আহসান মঞ্জিল ভ্রমণ: ইতিহাস, কী দেখবেন, খোলার সময় ও কীভাবে যাবেন
ট্রাভেল ডেস্ক · ঢাকা
প্রকাশ:
বুড়িগঙ্গার বুকে নৌকা থেকে তাকালে নদীর তীরে গোলাপি রঙের যে বিশাল প্রাসাদ চোখে পড়ে, তার চূড়ায় একটি বড় গম্বুজ, সামনে চওড়া সিঁড়ি নেমে গেছে বাগানের দিকে। এটিই আহসান মঞ্জিল, ঢাকার নবাবদের বাসভবন। উনিশ শতকের ঢাকার রাজনীতি, সমাজ আর অভিজাত জীবনের অনেকটাই এই প্রাসাদকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
আহসান মঞ্জিল কোথায় অবস্থিত? পুরান ঢাকার ইসলামপুর এলাকার কুমারটুলিতে, বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর তীরে, সদরঘাট থেকে খুব কাছে। প্রাসাদটি এখন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের একটি শাখা জাদুঘর। টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকে নবাবদের ব্যবহৃত আসবাব, ছবি, অস্ত্র আর ঘরসজ্জা দেখা যায়।
যাঁরা প্রথমবার যাচ্ছেন, তাঁদের জন্য মূল তথ্য তিনটি। জাদুঘর সাধারণত বৃহস্পতিবার বন্ধ থাকে, শুক্রবার খোলে জুমার নামাজের পর। ভেতরে ঘুরে দেখতে ঘণ্টা দেড়েক লাগে। আর পুরান ঢাকার যানজট এড়াতে সকালে পৌঁছানোই বুদ্ধিমানের কাজ।
আহসান মঞ্জিলের ইতিহাস
যে জমিতে আজকের আহসান মঞ্জিল, সেখানে আঠারো শতকে একটি বাগানবাড়ি ছিল, পরে সেটি ফরাসি বণিকদের কুঠি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে ঢাকার জমিদার খাজা আলীমুল্লাহ সম্পত্তিটি কিনে নেন এবং সেখানে বসবাস শুরু করেন।
বিজ্ঞাপন
তাঁর ছেলে নবাব খাজা আবদুল গনি এখানে নতুন করে বিশাল প্রাসাদ নির্মাণ করেন। নির্মাণকাজ চলে মোটামুটি ১৮৫৯ থেকে ১৮৭২ সাল পর্যন্ত। প্রিয় ছেলে খাজা আহসানুল্লাহর নামে প্রাসাদের নাম রাখা হয় আহসান মঞ্জিল।
১৮৮৮ সালের এক প্রবল টর্নেডোতে প্রাসাদটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে পুনর্নির্মাণের সময় ভবনটি অনেকটা নতুন রূপ পায়, আর এর পরের ভূমিকম্পেও কিছু অংশের ক্ষতি হয়। এরপর মেরামত হয়ে প্রাসাদটি আবার নবাব পরিবারের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
বিশ শতকের শুরুতে নবাব সলিমুল্লাহর সময়ে আহসান মঞ্জিল উপমহাদেশের মুসলিম রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। ১৯০৬ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলন এবং মুসলিম লীগ গঠনের আলোচনার সঙ্গে নবাব পরিবার ও এই প্রাসাদের নাম জড়িয়ে আছে। দেশভাগ ও জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর নবাব পরিবারের প্রভাব কমে আসে, প্রাসাদটিও অবহেলায় জীর্ণ হতে থাকে।
পরে সরকার প্রাসাদটি অধিগ্রহণ করে দীর্ঘ সংস্কারকাজ শেষে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে একে জাদুঘর হিসেবে দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেয়।
বিজ্ঞাপন
স্থাপত্য: কেন একে গোলাপি প্রাসাদ বলা হয়
আহসান মঞ্জিলের দুটি অংশ। গম্বুজওয়ালা পূর্ব দিকের অংশকে বলা হয় রংমহল, আর পশ্চিম দিকের অংশ অন্দরমহল। দুই অংশ ওপরে একটি বারান্দা ও করিডর দিয়ে যুক্ত।
দোতলা প্রাসাদের দক্ষিণ দিকে নদীর মুখোমুখি বিশাল খোলা সিঁড়ি আর বারান্দা, যা দূর থেকেই ভবনটিকে রাজকীয় চেহারা দেয়। প্রাসাদের মাঝখানের গোলাকার কক্ষের ওপর বসানো বড় গম্বুজটি একসময় ঢাকা শহরের অন্যতম উঁচু স্থাপনা ছিল, নদী থেকে দূর থেকেই চোখে পড়ত। দেয়ালের গোলাপি রঙের জন্য একে অনেকে গোলাপি প্রাসাদ বা পিংক প্যালেস বলেন।
ভেতরে কী দেখবেন
বিজ্ঞাপন
জাদুঘরের গ্যালারিগুলো এমনভাবে সাজানো, যাতে নবাবদের সময়ের ঘরগুলো যেমন ছিল, তেমন একটা ধারণা পাওয়া যায়। ঘোরার সময় যেগুলো বিশেষভাবে খেয়াল করবেন:
১. জলসাঘর ও নাচঘর: কাঠের মেঝে, ঝাড়বাতি আর দেয়ালের সাজসজ্জায় সে সময়ের আমোদ-প্রমোদের ছবি ফুটে ওঠে।
২. দরবার হল: নবাবদের সভা ও অতিথি আপ্যায়নের কক্ষ। বড় আয়না, আসবাব আর সাজানো চেয়ার এখানে দেখা যায়।
৩. ভোজনকক্ষ: লম্বা খাবার টেবিল, চীনামাটির তৈজসপত্র আর কাঠের আলমারি নবাবি খানাপিনার রীতি বোঝায়।
বিজ্ঞাপন
৪. গোলঘর ও গম্বুজের নিচের কক্ষ: প্রাসাদের কেন্দ্রবিন্দু, ওপরে তাকালে গম্বুজের ভেতরের নির্মাণশৈলী দেখা যায়।
৫. প্রতিকৃতি ও আলোকচিত্র: নবাব পরিবারের সদস্যদের তৈলচিত্র ও পুরোনো আলোকচিত্রে উনিশ-বিশ শতকের ঢাকার পোশাক ও জীবনযাপনের চিত্র পাওয়া যায়।
৬. অস্ত্র, তৈজসপত্র ও ব্যক্তিগত সামগ্রী: তলোয়ার, বন্দুক, রুপার বাসন, আলমারি, সিন্দুকসহ নানা জিনিস প্রদর্শিত আছে।
জাদুঘরের ভেতরে সাধারণত ছবি তোলা নিষেধ। ব্যাগ বড় হলে প্রবেশপথে জমা রাখতে বলা হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
খোলার সময় ও টিকিট
আহসান মঞ্জিল জাতীয় জাদুঘরের শাখা হওয়ায় মোটামুটি জাতীয় জাদুঘরের সময়সূচি মেনে চলে। সাধারণত বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক বন্ধ। শনিবার থেকে বুধবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত খোলা থাকে, আর শুক্রবার খোলে জুমার নামাজের পর বিকেলে। গ্রীষ্ম ও শীতে খোলা ও বন্ধের সময় কিছুটা বদলায়, সরকারি ছুটির দিনেও ভিন্ন নিয়ম হতে পারে।
টিকিট কাটতে হয় প্রবেশপথের কাউন্টার থেকে। দেশি দর্শনার্থীদের টিকিটের দাম কম, আনুমানিক ২০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে। শিশুদের জন্য কম দামের টিকিট থাকে, আর সার্কভুক্ত দেশ ও অন্যান্য বিদেশি দর্শনার্থীদের জন্য দাম আলাদা ও বেশি। জাদুঘর বন্ধ হওয়ার কিছুক্ষণ আগেই টিকিট বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়, তাই শেষ মুহূর্তে যাবেন না।
আহসান মঞ্জিল যাওয়ার উপায়
বিজ্ঞাপন
ঢাকার যেকোনো জায়গা থেকে প্রথমে গুলিস্তান, সদরঘাট বা বাবুবাজার এলাকায় আসুন। গুলিস্তান থেকে রিকশায় সদরঘাটের দিকে গেলে ইসলামপুর হয়ে কুমারটুলিতে প্রাসাদের ফটকে পৌঁছানো যায়। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে হেঁটে যাওয়া যায়।
কেরানীগঞ্জের দিক থেকে এলে বাবুবাজার সেতু পার হয়ে রিকশায় অল্প পথ। নিজের গাড়ি নিয়ে গেলে ইসলামপুরের সরু রাস্তা আর পাইকারি বাজারের ভিড়ে পার্কিং খুঁজে পাওয়া কঠিন, তাই গণপরিবহন বা রিকশাই ভালো।
চাইলে সদরঘাট থেকে ছোট নৌকায় বুড়িগঙ্গায় কিছুক্ষণ ঘুরে নদী থেকে আহসান মঞ্জিলের সামনের দিকটা দেখতে পারেন। প্রাসাদের আসল সৌন্দর্য নদীর দিক থেকেই বেশি চোখে পড়ে। নৌকায় ওঠার আগে ভাড়া ঠিক করুন আর ভিড়ের লঞ্চের কাছাকাছি যেতে মাঝিকে নিষেধ করুন।
আশপাশের দর্শনীয় স্থান ও খাবার
বিজ্ঞাপন
আহসান মঞ্জিলের আশপাশে পুরান ঢাকার ইতিহাস ছড়িয়ে আছে। কাছেই আর্মেনীয় গির্জা, তারা মসজিদ, রূপলাল হাউস, লালবাগ কেল্লা আর ঢাকেশ্বরী মন্দির। একদিনে লালবাগ কেল্লা ও আহসান মঞ্জিল একসঙ্গে দেখা সহজ।
খাওয়ার জন্য পুরান ঢাকার বিরিয়ানি, তেহারি, কাবাব, বাকরখানি আর লাচ্ছির দোকান সবখানেই। পরিচ্ছন্ন ও ভিড় কম এমন দোকান বেছে নিন, আর গরমের দিনে রাস্তার খোলা শরবত এড়িয়ে চলুন।
একটি দিনের সহজ পরিকল্পনা হতে পারে এমন: সকালে আহসান মঞ্জিল, তারপর হেঁটে বা রিকশায় আর্মেনীয় গির্জা ও তারা মসজিদ, দুপুরে পুরান ঢাকার খাবার, বিকেলে লালবাগ কেল্লা। শুধু খেয়াল রাখবেন, আহসান মঞ্জিল বৃহস্পতিবার আর লালবাগ কেল্লা রোববার বন্ধ থাকে, তাই দুটি একসঙ্গে দেখতে চাইলে শনি, সোম, মঙ্গল বা বুধবার বেছে নিন। সোমবার লালবাগ কেল্লা দুপুরের পর খোলে, সেটিও হিসাবে রাখুন।
ইসলামপুর ও সদরঘাট এলাকায় ভিড়ের মধ্যে পকেটমারের ঝুঁকি আছে। মোবাইল ও মানিব্যাগ সামনের পকেটে বা বন্ধ ব্যাগে রাখুন, শিশুদের হাত ধরে চলুন।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
আহসান মঞ্জিল কোন দিন বন্ধ থাকে?
সাধারণত বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক বন্ধ থাকে এবং শুক্রবার জুমার পর খোলে। সরকারি ছুটির দিনে সময়সূচি বদলাতে পারে।
আহসান মঞ্জিল কে নির্মাণ করেন?
বিজ্ঞাপন
নবাব খাজা আবদুল গনি এই প্রাসাদ নির্মাণ করেন এবং ছেলে খাজা আহসানুল্লাহর নামে এর নামকরণ করেন।
আহসান মঞ্জিল দেখতে কত সময় লাগে?
জাদুঘরের ভেতর ও বাইরের বাগান মিলিয়ে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা যথেষ্ট।
ভেতরে কি ছবি তোলা যায়?
বিজ্ঞাপন
জাদুঘরের ভেতরে সাধারণত ছবি তোলা নিষেধ। প্রাসাদের সামনের বাগান ও সিঁড়ি থেকে বাইরের ছবি তোলা যায়।