দোয়া কবুলের সময় ও আমল: কখন দোয়া বেশি কবুল হয়
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
দোয়া সব সময়ই করা যায়। আল্লাহ তাআলা সূরা বাকারার ১৮৬ নম্বর আয়াতে বলেছেন, আমার বান্দারা যখন আমার সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞেস করে, তখন বলো, আমি তো কাছেই আছি; আহ্বানকারী যখন আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই। তবু হাদিসে কিছু সময় ও অবস্থার কথা আলাদা করে বলা হয়েছে, যখন দোয়া কবুলের সম্ভাবনা বেশি।
বিজ্ঞাপন
সংক্ষেপে সেগুলো হলো: রাতের শেষ তৃতীয়াংশ, আজান ও ইকামতের মাঝের সময়, সিজদার অবস্থা, ফরজ নামাজের পর, জুমার দিনের একটি নির্দিষ্ট মুহূর্ত, রোজাদারের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া, মজলুমের দোয়া, সন্তানের জন্য মা-বাবার দোয়া এবং অন্যের অগোচরে তার জন্য করা দোয়া।
সময় চেনা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি দোয়া কবুলের আমলগুলো জানা। কারণ সঠিক সময়ে দোয়া করেও যদি জীবনে হারাম থাকে বা মনে সন্দেহ থাকে, তাহলে সেই দোয়া বাধাগ্রস্ত হয়।
হাদিসে বর্ণিত দোয়া কবুলের সময়
১. রাতের শেষ তৃতীয়াংশ: বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে আছে, প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ তাআলা নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন, কে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব; কে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দেব; কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব। বাংলাদেশে সাধারণত ফজরের আজানের দেড়-দুই ঘণ্টা আগে থেকে এই সময় শুরু হয়, মৌসুমভেদে কিছুটা বদলায়।
বিজ্ঞাপন
২. আজান ও ইকামতের মাঝখানে: আবু দাউদ ও তিরমিজির হাদিসে আছে, আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ের দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। মসজিদে আগে পৌঁছে এই কয়েক মিনিট মোবাইলে না কাটিয়ে দোয়ায় কাটানো যায়।
৩. সিজদায়: সহিহ মুসলিমে আছে, বান্দা তার রবের সবচেয়ে কাছে থাকে সিজদার অবস্থায়, তাই তোমরা সিজদায় বেশি বেশি দোয়া করো। হানাফি মতে ফরজ নামাজের সিজদায় কোরআন-হাদিসে বর্ণিত আরবি দোয়াই পড়তে হয়। নফল নামাজের সিজদায় দীর্ঘ সময় নিয়ে দোয়া করা যায়।
৪. ফরজ নামাজের পর: তিরমিজির এক বর্ণনায় মহানবী (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কোন দোয়া বেশি শোনা হয়। তিনি বলেছিলেন, শেষ রাতের মাঝের দোয়া এবং ফরজ নামাজের পরের দোয়া।
৫. জুমার দিনের বিশেষ মুহূর্ত: বুখারি ও মুসলিমে আছে, জুমার দিনে এমন একটি মুহূর্ত আছে, তখন কোনো মুসলমান আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাইলে তিনি তা দান করেন। মুহূর্তটি কখন, এ নিয়ে আলেমদের একাধিক মত আছে। কেউ বলেন ইমাম মিম্বারে বসা থেকে নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত, কেউ বলেন আসরের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। দুই সময়েই দোয়া করলে কোনোটি হাতছাড়া হয় না।
বিজ্ঞাপন
৬. রোজাদারের দোয়া: তিরমিজির হাদিসে তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না বলে উল্লেখ আছে: রোজাদার, ন্যায়পরায়ণ শাসক ও মজলুম। তাই ইফতারের আগের সময়টুকু দোয়ায় কাটানো উত্তম।
৭. মুসাফির, মজলুম ও মা-বাবা: আবু দাউদ ও তিরমিজির আরেক বর্ণনায় আছে, তিনটি দোয়া নিঃসন্দেহে কবুল হয়: মজলুমের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া এবং সন্তানের জন্য পিতার দোয়া।
৮. অন্যের অগোচরে তার জন্য দোয়া: সহিহ মুসলিমে আছে, কেউ তার ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার জন্য দোয়া করলে একজন ফেরেশতা বলেন, আমিন, তোমার জন্যও অনুরূপ।
৯. আরাফার দিন ও লাইলাতুল কদর: হাজিদের জন্য আরাফার দিনের দোয়াকে হাদিসে শ্রেষ্ঠ দোয়া বলা হয়েছে (তিরমিজি)। আর রমজানের শেষ দশকের রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর তালাশ করে দোয়া করার কথা সহিহ হাদিসে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
দোয়া কবুলের উপায়: যে আমলগুলো দরকার
সময়ের চেয়ে বড় বিষয় হলো দোয়াকারীর অবস্থা। হাদিসের আলোকে কয়েকটি আমল বিশেষভাবে লক্ষ করার মতো।
হালাল উপার্জন: সহিহ মুসলিমের হাদিসে এক দীর্ঘ সফরকারী এলোমেলো চুলের মানুষের কথা আছে, যে আকাশের দিকে হাত তুলে বলে, হে রব, হে রব। অথচ তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম। মহানবী (সা.) বলেছেন, তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে। অর্থাৎ হারাম আয় দোয়ার পথে বড় বাধা।
কবুলের দৃঢ় বিশ্বাস: দোয়ার সময় মনে সন্দেহ রাখা যাবে না। বুখারির হাদিসে নিষেধ করা হয়েছে এভাবে বলতে, হে আল্লাহ, তুমি চাইলে আমাকে ক্ষমা করো। বরং দৃঢ়ভাবে চাইতে বলা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ধৈর্য: বুখারি ও মুসলিমে আছে, তোমাদের দোয়া কবুল হয় যতক্ষণ না কেউ তাড়াহুড়া করে বলে, আমি দোয়া করেছি, কিন্তু কবুল হয়নি।
প্রশংসা ও দরুদ দিয়ে শুরু: আবু দাউদ ও তিরমিজির হাদিসে আছে, মহানবী (সা.) এক ব্যক্তিকে আল্লাহর প্রশংসা ও দরুদ ছাড়া সরাসরি দোয়া করতে দেখে বলেছিলেন, সে তাড়াহুড়া করেছে। তাই শুরুতে হামদ ও দরুদ পড়ে নিন।
গুনাহ থেকে তওবা: নিয়মিত ইস্তেগফার মনকে নরম করে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করে। সূরা নুহের ১০ থেকে ১২ নম্বর আয়াতে ক্ষমাপ্রার্থনার সঙ্গে বৃষ্টি, সম্পদ ও সন্তানের কল্যাণের কথা এসেছে।
দোয়া কবুলের দোয়া: কোরআনের কয়েকটি বাক্য
বিজ্ঞাপন
"দোয়া কবুলের দোয়া" নামে আলাদা কোনো জাদুকরি বাক্য নেই। তবে কোরআনে নবীদের কিছু দোয়া আছে, যেগুলো নিজের দোয়ার শুরুতে বা শেষে পড়া যায়।
হজরত ইউনুস (আ.) মাছের পেটে থেকে যে দোয়া করেছিলেন, তা সূরা আম্বিয়ার ৮৭ নম্বর আয়াতে আছে:
لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জালিমিন। অর্থ: তুমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তুমি পবিত্র, নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। তিরমিজির হাদিসে আছে, কোনো মুসলমান এই দোয়া দিয়ে কোনো বিষয়ে দোয়া করলে আল্লাহ তা কবুল করেন।
বিজ্ঞাপন
কাবাঘর নির্মাণের পর হজরত ইবরাহিম ও ইসমাইল (আ.)-এর দোয়া, সূরা বাকারার ১২৭ নম্বর আয়াত:
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
উচ্চারণ: রাব্বানা তাকাব্বাল মিন্না, ইন্নাকা আনতাস সামিউল আলিম। অর্থ: হে আমাদের রব, আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করো, নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
দোয়া কবুল মানে কী
বিজ্ঞাপন
অনেকে মনে করেন, যা চেয়েছি ঠিক তা না পেলে দোয়া কবুল হয়নি। আলেমরা মুসনাদে আহমদের একটি হাদিস উল্লেখ করেন, যার মর্ম হলো: গুনাহ বা আত্মীয়তা ছিন্ন করার দোয়া না হলে আল্লাহ বান্দাকে তিনটির একটি দেন। হয় দুনিয়াতেই চাওয়া জিনিস দেন, নয়তো তা আখিরাতের জন্য জমা রাখেন, অথবা সমপরিমাণ কোনো বিপদ তার থেকে সরিয়ে দেন।
তাই দোয়া কখনো বৃথা যায় না। ফল কখন ও কোন রূপে আসবে, সে সিদ্ধান্ত আল্লাহর।
একটি বাস্তব পরামর্শ: বিশেষ সময়গুলোর জন্য ছোট একটি রুটিন বানিয়ে নিন। যেমন প্রতিদিন মাগরিবের আজান ও ইকামতের মাঝে দুই মিনিট, শুক্রবার আসরের পর মাগরিব পর্যন্ত কিছু সময়, আর সপ্তাহে অন্তত এক রাত শেষ ভাগে উঠে দুই রাকাত নফল ও দোয়া। ছোট কিন্তু নিয়মিত আমল দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকে, আর নিয়মিত আমলকেই হাদিসে আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয় বলা হয়েছে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
বাংলায় দোয়া করলে কি কবুল হয়?
হ্যাঁ। নামাজের বাইরে যেকোনো ভাষায় দোয়া করা যায়, আল্লাহ সব ভাষা বোঝেন। তবে হানাফি মতে নামাজের ভেতরে আরবি দোয়াই পড়তে হয়।
শেষ রাতে উঠতে না পারলে কী করব?
ঘুমানোর আগে নিয়ত করে অ্যালার্ম দিয়ে রাখতে পারেন। সম্ভব না হলে ফজরের আজানের কিছুক্ষণ আগে উঠে দোয়া করুন, সেটিও শেষ রাতের অংশ।
বিজ্ঞাপন
মা-বাবার দোয়া কি সন্তানের জন্য বিশেষ?
হ্যাঁ, হাদিসে সন্তানের জন্য পিতার দোয়াকে নিঃসন্দেহে কবুল হওয়া দোয়ার মধ্যে গণ্য করা হয়েছে। আলেমরা মায়ের দোয়াকেও এর অন্তর্ভুক্ত মনে করেন।
একই দোয়া বারবার করা কি ঠিক?
হ্যাঁ। সহিহ মুসলিমে আছে, মহানবী (সা.) দোয়া করলে তিনবার করতেন। বারবার চাওয়া আল্লাহর ওপর নির্ভরতার প্রকাশ।