বিছনাকান্দি ভ্রমণ গাইড: যাতায়াত, সেরা সময়, খরচ ও দেখার বিষয়
ট্রাভেল ডেস্ক · সিলেট
প্রকাশ:
পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঠান্ডা পানি, যার নিচের প্রতিটি নুড়ি স্পষ্ট দেখা যায়। সামনে মেঘালয়ের পাহাড়ের সারি, আর সেই পাহাড়ের ভাঁজ থেকে নেমে আসা মেঘ। বিছনাকান্দির নামের সঙ্গেই একটা আরামের ছবি জড়িয়ে আছে, যেন পাথরের বিছানা পাতা।
বিজ্ঞাপন
বিছনাকান্দি কোথায় অবস্থিত, তার উত্তর: সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার রুস্তমপুর ইউনিয়নে, ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষে। সিলেট শহর থেকে দূরত্ব আনুমানিক ৪০ থেকে ৪৫ কিলোমিটার। মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির ধারা এখানে কয়েকটি স্তরে পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে যায়।
সিলেট শহর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় হাদারপার বাজার, সেখান থেকে ইঞ্জিন নৌকায় বিছনাকান্দি, এই হলো মূল পথ। সকালে বের হলে বিকেলের মধ্যে শহরে ফেরা যায়। চাইলে একই দিনে পাশের পাংথুমাই ঝরনার দৃশ্যও দেখে আসা সম্ভব।
কেন বিছনাকান্দি যাবেন
জাফলং বা সাদা পাথরের মতো বিছনাকান্দিও পাথর আর পাহাড়ি পানির জায়গা, তবু এর আলাদা একটা মেজাজ আছে। এখানে ভিড় তুলনামূলক কম, আর পানির ধারা চওড়া জায়গায় ছড়িয়ে থাকে বলে বসে বিশ্রাম নেওয়ার জায়গা বেশি। পরিবার নিয়ে পাথরে বসে পা ভেজানো, ছবি তোলা আর পাহাড়ের দিকে চেয়ে সময় কাটানো, এটুকুই বিছনাকান্দির আনন্দ।
বিজ্ঞাপন
যাত্রাপথটিও উপভোগ্য। হাদারপার থেকে নৌকা যখন পিয়াইন নদী ধরে এগোয়, দুই পাশে গ্রাম, ধানখেত আর দূরে পাহাড়ের সারি ক্রমে কাছে আসতে থাকে। বর্ষায় নদীর দুই তীর সবুজে ঢাকা থাকে।
বিছনাকান্দি যাওয়ার উপায়
১. ঢাকা থেকে সিলেট: সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, আরামবাগ ও মহাখালী থেকে সিলেটের বাস ছাড়ে, সময় লাগে ছয়-সাত ঘণ্টা। কমলাপুর থেকে পারাবত, জয়ন্তিকা, কালনী ও উপবন এক্সপ্রেস সিলেট যায়। চাইলে আকাশপথেও যাওয়া যায়।
২. সিলেট শহর থেকে হাদারপার: শহরের আম্বরখানা এলাকা থেকে হাদারপারগামী সিএনজিচালিত অটোরিকশা পাওয়া যায়। শেয়ারে জনপ্রতি ভাড়া দিতে হয়, রিজার্ভ নিলে পুরো গাড়ির ভাড়া। সালুটিকর হয়ে যাওয়া এই পথে সময় লাগে মোটামুটি এক থেকে দেড় ঘণ্টা। রাস্তার কিছু অংশ খারাপ থাকতে পারে।
বিজ্ঞাপন
৩. হাদারপার থেকে নৌকা: হাদারপার বাজারের ঘাটে বিছনাকান্দি যাওয়ার ইঞ্জিন নৌকা পাওয়া যায়। যাওয়া, সেখানে অবস্থান আর ফেরা মিলিয়ে পুরো নৌকা ভাড়া নিতে হয়। পানির পরিমাণ অনুযায়ী যেতে আধা ঘণ্টা থেকে পৌনে এক ঘণ্টা লাগে।
৪. শুকনো মৌসুমে বিকল্প: পানি একেবারে কমে গেলে নৌকার বদলে হাদারপার থেকে কিছুটা পথ হেঁটে বা স্থানীয় বাহনে যেতে হতে পারে। তখন স্থানীয়দের কাছ থেকে সর্বশেষ পথ জেনে নিন।
নৌকা ভাড়া করার সময় কত ঘণ্টা বিছনাকান্দিতে থাকবেন এবং পাংথুমাই যাবেন কি না, তা আগেই ঠিক করে নিন। এতে পরে বাড়তি টাকা নিয়ে তর্ক হয় না।
কখন যাবেন
বিজ্ঞাপন
বিছনাকান্দি দেখার আদর্শ সময় বর্ষা থেকে শরৎ, মোটামুটি জুন থেকে অক্টোবর। এ সময় পাহাড় থেকে পর্যাপ্ত পানি নামে, স্রোত পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে যায় আর মেঘালয়ের পাহাড়গুলো মেঘে ঢাকা থাকে। বর্ষার শেষ ভাগে, আগস্ট-সেপ্টেম্বরে, পানি তুলনামূলক স্বচ্ছ থাকে।
তবে টানা ভারী বৃষ্টির সময় পাহাড়ি ঢল নামলে পানি হঠাৎ বেড়ে যায় এবং স্রোত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। সিলেটে বন্যার সতর্কতা বা ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস থাকলে সেদিন যাত্রা বাতিল করুন।
শীত ও শুষ্ক মৌসুমে, ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল, পানি অনেক কমে যায়। তখন বিছনাকান্দি অনেকটা শুকনো পাথুরে মাঠের মতো দেখায় আর নৌকাভ্রমণও কঠিন হয়ে পড়ে। এ সময় না যাওয়াই ভালো।
বিছনাকান্দি ভ্রমণ খরচ
বিজ্ঞাপন
নিচের হিসাব সাধারণ ধারণার জন্য, সবই আনুমানিক এবং মৌসুম, দরদাম ও দলের আকারের ওপর নির্ভর করে।
ঢাকা-সিলেট যাতায়াত: নন-এসি বাস বা ট্রেনে জনপ্রতি যাওয়া-আসা ১৪০০ থেকে ১৮০০ টাকা।
সিলেট-হাদারপার: সিএনজি রিজার্ভ যাওয়া-আসা ১২০০ থেকে ২০০০ টাকা। শেয়ারে গেলে জনপ্রতি অনেক কম।
নৌকা: হাদারপার থেকে বিছনাকান্দি যাওয়া-আসা ১০০০ থেকে ২০০০ টাকা, পাংথুমাই যোগ করলে আরও কিছু বেশি। একটি নৌকায় সাধারণত আট-দশজন যাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
খাবার: বিছনাকান্দি ও হাদারপারে ছোট খাবারের দোকানে সাধারণ ভাত-মাছ, মুরগি ও হালকা নাশতা পাওয়া যায়। জনপ্রতি ২০০ থেকে ৪০০ টাকা।
চার-পাঁচজনের দলে গেলে সিলেট শহর থেকে বিছনাকান্দির দিনটিতে জনপ্রতি খরচ আনুমানিক ৮০০ থেকে ১২০০ টাকার মধ্যে রাখা যায়। এর সঙ্গে ঢাকা-সিলেট যাতায়াত ও শহরের হোটেল খরচ যোগ করতে হবে।
একই দিনে পাংথুমাই ও অন্যান্য
বিছনাকান্দির কাছেই পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের পাংথুমাই গ্রাম। সেখান থেকে সীমান্তের ওপারে মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা একটি বড় ঝরনা দেখা যায়। ঝরনাটি ভারতের ভূখণ্ডে, তাই কাছে যাওয়া যায় না, তবে বাংলাদেশের দিক থেকে এর দৃশ্য অসাধারণ, বিশেষ করে বর্ষায়।
বিজ্ঞাপন
অনেকে নৌকা রিজার্ভ করে একই দিনে বিছনাকান্দি, পাংথুমাই আর লক্ষ্মণছড়া ঘুরে আসেন। এতে সময় বেশি লাগে, তাই খুব ভোরে রওনা দেওয়া দরকার। দলে শিশু বা বয়স্ক কেউ থাকলে শুধু বিছনাকান্দি রাখাই ভালো।
নিরাপত্তা ও সতর্কতা
স্রোত: বিছনাকান্দির পানি দেখতে শান্ত হলেও পাথরের ফাঁকে স্রোত অনেক জোরালো। এখানে পানিতে ভেসে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সাঁতার জানলেও গভীর ও স্রোতের জায়গায় নামবেন না।
পিচ্ছিল পাথর: শ্যাওলা ধরা পাথরে পা ফসকে পড়ে মাথায় আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ভালো গ্রিপের রাবারের জুতা পরুন।
বিজ্ঞাপন
সীমান্ত: বিছনাকান্দির শেষ প্রান্ত থেকেই ভারতের সীমানা শুরু। বিজিবির টাঙানো নির্দেশনা ও সীমানা মেনে চলুন, ওপারের দিকে এগোবেন না।
লাইফ জ্যাকেট: নৌকায় লাইফ জ্যাকেট আছে কি না দেখে উঠুন, শিশুদের অবশ্যই পরান।
ফেরার সময়: সন্ধ্যার পর নৌকা ও সিএনজি পাওয়া কঠিন হয়, রাস্তাও নির্জন হয়ে যায়। বিকেল চারটার মধ্যে ফেরার পথ ধরুন।
পরিবেশ: খাবারের প্যাকেট ও বোতল পানিতে বা পাথরের ফাঁকে ফেলবেন না।
বিজ্ঞাপন
সঙ্গে যা রাখবেন: এক সেট বাড়তি কাপড়, ছোট তোয়ালে, মোবাইল ও টাকার জন্য জলরোধী পাউচ, খাবার পানি, টুপি ও সানস্ক্রিন। বিছনাকান্দিতে কাপড় বদলানোর জন্য কয়েকটি অস্থায়ী ঘর থাকলেও সেগুলোর অবস্থা সব সময় ভালো থাকে না, তাই নারী সদস্যদের জন্য বড় ওড়না বা চাদর কাজে লাগে।
শিশুদের দিকে নজর: পানির ধারে শিশুরা খেলতে খেলতে কখন স্রোতের দিকে চলে যায়, বোঝা যায় না। একজন বড় মানুষকে শুধু শিশুদের দেখার দায়িত্ব দিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিছনাকান্দি কোথায় অবস্থিত?
বিজ্ঞাপন
সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার রুস্তমপুর ইউনিয়নে, ভারতের মেঘালয় সীমান্তের কাছে, সিলেট শহর থেকে আনুমানিক ৪০ থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে।
বিছনাকান্দি যাওয়ার সেরা সময় কোনটি?
জুন থেকে অক্টোবর। তবে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের দিনে যাওয়া উচিত নয়।
সিলেট থেকে বিছনাকান্দি এক দিনে ঘুরে আসা যায়?
বিজ্ঞাপন
হ্যাঁ। সকালে রওনা দিলে বিছনাকান্দি ঘুরে বিকেলে শহরে ফেরা যায়।
বিছনাকান্দিতে কি থাকার ব্যবস্থা আছে?
সেখানে পর্যটকদের জন্য মানসম্মত থাকার ব্যবস্থা তেমন নেই। সিলেট শহরে থেকে দিনে ঘুরে আসাই সুবিধাজনক।
বিছনাকান্দি আর জাফলংয়ের মধ্যে কোনটি বেছে নেব?
বিজ্ঞাপন
সময় কম হলে যেকোনো একটি বেছে নিন। জাফলংয়ে সুযোগ-সুবিধা ও ভিড় দুটিই বেশি, বিছনাকান্দি তুলনামূলক নিরিবিলি এবং পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া পানির দৃশ্য বেশি উপভোগ্য। দুই দিন হাতে থাকলে দুটিই দেখে নিন।