ওজন কমানোর ব্যায়াম: ঘরে বসেই করা যায় এমন সহজ ব্যায়াম
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
জিমে ভর্তি হওয়ার সময় নেই, বাইরে হাঁটার মতো নিরাপদ জায়গা নেই, বৃষ্টি বা কড়া রোদ তো আছেই। ওজন কমাতে চাওয়া অনেক মানুষের এটাই বাস্তবতা। ভালো খবর হলো, শোবার ঘরের মেঝেতে একটি মাদুর বিছানোর মতো জায়গা থাকলেই কার্যকর ব্যায়াম করা সম্ভব, কোনো যন্ত্রপাতি ছাড়াই।
বিজ্ঞাপন
ওজন কমাতে ব্যায়ামের দুটি ধরন দরকার। একটি হলো কার্ডিও, যা হৃৎস্পন্দন বাড়ায় ও বেশি ক্যালরি খরচ করে, যেমন জায়গায় দাঁড়িয়ে দ্রুত হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা, জাম্পিং জ্যাক বা দড়িলাফ। অন্যটি হলো পেশি শক্ত করার ব্যায়াম, যেমন স্কোয়াট, পুশআপ ও প্ল্যাংক। পেশি বাড়লে বিশ্রামের সময়ও শরীর কিছুটা বেশি শক্তি খরচ করে। সাধারণ স্বাস্থ্য নির্দেশনা অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম করা উচিত, আর ওজন কমাতে এর চেয়ে বেশি সময় দিলে ভালো ফল মেলে।
তবে একটা কথা শুরুতেই পরিষ্কার থাকা দরকার: ওজন কমানোর বড় অংশ নির্ভর করে খাবারের ওপর। ব্যায়াম সেই চেষ্টাকে জোরালো করে, শরীর সুগঠিত রাখে এবং কমানো ওজন ধরে রাখতে সাহায্য করে।
শুরুর আগে কয়েকটি কথা
চিকিৎসকের পরামর্শ: হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হাঁটু বা কোমরের ব্যথা থাকলে, গর্ভাবস্থায় অথবা দীর্ঘদিন একেবারে ব্যায়াম না করে থাকলে শুরুর আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।
বিজ্ঞাপন
পোশাক ও জায়গা: ঢিলেঢালা আরামদায়ক কাপড় পরুন। পিচ্ছিল মেঝেতে নয়, মাদুর বা কার্পেটের ওপর ব্যায়াম করুন। লাফানোর ব্যায়ামের সময় নরম তলার জুতা পরলে হাঁটুতে চাপ কম পড়ে।
সময়: ভরপেট খাওয়ার পরপর ব্যায়াম নয়, অন্তত দেড়-দুই ঘণ্টা পর করুন। সকাল বা বিকেল, যে সময়টা নিয়মিত রাখতে পারবেন, সেটাই সেরা সময়।
পানি: ব্যায়ামের আগে ও পরে পানি পান করুন, মাঝেও প্রয়োজনে চুমুক দিন।
ওজন কমাতে কার্ডিও: ঘরে যা করা যায়
বিজ্ঞাপন
১. জায়গায় দাঁড়িয়ে দ্রুত হাঁটা: এক জায়গায় দাঁড়িয়ে হাঁটু ওপরে তুলে তুলে দ্রুত হাঁটুন, সঙ্গে হাত দোলান। একেবারে নতুনদের জন্য এটি সবচেয়ে নিরাপদ শুরু।
২. সিঁড়ি ভাঙা: বাসায় সিঁড়ি থাকলে ধীরে ধীরে ওঠানামা করুন। এটি খুব কার্যকর কার্ডিও, তবে হাঁটুর ব্যথা থাকলে সাবধান।
৩. জাম্পিং জ্যাক: লাফ দিয়ে পা দুই দিকে ছড়িয়ে হাত মাথার ওপর তুলুন, আবার লাফিয়ে আগের অবস্থায় ফিরুন। লাফাতে অসুবিধা হলে লাফ ছাড়া এক পা করে পাশে সরিয়ে একই নড়াচড়া করুন।
৪. দড়িলাফ: অল্প সময়ে অনেক ক্যালরি খরচ হয়। শুরুতে ত্রিশ সেকেন্ড লাফিয়ে ত্রিশ সেকেন্ড বিশ্রাম নিন। ওজন অনেক বেশি হলে বা হাঁটুতে সমস্যা থাকলে এটি পরে শুরু করুন।
বিজ্ঞাপন
৫. নাচ: পছন্দের গান চালিয়ে পনেরো-বিশ মিনিট টানা নাচলেও ভালো কার্ডিও হয়, একঘেয়েমিও কাটে।
পেশি শক্ত করার ব্যায়াম
স্কোয়াট: পা কাঁধের সমান ফাঁক করে দাঁড়ান। চেয়ারে বসার ভঙ্গিতে নিতম্ব পেছনে ঠেলে হাঁটু ভাঁজ করুন, পিঠ সোজা থাকবে, হাঁটু যেন পায়ের আঙুলের বেশি সামনে না যায়। তারপর উঠে দাঁড়ান। শুরুতে পেছনে একটি চেয়ার রেখে করতে পারেন। ১০ থেকে ১৫ বার করে দুই-তিন সেট।
পুশআপ: পুরো পুশআপ কঠিন লাগলে দেয়ালে হাত রেখে বা হাঁটু মেঝেতে রেখে করুন। শরীর মাথা থেকে হাঁটু পর্যন্ত সোজা রাখুন। ৮ থেকে ১২ বার করে দুই সেট।
বিজ্ঞাপন
লাঞ্জ: এক পা সামনে বড় করে ফেলে দুই হাঁটু ভাঁজ করে শরীর নিচে নামান, তারপর ফিরে আসুন। পা বদলে করুন। ভারসাম্য রাখতে দেয়াল বা চেয়ার ধরতে পারেন।
গ্লুট ব্রিজ: চিত হয়ে শুয়ে হাঁটু ভাঁজ করে পায়ের পাতা মেঝেতে রাখুন। নিতম্ব ওপরে তুলে দুই সেকেন্ড ধরে রাখুন, তারপর নামান। কোমরের পেশির জন্য ভালো।
প্ল্যাংক: কনুই ও পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে শরীর একটি সরল রেখায় রাখুন। শুরুতে ২০ সেকেন্ড, ধীরে ধীরে এক মিনিট পর্যন্ত বাড়ান। কোমর যেন নিচে ঝুলে না পড়ে।
শুধু পেটের ব্যায়াম করে পেটের মেদ আলাদা করে কমানো যায় না। সারা শরীরের চর্বি কমলে তবেই পেটের মেদ কমে।
বিজ্ঞাপন
৩০ মিনিটের একটি সহজ রুটিন
ওয়ার্মআপ (৫ মিনিট): ঘাড়, কাঁধ, কোমর ও গোড়ালি ধীরে ধীরে ঘোরান, তারপর দুই মিনিট জায়গায় দাঁড়িয়ে হাঁটুন।
মূল অংশ (২০ মিনিট): নিচের পাঁচটি ব্যায়াম ৪০ সেকেন্ড করে করুন, প্রতিটির পর ২০ সেকেন্ড বিশ্রাম। পুরো চক্রটি চারবার।
১. জায়গায় দাঁড়িয়ে দ্রুত হাঁটা বা জাম্পিং জ্যাক
বিজ্ঞাপন
২. স্কোয়াট
৩. দেয়াল বা হাঁটু পুশআপ
৪. হাঁটু উঁচু করে জায়গায় দৌড়ানোর ভঙ্গি
৫. প্ল্যাংক বা গ্লুট ব্রিজ
বিজ্ঞাপন
কুলডাউন (৫ মিনিট): ধীরে হাঁটুন, তারপর পায়ের পেছনের পেশি, ঊরু, কাঁধ ও পিঠ আলতো করে টেনে প্রতিটি ভঙ্গি ২০ সেকেন্ড ধরে রাখুন।
একেবারে নতুন হলে প্রথম দুই সপ্তাহ চক্রটি দুবার করুন এবং বিশ্রাম বেশি নিন। শরীর অভ্যস্ত হলে ধীরে ধীরে বাড়ান।
প্রতিদিন কতক্ষণ ব্যায়াম করবেন
সপ্তাহে পাঁচ দিন ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম ওজন কমানোর জন্য ভালো লক্ষ্য। মাঝারি মাত্রা মানে এমন গতি, যাতে কথা বলা যায় কিন্তু গান গাওয়া কঠিন লাগে। এর মধ্যে সপ্তাহে অন্তত দুই দিন পেশি শক্ত করার ব্যায়াম রাখুন।
বিজ্ঞাপন
একবারে টানা সময় না পেলে দিনে তিনবার দশ মিনিট করে ভাগ করে নিন, এতেও উপকার মেলে। অফিসে লিফটের বদলে সিঁড়ি, ফোনে কথা বলার সময় হাঁটা, টিভির বিজ্ঞাপনের বিরতিতে স্কোয়াট, এসব ছোট নড়াচড়াও দিনের মোট খরচে যোগ হয়।
সপ্তাহে অন্তত এক-দুই দিন বিশ্রাম বা হালকা হাঁটার দিন রাখুন। পেশিকে সেরে ওঠার সময় দেওয়া দরকার।
খাবার আর ঘুম: ব্যায়ামের সঙ্গী
ব্যায়ামের পর খিদে বেশি লাগতে পারে। তখন ভাজাপোড়া বা মিষ্টি না খেয়ে ডিম, দই, ফল, ছোলা বা এক বাটি সবজি-ডাল খান। ভাতের পরিমাণ একটু কমিয়ে সবজির পরিমাণ বাড়ান, চিনিযুক্ত পানীয় বাদ দিন।
বিজ্ঞাপন
প্রতি রাতে সাত-আট ঘণ্টা ঘুমান। কম ঘুমে খিদে বাড়ানোর হরমোন বেড়ে যায়, ফলে ওজন কমানো কঠিন হয়।
সপ্তাহে আধা থেকে এক কেজি ওজন কমানো নিরাপদ গতি। প্রথম দিকে দ্রুত কমে, পরে গতি কমে আসে, এটা স্বাভাবিক। প্রতিদিন ওজন না মেপে সপ্তাহে একবার একই সময়ে মাপুন।
সতর্কতা: ব্যায়ামের সময় বুকে ব্যথা বা চাপ, অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা বা বুক ধড়ফড় করলে সঙ্গে সঙ্গে থামুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
খালি পেটে ব্যায়াম করা কি ভালো?
হালকা ব্যায়াম অনেকে খালি পেটে করেন, তাতে সমস্যা না হলে করতে পারেন। মাথা ঘোরা বা দুর্বল লাগলে ব্যায়ামের আগে একটা কলা বা কয়েকটি খেজুরের মতো হালকা কিছু খান। ডায়াবেটিস থাকলে খালি পেটে কঠিন ব্যায়াম করবেন না।
কত দিনে ফল দেখা যাবে?
নিয়মিত ব্যায়াম ও খাবার নিয়ন্ত্রণে চার থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে পরিবর্তন চোখে পড়ে। শক্তি ও ঘুমের উন্নতি অনেক সময় আগেই টের পাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
শুধু হাঁটলে কি ওজন কমে?
নিয়মিত দ্রুত হাঁটা আর খাবার নিয়ন্ত্রণ একসঙ্গে চললে ওজন কমে। শুধু হাঁটার ওপর ভরসা করলে ফল ধীর হয়, তাই সপ্তাহে কয়েক দিন পেশির ব্যায়াম যোগ করুন।
ব্যায়ামের পর শরীর ব্যথা করলে কী করব?
নতুন শুরু করলে এক-দুই দিন পেশিতে ব্যথা স্বাভাবিক। হালকা হাঁটা ও স্ট্রেচিং করুন। তীক্ষ্ণ ব্যথা বা গিঁট ফুলে গেলে ব্যায়াম বন্ধ রেখে চিকিৎসক দেখান।