রসুন খাওয়ার উপকারিতা ও নিয়ম: খালি পেটে কাঁচা রসুন কতটা ভালো
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
বাঙালি রান্নায় রসুন ছাড়া তরকারি কল্পনা করা কঠিন। মাছের ঝোল থেকে ডাল, ভর্তা থেকে আচার, সবখানে রসুনের সুবাস। রান্নার বাইরে রসুনের আরেকটি পরিচয়ও আছে: অনেক পরিবারে সকালে খালি পেটে এক কোয়া কাঁচা রসুন খাওয়ার রেওয়াজ চলে আসছে প্রজন্ম ধরে।
বিজ্ঞাপন
রসুনের উপকারের পেছনে আছে এর সালফারযুক্ত যৌগ, যার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত অ্যালিসিন। রসুন কাটলে, থেঁতো করলে বা চিবালে এই যৌগ তৈরি হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত রসুন খেলে উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল সামান্য কমতে পারে। তবে প্রভাবটা পরিমিত, এটি ওষুধের বিকল্প নয়।
খালি পেটে কাঁচা রসুন অনেকের জন্য ঠিক আছে, কিন্তু যাঁদের গ্যাস্ট্রিক বা বুকজ্বালার প্রবণতা আছে, তাঁদের পেটে জ্বালা হতে পারে। কতটা খাবেন, কীভাবে খাবেন এবং কারা এড়িয়ে চলবেন, তা জেনে নেওয়া তাই জরুরি।
রসুনে কী আছে
রসুনের কোয়ায় আছে ম্যাঙ্গানিজ, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন সি, সেলেনিয়াম ও কিছু আঁশ। তবে আমরা রসুন খাই অল্প পরিমাণে, তাই ভিটামিন-খনিজের উৎস হিসেবে এর ভূমিকা ছোট। রসুনের আসল বৈশিষ্ট্য এর সালফারযুক্ত যৌগগুলো, যেগুলো থেকেই এর ঝাঁঝালো গন্ধ আসে এবং যেগুলো নিয়ে স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
একটি মজার তথ্য: আস্ত রসুনের কোয়ায় অ্যালিসিন থাকে না। কোয়া কাটার বা থেঁতো করার পর রসুনের ভেতরের দুটি উপাদান একে অপরের সংস্পর্শে এসে এটি তৈরি করে। আবার বেশি তাপে রান্না করলে এই যৌগ অনেকটা নষ্ট হয়ে যায়।
রসুন খাওয়ার উপকারিতা
১. রক্তচাপে সহায়ক: উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের নিয়ে কিছু গবেষণায় নিয়মিত রসুন খাওয়ায় রক্তচাপ সামান্য কমতে দেখা গেছে। তবে যাঁরা রক্তচাপের ওষুধ খান, তাঁরা রসুন খেয়ে ওষুধ বাদ দেবেন না।
২. কোলেস্টেরল: রসুন মোট কোলেস্টেরল ও খারাপ কোলেস্টেরল কিছুটা কমাতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত আছে। ফলাফল সব গবেষণায় এক নয়, আর প্রভাবও ছোট।
বিজ্ঞাপন
৩. হৃদযন্ত্রের যত্নে খাদ্যাভ্যাসের অংশ: কম লবণ, বেশি সবজি ও রসুন-পেঁয়াজের মতো মসলাযুক্ত খাদ্যাভ্যাস হৃদযন্ত্রের জন্য ভালো বলে বিবেচিত।
৪. সর্দি-কাশিতে: রসুন খেলে সর্দি-কাশি কম হয় বা দ্রুত সারে, এমন দাবির পক্ষে প্রমাণ দুর্বল। গরম স্যুপে রসুন দিলে আরাম লাগে, তবে এটিকে প্রতিরোধের নিশ্চিত উপায় ভাববেন না।
৫. লবণ কমাতে সাহায্য: রসুনের তীব্র স্বাদ থাকায় রান্নায় লবণ কিছুটা কম দিলেও স্বাদ ভালো থাকে। উচ্চ রক্তচাপের রোগীর জন্য এটি ছোট কিন্তু কাজের কৌশল।
রসুন ক্যানসার সারায়, ডায়াবেটিস নিরাময় করে বা ধমনীর ব্লক খুলে দেয়, এমন দাবি প্রায়ই শোনা যায়। এসব দাবির কোনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই।
বিজ্ঞাপন
রসুন খাওয়ার নিয়ম
থেঁতো করে দশ মিনিট: কাঁচা রসুন খেতে চাইলে কোয়া থেঁতো বা কুচি করে দশ মিনিটের মতো রেখে দিন, তারপর খান। এতে উপকারী যৌগ তৈরির সময় পায়।
কতটা খাবেন: একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য দিনে এক থেকে দুই কোয়া কাঁচা রসুন যথেষ্ট। বেশি খেলে উপকার বাড়ে না, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বাড়ে।
কীভাবে খাবেন: কাঁচা রসুন সরাসরি চিবাতে কষ্ট হলে কুচি করে এক চামচ মধুর সঙ্গে, ভর্তায়, সালাদে বা টক দইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে খান। আলু ভর্তা বা বেগুন ভর্তায় কাঁচা রসুন থেঁতো করে দিলে স্বাদও বাড়ে।
বিজ্ঞাপন
রান্নায়: রসুন রান্নার একদম শুরুতে বেশি আঁচে পুড়িয়ে না ফেলে মাঝামাঝি সময়ে দিন। ডাল বা সবজিতে শেষে রসুনের ফোড়ন দিলে স্বাদ ও গন্ধ দুটোই ভালো থাকে।
খালি পেটে রসুন খাওয়া: কার জন্য ঠিক
খালি পেটে রসুন খেলে উপকার বেশি হয়, এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই। মূল উপকার নির্ভর করে নিয়মিত খাওয়ার ওপর, সময়ের ওপর নয়।
যাঁদের পেটে কোনো সমস্যা নেই, তাঁরা সকালে খালি পেটে এক কোয়া রসুন খেয়ে এক গ্লাস পানি পান করতে পারেন। কিন্তু খালি পেটে কাঁচা রসুন পাকস্থলীর আবরণে জ্বালা ধরাতে পারে। গ্যাস্ট্রিক আলসার, অ্যাসিডিটি বা বুকজ্বালার সমস্যা থাকলে খালি পেটে না খেয়ে খাবারের সঙ্গে খান, অথবা রান্না করা রসুন বেছে নিন।
বিজ্ঞাপন
খালি পেটে রসুন খেয়ে বমিভাব, পেটে ব্যথা বা বুক জ্বালা হলে অভ্যাসটি বন্ধ করুন। শরীর যে সংকেত দিচ্ছে, তা উপেক্ষা করে জোর করে চালিয়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই।
রসুনের অপকারিতা ও সতর্কতা
মুখ ও শরীরে গন্ধ: কাঁচা রসুনের সবচেয়ে পরিচিত সমস্যা। খাওয়ার পর কয়েকটি পুদিনাপাতা, এক টুকরা আপেল চিবালে বা দুধ পান করলে গন্ধ কিছুটা কমে।
পেটের সমস্যা: বেশি খেলে গ্যাস, পেট ফাঁপা, বুকজ্বালা ও পাতলা পায়খানা হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
রক্তপাতের ঝুঁকি: রসুন রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ায় সামান্য প্রভাব ফেলতে পারে। যাঁরা রক্ত পাতলা করার ওষুধ খান, তাঁরা নিয়মিত বেশি রসুন বা রসুনের সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। অস্ত্রোপচারের আগে চিকিৎসককে জানাবেন যে আপনি নিয়মিত রসুন বা রসুনের ক্যাপসুল খান।
ত্বকে পোড়া: কাঁচা রসুন বেটে ত্বকে লাগিয়ে রাখলে, বিশেষ করে শিশুদের ত্বকে, রাসায়নিক পোড়ার মতো ক্ষত হতে পারে। ব্রণ বা দাঁতের ব্যথায় রসুন চেপে রাখার পরামর্শ তাই নিরাপদ নয়।
অ্যালার্জি: কারও কারও রসুনে অ্যালার্জি থাকে। খাওয়ার পর চুলকানি, ফুসকুড়ি বা শ্বাসকষ্ট হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
গর্ভাবস্থা ও বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় রান্নায় স্বাভাবিক পরিমাণে রসুন নিরাপদ, তবে সাপ্লিমেন্ট বা অনেক বেশি কাঁচা রসুন খাওয়ার আগে চিকিৎসকের মত নিন।
বিজ্ঞাপন
রসুন কেনা, রাখা আর সহজ এক পদ
শক্ত, ভারী, শুকনো খোসার রসুন কিনুন। নরম হয়ে যাওয়া, কালো ছোপ পড়া বা সবুজ অঙ্কুর বের হওয়া রসুনের স্বাদ তেতো হয়। আস্ত রসুন ফ্রিজে নয়, বাতাস চলাচল করে এমন শুকনো ঝুড়িতে রাখুন। ছাড়ানো কোয়া ঢাকনাওয়ালা বয়ামে ফ্রিজে কয়েক দিন ভালো থাকে।
কাঁচা রসুন খাওয়ার একটি সহজ উপায় হলো রসুন ভর্তা। আট-দশ কোয়া রসুন খোসা ছাড়িয়ে শুকনো কড়াইয়ে অল্প আঁচে হালকা সেঁকে নিন, যাতে ঝাঁঝ কিছুটা কমে। দুটি শুকনো মরিচ টেলে নিন। এবার রসুন, মরিচ, স্বাদমতো লবণ আর এক চা-চামচ সরিষার তেল একসঙ্গে মিহি করে মেখে নিন। গরম ভাতের সঙ্গে অল্প পরিমাণে খান। এতে রসুনের স্বাদও পাবেন, আবার একবারে বেশি খাওয়ার ঝুঁকিও থাকে না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
রসুন কি রক্তচাপের ওষুধের বদলে খাওয়া যায়?
না। রসুন রক্তচাপ সামান্য কমাতে পারে, কিন্তু ওষুধের জায়গা নিতে পারে না। ওষুধ বন্ধ বা কমানোর সিদ্ধান্ত শুধু চিকিৎসক নেবেন।
এক কোয়া রসুন নাকি সাধারণ রসুন, কোনটা ভালো?
বাজারে 'এক কোয়া রসুন' নামে যে রসুন বিক্রি হয়, তার আলাদা কোনো গুণের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। সাধারণ রসুনও একই রকম উপকারী।
বিজ্ঞাপন
রসুন ভাজা বা রান্না করে খেলে কি উপকার থাকে?
কিছু উপকারী যৌগ তাপে কমে যায়, তবে রান্না করা রসুনেরও উপকার আছে এবং পেটে সহজে সয়। কাঁচা খেতে না পারলে রান্না করা রসুনই খান। রান্নার সময় রসুন থেঁতো করে দশ মিনিট রেখে তারপর কম আঁচে দিলে উপকারী যৌগ তুলনামূলক বেশি থাকে।
রাতে রসুন খাওয়া যাবে?
যাবে। তবে রাতে কাঁচা রসুন খেলে কারও কারও বুকজ্বালা হয়, তাই এমন হলে রাতের খাবারের সঙ্গে রান্না করা রসুন খান এবং খাওয়ার পরপর শুয়ে পড়বেন না।