সাইয়্যেদুল ইস্তেগফার: উচ্চারণ, অর্থ ও সকাল-সন্ধ্যায় পড়ার ফজিলত
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
ক্ষমা চাওয়ার অনেক দোয়া আছে, কিন্তু মহানবী (সা.) একটি দোয়াকে নিজেই নাম দিয়েছেন "সাইয়্যেদুল ইস্তেগফার", অর্থাৎ ইস্তেগফারের সরদার বা ক্ষমা প্রার্থনার শ্রেষ্ঠ দোয়া। সহিহ বুখারিতে হজরত শাদ্দাদ ইবনে আওস (রা.) থেকে দোয়াটি বর্ণিত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এর ফজিলতও একই হাদিসে বলা আছে। যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে দিনের বেলা এটি পড়বে এবং সন্ধ্যা হওয়ার আগে মারা যাবে, সে জান্নাতিদের অন্তর্ভুক্ত। আর যে রাতে দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে পড়বে এবং সকাল হওয়ার আগে মারা যাবে, সে-ও জান্নাতিদের অন্তর্ভুক্ত। এ কারণে আলেমরা সকালে ও সন্ধ্যায় একবার করে দোয়াটি পড়ার পরামর্শ দেন।
দোয়াটি এক মিনিটেরও কম সময়ে পড়া যায়। নিচে আরবি, বাংলা উচ্চারণ, অর্থ এবং প্রতিটি বাক্যের তাৎপর্য দেওয়া হলো।
সাইয়্যেদুল ইস্তেগফার আরবি
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ، وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي، فَاغْفِرْ لِي، فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
বিজ্ঞাপন
বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আনতা রাব্বি, লা ইলাহা ইল্লা আনতা, খালাকতানি ওয়া আনা আবদুকা, ওয়া আনা আলা আহদিকা ওয়া ওয়া'দিকা মাসতাতা'তু, আউজু বিকা মিন শাররি মা সানা'তু, আবুউ লাকা বিনি'মাতিকা আলাইয়া, ওয়া আবুউ লাকা বিজাম্বি, ফাগফিরলি, ফাইন্নাহু লা ইয়াগফিরুজ জুনুবা ইল্লা আনতা।
অর্থ: হে আল্লাহ, তুমিই আমার রব, তুমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছ, আর আমি তোমার বান্দা। আমি সাধ্যমতো তোমার সঙ্গে করা অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির ওপর আছি। আমি যা করেছি, তার মন্দ থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাই। আমার ওপর তোমার অনুগ্রহ আমি স্বীকার করি, আর আমার গুনাহও স্বীকার করি। অতএব আমাকে ক্ষমা করো, কারণ তুমি ছাড়া আর কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না।
বাংলা হরফে আরবির কিছু ধ্বনি, যেমন আইন, হা, জোয়াদ, পুরোপুরি লেখা যায় না। তাই উচ্চারণটি কোনো কারি বা ইমামের কাছে একবার শুনে নিলে ভুল কম হবে।
বিজ্ঞাপন
কেন এটিকে শ্রেষ্ঠ ইস্তেগফার বলা হয়
দোয়াটির গঠন লক্ষ করলে কারণটি বোঝা যায়। এতে ক্ষমা চাওয়ার আগে বান্দা কয়েকটি স্বীকৃতি দেয়।
১. আল্লাহর রুবুবিয়াত ও তাওহিদ: "তুমিই আমার রব, তুমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই" বলে শুরু হয়। ক্ষমা চাওয়ার ভিত্তি এই বিশ্বাস।
২. নিজের বান্দা পরিচয়: "তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছ, আমি তোমার বান্দা" বাক্যে বিনয় ও আত্মসমর্পণ।
বিজ্ঞাপন
৩. অঙ্গীকারে অটল থাকার চেষ্টা: "সাধ্যমতো" শব্দটি বাস্তবসম্মত। মানুষ পুরোপুরি পারে না, তবু চেষ্টা করে।
৪. নিজের মন্দ থেকে আশ্রয়: নিজের কৃতকর্মের ক্ষতি থেকে বাঁচার আবেদন।
৫. অনুগ্রহ ও গুনাহ দুটোই স্বীকার: আল্লাহর দান স্বীকার করা আর নিজের ভুল মেনে নেওয়া, দুটি একসঙ্গে। এই সততাই তওবার প্রাণ।
৬. শেষে ক্ষমা প্রার্থনা: সবশেষে ঘোষণা, তুমি ছাড়া কেউ ক্ষমা করতে পারে না।
বিজ্ঞাপন
এভাবে দোয়াটি একসঙ্গে তাওহিদ, কৃতজ্ঞতা, অনুশোচনা ও আশার পূর্ণ প্রকাশ।
কখন ও কীভাবে পড়বেন
সকালে: ফজরের নামাজের পর থেকে দুপুরের আগ পর্যন্ত যেকোনো সময় একবার। অনেকে ফজরের পর সকালের জিকিরের সঙ্গে পড়েন।
সন্ধ্যায়: আসরের পর থেকে বা মাগরিবের পর রাতে ঘুমানোর আগে একবার।
বিজ্ঞাপন
দৃঢ় বিশ্বাস জরুরি: হাদিসে ফজিলতের শর্ত হিসেবে বলা হয়েছে, "দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে"। তাই অর্থ জেনে মনোযোগ দিয়ে পড়ুন, শুধু মুখস্থ বুলি হিসেবে নয়।
ওজু শর্ত নয়: দোয়া ও জিকিরের জন্য ওজু থাকা ভালো, তবে বাধ্যতামূলক নয়।
ইস্তেগফারের অন্যান্য ছোট দোয়া
সাইয়্যেদুল ইস্তেগফার ছাড়াও হাদিসে ক্ষমা চাওয়ার সহজ কিছু বাক্য আছে, যা চলতে-ফিরতে পড়া যায়।
বিজ্ঞাপন
আস্তাগফিরুল্লাহ: অর্থ, আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। বুখারির হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহর কসম, আমি দিনে সত্তরবারের বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই ও তওবা করি। সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় দিনে একশবারের কথা এসেছে।
আস্তাগফিরুল্লাহা ওয়া আতুবু ইলাইহি: আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই এবং তাঁর দিকে ফিরে আসি।
আস্তাগফিরুল্লাহাল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুমু ওয়া আতুবু ইলাইহি: আমি সেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, যিনি চিরঞ্জীব ও সবকিছুর ধারক, আর আমি তাঁর দিকে ফিরে আসি। আবু দাউদ ও তিরমিজিতে এ দোয়ার ফজিলতে বড় গুনাহ মাফের কথা এসেছে।
ফরজ নামাজের সালাম ফেরানোর পর তিনবার "আস্তাগফিরুল্লাহ" বলা মহানবী (সা.)-এর নিয়মিত আমল ছিল বলে সহিহ মুসলিমে আছে।
বিজ্ঞাপন
ইস্তেগফার ও তওবার পার্থক্য এবং শর্ত
ইস্তেগফার মানে ক্ষমা চাওয়া, আর তওবা মানে গুনাহ থেকে ফিরে আসা। দুটি শব্দ প্রায় একসঙ্গে ব্যবহৃত হয়, তবে আলেমরা তওবা কবুলের জন্য কয়েকটি শর্তের কথা বলেছেন।
১. গুনাহ ছেড়ে দেওয়া: যে গুনাহর জন্য ক্ষমা চাইছেন, তা তখনই বন্ধ করতে হবে।
২. অনুতপ্ত হওয়া: কৃতকর্মের জন্য অন্তরে সত্যিকারের অনুশোচনা থাকতে হবে।
বিজ্ঞাপন
৩. আর না করার সংকল্প: ভবিষ্যতে আবার না করার দৃঢ় ইচ্ছা রাখতে হবে। পরে দুর্বলতায় আবার ভুল হলে আবারও তওবা করার দরজা খোলা।
৪. অন্যের হক ফেরত দেওয়া: গুনাহ যদি কোনো মানুষের অধিকারের সঙ্গে জড়িত হয়, যেমন টাকা আত্মসাৎ, গিবত বা কারও প্রতি অন্যায়, তাহলে পাওনা ফিরিয়ে দিতে হবে বা তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে।
এই শর্তগুলো মেনে সাইয়্যেদুল ইস্তেগফার পড়লে দোয়াটি কেবল মুখের কথা থাকে না, পুরো জীবনের সংশোধনের অঙ্গীকারে পরিণত হয়। সূরা জুমারের ৫৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করেন।
ইস্তেগফারের দুনিয়াবি সুফল
বিজ্ঞাপন
সূরা নুহের ১০ থেকে ১২ নম্বর আয়াতে নবী নুহ (আ.) তাঁর জাতিকে বলেছিলেন, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও, তিনি মহা ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, সম্পদ ও সন্তান দিয়ে সাহায্য করবেন এবং বাগান ও নদী দান করবেন।
এ আয়াত থেকে আলেমরা বলেন, ইস্তেগফার কেবল আখিরাতের জন্য নয়, দুনিয়ার বরকতের জন্যও। তবে এটি কোনো যান্ত্রিক সূত্র নয়। আন্তরিক তওবা, গুনাহ ছেড়ে দেওয়া এবং অন্যের হক ফিরিয়ে দেওয়া ইস্তেগফারের পূর্ণতা।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সাইয়্যেদুল ইস্তেগফার দিনে কতবার পড়তে হয়?
বিজ্ঞাপন
হাদিসে সকালে ও সন্ধ্যায় একবার করে পড়ার ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। এর বেশি পড়তেও বাধা নেই।
নারীরা কি ঋতুস্রাবের সময় পড়তে পারবেন?
হ্যাঁ। এটি দোয়া ও জিকির, কোরআনের তিলাওয়াত নয়। তাই এ সময়ও পড়া যায়।
আরবি না পারলে শুধু বাংলা অর্থ পড়লে কি হবে?
বিজ্ঞাপন
বাংলায় আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া অবশ্যই কবুলযোগ্য দোয়া। তবে হাদিসে বর্ণিত বিশেষ ফজিলত পেতে মূল শব্দগুলো শিখে নেওয়ার চেষ্টা করুন।
সাইয়্যেদুল ইস্তেগফার কি নামাজের ভেতরে পড়া যায়?
হ্যাঁ। এটি হাদিসে বর্ণিত আরবি দোয়া, তাই শেষ বৈঠকে দরুদের পর সালাম ফেরানোর আগে দোয়া মাসুরার জায়গায় বা তার সঙ্গে পড়া যায়। নফল নামাজের সিজদাতেও পড়া যায়। তবে সকাল-সন্ধ্যার ফজিলত পেতে নামাজের বাইরে আলাদা করে পড়ে নেওয়াই ভালো, যাতে আমলটি নিয়মিত থাকে।
মুখে ইস্তেগফার পড়ি, কিন্তু গুনাহ ছাড়তে পারি না, লাভ কী?
বিজ্ঞাপন
ইস্তেগফার চালিয়ে যান এবং গুনাহ ছাড়ার চেষ্টাও করুন। বারবার ক্ষমা চাওয়া মনকে সজাগ রাখে। তবে জেনেশুনে গুনাহে অটল থেকে শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়াকে আলেমরা পূর্ণ তওবা বলেননি।