কোরবানির ভাগের নিয়ম: গরু-মহিষে সাত শরিক ও শর্তাবলি
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
বাংলাদেশে কোরবানির সবচেয়ে প্রচলিত রূপ হলো কয়েকজন মিলে একটি গরু কেনা। একা একটি গরু কেনার সামর্থ্য অনেকের থাকে না, আবার ছাগলের চেয়ে গরুতে অংশ নিলে মাংসও বেশি পাওয়া যায়। শরিয়ত এ সুযোগ দিয়েছে: গরু, মহিষ ও উটে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারেন, আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বায় শুধু একজন।
বিজ্ঞাপন
সহিহ মুসলিমে হজরত জাবের (রা.) বলেছেন, হুদায়বিয়ার বছর তাঁরা মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে একটি উট সাতজনের পক্ষ থেকে এবং একটি গরু সাতজনের পক্ষ থেকে কোরবানি করেছিলেন। এই হাদিসই ভাগে কোরবানির মূল ভিত্তি।
তবে শরিকে কোরবানি দিতে গিয়ে প্রতিবছর কিছু ভুল দেখা যায়, যার কারণে শুধু একজনের নয়, পুরো পশুর সব শরিকের কোরবানি প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই কাদের সঙ্গে ভাগ নেবেন এবং কীভাবে হিসাব রাখবেন, তা আগে থেকে জেনে নেওয়া দরকার।
কোন পশুতে কতজন, কত ভাগ
গরু, মহিষ বা উট একজনের পক্ষ থেকেও কোরবানি দেওয়া যায়, আবার দুই থেকে সাতজন পর্যন্ত মিলে দেওয়া যায়। শরিকের সংখ্যা সাতের কম হলে সমস্যা নেই, যেমন তিনজন, পাঁচজন বা ছয়জন। শর্ত শুধু একটি: কারও অংশ যেন পুরো পশুর এক-সপ্তমাংশের কম না হয়।
বিজ্ঞাপন
উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। পাঁচজন মিলে একটি গরু নিলে কেউ দুই ভাগ, কেউ এক ভাগ নিতে পারেন, যদি মোট সাত ভাগের মধ্যে থাকে। কিন্তু আটজন মিলে একটি গরু নিলে প্রত্যেকের অংশ এক-সপ্তমাংশের কম হয়ে যায়, তখন কারও কোরবানিই শুদ্ধ হয় না।
একজন ব্যক্তি একই গরুতে একাধিক ভাগ নিতে পারেন। যেমন একটি ভাগ নিজের ওয়াজিব কোরবানির জন্য, আরেকটি মৃত বাবার পক্ষ থেকে নফল কোরবানির জন্য। ছাগল, ভেড়া বা দুম্বায় ভাগ চলে না; এগুলো একটি দিয়ে একজনের কোরবানি হয়।
শরিক হওয়ার শর্ত
১. সবার নিয়ত ইবাদতের হওয়া: প্রত্যেক শরিকের উদ্দেশ্য হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি, যেমন ওয়াজিব কোরবানি, নফল কোরবানি, আকিকা বা মানত। কেউ যদি শুধু মাংস খাওয়ার উদ্দেশ্যে ভাগ নেন, তাহলে হানাফি মতে কারও কোরবানি শুদ্ধ হয় না।
বিজ্ঞাপন
২. সবাই মুসলমান হওয়া: কোরবানি ইবাদত, তাই শরিকদের সবাইকে মুসলমান হতে হবে।
৩. হালাল টাকা: কোনো শরিকের পুরো আয় বা ভাগের টাকা স্পষ্টভাবে হারাম উৎস থেকে হলে অন্যদের কোরবানিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আলেমরা সতর্ক করেছেন।
৪. কোরবানির দিনগুলোতে জবাই: সব শরিকের কোরবানি একসঙ্গে, ঈদের নামাজের পর থেকে ১২ জিলহজের সূর্যাস্তের মধ্যে জবাই হতে হবে।
৫. পশুর বয়স ও সুস্থতা: গরু ও মহিষের বয়স কমপক্ষে দুই বছর, উটের পাঁচ বছর এবং কোরবানিতে বাধা হয় এমন দোষমুক্ত হতে হবে। পশুতে বড় দোষ থাকলে কোনো শরিকেরই কোরবানি হবে না।
বিজ্ঞাপন
আকিকা ও কোরবানি একসঙ্গে
হানাফি মাজহাবে কোরবানির গরুতে আকিকার ভাগ রাখা জায়েজ। ছেলের আকিকার জন্য দুই ভাগ এবং মেয়ের জন্য এক ভাগ নেওয়ার প্রচলন আছে; ছেলের জন্য এক ভাগ নিলেও আকিকা আদায় হয়ে যায়। এতে খরচ কমে এবং কোরবানির দিনেই আকিকার কাজ সেরে ফেলা যায়।
তবে আকিকা ও কোরবানি একই ভাগে নয়, প্রতিটির জন্য আলাদা ভাগ রাখতে হবে। এক ভাগে দুটি ইবাদতের নিয়ত করলে তা যথেষ্ট হবে না। আলেমদের কেউ কেউ গরুতে আকিকার বিষয়ে ভিন্নমতও দিয়েছেন, তবে বাংলাদেশে হানাফি মতের ভিত্তিতে এটি সাধারণভাবে প্রচলিত।
টাকা, খরচ ও মাংসের হিসাব
বিজ্ঞাপন
পশুর দাম যতজন শরিক, যত ভাগ, সেই অনুপাতে ভাগ হবে। পশু পরিবহন, খাবার, রাখালের খরচ ও কসাইয়ের মজুরিও একই অনুপাতে ভাগ করুন। কসাইয়ের মজুরি মাংস বা চামড়া দিয়ে দেওয়া যাবে না; আলাদা টাকায় দিতে হবে।
জবাইয়ের পর মাংস দাঁড়িপাল্লায় মেপে শরিকদের মধ্যে ভাগ করা জরুরি। হানাফি ফকিহরা অনুমানে ভাগ না করতে বলেছেন, কারণ এতে একজনের অংশ আরেকজনের চেয়ে বেশি হয়ে যেতে পারে। মাথা, পা, কলিজা বা ভুঁড়ির মতো অংশ কারও ভাগে যোগ করলে সামান্য কম-বেশিতে অসুবিধা নেই, তবে সবাই এতে সম্মত থাকতে হবে।
চামড়া বিক্রি করলে সেই টাকা কোনো শরিক নিজে রাখতে পারবেন না। পুরো দাম গরিবদের সদকা করে দিতে হবে। অনেক এলাকায় সব শরিক মিলে চামড়া এলাকার মাদরাসার এতিমখানায় দিয়ে দেন, এতে হিসাবও সহজ হয়।
লিখিত হিসাব রাখার সহজ পদ্ধতি
বিজ্ঞাপন
ভাগের কোরবানিতে মনোমালিন্যের বড় কারণ হলো মৌখিক হিসাব। ঈদের ব্যস্ততায় কে কত টাকা দিয়েছেন, কার কয় ভাগ, কসাইকে কে টাকা দিলেন, এসব ভুলে যাওয়া খুব স্বাভাবিক। একটি খাতা বা মোবাইলে সবার দেখার মতো একটি তালিকা রাখলে ঝামেলা অনেক কমে।
১. শরিকের তালিকা: প্রত্যেক শরিকের নাম, কয় ভাগ এবং কোন নিয়তে, যেমন নিজের কোরবানি, মৃত বাবার পক্ষ থেকে বা সন্তানের আকিকা।
২. টাকার হিসাব: পশুর দাম, হাসিল, পরিবহন, খাবার ও কসাইয়ের খরচ আলাদা লিখে মোট অঙ্ককে ভাগের সংখ্যা দিয়ে ভাগ করুন।
৩. জমা ও বাকি: কে কত টাকা জমা দিয়েছেন, কার কাছে কত বাকি, তা তারিখসহ লিখুন।
বিজ্ঞাপন
৪. চামড়া ও উদ্বৃত্ত টাকা: চামড়া কোথায় দেওয়া হলো বা বিক্রির টাকা কোন গরিব বা প্রতিষ্ঠানকে সদকা করা হলো, তা-ও লিখে রাখুন।
একজন বিশ্বস্ত শরিককে হিসাবের দায়িত্ব দিন এবং ঈদের পর সবার সামনে হিসাব মিলিয়ে নিন। এতে পরের বছরও একসঙ্গে কোরবানি দেওয়ার সম্পর্ক অটুট থাকে।
শরিক নির্বাচনে সতর্কতা ও বিশেষ পরিস্থিতি
শরিক বাছাইয়ের সময় শুধু টাকার সামর্থ্য দেখবেন না। এমন মানুষ বাছুন, যাঁর আয় হালাল বলে আপনি জানেন এবং যিনি কোরবানিকে ইবাদত হিসেবেই দেখেন। অফিস বা মহল্লায় অপরিচিত কারও সঙ্গে ভাগ নেওয়ার আগে একটু খোঁজ নিন।
বিজ্ঞাপন
পশু কেনার আগেই শরিক চূড়ান্ত করে নেওয়া উত্তম। কেউ একা কোরবানির নিয়তে পশু কিনে পরে শরিক নিলে ফকিহদের মধ্যে কিছু বিস্তারিত আলোচনা আছে, বিশেষ করে ক্রেতা গরিব হলে বিষয়টি জটিল হয়। তাই শুরুতেই লিখিতভাবে নাম, ভাগ ও টাকার অঙ্ক ঠিক করুন।
কোরবানির আগে কোনো শরিক মারা গেলে তাঁর ওয়ারিশদের অনুমতি নিয়ে তাঁর পক্ষ থেকে কোরবানি দেওয়া যায়; অনুমতি ছাড়া দিলে সমস্যা তৈরি হয়। পশু হারিয়ে গেলে বা মারা গেলে শরিকদের, বিশেষ করে যাঁদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব, নতুন পশুর ব্যবস্থা করতে হবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
গরু কোরবানিতে কয় ভাগ করা যায়?
বিজ্ঞাপন
সর্বোচ্চ সাত ভাগ। সাতজনের কম শরিক হলেও চলে, তবে কারও অংশ এক-সপ্তমাংশের কম হতে পারবে না।
একজন শরিকের নিয়ত ঠিক না থাকলে কী হবে?
হানাফি মতে কোনো শরিক যদি ইবাদতের বদলে শুধু মাংসের উদ্দেশ্যে অংশ নেন, তাহলে পুরো পশুর কোনো শরিকের কোরবানিই শুদ্ধ হয় না। তাই শরিক বাছাইয়ে সতর্কতা জরুরি।
মৃত ব্যক্তির নামে এক ভাগ রাখা যায়?
বিজ্ঞাপন
যায়। নিজের টাকায় মৃত বাবা-মা বা আত্মীয়ের পক্ষ থেকে নফল কোরবানির ভাগ রাখা জায়েজ এবং সওয়াবের কাজ।
শরিকদের মধ্যে মাংস ওজন না করে ভাগ করলে কী হবে?
অনুমানে ভাগ করা অনুচিত। মাথা বা পায়ের মতো কোনো অংশ যোগ না করে সমান ভাগ দাবি করলে ওজন করে ভাগ করাই নিয়ম। ভুল হয়ে গেলে শরিকরা পরস্পর মিটিয়ে নেবেন।