আকিকার নিয়ম: ছেলে ও মেয়ের আকিকা, সময় ও পশুর সংখ্যা
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
ঘরে নতুন শিশু এলে আনন্দের পাশাপাশি অভিভাবকদের মনে একটি প্রশ্ন জাগে: আকিকা কবে দেব, কয়টি পশু লাগবে? সংক্ষেপে উত্তর হলো, জন্মের সপ্তম দিনে আকিকা দেওয়া সুন্নত। ছেলের জন্য দুটি ছাগল বা ভেড়া এবং মেয়ের জন্য একটি জবাই করা উত্তম। সামর্থ্য না থাকলে ছেলের জন্যও একটি দিলে আকিকা আদায় হয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
সপ্তম দিনে না পারলে পরে যেকোনো সময় দেওয়া যায়। আকিকা ফরজ বা ওয়াজিব নয়, তাই সামর্থ্য না থাকলে না দিলেও গুনাহ নেই। কিন্তু সামর্থ্য থাকলে এই সুন্নত আদায় করা উচিত, কারণ এটি সন্তানের জন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম।
আকিকা কী এবং এর বিধান
আকিকা হলো সন্তান জন্মের শুকরিয়া হিসেবে তার পক্ষ থেকে পশু জবাই করা। আরবি শব্দটির মূল অর্থ কাটা; নবজাতকের মাথার চুল কাটা এবং পশু জবাই, দুটোর সঙ্গেই এর সম্পর্ক আছে বলে ভাষাবিদেরা উল্লেখ করেছেন।
আবু দাউদ, তিরমিজি ও নাসায়িতে হজরত সামুরা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, প্রত্যেক শিশু তার আকিকার সঙ্গে বন্ধক থাকে। সপ্তম দিনে তার পক্ষ থেকে জবাই করা হবে, তার মাথা মুণ্ডন করা হবে এবং নাম রাখা হবে।
বিজ্ঞাপন
শিশু আকিকার সঙ্গে বন্ধক থাকার অর্থ কী, তা নিয়ে আলেমদের একাধিক ব্যাখ্যা আছে। কেউ বলেছেন, আকিকা না হলে শিশু বাবা-মায়ের জন্য পূর্ণভাবে কল্যাণের মাধ্যম হয় না; কেউ বলেছেন, আকিকা শিশুর জন্য নিরাপত্তা ও বরকতের উপলক্ষ। ব্যাখ্যা যা-ই হোক, মূল বার্তা হলো সামর্থ্য থাকলে এ আমল অবহেলা না করা।
আকিকার একটি সামাজিক দিকও আছে। এর মাধ্যমে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা নতুন শিশুর আগমনের খবর পান, একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া হয়, গরিবেরাও আনন্দে শরিক হন। সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে, দুই ক্ষেত্রেই সমান আনন্দ নিয়ে আকিকা দেওয়া ইসলামের শিক্ষা। জাহেলি যুগে মেয়ের জন্মকে অনেকে অপমান মনে করত, ইসলাম সেই মানসিকতা ভেঙে দিয়েছে।
আকিকার বিধান নিয়ে মাজহাবগুলোর মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাবে এটি সুন্নতে মুয়াক্কাদা। হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ মত হলো আকিকা মুস্তাহাব, অর্থাৎ পছন্দনীয় আমল। সব মতেই এটি সওয়াবের কাজ, বাধ্যতামূলক ইবাদত নয়।
কবে আকিকা দিতে হয়
বিজ্ঞাপন
সবচেয়ে উত্তম সময় জন্মের সপ্তম দিন। দিন গোনার সময় জন্মের দিনটিকেও ধরা হয়। সহজ নিয়ম হলো, শিশু যে বারে জন্মেছে, তার আগের বারটি হবে সপ্তম দিন। যেমন শুক্রবার জন্ম হলে পরের বৃহস্পতিবার, সোমবার জন্ম হলে পরের রবিবার।
সপ্তম দিনে সম্ভব না হলে কিছু বর্ণনার ভিত্তিতে ফকিহরা ১৪তম বা ২১তম দিনের কথা বলেছেন, যা একই হিসাবে জন্মবারের আগের বারে পড়ে। এরপরও না পারলে পরে যেকোনো সময় দেওয়া যায়। অনেকে কোরবানির ঈদে গরুর ভাগে আকিকা দেন, এটিও প্রচলিত ও জায়েজ পদ্ধতি।
মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য, হাসপাতালের খরচ বা পরিবারের অবস্থার কারণে সপ্তম দিনে আকিকা দিতে না পারলে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। আগে মা ও শিশুর সুস্থতা, তারপর আনুষ্ঠানিকতা।
ছেলে ও মেয়ের আকিকায় পশুর সংখ্যা
বিজ্ঞাপন
তিরমিজি ও আবু দাউদের হাদিসে এসেছে, ছেলের পক্ষ থেকে সমবয়সী দুটি ছাগল এবং মেয়ের পক্ষ থেকে একটি ছাগল আকিকা দিতে হবে। আবার আবু দাউদে বর্ণিত আছে, মহানবী (সা.) হজরত হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর পক্ষ থেকে একটি করে দুম্বা আকিকা দিয়েছিলেন। এ দুই বর্ণনার আলোকে আলেমরা বলেন, ছেলের জন্য দুটি উত্তম, তবে একটিও যথেষ্ট।
১. ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা: ছেলের জন্য দুটি, মেয়ের জন্য একটি। প্রতিটির বয়স ও সুস্থতার শর্ত কোরবানির পশুর মতো: ছাগলের বয়স কমপক্ষে এক বছর, দোষমুক্ত।
২. গরু বা মহিষ: পুরো একটি গরু দিয়ে আকিকা দেওয়া যায়। আবার গরুর সাত ভাগের মধ্যে ছেলের জন্য দুই ভাগ এবং মেয়ের জন্য এক ভাগ নেওয়া যায়। গরুর বয়স কমপক্ষে দুই বছর হতে হবে।
৩. কোরবানির সঙ্গে ভাগ: হানাফি মতে কোরবানির গরুতে আলাদা ভাগ নিয়ে আকিকা দেওয়া জায়েজ। এক ভাগে কোরবানি ও আকিকা দুটির নিয়ত করা যাবে না।
বিজ্ঞাপন
যমজ সন্তান হলে প্রত্যেকের জন্য আলাদা আকিকা দিতে হবে। আকিকার খরচ সাধারণত বাবা বহন করেন; দাদা-দাদি, নানা-নানি বা অন্য কেউ বাবার সম্মতিতে দিলে তা-ও আদায় হয়।
আকিকার দিনের অন্যান্য সুন্নত
সপ্তম দিনে আকিকার সঙ্গে আরও কয়েকটি কাজ সুন্নত। প্রথমত, নবজাতকের মাথার চুল মুণ্ডন করা। তিরমিজির হাদিসে আছে, হজরত হাসান (রা.)-এর জন্মের পর মহানবী (সা.) হজরত ফাতিমা (রা.)-কে মাথা মুণ্ডন করে চুলের ওজনের সমপরিমাণ রুপা সদকা করতে বলেছিলেন। এখন চুল মাপা কঠিন হলে আনুমানিক ওজন ধরে রুপার দাম হিসাব করে সদকা করা যায়। নবজাতকের মাথা কোমল, তাই অভিজ্ঞ কাউকে দিয়ে সাবধানে মুণ্ডন করান।
দ্বিতীয়ত, সুন্দর অর্থবহ নাম রাখা। সপ্তম দিনে নাম রাখার কথা হাদিসে এসেছে, তবে জন্মের দিনেও নাম রাখা যায়; সহিহ মুসলিমে আছে, মহানবী (সা.) নিজের ছেলের জন্মের রাতেই তাঁর নাম রেখেছিলেন ইবরাহিম।
বিজ্ঞাপন
জন্মের পর পরই কিছু আমল আছে, যা আকিকার দিনের অপেক্ষায় রাখার দরকার নেই। বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত, সাহাবিরা নবজাতককে মহানবী (সা.)-এর কাছে আনলে তিনি খেজুর চিবিয়ে শিশুর মুখে লাগিয়ে দিতেন এবং বরকতের দোয়া করতেন; একে তাহনিক বলে। আবু দাউদ ও তিরমিজির বর্ণনার ভিত্তিতে নবজাতকের ডান কানে আজান দেওয়ার প্রচলনও রয়েছে। তাহনিকের সময় শিশুর বয়স ও স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রাখুন; খুব সামান্য পরিমাণ নরম খেজুর ব্যবহার করুন, প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
আকিকা নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা
১. বাবা-মা আকিকার মাংস খেতে পারবেন না: এ ধারণার ভিত্তি নেই। আকিকার মাংস বাবা-মা, দাদা-দাদিসহ পরিবারের সবাই খেতে পারেন।
২. আকিকা না দিলে সন্তানের নামাজ বা বিয়ে কবুল হয় না: এমন কোনো কথা কোরআন-হাদিসে নেই। আকিকা মুস্তাহাব আমল, এর সঙ্গে সন্তানের ইবাদত কবুল হওয়ার শর্ত জড়ানো ভুল।
বিজ্ঞাপন
৩. আকিকার পশুর হাড় ভাঙা যাবে না: কোনো কোনো আলেম শুভ লক্ষণ হিসেবে হাড় না ভাঙাকে পছন্দ করেছেন, কিন্তু এটি বাধ্যতামূলক নয়।
৪. বড় অনুষ্ঠান না করলে আকিকা হয় না: আকিকার মূল কাজ পশু জবাই। আত্মীয়দের দাওয়াত দেওয়া যায়, তবে ঋণ করে লোক দেখানো আয়োজনের প্রয়োজন নেই।
৫. বড় হয়ে গেলে আকিকা দেওয়া যায় না: ছোটবেলায় আকিকা না হলে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি নিজের আকিকা নিজে দিতে পারেন বলে অনেক আলেম মত দিয়েছেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
আকিকা কত দিনে দিতে হয়?
জন্মের সপ্তম দিনে দেওয়া উত্তম। না পারলে ১৪ বা ২১তম দিনে, এরপরও না হলে পরে যেকোনো সময় দেওয়া যায়।
ছেলের আকিকায় একটি ছাগল দিলে কি হবে?
হবে। ছেলের জন্য দুটি দেওয়া উত্তম, তবে সামর্থ্য না থাকলে একটি দিলেও আকিকা আদায় হয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
মৃত সন্তানের আকিকা দিতে হয়?
জন্মের পর সপ্তম দিনের আগে শিশু মারা গেলে আকিকা দেওয়া জরুরি নয়। এ বিষয়ে কিছু আলেম ভিন্নমত দিয়েছেন, তবে সাধারণভাবে বাধ্যবাধকতা নেই।
আকিকার মাংস কীভাবে বণ্টন করব?
কোরবানির মাংসের মতো নিজের, আত্মীয়ের ও গরিবের জন্য তিন ভাগ করা উত্তম। চাইলে রান্না করে দাওয়াত দিয়েও খাওয়ানো যায়।
বিজ্ঞাপন
আকিকার জন্য ঋণ করা কি ঠিক?
আকিকা বাধ্যতামূলক নয়, তাই ঋণ করে বা পরিবারের জরুরি খরচ কাটছাঁট করে আকিকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সামর্থ্য হলে পরে দিলেও সুন্নত আদায়ের সুযোগ থাকে।