মোবাইল চার্জ হচ্ছে না কেন: কারণ খুঁজে ঘরেই সমাধানের উপায়
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
রাতে চার্জে দিয়ে ঘুমিয়েছিলেন, সকালে দেখলেন ব্যাটারি সেই আগের জায়গায়। অথবা চার্জার লাগালে চার্জিংয়ের চিহ্ন একবার আসে, একবার যায়। এমন হলে প্রথমেই ফোন বদলানোর বা দোকানে দৌড়ানোর দরকার নেই। মোবাইল চার্জ হচ্ছে না কেন, তার উত্তর বেশির ভাগ সময় খুব সাধারণ কোনো জায়গায় লুকিয়ে থাকে।
বিজ্ঞাপন
চার্জিং আসলে একটি শিকল। দেয়ালের সকেট থেকে বিদ্যুৎ যায় অ্যাডাপ্টারে, অ্যাডাপ্টার থেকে কেবলে, কেবল থেকে ফোনের পোর্টে, পোর্ট থেকে ব্যাটারিতে, আর পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করে ফোনের সফটওয়্যার। এই শিকলের যেকোনো একটি জায়গায় সমস্যা হলেই চার্জ বন্ধ বা ধীর হয়ে যায়। তাই সমাধানের কৌশল হলো একটা একটা করে প্রতিটি অংশ পরীক্ষা করা।
নিচের ধাপগুলো সহজ থেকে জটিলের দিকে সাজানো। প্রথম দিকের ধাপেই বেশির ভাগ মানুষের সমস্যা মিটে যায়।
প্রথম পরীক্ষা: সকেট, অ্যাডাপ্টার ও কেবল
১. অন্য সকেটে লাগান: যে সকেটে চার্জ দিচ্ছেন, সেখানে অন্য কোনো যন্ত্র চলে কি না দেখুন। মাল্টিপ্লাগ বা এক্সটেনশন বোর্ড ঢিলা হলে সংযোগ বারবার কেটে যায়।
বিজ্ঞাপন
২. কেবল বদলে দেখুন: চার্জিং কেবল সবচেয়ে বেশি নষ্ট হয়, বিশেষ করে দুই মাথার কাছের অংশ। বাইরে থেকে ঠিক দেখালেও ভেতরের তার ছিঁড়ে যেতে পারে। পরিচিত কারও ভালো কেবল দিয়ে চেষ্টা করুন।
৩. অ্যাডাপ্টার বদলান: একই কেবল অন্য অ্যাডাপ্টারে লাগিয়ে দেখুন। অ্যাডাপ্টার গরম হয়ে যাওয়া, পোড়া গন্ধ বা গুনগুন শব্দ করলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার বন্ধ করুন।
৪. কম্পিউটারে লাগিয়ে দেখুন: কম্পিউটারের ইউএসবি পোর্টে লাগালে ফোন চার্জিং দেখায় কি না, দেখুন। দেখালে বুঝবেন ফোনের দিকটা মোটামুটি ঠিক আছে, সমস্যা অ্যাডাপ্টারে।
চার্জিং পোর্টে ধুলা: সবচেয়ে উপেক্ষিত কারণ
বিজ্ঞাপন
পকেট আর ব্যাগে থাকতে থাকতে ফোনের চার্জিং পোর্টে কাপড়ের আঁশ ও ধুলা জমে শক্ত স্তর তৈরি হয়। তখন কেবল পুরোপুরি ভেতরে ঢোকে না, একটু নড়লেই সংযোগ কেটে যায়। টর্চের আলো ফেলে পোর্টের ভেতরে তাকালে অনেক সময় এই ময়লা দেখা যায়।
পরিষ্কারের আগে ফোন বন্ধ করুন। এরপর কাঠের টুথপিক বা প্লাস্টিকের সরু কাঠি দিয়ে খুব আলতো করে ময়লা বের করে আনুন। সুই, পিন বা কোনো ধাতব জিনিস ব্যবহার করবেন না, এতে পোর্টের ভেতরের সংযোগ বিন্দু নষ্ট বা শর্ট সার্কিট হতে পারে। জোরে ফুঁ দেওয়াও ঠিক নয়, মুখের জলীয় বাষ্প ভেতরে চলে যায়। পরিষ্কারের পর কেবল আগের চেয়ে শক্তভাবে বসলে বুঝবেন সমস্যা এখানেই ছিল।
চার্জ দেরিতে হয় কেন
চার্জ হচ্ছে, কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগছে, এই অভিযোগও কম নয়।
বিজ্ঞাপন
১. কম ক্ষমতার অ্যাডাপ্টার: পুরোনো বা অন্য ফোনের কম ক্ষমতার অ্যাডাপ্টারে নতুন ফোন ধীরে চার্জ হয়। ফাস্ট চার্জিং পেতে ফোনের সঙ্গে মানানসই অ্যাডাপ্টার ও কেবল লাগে।
২. চার্জের সময় ব্যবহার: চার্জে রেখে গেম খেললে, ভিডিও দেখলে বা ভিডিও কলে থাকলে যত বিদ্যুৎ ঢোকে, প্রায় তত খরচও হয়।
৩. গরম অবস্থা: ফোন বেশি গরম হলে ব্যাটারি রক্ষার জন্য ফোন নিজেই চার্জের গতি কমিয়ে দেয় বা সাময়িক বন্ধ রাখে। ঠান্ডা ও বাতাস চলাচলের জায়গায় চার্জ দিন, মোটা কভার খুলে রাখুন।
৪. ব্যাটারি সুরক্ষা ফিচার: অনেক ফোনে অপটিমাইজড বা অ্যাডাপটিভ চার্জিং নামে সুবিধা থাকে, যা রাতে আশি শতাংশের কাছাকাছি গিয়ে চার্জ ধীর করে দেয় এবং ঘুম থেকে ওঠার আগে পূর্ণ করে। আবার কিছু ফোনে চার্জ একটি নির্দিষ্ট সীমায় থামিয়ে রাখার বিকল্প থাকে। এগুলো ত্রুটি নয়, ব্যাটারির আয়ু বাড়ানোর ব্যবস্থা। সেটিংসের ব্যাটারি অংশে দেখে নিন চালু আছে কি না।
বিজ্ঞাপন
৫. দুর্বল সকেট বা বিদ্যুতের ভোল্টেজ কম: লো ভোল্টেজের সময় অনেক অ্যাডাপ্টার পূর্ণ ক্ষমতায় কাজ করে না।
সফটওয়্যার ও সেটিংয়ের দিক
হার্ডওয়্যার ঠিক থাকলেও সফটওয়্যারের গোলমালে চার্জিং আটকে যেতে পারে।
১. রিস্টার্ট: ফোন একবার বন্ধ করে চালু করুন। অনেক সাময়িক জটিলতা এতেই কেটে যায়।
বিজ্ঞাপন
২. হালনাগাদ: সেটিংসে সফটওয়্যার আপডেট আছে কি না দেখুন। চার্জিং-সংক্রান্ত ত্রুটি অনেক সময় আপডেটে ঠিক হয়।
৩. ব্যাটারি খাওয়া অ্যাপ: সেটিংসের ব্যাটারি অংশে কোন অ্যাপ অস্বাভাবিক বেশি চার্জ খরচ করছে দেখুন। অচেনা বা সন্দেহজনক অ্যাপ সরিয়ে দিন।
৪. সেফ মোডে পরীক্ষা: অ্যান্ড্রয়েডে সেফ মোডে চালু করলে বাইরের অ্যাপগুলো বন্ধ থাকে। সেফ মোডে ঠিকঠাক চার্জ হলে বুঝবেন কোনো অ্যাপ সমস্যা করছে। সেফ মোডে ঢোকার পদ্ধতি ব্র্যান্ডভেদে আলাদা, সাধারণত পাওয়ার মেনুতে বন্ধ করার বিকল্প চেপে ধরে রাখলে আসে।
৫. আর্দ্রতার সতর্কবার্তা: কিছু ফোন পোর্টে পানি বা আর্দ্রতা শনাক্ত করলে চার্জিং বন্ধ রাখে এবং সতর্কবার্তা দেখায়। তখন ফোন শুকনো জায়গায় কিছুক্ষণ রেখে দিন। চুলা, হেয়ার ড্রায়ার বা রোদে শুকানোর চেষ্টা করবেন না, চালের ভেতরে রাখার প্রচলিত পদ্ধতিও নির্ভরযোগ্য নয়।
বিজ্ঞাপন
ব্যাটারির স্বাস্থ্য বুঝবেন যেভাবে
লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি সময়ের সঙ্গে ধারণক্ষমতা হারায়। দুই-তিন বছরের পুরোনো ফোনে দ্রুত চার্জ ফুরিয়ে যাওয়া, হঠাৎ বিশ-ত্রিশ শতাংশ থেকে বন্ধ হয়ে যাওয়া, বা চার্জের শতাংশ লাফিয়ে ওঠানামা করা ব্যাটারি দুর্বল হওয়ার লক্ষণ। আইফোনের সেটিংসের ব্যাটারি অংশে ব্যাটারির স্বাস্থ্য দেখা যায়। অনেক অ্যান্ড্রয়েড ফোনের সেটিংস বা নির্মাতার নিজস্ব সহায়তা অ্যাপেও ব্যাটারি পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকে।
বিপদের সংকেত: ফোনের পেছনের কভার বা স্ক্রিন উঁচু হয়ে উঠলে ব্যাটারি ফুলে গেছে। এ অবস্থায় আর চার্জ দেবেন না, চাপ দেবেন না, নিজে খোলার চেষ্টা করবেন না। যত দ্রুত সম্ভব অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারে নিয়ে যান। ফোলা ব্যাটারি আগুন ধরার ঝুঁকি তৈরি করে।
কখন মেরামতের দোকানে যাবেন
বিজ্ঞাপন
ভিন্ন ভিন্ন ভালো কেবল ও অ্যাডাপ্টারে চেষ্টা করেছেন, পোর্ট পরিষ্কার করেছেন, সফটওয়্যারও হালনাগাদ, তবু চার্জ হচ্ছে না, তাহলে সমস্যা সম্ভবত পোর্টের ভেতরের যন্ত্রাংশ, চার্জিং আইসি বা ব্যাটারিতে। এ পর্যায়ে নির্মাতার অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারে যাওয়াই নিরাপদ। ওয়ারেন্টি থাকলে বাইরের দোকানে খোলাবেন না, তাতে ওয়ারেন্টি বাতিল হতে পারে। মেরামতের সময় আসল বা মানসম্মত যন্ত্রাংশ ব্যবহারের নিশ্চয়তা চান।
চার্জিং ঠিক রাখতে প্রতিদিনের অভ্যাস
চার্জ শূন্যে নামিয়ে আনার অপেক্ষা করবেন না, আবার সারাক্ষণ একশ শতাংশেও আটকে রাখার দরকার নেই। মোটামুটি বিশ থেকে আশি শতাংশের মধ্যে রাখার চেষ্টা ব্যাটারির জন্য ভালো। বালিশ বা বিছানার ওপর রেখে চার্জ দেবেন না, এতে তাপ বের হতে পারে না। সস্তা নামহীন চার্জার এড়িয়ে চলুন এবং কেবল টেনে না খুলে প্লাগ ধরে খুলুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
মোবাইল কেন চার্জ হয় না, অথচ চার্জিং চিহ্ন দেখায়?
এর মানে সংযোগ হচ্ছে, কিন্তু যথেষ্ট বিদ্যুৎ ঢুকছে না বা ফোন একই সময়ে বেশি খরচ করছে। কম ক্ষমতার অ্যাডাপ্টার, দুর্বল কেবল বা ব্যাকগ্রাউন্ডে ভারী অ্যাপ চলা এর সাধারণ কারণ।
অন্য ব্র্যান্ডের চার্জার দিয়ে চার্জ দেওয়া কি নিরাপদ?
মানসম্মত ও সঠিক মানের চার্জার হলে সাধারণত নিরাপদ, তবে ফাস্ট চার্জিং না-ও পেতে পারেন। সস্তা নামহীন চার্জার ফোন ও ব্যাটারির ক্ষতি করতে পারে।
বিজ্ঞাপন
সারারাত চার্জে রাখলে কি ব্যাটারি নষ্ট হয়?
এখনকার ফোন পূর্ণ হলে চার্জ নেওয়া নিয়ন্ত্রণ করে, তাই বড় ক্ষতি হয় না। তবে গরম জায়গায় বা বালিশের নিচে রাখা ক্ষতিকর।
ফোন পানিতে পড়ার পর চার্জ হচ্ছে না, কী করব?
ফোন বন্ধ করে চার্জ দেওয়া থেকে বিরত থাকুন এবং ভালোভাবে শুকাতে দিন। এরপরও সমস্যা থাকলে দেরি না করে সার্ভিস সেন্টারে নিন, কারণ ভেতরে ক্ষয় শুরু হতে পারে।