ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ, পদ্মা নদীতে নতুন চিত্র
ইলিশের ডিমের সময়ে মাছের আড়তে ইলিশ নেই, গবেষণা দল ৩৬ প্রজাতির মাছ পর্যবেক্ষণ করেছে
পাবনা জেলা প্রতিনিধি · পাবনা
প্রকাশ:
১৮ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আরিচা ফেরিঘাট থেকে ‘বাঘমামা’ লঞ্চ রওনা হয় এবং গন্তব্য হয় পাবনার নাজিরহাট। লঞ্চকে পদ্মা নদীর উজান ঠেলে যেতে হয়; পলি‑বালু থাকায় পানি ঘোলাটে, বর্ষার শেষ ভাগেও স্রোত তীব্র, ফলে পদ্মার বুকে চর জাগতে শুরু করেছে।
বিজ্ঞাপন
১৭ অক্টোবর বিকেলে গবেষকরা বোটে চড়ে পদ্মা নদীতে প্রবেশ করেন এবং গবেষণা প্রকল্পের দ্বিতীয় বছরের কাজ শুরু করেন। শুশুক জরিপ দল ১১ অক্টোবর খুলনার রূপসা নদী থেকে রওনা দিয়ে আরিচার পদ্মায় পৌঁছায় ১৭ অক্টোবর এবং শিবালয়ের নেহালপুর গ্রামের পাশে নোঙর করে রাত কাটায়।
মাছের রাজা ইলিশ কীভাবে বড় হয়ে রুপালি হবে, সেই সময় ও সুযোগ নিশ্চিত করা যায় কি, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ভোরবেলায় আরিচা ফেরিঘাটে মাছের আড়ত বসে এবং ১৮ অক্টোবরের দিন বিভিন্ন জাতের মাছ দেখা যায়, যার মধ্যে বড় আকারের চিতল, পাঙাস, ছোট পিয়ালি ও পাবদা মাছ অন্তর্ভুক্ত। জরিপে মোট ৩৬ প্রজাতির পদ্মা-নদীর মাছ পাওয়া যায় এবং আড়তের মালিকেরা উঁচুগলায় মাছের দর হেঁকেন।
জরিপের সময় হঠাৎ চোখ আটকে গেল মাছের একটি খাঁড়ির পাশে, যেখানে দক্ষিণ আমেরিকার সাকার ফিশ আরিচার মাছের আড়তে দেখা যায়; এটি পদ্মা নদীতেও পৌঁছেছে বলে গবেষকরা চমকে উঠলেন।
অক্টোবরের ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে; ডিমের সময়ে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করার ফলে আড়তে ইলিশ নেই এবং ছোট বরফকলটিও বন্ধ। কয়েকজন দোকানির মতে, এই মাসে আড়তে ইলিশ আর উঠবে না এবং প্রশাসন নজরদারি করছে, যা ইলিশের রুপালি হওয়ার সুযোগ বাড়াবে।
বিজ্ঞাপন
রাতে পদ্মার চেহারায় বড় পরিবর্তন আসে; সন্ধ্যা থেকে স্রোতস্বিনী জলে জেলেদের সমাগম বাড়ে এবং ইলিশ ধরার ফাঁস জালে ভরে ওঠে। স্পিডবোটে মাঝেমধ্যে টহল দল আসে, জেলেরা সটকে পড়ে, আবার ফিরে এসে ফেলে রাখা জালের পাশে শিকারের কাজ চালিয়ে যায়। ফজরের আজানের পর জেলেরা শিবালয়ের নেহালপুর ও তেউতা গ্রামের আশপাশের নদীর পাড়ে এসে ইলিশ বিক্রি করে।
দৌলতদিয়া ফেরিঘাট থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার পশ্চিমে পদ্মা নদীর দক্ষিণ পাড়ে চরভরাট গ্রাম অবস্থিত, যেখানে ছোট খেয়াঘাটের পাশে মাছের বাজার আছে। জেলেরা নৌকে বা নদীর পাড়ে তোলা জাল দিয়ে ইলিশ শিকারে যুক্ত, এবং বেশির ভাগ জাল 'কারেন্ট' জাল।
বেশির ভাগই বাচ্চা ইলিশ, পাঁচ-ছয় ইঞ্চি লম্বা; দু-একটি দেখা যায় ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের। বড় ইলিশের পেটে ডিম থাকে এবং গড়ে প্রতি কেজি ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়। দুপুর ১২টা বেজে যাওয়ার সাথে সাথে ভোরের তুলনায় জেলেদের উপস্থিতি কমে যায়, দু-একটি নৌকা ঘাটে ভিড়ে, এবং ক্রেতারা জেলেদের কাছ থেকে মাছ কিনে কলাপাতায় ঢাকা ঝুড়িতে সংরক্ষণ করে।
ইলিশের জন্য জেলেরা যে জাল ব্যবহার করে, তা সবই 'কারেন্ট' জাল; এক ইঞ্চি, দেড় ইঞ্চি এবং দুই ইঞ্চি ফাঁসের তিনটি স্তরের জাল একের ওপর অন্যটি স্তরে বেঁধে থাকে। এই জাল ভেদ করে মা অথবা পোনা ইলিশ বেঁচে থাকে না এবং দেশের মধ্যে এই ধরনের কারেন্ট জাল নিষিদ্ধ।
বিজ্ঞাপন
চারভরাট গ্রামের তরুণ জেলে হোসেন মিয়া, খালি গা, গলায় গামছা, তৎক্ষণাৎ সঙ্গে হাঁটছিলেন। গত রাতে ইলিশের ধরার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার সময় তার মুখে নেতিবাচক অভিব্যক্তি ফুটে উঠে, "ক্যাল রাইতে মাত্র আড়াই কেজি ছোট ইলিশ পাইচিলাম।" তিনি জবাব দিলেন, "ছার, জানি না, মনে হয় ভাটি থাইক্কা কোনো ইলিশ এদিকে আইতে পারে না। ওই দিকে জাল আরও বেশি,"
মাছের রাজা ইলিশ কীভাবে বড় হয়ে রুপালি হবে, তা নিয়ে গবেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন। এম এ আজিজ, অধ্যাপক প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়