নওগাঁয় আমবাগান বাড়ায় কর্মসংস্থান সংকটে কৃষিশ্রমিক দম্পতি
ফসলি জমি কমে আমবাগান হওয়ায় সাপাহারের সাঁওতাল দম্পতির আয়ের পথ সংকুচিত হচ্ছে
নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি · সাপাহার, নওগাঁ
প্রকাশ:
নওগাঁর সাপাহার উপজেলার ফুরকুটিডাংগা গ্রামের বাসিন্দা রমেশ বাস্কী ও তাঁর স্ত্রী মারিয়া মুর্মু। সম্প্রতি তাঁদের দেখা যায় সড়কের পাশের একটি আমগাছে উঠে ডাল কাটছেন রমেশ, আর নিচে দাঁড়িয়ে সেই ডালগুলো জড়ো করছেন মারিয়া। বাগানমালিকের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে রান্নার লাকড়ি সংগ্রহ করছেন তাঁরা। একসময় যে মাঠে তাঁরা ধান রোপণ, কাটা ও মাড়াইয়ের কাজে ব্যস্ত থাকতেন, এখন সেই মাঠের বড় অংশ জুড়ে গড়ে উঠেছে আমবাগান। ফলে কৃষিশ্রমিকের কাজ কমে যাওয়ায় আমের মৌসুম শেষ হলে কাজের সন্ধানে তাঁদের অন্যের জমিতে ছুটতে হয় এবং সারা বছর কাজ মেলে না।
বিজ্ঞাপন
মারিয়া (২৬) ও তাঁর স্বামী রমেশ (৩০) সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মানুষ এবং পেশায় কৃষিশ্রমিক। তাঁদের নিজস্ব কোনো আবাদি জমি নেই, কেবল বসতভিটা রয়েছে। দুই মেয়েকে নিয়ে তাঁদের চার সদস্যের সংসার, যার মধ্যে বড় মেয়ের বয়স ছয় বছর ও ছোট মেয়ের বয়স মাত্র তিন মাস। মারিয়ার উপার্জন বন্ধ থাকলে স্বামীর একার আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফুরকুটিডাংগায় কথা বলার সময় মারিয়া জানান, দিন যত যাচ্ছে সংসার চালানো তত কঠিন হচ্ছে। তিনি বলেন, “আগে দুজনের আয় দিয়ে কোনো রকমে চলে যেত। এখন তো এলাকায় কাজই নাই। তিন বেলা শাক-ভাত জোটানোর ব্যবস্থাও হয় না।”
বিয়ের পর চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার জাতাহার গ্রামের বাবার বাড়ি থেকে সাপাহারে আসেন মারিয়া। তখন আশপাশের মাঠে আমন ও বোরো ধানসহ নানা ফসলের চাষ হতো, যেখানে কৃষিশ্রমিকেরা সারা বছর কাজের সুযোগ পেতেন। মারিয়া স্মৃতিচারণ করে বলেন, “যখন বিয়া হয়ে স্বামীর বাড়িত আসি, তখন গাঁয়ের আশপাশের মাঠত বর্ষালি ধান ও ইরি আবাদ হতো। তখন বছরের চার-পাঁচ মাস ধান লাগানো, কাটা-মাড়াইয়ের কাজ থাকত। আবার মাঠত সারা বছর অন্যান্য আবাদও হতো। কিন্তু দেখতে দেখতে এলাকার সব মাঠ আমবাগান হয়ে গেল। এখন আর মাঠত আবাদ তেমন নাই। লোকজন কামত নেয় না।”
বর্তমানে মারিয়া আম পাড়ার মৌসুমে ৪০ থেকে ৫০ দিন কাজ পান, যেখানে দৈনিক মজুরি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। এতে আমের মৌসুমে তাঁদের আয় হয় ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। অথচ আগে ধানের আবাদের সময় চার-পাঁচ মাসের কৃষিকাজ থেকে তাঁদের আয় হতো প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। আম পাড়ার কাজ শেষ হলে উপার্জনের পথ আরও সংকুচিত হয়ে পড়ে। তখন অন্যের ধানখেতে কাজ খোঁজা ছাড়া উপায় থাকে না, কিন্তু ধানের আবাদ কমে যাওয়ায় সেই কাজও আগের মতো মেলে না। তিন মাসের শিশুকে সামলে কাজ করা তাঁদের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্যমতে, সাপাহার ও পোরশা উপজেলার ফসলি মাঠের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ এখন আমবাগান। কৃষি বিভাগের চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিলের হিসাব অনুযায়ী, সাপাহার ও পোরশায় প্রায় ২১ হাজার ৫০০ হেক্টর এবং পুরো জেলায় ৩০ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে আমবাগান রয়েছে। রমেশ বাস্কী জানান, আমবাগানে পরিচর্যা ও সেচের জন্য কিছু শ্রমিকের প্রয়োজন হলেও ধানের আবাদের প্রতিটি ধাপে যে পরিমাণ শ্রমিকের দরকার হয়, তার তুলনায় কাজের সুযোগ অনেক কমে গেছে।
বিজ্ঞাপন
নিজের এলাকায় কাজ না পেলে রমেশ জীবিকার সন্ধানে দূরে পাড়ি জমান। কখনো রাজশাহী গিয়ে পানের বরজে কাজ করেন, আবার কখনো পঞ্চগড়ে পাথর তোলার কাজ করেন। এসব কাজের কোনো নিশ্চয়তা নেই এবং প্রতিদিন কাজও মেলে না, যদিও দৈনিক মজুরি প্রায় ৬০০ টাকা। ফলের বাগান বাড়লেও কৃষিশ্রমিকদের সারা বছরের কাজের নিশ্চয়তা তৈরি হয়নি। নিজের আবাদি জমি না থাকায় অন্যের জমিতে শ্রম বিক্রি করেই চলছে এই দম্পতির সংসার।
এত অনিশ্চয়তার মধ্যেও মারিয়া তাঁর আনন্দ খুঁজে নেন সম্প্রদায়ের উৎসবগুলোতে। তিনি বলেন, “সৎভাবে পরিশ্রম করে উপার্জন করে স্বামী-সন্তানের মুখেত দুবেলা খাবার জোটলেই হামরা অনেক খুশি। এর বাইরে বছরের বিভিন্ন সময় হামাগের পালাপার্বণে সবাই মিলে আনন্দ করি। বিশেষ করে অগ্রহায়ণ মাসে সোহরাই আর ভাদ্র মাসে ডালপূজা বা কারামপূজার সময় অনেক আনন্দ হয়। এই দুইটা উৎসবের জন্য হামাগের সম্প্রদায়ের মানুষ সারা বছর অপেক্ষা করে।”
বড় মেয়ে গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। দুই মেয়েকে লেখাপড়া করানোর স্বপ্ন দেখেন মারিয়া। তিনি বলেন, “হামাগের বাপ-দাদা, মা-চাচিরা অন্যের জমিত কৃষিকাজ করে খাইছে। এখন হামরাও সেটাই করোছি। এসব কাজ করে তো উন্নতি হছে না। সামর্থ্য থাকলে মেয়ে দুটাক লেখাপড়া করাতে চাই। লেখাপড়া করাতে পারলে ওরা হয়তো চাকরি-বাকরি করে নিজের জীবনে উন্নতি করতে পারবে।”