নেতানিয়াহুকে হটাতে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোটের আহ্বান মার্কিন ইহুদিদের
ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে কোনো জোটই এখন পর্যন্ত সরকার গঠনের মতো প্রয়োজনীয় আসন নিশ্চিত করতে পারেনি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ:
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট বা নেসেট নির্বাচনের ভোট গণনা প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন বা কারা সরকার গঠন করবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরোধী শিবির সরকার গঠনের লক্ষ্যে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট করবে কি না, তা নিয়ে কোনো স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে উদারপন্থী ইহুদিরা বিরোধীদের প্রতি আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট করার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত আটটা পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯৭ শতাংশ ভোট গণনা শেষ হয়েছে। এতে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ৫৩টি, গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন জোট ৪৮টি এবং আরব দলগুলো ১৯টি আসন পেতে যাচ্ছে। ১২০ আসনের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য ন্যূনতম ৬১টি আসনের প্রয়োজন। নেতানিয়াহুর জোটের আসন সংখ্যা না বাড়লেও তাঁর দল লিকুদ পার্টির একটি আসন বাড়ছে, তবে তাঁর জোটের কট্টরপন্থী অংশীদার শাস দলের আসন একটি কমে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখনো ‘ডাবল এনভেলপ’-এর ৪ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৪ লাখ ৮০ হাজার বিশেষ ব্যালট গণনা বাকি রয়েছে। সেনাসদস্য, কারাবন্দী ও কূটনীতিকদের এসব ভোটের ফলাফল সরকার গঠনের দর-কষাকষিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, এসব ব্যালটের ফলে এক বা দুটি আসনের ব্যবধান তৈরি হলে পুরো সমীকরণ বদলে যেতে পারে।
সরকার গঠনের এই জটিল সমীকরণে আরব দলগুলো এখন গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে উঠেছে। প্রাথমিক গণনায় জয়েন্ট লিস্ট ১২টি এবং মনসুর আব্বাসের দল ‘রাআম’ ৭টি আসনসহ মোট ১৯টি আসন পেতে যাচ্ছে। আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট যদি এই ১৯ আসনের সমর্থন নিশ্চিত করতে পারে, তবেই তারা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে সক্ষম হবে।
তবে এই সমঝোতার পথে বড় ধরনের রাজনৈতিক বাধা রয়েছে। মার্কিন আর্মি ওয়ার কলেজের গবেষক জ্যাকব স্টয়েল বলেন, আইজেনকটের জোটের একাধিক নেতা নির্বাচনী প্রচারে আরবদের সঙ্গে সরকার না গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর ইসরায়েলের কট্টর ইহুদি ভোটারদের একটি বড় অংশ আরবদের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি হোক, সেটি দেখতে চান না। এছাড়া দুই আরব দলের অবস্থানও ভিন্ন; রাআম অতীতে সরকারে যোগ দিলেও জয়েন্ট লিস্ট কোনো জায়নবাদী সরকারের মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে নারাজ।
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রগতিশীল ইহুদি লবি ‘জে স্ট্রিট’-এর প্রেসিডেন্ট জেরেমি বেন-অমি বলেন, “দেশের মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশের প্রতিনিধিদের বৈধ রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে গ্রহণ না করলে শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র গড়া সম্ভব নয়।” তিনি কট্টর ডানপন্থীদের বিকল্প সরকার গড়তে বিরোধীদের আরব দলগুলোর সঙ্গে হাত মেলানোর তাগিদ দেন। একই সুরে কথা বলে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান শাপিরো বলেন, আরব দলগুলোর সঙ্গে কাজ করলে বিরোধীদের সামনে দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের বড় সুযোগ তৈরি হবে।
জ্যাকব স্টয়েলের মতে, এই অচলাবস্থা কাটাতে ‘সংখ্যালঘু সরকার’ একটি সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারে। এতে আরব দলগুলো মন্ত্রিসভায় সরাসরি অংশ না নিয়ে বাইরে থেকে সরকারকে সমর্থন দিয়ে টিকিয়ে রাখবে। তবে এমন সরকারের পক্ষে পার্লামেন্টে আইন পাস করানো কঠিন হবে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সেনাসদস্য, কূটনীতিক ও কারাবন্দীদের বিশেষ ব্যালট গণনা শেষ হলে প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ সরকার গঠনের জন্য দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করবেন।
এদিকে, ইসরায়েলের নির্বাচনের সময় আরব-অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভোটার উপস্থিতিকে প্রভাবিত করতে কাতার ও তুরস্কসহ বিদেশি কোনো পক্ষ অর্থ পাঠিয়েছিল কি না, তা তদন্ত করছে দেশটির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেইত। ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান বিচারপতি নোয়াম সোলবার্গের নির্দেশে এই তদন্ত চলছে। আরবের দলগুলোর সাফল্যের পর লিকুদ পার্টি ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ তুলেছে। সোলবার্গ শিন বেইতের প্রধান ডেভিড জিনিকে এই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
আরব ভোটারদের নিয়ে কট্টর ইহুদি দলগুলোর সমালোচনার প্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বলেছেন, “এমন একটি মুহূর্তেও পুরো একটি সম্প্রদায়, যারা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে এবং গণতন্ত্রে সক্রিয় অংশ নিতে চেয়েছিল, তাদের কলঙ্কিত করা থেকে আমাদের অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।” তিনি জানান, বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগের বিষয়ে তিনি সেন্ট্রাল ইলেকশন কমিটি ও শিন বেইতের প্রধানদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করা উচিত বলে জোর দিয়েছেন।