নিয়ে সন্দেহ
মেঘনা ঘাট-হরিপুর সঞ্চালন লাইনে ত্রুটির কারণে ঢাকা ও চট্টগ্রামের একাংশে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল
নিজস্ব প্রতিবেদক · ঢাকা
প্রকাশ:
মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানী ঢাকার একটি অংশসহ চট্টগ্রাম পর্যন্ত বেশ কিছু জেলা হঠাৎ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। এটি বিদ্যুতের চাহিদা-ঘাটতির সমন্বয়ের জন্য করা লোডশেডিং ছিল না, বরং জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয়ের কারণে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয়েছে মেঘনা ঘাট-হরিপুর সঞ্চালন লাইনে।
বিজ্ঞাপন
পাওয়ার গ্রিড পিএলসির চারজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণ সঙ্গে সঙ্গে জানা যায় না, এটি বের করতে কয়েক দিন সময় লাগে। তবে তদন্ত কমিটির সদস্যসহ সংশ্লিষ্টরা প্রাথমিকভাবে একটি উৎস শনাক্ত করেছেন। গ্রিড লাইনের নিচে কয়েকটি আকাশমণি গাছ পাওয়া গেছে।
সঞ্চালন কাজে যুক্ত কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যুতের ফ্রিকোয়েন্সিতে সামান্য হেরফের, লাইনে ক্ষমতার চেয়ে কম বা বেশি বিদ্যুৎ সঞ্চালিত হওয়া, এমনকি সক্রিয় লাইনে পাখি বসা, গাছের ডালপালা ভেঙে পড়া বা জৈব পদার্থের সংস্পর্শ থেকেও গ্রিড বন্ধ হতে পারে। সাধারণত গ্রিড বিপর্যয়ে অবকাঠামোগত বড় ক্ষতি দেখা দিলেও এবার তেমন কিছু দৃশ্যমান নয়।
পাওয়ার গ্রিডের কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, গ্রিড লাইনের দুর্ঘটনা এড়াতে নিয়মিত টহল দল কাজ করে এবং লাইনের কাছাকাছি গাছের ডাল কেটে দেওয়া হয়। মেঘনা ঘাট-হরিপুর লাইনের মাঝামাঝি একটি এলাকায় কয়েকটি আকাশমণি গাছ রয়েছে। কাটার দু-তিন দিন পরেই হয়তো একটি গাছের ডাল বেড়ে উঠেছে। যদিও লাইন স্পর্শ করেনি গাছটি, তবুও হাইভোল্টেজ লাইনের ২ মিটারের মধ্যে গাছের ডাল এলে ‘ফ্লাশ ওভার’ হয়ে শর্টসার্কিট হতে পারে। এই লাইনে এমনটি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে একটি সার্কিট বন্ধ হয়ে যায় এবং পাশের সার্কিটে সব লোড পড়ায় সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। তবে এটিই বিপর্যয়ের নিশ্চিত কারণ কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
মেঘনা ঘাট-হরিপুর লাইনের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ এমরান আলী এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সাধারণত দুটি সার্কিটের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সঞ্চালন করা হয়। মেঘনা ঘাট-হরিপুর লাইনে দুটি সার্কিটের ২০০ মেগাওয়াট করে ৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা আছে। বিপর্যয়ের আগে দুটি লাইনে ১৫০ মেগাওয়াট করে সরবরাহ হচ্ছিল। একটি বন্ধের পর অন্যটিতে ৩০০ মেগাওয়াট লোড চলে যায় এবং সক্ষমতার বাড়তি চাপ নিতে না পারায় সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হতে থাকে। লাইন দ্রুত সচল করা হলেও বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন শুরু করে সরবরাহ করতে সময় লেগে যায়।
বিজ্ঞাপন
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। পৌনে একটার দিকে গ্রিড বিপর্যয় হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ নেমে যায় ১০ হাজার মেগাওয়াটে। ঢাকার পূর্বাঞ্চল (ভুলতা, হরিপুর, সিদ্ধিরগঞ্জ, গুলশান, রামপুরা, উলন, মতিঝিল, মগবাজার, বনশ্রী, খিলগাঁও, বাংলামোটর ইত্যাদি) এবং চট্টগ্রামের একাংশ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। পৌনে দুই ঘণ্টা পর জাতীয় গ্রিড পুরোপুরি চালু হলেও গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। রাত ২টার সময়ও ২ হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে।
তদন্ত কমিটি ও পাওয়ার গ্রিডের কর্মকর্তারা বলছেন, এখনো সব তথ্য পাওয়া যায়নি। সঞ্চালন লাইনের বিভিন্ন জায়গায় থাকা ডেটা রেকর্ডারের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। গ্রিড বিপর্যয়ের পর সুরক্ষা সিস্টেম কাজ করায় বিপর্যয় বড় হয়নি, তবে একসঙ্গে একাধিক ঘটনা ঘটায় সরবরাহ ধরে রাখা যায়নি। গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদাও ছিল বেশি।
বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও সুপারিশ দিতে গত মঙ্গলবার রাতে প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ এবাদুল্লাহ হায়দার আলীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে হবে। তদন্ত কমিটির প্রধান সৈয়দ এবাদুল্লাহ হায়দার আলী জানান, তিনি তদন্তকাজ শুরু করেছেন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার চেষ্টা করবেন।
অন্যদিকে বুধবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আদেশে অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী রেজাকে প্রধান করে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে আরও একটি পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। এই কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দিতে দুই সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞরা জানান, জাতীয় গ্রিড দুটি ভাগে বিভক্ত। যমুনা নদীর এপারে ঢাকাসহ সব জেলায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন করে পূর্বাঞ্চল গ্রিড এবং ওপারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে বিদ্যুৎ সঞ্চালন করে পশ্চিমাঞ্চল গ্রিড। পশ্চিমাঞ্চল গ্রিডের চেয়ে তিন গুণ বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পূর্বাঞ্চল গ্রিড। এখন বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ভারত থেকে আসা বিদ্যুতের যথাযথ সমন্বয় না হলে ফ্রিকোয়েন্সির হেরফের হওয়ার ঝুঁকি থাকে।