শিশুর ইসলামিক নাম রাখার নিয়ম: কোন নাম উত্তম, কোনটি এড়াবেন
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
সন্তানের নাম তার সারা জীবনের পরিচয়। স্কুলের খাতা থেকে পাসপোর্ট, প্রতিটি জায়গায় এই নামেই তাকে ডাকা হবে। তাই ইসলাম নাম রাখার বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখেনি। মহানবী (সা.) সুন্দর নাম পছন্দ করতেন, আর খারাপ অর্থের নাম শুনলে তা বদলে দিতেন।
বিজ্ঞাপন
সংক্ষেপে নিয়ম হলো: জন্মের দিন বা সপ্তম দিনে নাম রাখা সুন্নত; নামের অর্থ সুন্দর হতে হবে; আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও দাসত্ব, শিরকের ইঙ্গিত, অহংকার বা খারাপ অর্থ বহন করে এমন নাম এড়াতে হবে। সহিহ মুসলিমের হাদিস অনুযায়ী আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় নাম আবদুল্লাহ ও আবদুর রহমান।
কখন নাম রাখবেন
আবু দাউদ, তিরমিজি ও নাসায়িতে বর্ণিত হাদিসে সপ্তম দিনে আকিকা দেওয়া, মাথা মুণ্ডন করা ও নাম রাখার কথা এসেছে। আবার সহিহ মুসলিমে আছে, মহানবী (সা.) নিজের ছেলের জন্মের রাতেই বলেছিলেন, আজ রাতে আমার একটি ছেলে হয়েছে, আমি তার নাম রেখেছি আমার পিতৃপুরুষ ইবরাহিমের নামে। বুখারি ও মুসলিমে হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) জানিয়েছেন, তাঁর ছেলে জন্মের পর তিনি তাকে নবীজির কাছে নিয়ে যান; নবীজি তার নাম রাখেন ইবরাহিম এবং খেজুর চিবিয়ে মুখে দেন।
এসব বর্ণনা থেকে আলেমরা বলেছেন, জন্মের দিন থেকে সপ্তম দিন পর্যন্ত যেকোনো সময় নাম রাখা যায়। নাম ঠিক করতে দেরি হলে গুনাহ নেই, তবে অনির্দিষ্টকাল নামহীন রাখা বা 'বাবু', 'খুকি' বলে মাসের পর মাস কাটিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।
বিজ্ঞাপন
কে নাম রাখবেন
নাম রাখার প্রধান দায়িত্ব বাবার, তবে মায়ের মতামত নেওয়া সুন্দর আচরণ। পরিবারের মুরব্বি বা কোনো নেককার আলেমকে নাম রাখার অনুরোধ করা যায়, সাহাবিরাও নিজেদের সন্তানকে নবীজির কাছে নিয়ে গিয়ে নাম রাখাতেন। তবে দাদা-দাদি বা নানা-নানির পছন্দ নিয়ে পরিবারে বিরোধ তৈরি হলে বাবা-মা আলোচনা করে একটি সুন্দর অর্থের নামে একমত হবেন। নাম নিয়ে সম্পর্ক নষ্ট করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
যেসব নামকে প্রাধান্য দেবেন
১. আবদ যুক্ত নাম: আল্লাহর গুণবাচক নামের আগে আবদ যুক্ত নাম, যেমন আবদুল্লাহ, আবদুর রহমান, আবদুর রহিম, আবদুল করিম। সহিহ মুসলিমের হাদিসে প্রথম দুটিকে সবচেয়ে প্রিয় বলা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
২. নবী-রাসুলদের নাম: ইবরাহিম, ইউসুফ, মুসা, ইয়াহইয়া, মুহাম্মাদ, আহমাদ ইত্যাদি। বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে নবীজি বলেছেন, তোমরা আমার নামে নাম রাখো।
৩. সাহাবি ও নেককারদের নাম: মেয়েদের ক্ষেত্রে খাদিজা, আয়েশা, ফাতিমা, মারইয়াম; ছেলেদের ক্ষেত্রে উমর, আলী, হাসান, খালিদ।
৪. সুন্দর অর্থের শব্দ: পবিত্রতা, সত্যবাদিতা, দয়া, আলো, সৌভাগ্যের মতো ইতিবাচক অর্থ বোঝায় এমন নাম, যেমন তাহিরা, সাদিয়া, আমিন, মুনির।
যেসব নাম রাখা নিষেধ বা অপছন্দনীয়
বিজ্ঞাপন
১. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও বান্দা বোঝায় এমন নাম: আবদুন নবী, আবদুর রাসুল বা কোনো মানুষ, পীর বা বস্তুর সঙ্গে আবদ যুক্ত নাম রাখা জায়েজ নয়, কারণ বান্দা কেবল আল্লাহর। গোলাম শব্দযুক্ত নাম, যেমন গোলাম রাসুল, নিয়ে আলেমদের আলোচনা আছে; শব্দটির অর্থ ছেলে বা সেবক দুটোই হতে পারে, তবে দাসত্বের অর্থের কারণে অনেক আলেম এ ধরনের নাম অপছন্দ করেছেন।
২. আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট নাম: আর-রহমান, আল-খালিক, আর-রাজ্জাক, আল-কুদ্দুসের মতো নাম মানুষের জন্য ব্যবহার করা যায় না। বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে আছে, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট নাম সেই ব্যক্তির, যে নিজেকে রাজাধিরাজ বলে ডাকায়। শাহানশাহ বা এ ধরনের অর্থের নাম তাই এড়িয়ে চলুন।
৩. খারাপ অর্থের নাম: অবাধ্য, কঠোর, দুঃখ, যুদ্ধ বা অশুভ অর্থ বোঝায় এমন নাম। বুখারিতে আছে, হাজন অর্থাৎ রুক্ষ নামের এক সাহাবিকে নবীজি নাম বদলে সাহল, অর্থাৎ সহজ রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
৪. আত্মপ্রশংসার নাম: নিজের পবিত্রতা বা শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে এমন নাম। সহিহ মুসলিমে বাররা, অর্থাৎ পুণ্যবতী নামটি বদলে নবীজি জয়নব রেখেছিলেন।
বিজ্ঞাপন
৫. অন্য ধর্মের উপাস্য বা প্রতীকের নাম: কোনো দেব-দেবী বা অন্য ধর্মের বিশেষ ধর্মীয় পরিচয় বহনকারী নাম মুসলিম শিশুর জন্য উপযুক্ত নয়।
৬. কুখ্যাত ব্যক্তিদের নাম: ফেরাউন, হামান, আবু জাহেলের মতো ইসলামের শত্রু হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের নাম।
৭. অশালীন বা অর্থহীন নাম: শুধু চলতি ফ্যাশনের কারণে এমন শব্দ, যার অর্থ জানা নেই বা অশোভন।
নাম রাখার পর করণীয়
বিজ্ঞাপন
নাম ঠিক হয়ে গেলে কয়েকটি কাজ দ্রুত সেরে ফেলা ভালো। প্রথমত, সামর্থ্য থাকলে সপ্তম দিনে আকিকা দিন, শিশুর মাথার চুল মুণ্ডন করে চুলের ওজনের সমপরিমাণ রুপার মূল্য সদকা করুন। এগুলো নাম রাখার সঙ্গেই একই হাদিসে এসেছে।
দ্বিতীয়ত, জন্মনিবন্ধন করুন। বাংলাদেশে জন্মনিবন্ধনের সময় শিশুর নাম বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায় লিখতে হয়, সঙ্গে বাবা-মায়ের নামও। বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের বানানের সঙ্গে মিলিয়ে তথ্য দিন, নইলে পরে স্কুলে ভর্তি বা পাসপোর্ট করতে গিয়ে জটিলতা হয়। জমা দেওয়ার আগে প্রতিটি অক্ষর মিলিয়ে দেখুন।
তৃতীয়ত, শিশুর জন্য দোয়া করুন এবং বড় হলে তাকে তার নামের অর্থ জানান। নিজের নামের সুন্দর অর্থ জানা শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, আর নবী বা সাহাবির নামে নাম হলে সেই মানুষটির জীবনের গল্প শোনানো তার চরিত্র গঠনে সহায়ক হয়।
নাম বদলানো ও ডাকনাম
বিজ্ঞাপন
কারও নামের অর্থ খারাপ হলে বড় হয়েও নাম বদলানো সুন্নতসম্মত। নবীজি নিজে বহু সাহাবির নাম বদলে দিয়েছেন। তবে বাংলাদেশে জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, শিক্ষাসনদ ও পাসপোর্টে নাম পরিবর্তন একটি আইনি প্রক্রিয়া, যাতে সময় লাগে। তাই শুরুতেই নাম যাচাই করে নেওয়া সবচেয়ে সহজ পথ।
ডাকনামের ক্ষেত্রেও সতর্কতা দরকার। সুরা হুজুরাতের ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ একে অপরকে মন্দ নামে ডাকতে নিষেধ করেছেন। শিশুকে কালু, বোকা বা অপমানজনক নামে ডাকা, শারীরিক গঠন নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক নাম দেওয়া শিশুর আত্মবিশ্বাসে আঘাত করে। ভালো নাম রেখে খারাপ ডাকনামে ডাকলে সুন্দর নামের উদ্দেশ্যই নষ্ট হয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সপ্তম দিনের আগে নাম রাখলে কি সুন্নত ছুটে যাবে?
বিজ্ঞাপন
না। জন্মের দিন নাম রাখার কথাও সহিহ হাদিসে আছে। জন্মের দিন থেকে সপ্তম দিনের মধ্যে যেকোনো সময় নাম রাখা যায়।
আরবি নয় এমন বাংলা নাম কি রাখা যাবে?
যাবে, যদি অর্থ সুন্দর হয় এবং তাতে শিরক বা অন্য ধর্মের বিশেষ পরিচয়ের ইঙ্গিত না থাকে। ইসলামের নীতি অর্থভিত্তিক, ভাষাভিত্তিক নয়।
নবীজির নাম রাখলে কি সম্মান রক্ষার বিশেষ দায়িত্ব আছে?
বিজ্ঞাপন
মুহাম্মাদ বা আহমাদ নাম রাখা উত্তম। তবে নামের সম্মান রক্ষায় শিশুকে সুন্দর আচরণ শেখানো এবং নাম বিকৃত করে না ডাকার ব্যাপারে খেয়াল রাখা উচিত।
দাদা বা নানার নামে নাতির নাম রাখা কি ঠিক?
ঠিক আছে, যদি নামের অর্থ সুন্দর হয়। প্রিয় মানুষের স্মৃতি ধরে রাখতে বংশের মুরব্বির নামে নাম রাখার রেওয়াজ বহু পুরোনো, ইসলামে এতে কোনো নিষেধ নেই। তবে নামটির অর্থ বা ধরন উপরের নিষিদ্ধ তালিকার মধ্যে পড়লে আদব রক্ষা করেই বিকল্প বেছে নেওয়া উচিত।
জন্মনিবন্ধনে নাম ভুল হলে কী করব?
বিজ্ঞাপন
দ্রুত সংশোধনের আবেদন করুন, কারণ পরে স্কুল ও অন্যান্য কাগজে একই ভুল ছড়িয়ে পড়ে। সংশোধনের প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় কাগজ সম্পর্কে স্থানীয় নিবন্ধন কার্যালয় থেকে জেনে নিন।