ভুনা খিচুড়ি রেসিপি: বৃষ্টির দিনে মাংস দিয়ে ঝরঝরে খিচুড়ি
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
আকাশ কালো হয়ে বৃষ্টি নামলেই বাঙালির রান্নাঘর থেকে খিচুড়ির ঘ্রাণ ভেসে আসে। কারও পছন্দ নরম ল্যাটকা খিচুড়ি, ডিম ভাজা আর বেগুনভাজার সঙ্গে; কারও পছন্দ ভুনা খিচুড়ি, যেখানে প্রতিটি চাল-ডালের দানা আলাদা থাকে আর মাঝে মাঝে মসলাদার মাংসের টুকরা।
বিজ্ঞাপন
ভুনা খিচুড়ি রেসিপির রহস্য পানির মাপে। ল্যাটকা খিচুড়িতে পানি বেশি দিয়ে গলিয়ে রান্না হয়, আর ভুনা খিচুড়িতে পানি মাপা থাকে, চাল-ডাল আগে তেলে ভালো করে ভাজা হয়। মুগ ডাল শুকনো কড়াইয়ে টেলে নিলে ঘ্রাণ বাড়ে এবং ডাল গলে যায় না। মাংস আলাদা করে ভুনা করে শেষে খিচুড়ির সঙ্গে মিশিয়ে দমে রাখলে দুটির স্বাদই ঠিক থাকে।
নিচের পরিমাণে পাঁচ থেকে ছয়জনের খিচুড়ি হবে। মাংস না থাকলে একই পদ্ধতিতে ডিম খিচুড়ি করা যায়, সেই পদ্ধতিও আলাদা করে দেওয়া আছে।
খিচুড়ি রান্নার উপকরণ
খিচুড়ির জন্য: পোলাওয়ের চাল বা চিনিগুঁড়া দুই কাপ (চাইলে নাজিরশাইল), মুগ ডাল এক কাপ, মসুর ডাল আধা কাপ (ঐচ্ছিক), পেঁয়াজকুচি এক কাপ, আদাবাটা এক টেবিল-চামচ, রসুনবাটা দুই চা-চামচ, হলুদ গুঁড়া এক চা-চামচ, মরিচের গুঁড়া এক চা-চামচ, জিরা গুঁড়া এক চা-চামচ, তেজপাতা দুটি, এলাচ তিনটি, দারুচিনি দুই টুকরা, লবঙ্গ তিনটি, কাঁচা মরিচ আট-দশটি, তেল আধা কাপ, ঘি দুই টেবিল-চামচ, লবণ স্বাদমতো, গরম পানি প্রয়োজনমতো।
বিজ্ঞাপন
গরুর মাংস ভুনার জন্য: হাড়সহ বা হাড় ছাড়া গরুর মাংস ৭৫০ গ্রাম, পেঁয়াজকুচি এক কাপ, আদাবাটা দেড় টেবিল-চামচ, রসুনবাটা এক টেবিল-চামচ, হলুদ আধা চা-চামচ, মরিচের গুঁড়া দেড় চা-চামচ, ধনে গুঁড়া এক চা-চামচ, জিরা গুঁড়া এক চা-চামচ, গরম মসলা গুঁড়া আধা চা-চামচ, টক দই দুই টেবিল-চামচ, তেল আধা কাপ, লবণ স্বাদমতো।
গরুর মাংসের ভুনা আগে সেরে নিন
মাংস মাঝারি টুকরা করে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিন। তেল গরম করে পেঁয়াজ বাদামি হওয়া পর্যন্ত ভাজুন। এরপর আদা-রসুনবাটা, সব গুঁড়া মসলা আর সামান্য পানি দিয়ে মসলা কষান, যতক্ষণ না তেল আলাদা হয়ে আসে।
মাংস আর দই দিয়ে বড় আঁচে কিছুক্ষণ নেড়ে কষান, তারপর ঢেকে কম আঁচে রান্না করুন। মাংসের পানিতেই সেদ্ধ হতে থাকবে; প্রয়োজনে অল্প অল্প গরম পানি দিন। গরুর মাংস নরম হতে সাধারণত এক থেকে দেড় ঘণ্টা লাগে, প্রেশার কুকারে কম। মাংস নরম হলে ঢাকনা খুলে নাড়তে নাড়তে ঝোল শুকিয়ে মাখা মাখা ভুনা করে নিন। শেষে গরম মসলা গুঁড়া ছড়িয়ে দিন।
বিজ্ঞাপন
খিচুড়ির জন্য মাংস একেবারে শুকনো না করে সামান্য ঘন ঝোল রাখুন। এই ঝোল খিচুড়িতে স্বাদ ছড়িয়ে দেবে।
খিচুড়ি রান্নার নিয়ম ধাপে ধাপে
১. ডাল টেলে নেওয়া: শুকনো কড়াইয়ে মুগ ডাল কম আঁচে নেড়ে নেড়ে হালকা বাদামি ও সুগন্ধি হওয়া পর্যন্ত টেলে নিন। পুড়তে দেবেন না। ঠান্ডা হলে ধুয়ে নিন। মসুর ডাল টালতে হয় না।
২. চাল-ডাল ভেজানো: চাল আর দুই ডাল একসঙ্গে ধুয়ে ২০ থেকে ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রেখে পানি ঝরিয়ে নিন।
বিজ্ঞাপন
৩. ফোড়ন ও মসলা: হাঁড়িতে তেল গরম করে তেজপাতা, এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ ফোড়ন দিন। পেঁয়াজকুচি দিয়ে সোনালি করে ভাজুন। আদা-রসুনবাটা, হলুদ, মরিচ, জিরা গুঁড়া আর সামান্য পানি দিয়ে মসলা কষান।
৪. চাল-ডাল ভাজা: ঝরানো চাল-ডাল মসলায় দিয়ে মাঝারি আঁচে সাত থেকে আট মিনিট ভাজুন। এটিই ভুনা খিচুড়ির আসল ধাপ। চাল-ডাল মসলা শুষে নিয়ে ঝরঝরে আর চকচকে দেখাবে।
৫. পানি মাপ: চাল-ডাল মিলিয়ে যত কাপ, ভুনা খিচুড়ির জন্য সাধারণত তার প্রায় দ্বিগুণ গরম পানি লাগে। এখানে সাড়ে তিন কাপ চাল-ডালের জন্য মোটামুটি সাত কাপ। ল্যাটকা খিচুড়ি চাইলে পানি আরও দুই-তিন কাপ বাড়িয়ে দিন। লবণ দিয়ে চেখে নিন।
৬. রান্না: ফুটে উঠলে আঁচ মাঝারি করে ঢেকে দিন। মাঝে মাঝে তলা থেকে আলতো করে নাড়ুন, যাতে ডাল লেগে না যায়। পানি প্রায় শুকিয়ে এলে চাল-ডাল সেদ্ধ হয়েছে কি না দেখে নিন।
বিজ্ঞাপন
৭. মাংস মেশানো ও দম: ভুনা মাংস ঝোলসহ খিচুড়িতে দিয়ে আলতো করে মিশিয়ে দিন। কাঁচা মরিচ আর ঘি ছড়িয়ে ঢাকনা দিন। তাওয়ার ওপর হাঁড়ি রেখে সবচেয়ে কম আঁচে ১৫ মিনিট দমে রাখুন।
ডিম খিচুড়ি: মাংস ছাড়া সহজ বিকল্প
পাঁচ-ছয়টি ডিম সেদ্ধ করে খোসা ছাড়িয়ে গায়ে ছুরি দিয়ে হালকা দাগ কাটুন। সামান্য লবণ, হলুদ আর মরিচের গুঁড়া মেখে তেলে লালচে করে ভেজে নিন। ওপরের নিয়মে খিচুড়ি রান্না করুন, শুধু মাংসের ধাপ বাদ দিন। পানি শুকিয়ে এলে ভাজা ডিমগুলো খিচুড়ির ভেতরে গুঁজে দিয়ে ঘি আর কাঁচা মরিচ ছড়িয়ে দমে রাখুন।
ডিম খিচুড়িতে আলু, ফুলকপি বা মটরশুঁটি দিলে পুষ্টি আর স্বাদ দুটোই বাড়ে। সবজি ছোট টুকরা করে চাল-ডাল ভাজার সময় দিয়ে দিন।
বিজ্ঞাপন
সঙ্গে কী খাবেন, কিছু জরুরি টিপস
ভুনা খিচুড়ির সঙ্গে বেগুনভাজা, ইলিশ ভাজা, ডিম ভাজা, আলুভর্তা, শসা-পেঁয়াজের সালাদ আর আচার জমে যায়। গরুর মাংসের খিচুড়ির সঙ্গে লেবু আর কাঁচা পেঁয়াজ রাখলে খেতে ভারী লাগে না।
টিপস: মুগ ডাল না টাললে খিচুড়িতে কাঁচা গন্ধ থাকে। চাল-ডাল ভাজার ধাপ সংক্ষেপ করবেন না, এতেই দানা আলাদা থাকে। পানি সবসময় গরম দিন; ঠান্ডা পানি দিলে চাল ফেটে যায় এবং রান্নায় সময় লাগে। খিচুড়ি ঠান্ডা হলে ঘন হয়ে যায়, তাই পরিবেশনের ঠিক আগে দম থেকে নামান।
মাংস ভুনা আগের দিন রান্না করে ফ্রিজে রেখে দিলে খিচুড়ির দিনে কাজ অর্ধেক হয়ে যায়। বৃষ্টির দিনে হঠাৎ খিচুড়ির ইচ্ছা হলে এই কৌশল খুব কাজে লাগে। কোরবানির পর জমিয়ে রাখা মাংস দিয়েও এই খিচুড়ি চমৎকার হয়, শুধু ফ্রিজ থেকে বের করে পুরোপুরি গলিয়ে নিয়ে রান্না শুরু করুন।
বিজ্ঞাপন
ডাল আর চালের অনুপাত রুচিভেদে বদলানো যায়। ডাল বেশি দিলে খিচুড়ি পুষ্টিকর হয় কিন্তু কিছুটা ভারী লাগে; সাধারণত চালের অর্ধেক থেকে সমান পরিমাণ ডাল বেশির ভাগ পরিবারে পছন্দের।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ভুনা খিচুড়িতে কোন চাল সবচেয়ে ভালো?
পোলাওয়ের চিনিগুঁড়া বা কালিজিরা চালে ঘ্রাণ বেশি হয়। মোটা বা নাজিরশাইল চালেও ভালো হয়, তবে পানি কিছুটা বাড়াতে হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
খিচুড়ি তলায় লেগে যায় কেন?
আঁচ বেশি থাকলে, পাতলা হাঁড়ি ব্যবহার করলে বা পানি শুকানোর সময় না নাড়লে তলায় লাগে। ভারী তলার হাঁড়ি আর দমের সময় তাওয়া ব্যবহার করুন।
মুরগির মাংস দিয়ে কি একই নিয়মে হয়?
হ্যাঁ। মুরগি দ্রুত সেদ্ধ হয়, তাই ভুনার সময় কম লাগবে। মুরগির খিচুড়িতে আলু দিলে আরও ভালো লাগে।
বিজ্ঞাপন
খিচুড়ি কি পরের দিন খাওয়া যায়?
ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখলে পরের দিন খাওয়া যায়। গরম করার সময় অল্প গরম পানি ছিটিয়ে ঢেকে কম আঁচে গরম করুন। বারবার গরম-ঠান্ডা করবেন না।
নরম ল্যাটকা খিচুড়ি করতে চাইলে কী বদলাব?
চাল-ডাল ভাজার সময় কমিয়ে দুই-তিন মিনিট করুন, আর পানি চাল-ডালের তিন থেকে চার গুণ দিন। মসুর ডালের পরিমাণ বাড়ালে খিচুড়ি তাড়াতাড়ি গলে মাখা মাখা হয়। ল্যাটকা খিচুড়িতে মাংসের বদলে সবজি আর ডিম ভাজা বেশি মানায়। পরিবেশনের সময় ওপরে এক চামচ ঘি দিলে স্বাদ বাড়ে।