নদীর ঘাট থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বেদেদের ভাসমান বসতি
সাপ ধরা, সাপ খেলা আর শিকড়-বাকড় বিক্রির পুরোনো জীবনধারা বদলে গেছে সময়ের সঙ্গে
নিজস্ব প্রতিবেদক · ঢাকা
প্রকাশ:
একসময় গ্রামবাংলার নদীর তীরে নোঙর করা বেদেদের নৌকার বহর ছিল খুব চেনা দৃশ্য। সাপ ধরা, সাপ খেলা দেখানো, শিকড়-বাকড় ও তাবিজ-কবচ বিক্রি করে সংসার চালাতেন এই জনগোষ্ঠীর মানুষ। সময়ের পরিবর্তনে তাঁদের জীবনধারা ক্রমে বদলে গেছে। এখন নৌকার বিশাল বহর নিয়ে কোনো ঘাটে তাঁদের আর তেমন দেখা মেলে না। আধুনিকতার ছোঁয়ায় বাংলার লোকজ সংস্কৃতির একটি পরিচিত অধ্যায় হারিয়ে যেতে বসেছে। প্রয়োজনের তাড়নায় বেদেরাও বদলে ফেলেছেন জীবন-জীবিকা।
বিজ্ঞাপন
নদীতীরে একসময় সারি সারি নৌকা চোখে পড়ত। নৌকার ওপর বাঁশ, বেত ও নানা উপকরণে তৈরি ছাউনি থাকত। কোথাও কাপড় শুকাতে দেওয়া হতো, কোথাও চলত রান্নার আয়োজন, আবার কোথাও শিশুরা ছোটাছুটি করত। নৌকাকে ঘর বানিয়ে নদীর বুকেই কাটত বেদে সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন। কখনো নদীর তীরের কোনো খোলা জমি, ছায়াঘেরা গাছতলা কিংবা আমবাগানের পাশে ছাউনি তুলে তাঁরা সাময়িক বসতি গড়তেন। কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ থাকার পর জীবিকার খোঁজে আবার অন্য কোথাও পাড়ি জমাতেন। নদীর স্রোতের সঙ্গে যেন বাঁধা ছিল তাঁদের জীবন, জীবিকা ও যাযাবর সংস্কৃতি। ছোট ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া হতো না বললেই চলে।
তখন বাড়িতে সাপ ঢুকলে খবর যেত সাপুড়ের কাছে। গ্রামের মানুষের কাছে সাপুড়েরা ছিলেন পরিচিত মুখ। কাউকে সাপে কামড়ালে বিষ নামানোর জন্য চিকিৎসকের বদলে সাপুড়িদের খোঁজ করা হতো। ঘরের কোণে, খড়ের গাদায় বা রান্নাঘরের আশপাশে সাপ দেখলে অনেকেই সাপুড়েকে ডাকতেন। অভিজ্ঞ সাপুড়েরা এসে সাপটি ধরার চেষ্টা করতেন, আর তাঁদের কৌশল দেখতে আশপাশের মানুষ ভিড় জমাতেন।
সাপ ধরার পাশাপাশি সাপ খেলা দেখানোও ছিল তাঁদের জীবিকার বড় অবলম্বন। হাতে কাঠের বাক্স বা সাপ রাখার ঝুড়ি নিয়ে তাঁরা গ্রামে গ্রামে ঘুরতেন। বাড়ির উঠানে বা গ্রামের খোলা জায়গায় বিনবাঁশি বাজিয়ে সাপের খেলা দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে অর্থ ও সহায়তা পেতেন। সাপুড়ের উপস্থিতি, ঝুড়ি থেকে ফণা তোলা সাপ আর দর্শকদের কৌতূহল মিলিয়ে তৈরি হতো গ্রামীণ জীবনের এক চেনা ছবি।
সাপের উপদ্রব ঠেকাতে অনেক সাপুড়ে বাড়ির আশপাশে গাছগাছড়া দিয়ে তৈরি বিশেষ বাঁধন বা লোকজ উপকরণ রেখে যেতেন বলে প্রচলিত আছে। এগুলো সাপের প্রবেশ ঠেকাবে—এমন বিশ্বাস ছিল অনেকের। তবে এসব উপকরণের কার্যকারিতার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। সাপ এড়াতে ঘরবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং সাপ দেখা গেলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারীর সহায়তা নেওয়াই জরুরি।
বিজ্ঞাপন
শিকড়-বাকড় থেকে তাবিজ-কবচ—নানা পথেই আয় হতো বেদেদের। তাঁদের অনেকে কাছের হাটবাজারে গিয়ে শিকড়-বাকড়, গাছগাছড়া ও তাবিজ-কবচসহ নানা লোকজ সামগ্রী বিক্রি করতেন। কেউ তাবিজ-কবচ নিয়ে ঘুরতেন, কেউ বাড়ি বাড়ি গিয়ে পণ্য বেচতেন। এ কাজের সামান্য আয়েই চলত সংসার। দিন শেষে উপার্জন নিয়ে তাঁরা নৌকায় ফিরতেন, যেখানে থাকতেন দলের সর্দার। তখন প্রতিটি দলে একজন সর্দার থাকতেন, যাঁর ইশারার বাইরে কিছুই হতো না।
নদী এলাকায় কোনো আমবাগানে গড়ে ওঠা অস্থায়ী বসতির দৃশ্য ছিল বাংলার গ্রামীণ জীবনের পরিচিত অধ্যায়। বসতঘরের পাশে খোলা জায়গায় রান্নাবান্না হতো। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং পরদিনের প্রস্তুতি—সবই চলত সেখানে। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও নৌকাকেন্দ্রিক এই জীবন ছিল তাঁদের নিজস্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ।
জীবনযাত্রার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল নৌকায় বসবাস। নৌকা ছিল তাঁদের ঘর, আবার জীবিকার সন্ধানে চলাচলের প্রধান মাধ্যমও। নৌকার ভেতরে থাকত পরিবারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। নৌকার গায়ে বাঁধা বাঁশের খুঁটি, ছাউনির নিচে সাজানো সংসার, রোদে শুকাতে দেওয়া কাপড় আর পানিতে নৌকার প্রতিচ্ছবি মিলিয়ে নদীর তীরে গড়ে উঠত স্বতন্ত্র এক জনপদ।
এই জীবন ছিল প্রকৃতিনির্ভর। নদীর পানি, আবহাওয়া, নৌ-জীবন ও মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ওপর নির্ভর করেই চলত যাপন। সঙ্গে ছিল নানা অনিশ্চয়তা। শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপদ আবাসন ও স্থায়ী জীবিকার সীমাবদ্ধতা তাঁদের দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। তাই সময়ের পরিবর্তনে বদলে গেছে বেদেদের জীবন।
বিজ্ঞাপন
সময়ের সঙ্গে গ্রামবাংলার সেই চেনা দৃশ্য অনেক কমে এসেছে। বেদে সম্প্রদায়ের বহু পরিবার এখন স্থলভাগে বসবাস করছে। কেউ পেশা পাল্টেছেন, কেউ অন্য ধরনের ব্যবসা বা শ্রমের কাজে যুক্ত হয়েছেন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন, স্থায়ী আবাসনের আকাঙ্ক্ষা এবং জীবিকার নতুন সুযোগ তাঁদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনেছে।
একসময় যাঁদের নৌকার বহর ঘাটে ঘাটে দেখা যেত, সাপ ধরার জন্য যাঁদের বাড়িতে ডাকা হতো, তাঁদের সেই উপস্থিতি এখন অনেকের কাছে অতীতের স্মৃতি। তবে বেদে সম্প্রদায়ের সব পরিবার একইভাবে চলে না। অঞ্চল ও আর্থসামাজিক অবস্থাভেদে পেশা ও বসবাসের ধরনে ভিন্নতা আছে। দু-একজন সাপুড়ে এখনও নিজ গ্রামে আদি পেশা ধরে রেখেছেন।
অনেকেই বলছেন, ঐতিহ্য হারানোর আগে প্রয়োজন স্বীকৃতি। কারণ বেদে সম্প্রদায়ের জীবন শুধু সাপ খেলা বা নৌকায় বসবাসের গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার নদীকেন্দ্রিক সমাজ, লোকজ পেশা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং প্রতিকূলতার মধ্যে টিকে থাকার ইতিহাস।
এই জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ আবাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে নানাভাবে। তবে তাঁদের ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতা সংরক্ষণে আরও উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রবীণ সাপুড়ে ও বেদে পরিবারের সদস্যদের অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গ্রামবাংলার এই বিশেষ জীবনধারার গল্প জানতে পারবে।
বিজ্ঞাপন
নদী ছিল বেদেদের ঠিকানা, নৌকা ছিল ঘর, আর মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে জীবিকা অর্জন ছিল প্রতিদিনের বাস্তবতা। সেই জীবনগাথা বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের অংশ, যা বর্তমান প্রজন্ম চাইলেও আর দেখতে পায় না।