কোরবানির পশু কেনার নিয়ম: বয়স, দোষ-ত্রুটি ও যা দেখে কিনবেন
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
হাটে ঢুকে প্রথম যে গরুটি চোখে লাগে, সেটিই সবচেয়ে ভালো, এমন নয়। কোরবানির পশু কেনার সময় দুই ধরনের যাচাই দরকার। একটি শরিয়তের: পশুর বয়স পূর্ণ হয়েছে কি না এবং কোরবানিতে বাধা হয় এমন কোনো দোষ আছে কি না। অন্যটি স্বাস্থ্যের: পশুটি সুস্থ কি না, কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা হয়েছে কি না।
বিজ্ঞাপন
শরিয়তের শর্ত না মিললে দাম যত বেশিই হোক, কোরবানি আদায় হবে না। আবার অসুস্থ বা ওষুধ দিয়ে ফোলানো পশু কিনলে টাকা যেমন নষ্ট হয়, ঈদের আগেই পশু অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকিও থাকে। তাই তাড়াহুড়া না করে নিচের বিষয়গুলো মিলিয়ে কিনুন। সম্ভব হলে পশু চেনেন এমন একজন অভিজ্ঞ মানুষকে সঙ্গে নিন।
বয়স যাচাই: দাঁত দেখে বোঝার উপায়
হানাফি মাজহাবে কোরবানির পশুর ন্যূনতম বয়স হলো: গরু ও মহিষ দুই বছর, ছাগল এক বছর, উট পাঁচ বছর। ভেড়া ও দুম্বা ছয় মাস পেরিয়ে এক বছর বয়সীর মতো হৃষ্টপুষ্ট হলে তা দিয়েও কোরবানি জায়েজ। বয়স এক দিন কম হলেও কোরবানি শুদ্ধ হবে না।
হাটে জন্মতারিখের কাগজ থাকে না, তাই সাধারণত দাঁত দেখে বয়স আন্দাজ করা হয়। গরু ও মহিষের দুধদাঁত পড়ে সামনের নিচের পাটিতে প্রথম দুটি বড় স্থায়ী দাঁত ওঠে মোটামুটি দুই বছর বয়সে। তাই 'দুই দাঁতের গরু'কে সাধারণত বয়স পূর্ণ হওয়ার লক্ষণ ধরা হয়। স্থায়ী দাঁত চওড়া ও বড়, দুধদাঁত ছোট ও সরু; পাশাপাশি দেখলে পার্থক্য সহজে বোঝা যায়।
বিজ্ঞাপন
মনে রাখবেন, শরিয়তের মূল শর্ত বয়স, দাঁত নয়। নিজের খামারে লালিত বা জন্মের সময় জানা থাকলে সেটিই বেশি নির্ভরযোগ্য। ছাগলের ক্ষেত্রে এক বছর পূর্ণ হলেও সব সময় স্থায়ী দাঁত ওঠে না, তাই বিক্রেতা বা খামারির কাছ থেকে বয়স জেনে নিন এবং আকার-আকৃতি মিলিয়ে দেখুন। বয়স নিয়ে সন্দেহ থাকলে সেই পশু না কেনাই নিরাপদ।
যেসব দোষ থাকলে কোরবানি হবে না
আবু দাউদ ও তিরমিজির হাদিসে চার ধরনের পশু দিয়ে কোরবানি না করার কথা এসেছে: স্পষ্ট অন্ধ, স্পষ্ট অসুস্থ, স্পষ্ট খোঁড়া এবং অতিশয় দুর্বল ও হাড্ডিসার। হানাফি ফকিহরা এর আলোকে আরও কিছু দোষ চিহ্নিত করেছেন। কেনার আগে পশুকে কয়েক কদম হাঁটিয়ে দেখুন এবং কাছ থেকে নিচের বিষয়গুলো খেয়াল করুন:
১. চোখ: এক বা দুই চোখ পুরোপুরি অন্ধ কি না। চোখের সামনে হাত নাড়িয়ে প্রতিক্রিয়া দেখুন।
বিজ্ঞাপন
২. পা: এত খোঁড়া কি না যে তিন পায়ে চলে বা জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত নিজে হেঁটে যেতে পারবে না।
৩. কান ও লেজ: কান বা লেজের এক-তৃতীয়াংশের বেশি কাটা কি না।
৪. শিং: শিং গোড়া থেকে এমনভাবে ভাঙা কি না, যাতে মাথার ভেতরে ক্ষতি পৌঁছেছে। জন্ম থেকে শিং না থাকা বা শিং সামান্য ভাঙা দোষ নয়।
৫. দাঁত ও শরীর: বেশির ভাগ দাঁত পড়ে গেছে কি না, আর পশু এত দুর্বল কি না যে হাড় বেরিয়ে আছে।
বিজ্ঞাপন
খাসি করা পশু দিয়ে কোরবানি জায়েজ; অনেক ফকিহ একে উত্তমও বলেছেন, কারণ এর মাংস সাধারণত ভালো হয়।
সুস্থ গরু ও ছাগল চেনার উপায়
সুস্থ গরু বা ছাগল সাধারণত চঞ্চল ও সতর্ক থাকে। কান নাড়ায়, লেজ দিয়ে মাছি তাড়ায়, মানুষ কাছে গেলে প্রতিক্রিয়া দেখায়। চোখ উজ্জ্বল ও পরিষ্কার, চোখের কোণে ময়লা বা পানি জমে থাকে না। গরুর নাকের ডগা সাধারণত ভেজা ও ঠান্ডা থাকে; শুকনো ও গরম নাক জ্বরের লক্ষণ হতে পারে।
বিশ্রামের সময় জাবর কাটছে কি না দেখুন। সুস্থ গরু-ছাগল খাবার পেলে আগ্রহ নিয়ে খায় এবং অবসরে জাবর কাটে। লোম মসৃণ ও চকচকে হয়, শরীরে ক্ষত, ঘা বা ফোলা থাকে না। গোবর স্বাভাবিক ঘনত্বের, খুব পাতলা বা রক্তমিশ্রিত নয়। নাক বা মুখ দিয়ে লালা বা সর্দি ঝরছে কি না এবং পায়ের খুরে ঘা আছে কি না, সেটাও দেখে নিন।
বিজ্ঞাপন
কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা পশুর লক্ষণ
ঈদের আগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ক্ষতিকর ওষুধ বা হরমোন দিয়ে অল্প সময়ে পশু মোটাতাজা করে, এ নিয়ে প্রতিবছরই সতর্কতা জারি হয়। এমন পশুর শরীরে পানি জমে থাকতে পারে, ফলে দেখতে অস্বাভাবিক ফোলা ও থলথলে লাগে। শরীরের কোথাও আঙুল দিয়ে চাপ দিলে গর্ত হয়ে থাকা, ঘন ঘন হাঁপানো বা দ্রুত শ্বাস নেওয়া, হাঁটতে অনীহা ও ঝিমুনি এর সম্ভাব্য লক্ষণ।
এসব লক্ষণ নিশ্চিত প্রমাণ নয়, তবে সন্দেহ জাগানোর জন্য যথেষ্ট। শরীরের তুলনায় পা দুর্বল মনে হলে বা পশু খুব অস্থির ও ক্লান্ত দেখালে সেটি এড়িয়ে চলুন। পরিচিত খামার বা যাঁরা প্রাকৃতিক খাবারে পশু লালন করেন, তাঁদের কাছ থেকে কেনা তুলনামূলক নিরাপদ।
হাটে কেনার সময় ব্যবহারিক সতর্কতা
বিজ্ঞাপন
দিনের আলোয় হাটে যান, রাতের অন্ধকারে পশুর দোষ চোখে পড়ে না। বড় অঙ্কের নগদ টাকা বহন করলে সঙ্গে পরিচিত কাউকে রাখুন; হাটে ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবস্থা থাকলে সেটি ব্যবহার করা নিরাপদ। নোট গোনার সময় জাল নোট আছে কি না দেখে নিন, অনেক হাটে জাল নোট শনাক্তের বুথও থাকে।
দরদাম ভদ্রভাবে করুন, বিক্রেতার সঙ্গে প্রতারণা বা মিথ্যা বলা ইবাদতের পশুর কেনাকাটায় একেবারেই মানায় না। কেনার পর হাসিল পরিশোধ করে রসিদ সংগ্রহ করুন; পথে কেউ জিজ্ঞেস করলে এটি বৈধ কেনার প্রমাণ। অপরিচিত কারও দেওয়া খাবার বা পানীয় খাবেন না। পশু আনার জন্য উপযুক্ত গাড়ি ভাড়া করুন, অতিরিক্ত পশু ঠাসাঠাসি করে আনবেন না।
কেনার পর পশুর যত্ন
পশু বাড়িতে এনে ছায়াযুক্ত, বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় রাখুন। পর্যাপ্ত পরিষ্কার পানি ও তার অভ্যস্ত খাবার, যেমন খড়, কাঁচা ঘাস ও ভুসি দিন। হঠাৎ অপরিচিত বা অতিরিক্ত খাবার দিলে পেট ফাঁপা বা ডায়রিয়া হতে পারে। শিশুরা পশুর সঙ্গে খেলতে চাইলে বড়দের নজরে রাখুন, যাতে কেউ আঘাত না পায়।
বিজ্ঞাপন
কোরবানির নিয়তে কেনা পশু দিয়ে চাষাবাদ বা ভারী কাজ করানো, দুধ দোহন করে নিজে খাওয়া কিংবা পশমের ব্যবসা করা ঠিক নয় বলে হানাফি ফকিহরা বলেছেন। দুধ দোহন করতেই হলে তা সদকা করে দিন। কেনার পর বড় দোষ দেখা দিলে ধনী ব্যক্তির জন্য আরেকটি পশু কোরবানি করা জরুরি; গরিব ব্যক্তি সেটিই কোরবানি করতে পারেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
গর্ভবতী গাভী দিয়ে কি কোরবানি হয়?
হানাফি মতে জায়েজ, তবে প্রসবের সময় কাছাকাছি হলে তা অনুচিত। জবাইয়ের পর বাচ্চা জীবিত পাওয়া গেলে সেটিও জবাই করে মাংস সদকা করার কথা ফকিহরা বলেছেন। জেনে-বুঝে গর্ভবতী পশু না কেনাই ভালো।
বিজ্ঞাপন
বিক্রেতা বয়স নিয়ে মিথ্যা বললে কোরবানি কি হবে?
পশুর প্রকৃত বয়স পূর্ণ না হলে কোরবানি হবে না। ঈদের দিনগুলোর মধ্যে জানা গেলে আরেকটি পশু কোরবানি করতে হবে। তাই বয়স নিশ্চিত না হয়ে কিনবেন না।
কালো, সাদা বা কোন রঙের পশু উত্তম?
শরিয়তে কোনো রং বাধ্যতামূলক নয়। হাদিসে মহানবী (সা.)-এর সাদা-কালো মিশ্রিত শিংওয়ালা দুম্বা কোরবানির কথা এসেছে, তবে যেকোনো রঙের সুস্থ পশুতে কোরবানি শুদ্ধ।
বিজ্ঞাপন
অনলাইনে বা খামার থেকে পশু কেনা কি ঠিক?
শরিয়তের দিক থেকে সমস্যা নেই, যদি বয়স ও দোষমুক্ত হওয়া নিশ্চিত থাকে। ছবি দেখে নয়, সম্ভব হলে নিজে গিয়ে বা ভিডিও কলে পশু ভালোভাবে দেখে, লিখিত শর্তে কিনুন।