পুরুষ বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা: চার উপায়ে সমাধানের সম্ভাবনা
সন্তান না হওয়ার জন্য শুধু নারীকে দায়ী করা ঠিক নয়, প্রজনন সমস্যায় ভোগা দম্পতিদের প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রে পুরুষের সমস্যা থাকে
স্বাস্থ্য ডেস্ক · ঢাকা
প্রকাশ:
সন্তান না হলে আমাদের সমাজে বেশির ভাগ সময় নারীকেই দায়ী করা হয়। অথচ বিশ্বজুড়ে প্রজনন সমস্যায় ভোগা দম্পতিদের প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রেই পুরুষের কোনো না কোনো সমস্যা কারণ হিসেবে থাকে। বন্ধ্যত্ব বা ইনফার্টিলিটি নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই সমানভাবে হতে পারে। তাই এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
বিজ্ঞাপন
কোনো দম্পতি নিয়মিত যৌন সম্পর্কের পরও এক বছরের মধ্যে সন্তান ধারণ করতে না পারলে সেটিকে বন্ধ্যত্ব বলা হয়। পুরুষের ক্ষেত্রে শুক্রাণুর সংখ্যা, গঠন বা চলাচলের ত্রুটির কারণে গর্ভধারণে সমস্যা হতে পারে। যৌনসক্ষমতা স্বাভাবিক থাকলেও অনেক সময় পুরুষ বন্ধ্যত্বে আক্রান্ত হন।
সাধারণত সন্তান ধারণে ব্যর্থ হওয়ার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই এটি ধরা পড়ে। তবে কিছু ক্ষেত্রে শরীর আগেভাগেই ইঙ্গিত দেয়। যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়া, অণ্ডকোষে ব্যথা বা ফোলা ভাব, শরীরে হরমোনজনিত পরিবর্তন এবং মুখ বা শরীরের লোম কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে সতর্ক হওয়া জরুরি।
সঠিক চিকিৎসার জন্য আগে কারণ জানা দরকার। এ জন্য চিকিৎসকেরা সাধারণত চারটি পরীক্ষা করান। বীর্য পরীক্ষা এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; এতে শুক্রাণুর সংখ্যা, গতি, আকার ও গুণগত মান যাচাই করা হয়। রক্ত পরীক্ষায় বিভিন্ন হরমোনের মাত্রা দেখে হরমোনজনিত সমস্যা শনাক্ত করা হয়। আলট্রাসনোগ্রাফিতে দেখা হয় ভেরিকোসিল বা অন্য কোনো শারীরিক ত্রুটি আছে কি না। জিনগত কারণ সন্দেহ হলে বিশেষ ক্ষেত্রে জিনগত পরীক্ষাও করা হয়।
চিকিৎসকেরা বলছেন, পুরুষ বন্ধ্যত্ব মানেই সন্তানের আশা শেষ, এই ধারণা ঠিক নয়। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর চিকিৎসা সম্ভব। সমস্যার ধরন অনুযায়ী চারটি উপায়ে সমাধান মিলতে পারে।
বিজ্ঞাপন
প্রথম উপায় জীবনযাপনে পরিবর্তন। অনেক সময় শুধু জীবনধারা বদলালেই উল্লেখযোগ্য সুফল পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে ধূমপান ছাড়া, মাদক ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা, নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ওজন নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ কমানো।
দ্বিতীয় উপায় ওষুধ। হরমোনজনিত সমস্যা বা কিছু সংক্রমণে ওষুধ কার্যকর ভূমিকা রাখে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ খাওয়া যাবে না।
তৃতীয় উপায় অস্ত্রোপচার। ভেরিকোসিল থাকলে কিংবা শুক্রাণু পরিবহনের পথে বাধা থাকলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার সমাধান করা হয়।
চতুর্থ উপায় আধুনিক প্রজননপ্রযুক্তি। স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ সম্ভব না হলে এসব প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হয়। আইইউআই পদ্ধতিতে প্রস্তুতি শেষে শুক্রাণু সরাসরি জরায়ুতে প্রবেশ করানো হয়। ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন বা আইভিএফ পদ্ধতিতে ল্যাবরেটরিতে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন ঘটিয়ে ভ্রূণ তৈরি করা হয়। ইন্ট্রাসাইটোপ্লাজমিক স্পার্ম ইনজেকশন পদ্ধতিতে একটি শুক্রাণু সরাসরি ডিম্বাণুর ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। গুরুতর পুরুষ বন্ধ্যত্বে এটি অত্যন্ত কার্যকর।
বিজ্ঞাপন
নিচের পরিস্থিতিতে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত: এক বছর নিয়মিত অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্কের পরও সন্তান না হলে, অণ্ডকোষে ব্যথা বা ফোলা ভাব থাকলে, যৌনক্ষমতায় সমস্যা দেখা দিলে, আগে অণ্ডকোষে আঘাত লাগলে বা অস্ত্রোপচার হয়ে থাকলে এবং ক্যানসারের চিকিৎসা নিয়ে থাকলে।
পুরুষ বন্ধ্যত্ব কোনো লজ্জার বিষয় নয়, এটি পুরুষত্বের ঘাটতিরও প্রমাণ নয়। এটি একটি স্বাস্থ্য সমস্যা, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যার চিকিৎসা সম্ভব। সন্তান না হলে শুধু নারীর নয়, স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই একসঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
সামাজিক কুসংস্কার ও ভুল ধারণা দূর করে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই হওয়া উচিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে আজ অসংখ্য দম্পতি সফলভাবে সন্তান লাভ করছেন।
অনেকেই এ ধরনের সমস্যায় নানা ধরনের টোটকা ও অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করেন, এতে অকারণ কালক্ষেপণ ছাড়াও মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। সচেতনতা, সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যথাযথ বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসার মাধ্যমে পুরুষ বন্ধ্যত্বের সমাধান সম্ভব।