ইন্টারনেট কি এবং কিভাবে কাজ করে: সহজ ভাষায় বুঝে নিন
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
ফোনে একটা ভিডিও চালু করলেন, আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হাজার কিলোমিটার দূরের কোনো সার্ভার থেকে ছবি আর শব্দ এসে পৌঁছাল আপনার হাতে। মাঝখানে কী ঘটল? এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে ইন্টারনেটের রহস্য।
বিজ্ঞাপন
ইন্টারনেট হলো পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কম্পিউটার নেটওয়ার্কের একটি বিশাল সংযোগব্যবস্থা। একে বলা হয় "নেটওয়ার্কের নেটওয়ার্ক"। আপনার বাসার ওয়াইফাই একটি ছোট নেটওয়ার্ক, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটারগুলো আরেকটি, একটি মোবাইল অপারেটরের ব্যবস্থা আরেকটি। এই সব নেটওয়ার্ক একটি সাধারণ নিয়ম মেনে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়েই তৈরি করেছে ইন্টারনেট।
এর মালিক কোনো একক দেশ বা প্রতিষ্ঠান নয়। বিভিন্ন দেশের সরকার, টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান, ইন্টারনেট সেবাদাতা ও বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নিজেদের অংশ চালায়, আর সবাই মেনে চলে কিছু সাধারণ প্রযুক্তিগত নিয়ম। এ কারণেই ঢাকার একটি মোবাইল ফোন আমেরিকা বা জাপানের একটি সার্ভারের সঙ্গে নির্বিঘ্নে কথা বলতে পারে।
সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
ইন্টারনেটের শুরু ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৬৯ সালে আরপানেট নামের একটি গবেষণা নেটওয়ার্কে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার যুক্ত করা হয়। পরে টিসিপি/আইপি নামের যোগাযোগের নিয়ম চালু হলে ভিন্ন ভিন্ন নেটওয়ার্ক একে অপরের সঙ্গে সহজে যুক্ত হতে পারল।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ মানুষের কাছে ইন্টারনেট জনপ্রিয় হয় ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব আসার পর। ১৯৮৯ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী টিম বার্নার্স-লি ইউরোপের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সার্নে কাজ করার সময় এর ধারণা দেন। ওয়েবের মাধ্যমেই লিংকে ক্লিক করে এক পাতা থেকে আরেক পাতায় যাওয়ার সুবিধা আসে, যা আজকের ওয়েবসাইটের ভিত্তি।
একটা বিষয় মনে রাখা দরকার: ইন্টারনেট আর ওয়েব এক নয়। ইন্টারনেট হলো সংযোগের অবকাঠামো, রাস্তার মতো। ওয়েব সেই রাস্তায় চলা অনেক সেবার একটি। ইমেইল, ভিডিও কল, অনলাইন গেম, মোবাইল অ্যাপের তথ্য আদান-প্রদানও একই রাস্তা ব্যবহার করে।
ইন্টারনেট কিভাবে কাজ করে
একটি উদাহরণ ধরে পুরো যাত্রাটা দেখা যাক। ধরুন আপনি ফোনে একটি সংবাদ ওয়েবসাইট খুললেন।
বিজ্ঞাপন
১. ঠিকানা খোঁজা: আপনি ওয়েবসাইটের নাম লিখলেন, কিন্তু কম্পিউটার বোঝে সংখ্যা। তাই প্রথমে ডিএনএস নামের একটি ব্যবস্থা নামটিকে একটি সংখ্যাভিত্তিক ঠিকানায় রূপান্তর করে, যাকে বলে আইপি অ্যাড্রেস। এটি অনেকটা ফোনবুকে নাম দেখে নম্বর বের করার মতো।
২. অনুরোধ পাঠানো: আপনার ফোন ওই আইপি ঠিকানার সার্ভারের কাছে পাতাটি চেয়ে অনুরোধ পাঠায়। অনুরোধটি প্রথমে যায় আপনার মোবাইল অপারেটর বা ব্রডব্যান্ড সেবাদাতার কাছে।
৩. প্যাকেটে ভাগ: সার্ভার পাতাটির লেখা, ছবি, ভিডিও সব ছোট ছোট টুকরায় ভাগ করে পাঠায়। এই টুকরাগুলোকে বলে ডেটা প্যাকেট। প্রতিটি প্যাকেটে লেখা থাকে কোথা থেকে এসেছে, কোথায় যাবে এবং পুরো তথ্যের কোন অংশ।
৪. পথ খোঁজা: পথে থাকা রাউটার নামের যন্ত্রগুলো প্রতিটি প্যাকেটকে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে দেয়। বিভিন্ন প্যাকেট ভিন্ন ভিন্ন পথেও যেতে পারে, অনেকটা একই গন্তব্যের যাত্রীদের আলাদা রাস্তায় যাওয়ার মতো।
বিজ্ঞাপন
৫. জোড়া লাগানো: সব প্যাকেট আপনার ফোনে পৌঁছালে সেগুলো ঠিক ক্রমে সাজিয়ে পুরো পাতা দেখানো হয়। কোনো প্যাকেট হারিয়ে গেলে সেটি আবার চেয়ে নেওয়া হয়।
এই পুরো প্রক্রিয়া ঘটে চোখের পলকে। ধীর ইন্টারনেটে পাতা লোড হতে দেরি হওয়া মানে প্যাকেটগুলো আসতে বেশি সময় নিচ্ছে।
একই নিয়মে চলে ভিডিও কলও। আপনার মুখের ছবি আর কণ্ঠ প্রতি মুহূর্তে প্যাকেটে ভাগ হয়ে অন্য প্রান্তে যাচ্ছে, আর ওপাশের ছবি আসছে আপনার কাছে। সংযোগ দুর্বল হলে কিছু প্যাকেট দেরিতে পৌঁছায়, তখন ছবি আটকে যায় বা কথা কেটে কেটে আসে। ওয়েবসাইটের ঠিকানার শুরুতে এইচটিটিপিএস আর তালার চিহ্ন থাকলে বুঝবেন, পথে থাকা প্যাকেটগুলো সাংকেতিক ভাষায় সুরক্ষিত, অন্য কেউ মাঝপথে পড়তে পারবে না।
তথ্য কোন পথে চলে
বিজ্ঞাপন
অনেকে ভাবেন ইন্টারনেট বুঝি আকাশ দিয়ে, স্যাটেলাইটে চলে। বাস্তবে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেটের বড় অংশ চলে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে বিছানো সাবমেরিন কেবলে। এগুলো আলোর সংকেত বহনকারী অপটিক্যাল ফাইবারের তার, যা মহাদেশগুলোকে যুক্ত করেছে।
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ইন্টারনেটে যুক্ত সাবমেরিন কেবল এবং স্থলপথের কেবলের মাধ্যমে। কক্সবাজারে ও পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় সাবমেরিন কেবলের ল্যান্ডিং স্টেশন আছে। সেখান থেকে দেশের ভেতরে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক হয়ে ইন্টারনেট পৌঁছায় মোবাইল টাওয়ার ও ব্রডব্যান্ড সেবাদাতাদের কাছে। শেষ ধাপে আপনার বাসায় আসে তার দিয়ে, আর মোবাইলে আসে টাওয়ার থেকে বেতার তরঙ্গে।
এ কারণেই কখনো সাবমেরিন কেবলের রক্ষণাবেক্ষণ চললে বা কোথাও কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো দেশে ইন্টারনেটের গতি কমে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। তখন বিকল্প পথে তথ্য পাঠানো হয়, কিন্তু সেই পথের সক্ষমতা সীমিত হলে ভিড় বাড়ে।
স্যাটেলাইট ইন্টারনেটও আছে, যা দুর্গম এলাকা বা জাহাজে কাজে লাগে। তবে বেশির ভাগ দৈনন্দিন ব্যবহারের ভার এখনো বহন করে মাটির নিচ ও সমুদ্রের তলার তার।
বিজ্ঞাপন
দৈনন্দিন জীবনে ইন্টারনেটের ব্যবহার
ইন্টারনেটের ব্যবহার এখন জীবনের প্রায় প্রতিটি কোণে।
১. যোগাযোগ: ইমেইল, ভিডিও কল, মেসেজিং অ্যাপে দূরের মানুষের সঙ্গে মুহূর্তে কথা।
২. শিক্ষা: অনলাইন ক্লাস, ভিডিও লেকচার, ই-বুক, ভর্তি ও পরীক্ষার ফল জানা।
বিজ্ঞাপন
৩. সরকারি সেবা: জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন, জন্ম নিবন্ধন, পাসপোর্ট ও নানা ভাতার আবেদন এখন অনলাইনে।
৪. ব্যবসা ও আয়: অনলাইন দোকান, ফ্রিল্যান্সিং, কৃষিপণ্যের বাজার খোঁজা।
৫. আর্থিক লেনদেন: মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন ব্যাংকিং, বিল পরিশোধ।
৬. স্বাস্থ্য: হাসপাতালের অ্যাপয়েন্টমেন্ট, টেলিমেডিসিনে চিকিৎসকের পরামর্শ।
বিজ্ঞাপন
৭. বিনোদন ও তথ্য: খবর, ভিডিও, গান, খেলা।
ইন্টারনেট কেন প্রয়োজন, আর ঝুঁকি কোথায়
আজ ইন্টারনেট বিদ্যুৎ বা সড়কের মতোই মৌলিক অবকাঠামো। যে শিক্ষার্থী অনলাইনে তথ্য খুঁজতে পারে, যে কৃষক মোবাইলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখেন, যে উদ্যোক্তা অনলাইনে পণ্য বিক্রি করেন, তাঁরা সবাই এগিয়ে থাকেন। তাই ইন্টারনেট ব্যবহারের দক্ষতা এখন সাক্ষরতার মতোই জরুরি।
তবে সুবিধার পাশাপাশি ঝুঁকিও আছে। ভুয়া খবর ও গুজব দ্রুত ছড়ায়, প্রতারকেরা ফাঁদ পাতে, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হয়, আর অতিরিক্ত ব্যবহারে ঘুম ও মনোযোগের ক্ষতি হয়, বিশেষ করে শিশুদের। কোনো খবর শেয়ারের আগে উৎস যাচাই করা, পাসওয়ার্ড ও ওটিপি গোপন রাখা এবং শিশুদের ব্যবহারে নজর রাখা, এই তিনটি অভ্যাস ইন্টারনেটকে নিরাপদ রাখে।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ইন্টারনেট আর ওয়াইফাই কি একই জিনিস?
না। ওয়াইফাই হলো তার ছাড়া যন্ত্রগুলোকে একটি রাউটারের সঙ্গে যুক্ত করার প্রযুক্তি। রাউটার ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত থাকলে তবেই ওয়াইফাই দিয়ে ইন্টারনেট পাওয়া যায়।
ইন্টারনেটের মালিক কে?
বিজ্ঞাপন
কেউ একা নয়। বিভিন্ন দেশের টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান, সেবাদাতা ও সংস্থা নিজ নিজ অংশ পরিচালনা করে, আর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ঠিকানা ও প্রযুক্তিগত মানদণ্ড সমন্বয় করে।
এমবি আর জিবি মানে কী?
এগুলো তথ্যের পরিমাণের একক। এক জিবি মোটামুটি এক হাজার এমবির সমান। ভিডিও দেখায় বেশি ডেটা খরচ হয়, লেখা পড়ায় কম।
ইন্টারনেট স্পিড কম হয় কেন?
বিজ্ঞাপন
নেটওয়ার্কে ভিড়, দুর্বল সিগন্যাল, পুরোনো রাউটার বা ফোন, কিংবা আন্তর্জাতিক সংযোগে সমস্যার কারণে গতি কমতে পারে। সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে সেবাদাতাকে জানান।
ইন্টারনেট চালাতে কী কী লাগে?
একটি যন্ত্র, যেমন মোবাইল, কম্পিউটার বা ট্যাবলেট, আর একটি সংযোগ, যেমন মোবাইল ডেটা প্যাক বা ব্রডব্যান্ড লাইনের সঙ্গে যুক্ত ওয়াইফাই। সঙ্গে লাগে ব্রাউজার বা প্রয়োজনীয় অ্যাপ। সংযোগের খরচ সেবাদাতা ও প্যাকেজভেদে আলাদা।