ইসলামে বিয়ের নিয়ম: ইজাব-কবুল, সাক্ষী, অভিভাবক ও দেনমোহর
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
ইসলামে বিয়ে একই সঙ্গে ইবাদত ও একটি চুক্তি। ইবাদত, কারণ এর মাধ্যমে মানুষ নিজেকে হারাম থেকে রক্ষা করে এবং নবীজির সুন্নত অনুসরণ করে। চুক্তি, কারণ এতে দুজন মানুষ পরস্পরের প্রতি অধিকার ও দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাই এর কিছু শর্ত আছে, যেগুলো পূরণ না হলে বিয়েই শুদ্ধ হয় না।
বিজ্ঞাপন
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী বিয়ের মূল উপাদান দুটি: একই বৈঠকে একপক্ষের প্রস্তাব, যাকে ইজাব বলে, এবং অপরপক্ষের গ্রহণ, যাকে কবুল বলে; আর এই ইজাব-কবুল শোনার মতো দুজন উপযুক্ত সাক্ষী। দেনমোহর বিয়ের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব, খুতবা সুন্নত, আর অভিভাবকের সম্মতি খুবই কাম্য। বাংলাদেশে এর সঙ্গে আইনি নিবন্ধনও বাধ্যতামূলক।
বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, নারীকে সাধারণত চারটি কারণে বিয়ে করা হয়: সম্পদ, বংশমর্যাদা, সৌন্দর্য ও দ্বীনদারি। তুমি দ্বীনদারকে প্রাধান্য দাও। বিয়ের নিয়ম জানার আগে এই মূলনীতিটি মনে রাখা দরকার।
বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার শর্ত
১. ইজাব ও কবুল: বর বা কনে কিংবা তাঁদের প্রতিনিধির পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রস্তাব এবং অপরপক্ষের স্পষ্ট গ্রহণ। যেমন, আমি অমুককে এত টাকা দেনমোহরে আপনার সঙ্গে বিয়ে দিলাম, উত্তরে আমি কবুল করলাম। কথাগুলো অতীত বা বর্তমান কালের নিশ্চিত শব্দে হতে হবে, ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি হিসেবে নয়।
বিজ্ঞাপন
২. একই বৈঠক: প্রস্তাব ও কবুল একই বৈঠকে হতে হবে। প্রস্তাবের পর অন্য প্রসঙ্গে চলে গিয়ে বা বৈঠক ভেঙে পরে কবুল বললে তা শুদ্ধ হয় না।
৩. দুজন সাক্ষী: হানাফি মতে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের মুসলিম পুরুষ, অথবা একজন পুরুষ ও দুজন নারী সাক্ষী লাগবে। তাঁরা একসঙ্গে ইজাব-কবুল শুনবেন এবং বুঝবেন যে বিয়ে হচ্ছে।
৪. পাত্র-পাত্রীর সম্মতি: প্রাপ্তবয়স্ক নারী বা পুরুষের সম্মতি ছাড়া বিয়ে বৈধ নয়। বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে কুমারী মেয়ের সম্মতি হিসেবে তার নীরবতাকে গ্রহণ করা হয়েছে, আর পূর্বে বিবাহিত নারীর ক্ষেত্রে মুখে স্পষ্ট সম্মতি লাগবে।
৫. বিয়ে বৈধ এমন সম্পর্ক: সুরা নিসার ২৩ নম্বর আয়াতে যাঁদের বিয়ে করা হারাম বলা হয়েছে, যেমন মা, বোন, মেয়ে, খালা, ফুফু, ভাইঝি, বোনঝি, দুধমা ও দুধবোন, তাঁদের সঙ্গে বিয়ে হয় না। স্ত্রীর বোনকে একই সময়ে বিয়েতে রাখাও নিষিদ্ধ।
বিজ্ঞাপন
৬. অন্যান্য বাধা না থাকা: নারী অন্য কারও বিবাহবন্ধনে বা ইদ্দতের মধ্যে থাকলে বিয়ে হবে না। মুসলিম নারীর জন্য অমুসলিম পুরুষকে বিয়ে করা বৈধ নয়, এ বিষয়ে আলেমরা একমত।
অভিভাবক বা ওলির ভূমিকা
ওলি বা অভিভাবকের বিষয়ে মাজহাবগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মতভেদ আছে। আবু দাউদ ও তিরমিজিতে বর্ণিত 'ওলি ছাড়া বিয়ে নেই' হাদিসের ভিত্তিতে শাফেয়ি, মালেকি ও হাম্বলি মাজহাবে নারীর বিয়েতে ওলির উপস্থিতি বা অনুমতি শর্ত। হানাফি মাজহাবে প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মস্তিষ্কের নারী নিজের বিয়ে নিজে সম্পন্ন করলে তা শুদ্ধ হয়, তবে অভিভাবকের মাধ্যমে বিয়ে হওয়াই সুন্নত ও কাম্য।
হানাফি মাজহাবেও কুফু বা সমতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মেয়ে যদি অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া এমন কাউকে বিয়ে করে, যে দ্বীনদারি বা সামাজিক অবস্থানে স্পষ্টভাবে অসম, তাহলে অভিভাবক আদালতের মাধ্যমে আপত্তি তোলার অধিকার রাখেন বলে ফকিহরা উল্লেখ করেছেন। বাস্তবে পরিবারের সম্মতি ও দোয়া নিয়ে বিয়ে হলে দাম্পত্য জীবনও সহজ হয়, তাই সব মাজহাবেই পরিবারকে যুক্ত রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
দেনমোহর
দেনমোহর স্ত্রীর প্রতি স্বামীর বাধ্যতামূলক আর্থিক দায়িত্ব, সুরা নিসার ৪ নম্বর আয়াতে স্ত্রীদের মোহর সন্তুষ্টচিত্তে দিয়ে দিতে বলা হয়েছে। হানাফি মতে এর ন্যূনতম পরিমাণ দশ দিরহাম রুপার মূল্য। বিয়ের সময় মোহর উল্লেখ না করলেও বিয়ে শুদ্ধ হয়, তবে তখন স্ত্রী তাঁর পরিবারের সমপর্যায়ের নারীদের প্রচলিত মোহর পাওয়ার অধিকারী হন।
মোহর নগদে পরিশোধ করা উত্তম। বাকি রাখলে তা স্বামীর কাছে স্ত্রীর পাওনা হিসেবে থাকে, যা সময়মতো পরিশোধ করতে হয়। সামর্থ্যের বাইরে লোক দেখানো মোহর নির্ধারণ করে পরে তা পরিশোধ না করা একটি সামাজিক ব্যাধি, যা থেকে বেঁচে থাকা উচিত।
বিয়ে পড়ানোর নিয়ম ও বিয়ের খুতবা
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশে সাধারণত কাজি বা একজন আলেম বিয়ে পড়ান। প্রচলিত ধাপগুলো এমন:
১. কনের সম্মতি গ্রহণ: কনের অভিভাবক বা উকিল দুজন সাক্ষীসহ কনের কাছে গিয়ে বর, মোহর ও অন্যান্য বিষয় জানিয়ে তাঁর সম্মতি নেন।
২. খুতবা: বিয়ের আগে মাসনুন খুতবা পড়া সুন্নত। আবু দাউদ ও তিরমিজিতে বর্ণিত এই খুতবা শুরু হয় 'ইন্নাল হামদা লিল্লাহি নাহমাদুহু ওয়া নাসতাঈনুহু' দিয়ে, অর্থাৎ সব প্রশংসা আল্লাহর, আমরা তাঁর প্রশংসা করি ও তাঁর সাহায্য চাই। এতে সুরা নিসার ১, সুরা আলে ইমরানের ১০২ এবং সুরা আহজাবের ৭০ ও ৭১ নম্বর আয়াত পাঠ করা হয়, যেগুলোতে তাকওয়া, সত্য কথা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার কথা আছে।
৩. ইজাব ও কবুল: কনের পক্ষ থেকে প্রস্তাব উত্থাপন, বরের পক্ষ থেকে সাক্ষীদের সামনে স্পষ্টভাবে কবুল বলা।
বিজ্ঞাপন
৪. দোয়া: বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর উপস্থিত সবাই নবদম্পতির জন্য বারাকাল্লাহু লাকা ওয়া বারাকা আলাইকা ওয়া জামাআ বাইনাকুমা ফি খাইর বলে দোয়া করেন।
৫. নিবন্ধন ও ওয়ালিমা: কাবিননামায় স্বাক্ষর ও নিবন্ধন সম্পন্ন করা, পরে সামর্থ্য অনুযায়ী ওয়ালিমার আয়োজন করা।
বাংলাদেশের আইনে নিবন্ধন ও বয়স
বাংলাদেশে মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন আইন অনুযায়ী প্রতিটি বিয়ে সরকার নিযুক্ত নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজির মাধ্যমে নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। নিবন্ধন না করলে বিয়ে শরিয়তের দৃষ্টিতে শুদ্ধ হলেও আইনি প্রমাণ, দেনমোহর আদায়, ভরণপোষণ ও উত্তরাধিকারের মতো অধিকার রক্ষায় জটিলতা তৈরি হয়। কাবিননামার প্রতিটি ঘর পড়ে-বুঝে তারপর স্বাক্ষর করুন।
বিজ্ঞাপন
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন অনুযায়ী বিয়ের জন্য মেয়ের বয়স কমপক্ষে ১৮ এবং ছেলের বয়স কমপক্ষে ২১ বছর হতে হবে। জন্মনিবন্ধন বা জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে বয়স যাচাই করেই কাজিরা বিয়ে নিবন্ধন করেন। শরিয়ত ও দেশের আইন দুটোই মেনে চলা মুসলমানের দায়িত্ব।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
মোবাইল বা ভিডিও কলে বিয়ে কি শুদ্ধ হয়?
হানাফি মতে ইজাব-কবুলের সময় দুই পক্ষ ও সাক্ষীরা একই বৈঠকে থাকা শর্ত, তাই সরাসরি ফোনে বিয়ে নিয়ে আলেমরা আপত্তি করেন। সমাধান হলো দূরে থাকা পক্ষ কাউকে উকিল নিযুক্ত করবেন, আর উকিল সাক্ষীদের সামনে বৈঠকে ইজাব বা কবুল করবেন।
বিজ্ঞাপন
বিয়েতে খুতবা না পড়লে কি বিয়ে হবে?
হবে। খুতবা সুন্নত, বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার শর্ত নয়। তবে সুন্নত অনুসরণে খুতবা পড়ে বিয়ে পড়ানো উত্তম।
মেয়ের অমতে বাবা বিয়ে দিলে কী হবে?
প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সম্মতি ছাড়া বিয়ে কার্যকর নয়। হানাফি মতে খবর পাওয়ার পর মেয়ে প্রত্যাখ্যান করলে বিয়ে হবে না। দেশের আইনেও জোরপূর্বক বিয়ে অপরাধ।
বিজ্ঞাপন
বিয়ের আগে পাত্রীকে দেখা কি জায়েজ?
জায়েজ, বরং উৎসাহিত। তিরমিজি ও নাসায়িতে আছে, মহানবী (সা.) এক সাহাবিকে বিয়ের আগে পাত্রীকে দেখে নিতে বলেছিলেন, কারণ এতে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। দেখা হবে পরিবারের উপস্থিতিতে, শালীনতা রক্ষা করে।