কাঁচা হলুদের উপকারিতা: খাওয়ার নিয়ম ও রূপচর্চায় ব্যবহার
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
গায়েহলুদের অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে প্রতিদিনের তরকারি, বাঙালির জীবনে হলুদের জায়গা অনেক পুরোনো। দোকানের গুঁড়া হলুদ আমরা রোজ ব্যবহার করি, কিন্তু শীতের মৌসুমে বাজারে যে কমলা-হলুদ রঙের কাঁচা হলুদের শিকড় ওঠে, তা নিয়েও আগ্রহ কম নয়। অনেকে সকালে এক টুকরা কাঁচা হলুদ চিবিয়ে খান, কেউ বানান হলুদ দুধ।
বিজ্ঞাপন
কাঁচা হলুদের প্রধান সক্রিয় উপাদান কারকিউমিন। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি শরীরে প্রদাহ কমাতে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করতে পারে। গিঁটের ব্যথার মতো কিছু সমস্যায় সহায়ক প্রভাবের ইঙ্গিতও আছে। তবে খাবারের মাধ্যমে যতটুকু কারকিউমিন শরীরে যায়, তা খুব বেশি নয়, আর শরীর একে সহজে শোষণও করতে পারে না। গোলমরিচ ও সামান্য চর্বি বা দুধের সঙ্গে খেলে শোষণ কিছুটা বাড়ে।
তাই কাঁচা হলুদকে একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে দেখুন, রোগ সারানোর ওষুধ হিসেবে নয়। খাওয়ার নিয়ম, হলুদ দুধ, রূপচর্চায় ব্যবহার আর কারা সাবধান থাকবেন, সব নিচে দেওয়া হলো।
কাঁচা হলুদ আর গুঁড়া হলুদের পার্থক্য
কাঁচা হলুদ মাটির নিচের শিকড়জাতীয় অংশ, আদার মতো দেখতে কিন্তু ভেতরটা উজ্জ্বল কমলা। এটি শুকিয়ে, সেদ্ধ করে বা রোদে শুকিয়ে গুঁড়া করলে আমরা পাই রান্নার হলুদ। পুষ্টিগুণে দুটির মধ্যে বড় পার্থক্য নেই, তবে কাঁচা হলুদে পানি বেশি থাকায় একই ওজনে কারকিউমিন কিছুটা কম।
বিজ্ঞাপন
কাঁচা হলুদের একটি সুবিধা হলো ভেজালের ঝুঁকি কম। খোলা বাজারের গুঁড়া হলুদে রং উজ্জ্বল করতে ক্ষতিকর রং বা সিসাযুক্ত রাসায়নিক মেশানোর অভিযোগ বিভিন্ন সময় উঠেছে। গুঁড়া হলুদ কিনলে নির্ভরযোগ্য প্যাকেটজাত পণ্য বেছে নিন, অথবা কাঁচা হলুদ কিনে বাড়িতে শুকিয়ে গুঁড়া করে নিন।
কাঁচা হলুদের উপকারিতা
১. প্রদাহ কমাতে সহায়ক: কারকিউমিন শরীরের কিছু প্রদাহজনিত প্রক্রিয়ায় বাধা দেয় বলে গবেষণায় দেখা গেছে। হাঁটু ও গিঁটের ব্যথায় কিছু মানুষ আরাম পান, তবে এটি চিকিৎসার বিকল্প নয়।
২. অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট: শরীরের কোষের ক্ষতি করে এমন উপাদানের বিরুদ্ধে কাজ করে।
বিজ্ঞাপন
৩. হজমে সাহায্য: অনেকে খাবারের সঙ্গে হলুদ খেলে পেট ভার কম লাগার কথা বলেন। প্রচলিতভাবে হজমের সহায়ক হিসেবে হলুদ ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
৪. খাবারে স্বাদ ও রং: কাঁচা হলুদ কুচি করে ভাজি, ডাল, ভর্তা বা মাছের ঝোলে দিলে টাটকা ঘ্রাণ আসে।
হলুদ খেলে ক্যানসার সারে, ডায়াবেটিস ভালো হয় বা ওজন কমে যায়, এমন দাবি প্রায়ই চোখে পড়ে। এসবের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। এ ধরনের অসুখে চিকিৎসকের দেওয়া চিকিৎসাই মূল।
কাঁচা হলুদ খাওয়ার নিয়ম
বিজ্ঞাপন
পরিমাণ: দিনে আধা ইঞ্চি থেকে এক ইঞ্চি লম্বা এক টুকরা কাঁচা হলুদ, মোটামুটি আঙুলের এক কর সমান, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য যথেষ্ট। এর বেশি খেলে উপকার বাড়ে না, পেটে অস্বস্তি হতে পারে।
কীভাবে খাবেন: হলুদের টুকরা ভালো করে ধুয়ে খোসা চেঁছে নিন। মিহি কুচি বা গ্রেট করে এক চিমটি গোলমরিচ গুঁড়া মিশিয়ে খান। কাঁচা খেতে অসুবিধা হলে সামান্য মধু মেশাতে পারেন। খাবারের সঙ্গে বা পরপর খেলে পেটে জ্বালা কম হয়।
রান্নায়: কাঁচা হলুদ বেটে মাছ বা মাংসে মাখিয়ে রান্না করা যায়। ভাজি বা ভর্তায় সরাসরি কুচি করে দিন।
সংরক্ষণ: কাঁচা হলুদ কাগজে মুড়িয়ে ফ্রিজের সবজির তাকে রাখলে দুই-তিন সপ্তাহ ভালো থাকে। কেটে টুকরা করে ডিপ ফ্রিজেও রাখা যায়।
বিজ্ঞাপন
কাঁচা হলুদ কাটার সময় হাতে ও কাটিং বোর্ডে হলুদ দাগ পড়ে। গ্লাভস পরে কাটলে বা আলাদা কাটিং বোর্ড ব্যবহার করলে ঝামেলা কমে।
হলুদ দুধ তৈরির নিয়ম
শীতের রাতে বা ঠান্ডা লাগলে গরম হলুদ দুধ অনেকের কাছে আরামের পানীয়। একজনের জন্য উপকরণ ও পদ্ধতি:
১. উপকরণ: এক কাপ (২৫০ মিলিলিটার) দুধ, আধা চা-চামচ গ্রেট করা কাঁচা হলুদ অথবা সিকি চা-চামচ ভালো মানের হলুদ গুঁড়া, এক চিমটি গোলমরিচ গুঁড়া, চাইলে এক টুকরা দারুচিনি বা থেঁতো আদা।
বিজ্ঞাপন
২. জ্বাল দেওয়া: দুধ হাঁড়িতে দিয়ে হলুদ, গোলমরিচ ও দারুচিনি মিশিয়ে অল্প আঁচে পাঁচ মিনিট ফুটিয়ে নিন।
৩. ছেঁকে পরিবেশন: ছাঁকনিতে ছেঁকে কাপে ঢালুন। একটু ঠান্ডা হলে প্রয়োজনে এক চা-চামচ মধু মেশান।
হলুদ দুধ ঘুমের আগে আরামদায়ক পানীয় হতে পারে, তবে এটি সর্দি-কাশি সারানোর ওষুধ নয়। ল্যাকটোজ সহ্য না হলে দুধের বদলে পানিতে হলুদ, আদা ও গোলমরিচ ফুটিয়ে চায়ের মতো খেতে পারেন।
রূপচর্চায় হলুদের ফেসপ্যাক
বিজ্ঞাপন
বাঙালি বিয়েতে গায়েহলুদের প্রথা ত্বককে উজ্জ্বল ও কোমল করার ঐতিহ্য থেকেই এসেছে। ঘরে সহজে বানানো যায় এমন কয়েকটি প্যাক:
বেসন ও দই: এক টেবিল চামচ বেসন, এক টেবিল চামচ টক দই আর সিকি চা-চামচ বাটা কাঁচা হলুদ মিশিয়ে পেস্ট বানান। মুখে লাগিয়ে দশ-পনেরো মিনিট রেখে কুসুম গরম পানিতে আলতো ঘষে ধুয়ে ফেলুন। সাধারণ ও তৈলাক্ত ত্বকের জন্য ভালো।
মধু ও হলুদ: এক চা-চামচ মধুর সঙ্গে এক চিমটি বাটা হলুদ মিশিয়ে দশ মিনিট লাগিয়ে রাখুন। শুষ্ক ত্বকে আরাম দেয়।
দুধের সর ও হলুদ: শীতে শুষ্ক ত্বকে এক চামচ দুধের সরের সঙ্গে সামান্য হলুদ মিশিয়ে লাগাতে পারেন।
বিজ্ঞাপন
সপ্তাহে এক-দুইবারই যথেষ্ট। বেশি হলুদ দিলে ত্বকে হলদে আভা থেকে যায়, তাই পরিমাণ কম রাখুন। প্রথমবার কানের পেছনে অল্প লাগিয়ে পরীক্ষা করে নিন, চুলকানি বা লালচে ভাব হলে ব্যবহার করবেন না। কাটা-ছেঁড়া বা সক্রিয় ব্রণের ওপর প্যাক লাগাবেন না।
কারা সাবধান থাকবেন
পিত্তথলির পাথর: হলুদ পিত্তরসের প্রবাহ বাড়াতে পারে, তাই পিত্তথলিতে পাথর থাকলে নিয়মিত বেশি হলুদ খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
রক্ত পাতলা করার ওষুধ: হলুদ বেশি পরিমাণে খেলে রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ ধরনের ওষুধ খেলে বা অস্ত্রোপচার সামনে থাকলে চিকিৎসককে জানান।
বিজ্ঞাপন
ডায়াবেটিসের ওষুধ: ওষুধের সঙ্গে বেশি হলুদ খেলে রক্তে শর্করা কমে যেতে পারে।
গর্ভাবস্থা: রান্নায় স্বাভাবিক পরিমাণে হলুদ নিরাপদ। কিন্তু কাঁচা হলুদ বেশি পরিমাণে বা কারকিউমিন সাপ্লিমেন্ট গর্ভাবস্থায় খাওয়া উচিত নয়।
পেটের সমস্যা: বেশি খেলে বমিভাব, পেটে ব্যথা বা পাতলা পায়খানা হতে পারে।
বাজারের কারকিউমিন ক্যাপসুলে মাত্রা অনেক বেশি থাকে এবং কিছু ক্ষেত্রে লিভারের সমস্যার খবর পাওয়া গেছে। এগুলো চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া খাবেন না।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
খালি পেটে কাঁচা হলুদ খাওয়া কি ভালো?
অনেকে খান, তবে খালি পেটে এর বাড়তি উপকারের প্রমাণ নেই। পেটে জ্বালা বা অস্বস্তি হলে খাবারের সঙ্গে খান।
মুখে হলুদ লাগালে কি স্থায়ীভাবে ফর্সা হওয়া যায়?
বিজ্ঞাপন
না। হলুদের প্যাক ত্বক পরিষ্কার ও কিছুটা উজ্জ্বল দেখাতে পারে, কিন্তু ত্বকের স্বাভাবিক রং বদলায় না।
শিশুদের হলুদ দুধ দেওয়া যাবে?
এক বছরের বেশি বয়সী শিশুকে অল্প হলুদ দেওয়া দুধ দেওয়া যায়। এর চেয়ে ছোট শিশুর ক্ষেত্রে আগে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন, আর এক বছরের কম বয়সী শিশুর খাবারে কখনো মধু মেশাবেন না। শিশুর কোনো অসুখের চিকিৎসা হিসেবে হলুদের ওপর নির্ভর করবেন না।
হলুদের দাগ হাত থেকে কীভাবে তুলব?
বিজ্ঞাপন
সাবান দিয়ে ধোয়ার পর লেবুর রস বা একটু তেল ঘষে আবার ধুয়ে নিন। দাগ সাধারণত এক-দুই দিনে নিজেই মিলিয়ে যায়।