নাফাখুম জলপ্রপাত: যাওয়ার পথ, খরচ, সেরা সময় ও সাবধানতা
ট্রাভেল ডেস্ক · বান্দরবান
প্রকাশ:
নাফাখুম সহজে যাওয়ার জায়গা নয়, আর সেটাই এর আকর্ষণ। বাস, জিপ, ইঞ্জিন নৌকা আর শেষে পাহাড়ি খালের পাশ দিয়ে কয়েক ঘণ্টার হাঁটা পেরিয়ে যখন পানির গর্জন কানে আসে, তখন ক্লান্তি ভুলে যেতে হয়। চওড়া খালের পুরো প্রস্থজুড়ে পানি একসঙ্গে নিচে আছড়ে পড়ছে, এমন জলপ্রপাত দেশে খুব কমই আছে।
বিজ্ঞাপন
নাফাখুম জলপ্রপাত কোথায় অবস্থিত? বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলার রেমাক্রি ইউনিয়নে, রেমাক্রি খালের ওপর। স্থানীয় মারমা ভাষায় খুম মানে জলপ্রপাত বা জলাধার। রেমাক্রি বাজার থেকে খাল ধরে হেঁটে যেতে হয়, সাধারণত আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লাগে।
ঢাকা থেকে নাফাখুম যাওয়া-আসায় অন্তত তিন রাত চার দিন হাতে রাখা দরকার। থানচি থেকে নিবন্ধিত গাইড নেওয়া এবং প্রশাসনের কাছে নাম নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন সময় এই এলাকায় পর্যটক চলাচলে নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হয়েছে, তাই রওনার আগে হালনাগাদ খবর নেওয়া সবচেয়ে জরুরি কাজ।
যাওয়ার আগে অনুমতি ও গাইড
থানচি থেকে রেমাক্রি ও নাফাখুমের পথে একা যাওয়ার সুযোগ নেই। থানচিতে স্থানীয় গাইড সমিতির মাধ্যমে নিবন্ধিত গাইড নিতে হয়। গাইডই সাধারণত থানা ও বিজিবির কাছে দলের সদস্যদের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ও ভ্রমণের পরিকল্পনা জমা দেওয়ার কাজে সাহায্য করেন।
বিজ্ঞাপন
সঙ্গে প্রত্যেক সদস্যের জাতীয় পরিচয়পত্রের কয়েকটি ফটোকপি রাখুন, অনেক জায়গায় জমা দিতে হয়। বিদেশি নাগরিকদের জন্য আলাদা অনুমতির নিয়ম আছে।
রওনা দেওয়ার কয়েক দিন আগে বান্দরবান জেলা প্রশাসন, থানচি উপজেলা প্রশাসন বা পরিচিত গাইডের মাধ্যমে জেনে নিন, এখন পর্যটকদের জন্য থানচি-রেমাক্রি পথ খোলা আছে কি না। নিষেধাজ্ঞা থাকলে সেটি অমান্য করার চেষ্টা করবেন না।
নাফাখুম জলপ্রপাত যাওয়ার উপায়
১. ঢাকা থেকে বান্দরবান: সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, আরামবাগ বা কলাবাগান থেকে রাতের বাসে বান্দরবান, সময় লাগে আট থেকে দশ ঘণ্টা। চাইলে ট্রেনে চট্টগ্রাম গিয়ে সেখান থেকে বাসে বান্দরবান যাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
২. বান্দরবান থেকে থানচি: বান্দরবান শহরের থানচি বাসস্ট্যান্ড থেকে লোকাল বাস ছাড়ে, আবার দলবেঁধে চাঁদের গাড়ি রিজার্ভ করেও যাওয়া যায়। পাহাড়ি পথে সময় লাগে তিন থেকে চার ঘণ্টা। পথে চিম্বুক ও নীলগিরি পড়ে। দুপুরের মধ্যে থানচি পৌঁছানো জরুরি, কারণ বিকেলের পর নদীপথে যাত্রা সাধারণত অনুমোদিত হয় না।
৩. থানচি থেকে রেমাক্রি: থানচি ঘাট থেকে সাঙ্গু নদী ধরে ইঞ্জিনচালিত সরু নৌকায় রেমাক্রি। উজানে যেতে হয় বলে পানির পরিমাণ অনুযায়ী দুই থেকে তিন ঘণ্টা লাগে। পথে তিন্দু আর রাজা পাথর এলাকার বিশাল পাথরের সারি দেখা যায়, যা এই যাত্রার অন্যতম সুন্দর অংশ। শুকনো মৌসুমে কোথাও কোথাও নৌকা থেকে নেমে ঠেলে নিতে হয়।
৪. রেমাক্রি থেকে নাফাখুম: রেমাক্রি বাজার থেকে রেমাক্রি খালের পাশ ধরে হাঁটা পথ। কখনো খালের পাশের পাথুরে পথ, কখনো হাঁটু বা কোমর পানি পার হতে হয়। সাধারণ হাঁটায় অভ্যস্ত মানুষের আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লাগে।
বেশির ভাগ দল প্রথম দিন রেমাক্রিতে রাত কাটায়, পরদিন সকালে নাফাখুম ঘুরে রেমাক্রি ফিরে আরেক রাত থাকে বা সরাসরি থানচি ফেরে।
বিজ্ঞাপন
কোথায় থাকবেন, কী খাবেন
রেমাক্রি বাজার ও আশপাশের পাড়ায় স্থানীয়দের পরিচালিত সাধারণ মানের কটেজ ও ঘর ভাড়া পাওয়া যায়। বাঁশ-কাঠের ঘর, মেঝেতে বা মাচায় বিছানা, বিদ্যুতের ব্যবস্থা সীমিত। বিলাসিতা নেই, তবে রাতে সাঙ্গুর শব্দ আর আকাশভরা তারা সেই অভাব পুষিয়ে দেয়। গাইড সাধারণত থাকার জায়গা ঠিক করে দেন।
খাবার হয় সহজ: ভাত, ডাল, আলু ভর্তা, ডিম, কখনো মুরগি বা পাহাড়ি সবজি। আগে থেকে জানিয়ে রাখলে রান্না করে দেওয়া হয়। থানচিতেও কয়েকটি থাকার জায়গা ও খাবারের হোটেল আছে।
রেমাক্রি ও নাফাখুমের পথে মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল বা অনুপস্থিত। পরিবারকে আগেই জানিয়ে রাখুন, এক-দুই দিন যোগাযোগ না-ও হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
থানচি পেরোনোর পর এটিএম বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ওপর ভরসা করা যায় না। নৌকা, গাইড, থাকা ও খাবারের পুরো খরচের নগদ টাকা বান্দরবান শহর থেকেই সঙ্গে নিন, ছোট নোট বেশি রাখুন। বিদ্যুৎ সীমিত বলে পাওয়ার ব্যাংক, টর্চ আর বাড়তি ব্যাটারি নিতে ভুলবেন না।
কখন যাবেন
নাফাখুম ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় বর্ষার পরপর, মোটামুটি সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর। তখন জলপ্রপাতে পানি ভরপুর থাকে, অথচ সাঙ্গু ও রেমাক্রি খালের স্রোত বর্ষার মতো ভয়ংকর থাকে না।
ভরা বর্ষায়, জুন থেকে আগস্ট, সাঙ্গু নদী উত্তাল হয়ে ওঠে, পাহাড়ি ঢল আর পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ে। এ সময় প্রশাসন প্রায়ই নৌ চলাচল সীমিত করে। শীত ও বসন্তে, ডিসেম্বর থেকে মার্চ, হাঁটা সহজ হয় কিন্তু পানি কমে যায়, জলপ্রপাতও কিছুটা শীর্ণ দেখায়।
বিজ্ঞাপন
নাফাখুম জলপ্রপাত ভ্রমণ খরচ
দলে আট থেকে দশজন হলে খরচ ভাগ হয়ে যুক্তিসংগত পর্যায়ে থাকে। ঢাকা থেকে তিন রাত চার দিনের সফরে জনপ্রতি আনুমানিক হিসাব:
ঢাকা-বান্দরবান যাওয়া-আসা: ১৬০০ থেকে ২০০০ টাকা।
বান্দরবান-থানচি: লোকাল বাসে জনপ্রতি কম, রিজার্ভ গাড়ি ভাগ করলে জনপ্রতি আনুমানিক ৪০০ থেকে ৭০০ টাকা এক পথে।
বিজ্ঞাপন
নৌকা: থানচি-রেমাক্রি যাওয়া-আসার নৌকা ভাড়া দলে ভাগ করলে জনপ্রতি আনুমানিক ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা। নৌকার ভাড়া প্রায়ই স্থানীয়ভাবে নির্ধারিত থাকে।
গাইড: দিনপ্রতি নির্ধারিত সম্মানী, দলে ভাগ করলে জনপ্রতি আনুমানিক ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা পুরো সফরে।
থাকা ও খাওয়া: রেমাক্রি ও থানচিতে দুই-তিন রাত থাকা আর খাবার মিলিয়ে জনপ্রতি আনুমানিক ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকা।
সব মিলিয়ে জনপ্রতি আনুমানিক ৫৫০০ থেকে ৯০০০ টাকা। দল ছোট হলে নৌকা ও গাইডের খরচ জনপ্রতি অনেক বেড়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
যে সাবধানতা মানতেই হবে
১. জলপ্রপাতের কুণ্ডে নামবেন না: নাফাখুমের নিচের কুণ্ড গভীর এবং ঘূর্ণি স্রোতময়। এখানে পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ওপর থেকে লাফ দেওয়া বা কিনারে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার ঝুঁকি নেবেন না।
২. নৌকায় লাইফ জ্যাকেট: সাঙ্গুতে নৌকা উল্টে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। লাইফ জ্যাকেট ছাড়া নৌকায় উঠবেন না।
৩. গাইডের কথা মানুন: পথ, সময় ও নিরাপত্তা নিয়ে গাইডের নির্দেশনা অগ্রাহ্য করবেন না। দল থেকে আলাদা হয়ে একা হাঁটবেন না।
বিজ্ঞাপন
৪. উপযুক্ত জুতা: পিচ্ছিল পাথর ও পানির পথে ভালো গ্রিপের জুতা বা স্যান্ডেল জরুরি। ফ্লিপ-ফ্লপ চলবে না।
৫. ওষুধ ও প্রাথমিক চিকিৎসা: ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকা হওয়ায় মশারোধী লোশন ও লম্বা কাপড় রাখুন। জ্বর, পেটের সমস্যা ও কাটাছেঁড়ার প্রাথমিক ওষুধ সঙ্গে নিন। আগে থেকে কোনো রোগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে যান।
৬. স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সম্মান: পাড়ায় অনুমতি ছাড়া ঢুকবেন না, ছবি তুলবেন না। ময়লা ফেরত আনুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
নাফাখুম জলপ্রপাত কোথায় অবস্থিত?
বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলার রেমাক্রি ইউনিয়নে, রেমাক্রি খালের ওপর। রেমাক্রি বাজার থেকে হেঁটে যেতে হয়।
গাইড ছাড়া কি নাফাখুম যাওয়া যায়?
না। থানচি থেকে নিবন্ধিত গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক এবং প্রশাসনের কাছে নাম নিবন্ধন করতে হয়।
বিজ্ঞাপন
নাফাখুম যেতে কত দিন লাগে?
ঢাকা থেকে যাওয়া-আসা মিলিয়ে সাধারণত তিন রাত চার দিন। হাতে আরও সময় থাকলে আমিয়াখুমের মতো দূরের জায়গাও পরিকল্পনায় রাখা যায়, তবে সেই পথ আরও কঠিন।
শিশুদের নিয়ে কি নাফাখুম যাওয়া উচিত?
দীর্ঘ নৌকাযাত্রা, পাথুরে পথে হাঁটা আর সীমিত সুবিধার কারণে ছোট শিশু ও বয়স্কদের জন্য এই ভ্রমণ উপযুক্ত নয়।