কোরবানির পশু জবাই করার নিয়ম, নিয়ত ও জবাইয়ের দোয়া
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
কোরবানির মূল কাজটি হলো আল্লাহর নাম নিয়ে পশু জবাই করা। জবাইয়ের মুহূর্তে 'বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার' বলা, অর্থাৎ আল্লাহর নামে, আল্লাহ সবচেয়ে মহান, এটুকু বলাই জরুরি। এর আগে মহানবী (সা.) যে আয়াত ও দোয়াগুলো পড়েছেন, সেগুলো পড়া সুন্নত। দোয়া মুখস্থ না থাকলেও শুধু বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে জবাই করলে কোরবানি পুরোপুরি শুদ্ধ।
বিজ্ঞাপন
কোরবানির নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা বাধ্যতামূলক নয়। মনে মনে এটুকু ঠিক রাখাই যথেষ্ট যে আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের বা যাঁদের পক্ষ থেকে কোরবানি দিচ্ছি, তাঁদের কোরবানি আদায় করছি। শরিকদের নাম পড়ে শোনানোর প্রচলিত রেওয়াজ আছে; এটি জরুরি নয়, তবে কারও আপত্তি না থাকলে নাম বলায় দোষ নেই।
তবে দোয়ার চেয়েও বেশি মনোযোগ দরকার জবাইয়ের পদ্ধতিতে। ভুল পদ্ধতিতে জবাই হলে পশু অযথা কষ্ট পায়, কখনো কখনো মাংস হালালই হয় না। নিচে প্রস্তুতি থেকে চামড়া ছাড়ানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে দেওয়া হলো।
জবাইয়ের আগে প্রস্তুতি
জবাইয়ের জায়গা আগে থেকে ঠিক করুন। শহরে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা অনেক সময় নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করে দেয়; বাড়িতে করলে রক্ত গড়িয়ে পড়ার জন্য একটি গর্ত খুঁড়ে রাখুন, যাতে পরে মাটিচাপা দেওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
ছুরি ভালোভাবে ধার দিন। সহিহ মুসলিমে হজরত শাদ্দাদ ইবনে আওস (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহ প্রতিটি কাজে সুন্দর আচরণ অপরিহার্য করেছেন। যখন জবাই করবে, সুন্দরভাবে জবাই করবে; তোমাদের প্রত্যেকে যেন ছুরি ধার দিয়ে নেয় এবং পশুকে আরাম দেয়। পশুর সামনে ছুরি ধার দেওয়া এবং এক পশুর সামনে আরেকটি জবাই করা অনুচিত, কারণ এতে পশু ভয় পায়।
পশুকে জবাইয়ের আগে পানি খাওয়ানো, টেনে-হিঁচড়ে না নেওয়া এবং আলতোভাবে শোয়ানো সুন্দর আচরণের অংশ। গরু বা মহিষের মতো বড় পশু শোয়াতে কয়েকজন শক্তিশালী মানুষ রাখুন এবং দড়ি আগে থেকে প্রস্তুত রাখুন, যাতে তাড়াহুড়ায় কেউ আহত না হন।
কোরবানির দোয়া: আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ
আবু দাউদের একটি হাদিসে বর্ণিত আছে, মহানবী (সা.) কোরবানির দিনে পশু কেবলামুখী করে নিচের আয়াতগুলো পড়েছেন, তারপর আল্লাহর নাম নিয়ে জবাই করেছেন। প্রথম অংশটি সুরা আনআমের ৭৯ নম্বর আয়াত:
বিজ্ঞাপন
إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ
উচ্চারণ: ইন্নি ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাজি ফাতারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানিফাও ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকিন। অর্থ: আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁর দিকে মুখ ফেরালাম, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, আর আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।
দ্বিতীয় অংশটি সুরা আনআমের ১৬২ ও ১৬৩ নম্বর আয়াত থেকে নেওয়া:
إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ، لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ
বিজ্ঞাপন
উচ্চারণ: ইন্না সালাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহইয়ায়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, লা শারিকা লাহু ওয়া বিজালিকা উমিরতু ওয়া আনা মিনাল মুসলিমিন। অর্থ: নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও মৃত্যু জগতসমূহের রব আল্লাহর জন্য। তাঁর কোনো শরিক নেই, আমাকে এরই আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত।
এরপর বলবেন: আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়া লাকা, অর্থাৎ হে আল্লাহ, এটি আপনারই দান এবং আপনার জন্যই। তারপর ছুরি চালানোর মুহূর্তে বলবেন:
بِسْمِ اللَّهِ اللَّهُ أَكْبَرُ
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার। অর্থ: আল্লাহর নামে, আল্লাহ সবচেয়ে মহান।
বিজ্ঞাপন
জবাইয়ের পর কবুলের দোয়া করা যায়। সহিহ মুসলিমে আছে, মহানবী (সা.) জবাইয়ের সময় বলেছেন, বিসমিল্লাহ, হে আল্লাহ, মুহাম্মদ, মুহাম্মদের পরিবার ও উম্মতের পক্ষ থেকে কবুল করুন। এর অনুসরণে কেউ বাংলায় বা আরবিতে বলতে পারেন: আল্লাহুম্মা তাকাব্বাল মিন্নি, অর্থাৎ হে আল্লাহ, আমার পক্ষ থেকে কবুল করুন। শরিকে কোরবানি হলে 'মিন্নি'র জায়গায় সবার পক্ষ থেকে কবুলের নিয়ত রাখুন।
জবাইয়ের সঠিক পদ্ধতি ধাপে ধাপে
১. পশু শোয়ানো: পশুকে বাম কাতে শোয়ান, মাথা দক্ষিণ দিকে আর মুখ ও গলা কেবলার দিকে, যাতে জবাইকারী ডান হাতে সহজে ছুরি চালাতে পারেন। বাংলাদেশে কেবলা পশ্চিম দিকে।
২. গলা নির্ধারণ: গলার নিচের অংশ, অর্থাৎ বুকের ওপরের হাড় থেকে চোয়ালের নিচ পর্যন্ত জায়গায় ছুরি চালাতে হয়।
বিজ্ঞাপন
৩. বিসমিল্লাহ বলে ছুরি চালানো: বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে দ্রুত ও জোরে ছুরি চালান, যাতে একবারে প্রয়োজনীয় নালিগুলো কেটে যায়। বারবার ঘষে কাটা পশুর জন্য কষ্টদায়ক।
৪. চারটি নালি: গলায় চারটি নালি আছে: শ্বাসনালি, খাদ্যনালি এবং দুই পাশের দুটি প্রধান রক্তনালি। হানাফি মাজহাবে এ চারটির অন্তত তিনটি কাটা গেলে জবাই শুদ্ধ। চারটিই কেটে ফেলা উত্তম।
৫. মাথা আলাদা না করা: ছুরি ঘাড়ের হাড় বা সুষুম্নাকাণ্ড পর্যন্ত চালিয়ে মাথা আলাদা করে ফেলা মাকরুহ। এতে মাংস হারাম হয় না, তবে পশুর কষ্ট বাড়ে।
৬. নিস্তেজ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা: রক্ত বের হয়ে পশু পুরোপুরি নিস্তেজ ও ঠান্ডা না হওয়া পর্যন্ত চামড়া ছাড়ানো, পা কাটা বা মাংস কাটা শুরু করবেন না। তাড়াহুড়ায় এ ভুল খুব বেশি হয়।
বিজ্ঞাপন
কে জবাই করবেন এবং কোন ভুলে মাংস হালাল হয় না
নিজের হাতে জবাই করা উত্তম; না পারলে অন্য মুসলমানকে দিয়ে করানো যায়। নারীরাও জবাই করতে পারেন। জবাইকারী মুসলমান হওয়া এবং জবাইয়ের সময় আল্লাহর নাম নেওয়া জরুরি।
হানাফি মাজহাবে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বিসমিল্লাহ না বললে সেই পশুর মাংস হালাল হয় না। ভুলে না বললে মাংস হালাল। একাধিক পশু জবাই করলে প্রতিটির জন্য আলাদাভাবে বিসমিল্লাহ বলতে হয়।
একটি প্রচলিত ভুল হলো, ইমাম বা হুজুর বিসমিল্লাহ বলে ছুরি ধরিয়ে দেন, আর কসাই বা অন্য কেউ ছুরি চালান। আবার কখনো দুজন একসঙ্গে ছুরি ধরে চালান। এ ক্ষেত্রে যিনি বা যাঁরা ছুরি চালাচ্ছেন, প্রত্যেককে নিজে বিসমিল্লাহ বলতে হবে। শুধু পশুর পা বা মাথা চেপে ধরা সহযোগীদের বলার প্রয়োজন নেই।
বিজ্ঞাপন
জবাইয়ের পর করণীয়
পশু পুরোপুরি নিস্তেজ হলে চামড়া ছাড়িয়ে মাংস কাটা শুরু করুন। কসাইয়ের মজুরি আলাদা টাকায় দিন, মাংস বা চামড়া দিয়ে নয়। রক্ত, নাড়িভুঁড়ি ও বর্জ্য গর্তে পুঁতে ফেলুন বা নির্ধারিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দিন। জবাইয়ের জায়গা পানি ও ব্লিচিং পাউডার দিয়ে পরিষ্কার করুন, যাতে দুর্গন্ধ ও মাছি না ছড়ায়।
শিশুদের জবাইয়ের দৃশ্য খুব কাছ থেকে দেখানো উচিত কি না, তা নিয়ে অভিভাবকদের বিবেচনা করা ভালো। কোরবানির শিক্ষা তারা পরিবারের আচরণ থেকে নেবে, পশুর প্রতি দয়া ও গরিবের প্রতি উদারতা দেখে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
জবাইয়ের সময় শুধু বিসমিল্লাহ বললে কি হবে?
হ্যাঁ, শুধু বিসমিল্লাহ বললেও জবাই শুদ্ধ হবে। তবে সঙ্গে আল্লাহু আকবার বলা সুন্নত, আর আগের আয়াতগুলো পড়া উত্তম।
কোরবানির নিয়ত কি আরবিতে মুখে বলতে হয়?
না। নিয়ত অন্তরের সংকল্প। মনে মনে কোরবানির উদ্দেশ্য ঠিক রাখাই যথেষ্ট। বাংলায় মুখে বললেও কোনো সমস্যা নেই।
বিজ্ঞাপন
জবাইয়ের পর পশু উঠে দৌড় দিলে কি মাংস হারাম?
প্রয়োজনীয় নালিগুলো কাটা গেলে পশু কিছুক্ষণ ছটফট করতে পারে, তাতে মাংস হারাম হয় না। তবে নালি ঠিকমতো না কাটলে দ্রুত আবার ছুরি চালিয়ে জবাই সম্পূর্ণ করতে হবে।
নারীরা কি কোরবানির পশু জবাই করতে পারেন?
পারেন। জবাইকারী নারী বা পুরুষ হওয়ার শর্ত নেই। মুসলমান হওয়া, আল্লাহর নাম নেওয়া এবং সঠিক পদ্ধতিতে জবাই করাই আসল।