আকিকার দোয়া ও গোশত বণ্টনের নিয়ম: জবাই থেকে বিতরণ পর্যন্ত
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
আকিকার পশু জবাইয়ের জন্য আলাদা কোনো লম্বা দোয়া মুখস্থ করা বাধ্যতামূলক নয়। কোরবানির মতোই আল্লাহর নাম নিয়ে, 'বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার' বলে জবাই করলে আকিকা পুরোপুরি শুদ্ধ হয়। অন্তরে শুধু এটুকু নিয়ত থাকা জরুরি যে এই পশু অমুক সন্তানের আকিকা হিসেবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জবাই করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
গোশত বণ্টনের ক্ষেত্রেও আকিকা অনেক সহজ। নিজেরা খাওয়া, আত্মীয়স্বজনকে দেওয়া, রান্না করে দাওয়াত খাওয়ানো এবং গরিবদের দান করা, সবই জায়েজ। বাবা-মা আকিকার গোশত খেতে পারবেন না, এমন ধারণা প্রচলিত থাকলেও শরিয়তে এর কোনো ভিত্তি নেই।
নিচে নিয়ত, দোয়া, জবাইয়ের ধাপ এবং গোশত ও চামড়ার বিধান আলাদা করে দেওয়া হলো, যাতে আয়োজনের দিনে কোনো দ্বিধা না থাকে।
আকিকার নিয়ত কীভাবে করবেন
নিয়ত অন্তরের কাজ। জবাইয়ের আগে মনে মনে ঠিক করুন: আমার অমুক ছেলে বা মেয়ের পক্ষ থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আকিকা দিচ্ছি। মুখে বাংলায় বলতে চাইলে বলতে পারেন, আরবিতে বলা জরুরি নয়।
বিজ্ঞাপন
জবাইকারী যদি বাবা নিজে না হন, যেমন হুজুর বা কসাই জবাই করেন, তাহলে তাঁকে আগে জানিয়ে দিন যে এটি কার আকিকা। শিশুর নাম বলে দেওয়া ভালো। গরুর ভাগে আকিকা হলে কোন ভাগ আকিকার, কোনটি কোরবানির, তা শরিকদের মধ্যে আগে থেকেই স্পষ্ট থাকা দরকার।
একই পরিবারে একাধিক সন্তানের আকিকা বাকি থাকলে, যেমন বড় সন্তানের আকিকা সময়মতো দেওয়া হয়নি, এখন ছোটটির সঙ্গে দিতে চান, তাহলে প্রত্যেকের জন্য আলাদা পশু বা গরুর আলাদা ভাগ নির্ধারণ করুন। একটি ছাগলে দুই সন্তানের আকিকা হয় না। গরু হলে সাত ভাগের মধ্যে দুই ছেলের জন্য চার ভাগ এবং এক মেয়ের জন্য এক ভাগ, এভাবে হিসাব মিলিয়ে নেওয়া যায়।
আকিকার পশু জবাইয়ের দোয়া
জবাইয়ের মুহূর্তে বলবেন:
বিজ্ঞাপন
بِسْمِ اللَّهِ اللَّهُ أَكْبَرُ
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার। অর্থ: আল্লাহর নামে, আল্লাহ সবচেয়ে মহান। এর আগে কোরবানির মতো সুরা আনআমের দুটি আয়াত পড়া যায়: ইন্নি ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাজি ফাতারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানিফাও ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকিন, এবং ইন্না সালাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহইয়ায়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। অর্থ: আমি একনিষ্ঠভাবে আসমান-জমিনের স্রষ্টার দিকে মুখ ফেরালাম, আমি মুশরিক নই; নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও মৃত্যু জগতসমূহের রব আল্লাহর জন্য।
এরপর বলতে পারেন: আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়া লাকা, অর্থাৎ হে আল্লাহ, এটি আপনারই দান এবং আপনার জন্যই। কিছু বর্ণনায় আকিকার সময় এভাবে বলার কথা এসেছে: বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহুম্মা লাকা ওয়া ইলাইকা, হাজিহি আকিকাতু ফুলান। শেষ অংশের অর্থ, এটি অমুকের আকিকা; 'ফুলান'-এর জায়গায় শিশুর নাম বলবেন।
জবাই শেষে নিজের ভাষায় দোয়া করুন: হে আল্লাহ, আমার সন্তানের পক্ষ থেকে এই আকিকা কবুল করুন, তাকে নেক, সুস্থ ও দীর্ঘায়ু করুন এবং আমাদের জন্য চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন। এ ধরনের দোয়া যেকোনো ভাষায় করা যায়।
বিজ্ঞাপন
প্রচলিত লম্বা দোয়া সম্পর্কে একটি কথা
অনেক বই ও পুস্তিকায় আকিকার একটি লম্বা দোয়া পাওয়া যায়, যেখানে বলা হয় এই পশুর রক্ত সন্তানের রক্তের বদলে, এর গোশত সন্তানের গোশতের বদলে, এর হাড় সন্তানের হাড়ের বদলে, চামড়া চামড়ার বদলে, পশম চুলের বদলে। ছেলে ও মেয়ের জন্য শব্দ বদলে এটি পড়ানো হয়।
হাদিস বিশেষজ্ঞ অনেক আলেম উল্লেখ করেছেন, এই দোয়ার পক্ষে নির্ভরযোগ্য সনদ পাওয়া যায় না। কেউ পড়লে অর্থের দিক থেকে বড় আপত্তি নেই, তবে একে নবীজির সুন্নত মনে করা বা এটি না পড়লে আকিকা হবে না ভাবা ঠিক নয়। মুখস্থ না থাকলে দুশ্চিন্তার কারণ নেই; বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবারই মূল।
জবাইয়ের ধাপ সংক্ষেপে
বিজ্ঞাপন
১. পশু যাচাই: ছাগল বা ভেড়ার বয়স কমপক্ষে এক বছর, গরুর দুই বছর এবং পশু অন্ধত্ব, খোঁড়া বা কান-লেজ কাটার মতো দোষমুক্ত কি না দেখে নিন।
২. প্রস্তুতি: ছুরি আগে থেকে ধার দিন, পশুর সামনে নয়। রক্ত ফেলার গর্ত ও পরিষ্কারের ব্যবস্থা রাখুন।
৩. শোয়ানো: পশুকে বাম কাতে কেবলামুখী করে আলতোভাবে শোয়ান।
৪. জবাই: বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে দ্রুত ছুরি চালান, যাতে শ্বাসনালি, খাদ্যনালি ও রক্তনালিগুলো কেটে যায়। হানাফি মতে চারটির অন্তত তিনটি কাটা জরুরি।
বিজ্ঞাপন
৫. অপেক্ষা: পশু পুরোপুরি নিস্তেজ হওয়ার পর চামড়া ছাড়ানো শুরু করুন।
ছুরি যিনি চালাবেন, বিসমিল্লাহ তাঁকেই বলতে হবে। দুজন একসঙ্গে ছুরি ধরলে দুজনকেই বলতে হবে।
আকিকার গোশত বণ্টনের নিয়ম
আকিকার গোশত বণ্টনের পদ্ধতি মোটামুটি কোরবানির মতো, তবে এখানে স্বাধীনতা একটু বেশি। তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজেদের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-প্রতিবেশীর জন্য এবং এক ভাগ গরিবদের জন্য রাখা উত্তম। এটি বাধ্যতামূলক নয়।
বিজ্ঞাপন
অনেক পরিবার পুরো গোশত রান্না করে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও গরিবদের দাওয়াত দিয়ে খাওয়ান। এটিও জায়েজ এবং প্রচলিত পদ্ধতি। কাঁচা গোশত বিতরণ না করে রান্না করে খাওয়ালে যাঁদের রান্নার সামর্থ্য বা সুযোগ নেই, তাঁরাও তৃপ্তি নিয়ে খেতে পারেন। দাওয়াতে শুধু সচ্ছল আত্মীয়দের না ডেকে আশপাশের অভাবী পরিবারগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করুন।
বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানিসহ পরিবারের সবাই আকিকার গোশত খেতে পারেন। ধনী-গরিব যে কাউকে দেওয়া যায়। অভাবী অমুসলিম প্রতিবেশীকে দেওয়াও হানাফি মতে জায়েজ। কোনো কোনো বর্ণনায় শিশুর জন্মে সহায়তাকারী ধাত্রীকে একটি রান উপহার দেওয়ার কথা এসেছে; এখন হাসপাতালে জন্ম হলে সেবাদানকারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে উপহার দেওয়া যায়, তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়।
চামড়া, মাথা ও কসাইয়ের মজুরি
আকিকার পশুর চামড়া নিজে ব্যবহার করা যায় বা কোনো গরিব কিংবা মাদরাসার এতিমখানায় দান করা যায়। চামড়া বিক্রি করলে সেই টাকা নিজে রাখা যাবে না, গরিবদের সদকা করতে হবে। মাথা, পা ও অন্যান্য অংশও গোশতের মতোই খাওয়া বা বিতরণ করা যায়।
বিজ্ঞাপন
কসাই বা জবাইকারীর পারিশ্রমিক আলাদা টাকায় দিতে হবে। মজুরি হিসেবে গোশত, চামড়া বা মাথা দেওয়া যাবে না। মজুরি দেওয়ার পর খুশি হয়ে গোশত উপহার দিলে সমস্যা নেই।
আয়োজনের খরচ নিয়েও একটু ভাবা দরকার। আকিকার মূল কাজ পশু জবাই, ভোজ বা ডেকোরেশন নয়। সামর্থ্য অনুযায়ী আত্মীয়দের দাওয়াত দেওয়া যায়, কিন্তু ঋণ করে বা লোক দেখানোর জন্য বড় অনুষ্ঠান করা ইসলামের মেজাজের সঙ্গে যায় না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
আকিকার দোয়া না জানলে কি আকিকা হবে?
বিজ্ঞাপন
হবে। জবাইয়ের সময় বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলা এবং অন্তরে আকিকার নিয়ত রাখাই যথেষ্ট। বাকি আয়াত ও দোয়া পড়া উত্তম, বাধ্যতামূলক নয়।
আকিকার গোশত কি বাবা-মা খেতে পারবেন?
পারবেন। বাবা-মা খেতে পারবেন না, এমন কথার কোনো দলিল নেই। পরিবারের সবাই খেতে পারেন।
আকিকার গোশত কি ফ্রিজে রেখে দেওয়া যায়?
বিজ্ঞাপন
যায়। আকিকার গোশত সংরক্ষণে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে গরিবদের অংশ সময়মতো পৌঁছে দেওয়া উত্তম।
আকিকার পশু জবাই কে করবেন?
বাবা নিজে জবাই করতে পারলে ভালো। না পারলে যেকোনো মুসলমান, পুরুষ বা নারী, জবাই করতে পারেন। জবাইকারীকে জানিয়ে দিন এটি কার আকিকা।