প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম রং, নকশা ও বুননে
‘নিজেরা করি’ সংগঠনের ৪৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে শুরু হয়েছে ‘প্রান্তিকের কল্পজগৎ’ নামের এই প্রদর্শনী
ঢাকা জেলা প্রতিনিধি · ঢাকা
প্রকাশ:
দেশের প্রান্তিক এলাকার ভূমিহীন মানুষেরা নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতা, চারপাশের পরিবেশ-প্রকৃতি, সংগ্রাম ও স্বপ্নগুলো রঙ, নকশা, বুনন এবং অবয়বের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাদের সৃজিত এসব শিল্পকর্ম নিয়ে ‘প্রান্তিকের কল্পজগৎ’ শিরোনামে একটি বিশেষ প্রদর্শনীর সূচনা হয়েছে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়, ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে। অধিকারভিত্তিক সংগঠন ‘নিজেরা করি’র ৪৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। এই আয়োজনে নিজেরা করির বিভিন্ন শাখার সদস্য এবং তাদের পরিবারের শিশু ও কিশোরেরা শিল্পকর্মগুলো তৈরি করেছেন, যেখানে তাদের সহায়তা দিয়েছেন বৃত্ত আর্ট ট্রাস্টের শিল্পীরা। প্রদর্শনীর কিউরেটরের দায়িত্ব পালন করেছেন বৃত্ত আর্ট ট্রাস্টের ট্রাস্টি শিল্পী মাহ্বুবুর রহমান।
বিজ্ঞাপন
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রদর্শনীটির উদ্বোধন করেন মুক্তিযোদ্ধা শিল্পী অধ্যাপক আবুল বার্ক্ আলভী এবং খুলনার ভূমিহীন নেত্রী ও নিজেরা করির সদস্য রাহেলা বেগম। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সহায়তায় আয়োজিত এই প্রদর্শনী শনিবার পর্যন্ত চলবে এবং প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত দর্শকদের জন্য খোলা থাকবে। সংগঠনটির বর্ষপূর্তির সমাপনী অনুষ্ঠান হবে শনিবার ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবর মঞ্চে, যেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্যরা নাটক পরিবেশন করবেন।
অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে নিজেরা করির সমন্বয়কারী খুশী কবির বলেন, ‘নিজেরা করি প্রথম থেকেই প্রান্তিক মানুষদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করে যাচ্ছে। আমরা ঋণ বা আর্থিক সাহায্য দেওয়া, প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো কাজ করি না। বরং প্রান্তিক মানুষকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা, শোষণ–বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা, গ্রামীণ এলাকার ভূমিহীন নারীদের পুরুষদের সঙ্গে কাজ করা ও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা চালানোর জন্য অনুপ্রাণিত করে থাকি।’
খুশী কবির আরও জানান, দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিজেরা করির কর্ম এলাকায় ১১ হাজার ৫৮৩টি ভূমিহীন মানুষের দল সক্রিয় রয়েছে, যার মধ্যে ৬ হাজার ৭৫৭টি দল নারীদের। প্রান্তিক মানুষের এসব দলে মোট ২ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি সদস্য যুক্ত রয়েছেন। তাঁরা সরকারি ও জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীর অধিকারকে এগিয়ে নেওয়া ও মৌলবাদকে মোকাবিলার মতো কাজ করে যাচ্ছেন।
প্রদর্শনীর উদ্বোধন করে শিল্পী আবুল বার্ক্ আলভী বলেন, এটি একটি ব্যতিক্রমী প্রদর্শনী। শিশু থেকে পরিণত বয়সের অনেক মানুষের তৈরি শিল্পকর্ম এখানে রয়েছে। তাঁরা যদিও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিল্পকলার শিক্ষা গ্রহণ করেননি, তবে সহজাত সৌন্দর্যবোধের প্রকাশ ঘটেছে তাঁদের কাজে। শুরুতে নিজেরা করির সঙ্গে যুক্ত হওয়া ভূমিহীন নারী নেত্রী রাহেলা বেগম বলেন, একসময় তিনি মানুষের সামনে এসে কথা বলতে পারতেন না। কিন্তু এখন জানেন নাগরিক হিসেবে, নারী হিসেবে তাঁদের কী অধিকার আছে। সেই অধিকার আদায়ের জন্য এখন সবার সামনে স্পষ্ট ভাষায় কথা বলতে পারেন।
বিজ্ঞাপন
প্রদর্শনীতে মূলত তিন রকমের কাজ রয়েছে। এর মধ্যে শিশুরা খবরের কাগজের ওপর নানা বিষয়ের ছবি এঁকেছে। দ্বিতীয়ত, নকশিকাঁথার মতো বিশালাকার কাপড়ের ওপর অ্যাপ্লিকের নকশা করা হয়েছে, যা প্রতিটিই আলাদা ও বড় আকারের। তৃতীয়ত, কাপড় ও তুলা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে পুতুল। এসব শিল্পকর্মের বিষয়বস্তু হিসেবে এসেছে সবজি বিক্রেতা, ফুল, ময়ূর, শহীদ মিনার, হাঁস, খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করা, কুঁড়েঘর, হাতি ও বাঘ। এছাড়া জামদানি শাড়ির ওপর অ্যাপ্লিকের নকশায় বিভিন্ন দাবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা ব্যানারের মতো ছাদ থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে ‘নারীর অধিকার মানবাধিকার/ সম্পদে তার সম অধিকার’ এবং ‘অংশীদারত্ব নিশ্চিত করো/ দুর্নীতি প্রতিরোধ কর’ ইত্যাদি।
প্রদর্শন কক্ষের মেঝের মাঝখানে ও বাইরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে পুতুলগুলো। বৃত্ত আর্ট ট্রাস্টের সঙ্গে ‘জলপুতুল পাপেটস’ অংশ নিয়ে নিজেরা করির সদস্যদের পুতুল তৈরির কলাকৌশল শিখিয়েছে। কিউরেটর মাহ্বুবুর রহমান জানান, আগের কাজের ধারাবাহিকতায় এবার খুলনার পাইকগাছা, নাটোরের বাগাতিপাড়া, নোয়াখালীর চরজব্বার এবং টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী এলাকায় গিয়ে প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে কর্মশালার আঙ্গিকে কাজ করেছেন তারা। অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের স্বাধীন চিন্তাভাবনা থেকেই কাজগুলো করেছেন এবং বৃত্ত আর্ট ট্রাস্ট ও জলপুতুলের কর্মীরা কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দিয়েছেন।
বৃত্তের শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন ইমরান হোসেন, মেহেদী হাসান, ফারহানা ফেরদৌসী, শাহরিয়ার শাওন, মোকাদেসুর রহমান, আমির ফয়সাল, মাহ্বুবুর রহমান, শিমুল সাহা, ফারহানা নাজ ও জিন্নাতুন জান্নাত। জলপুতুলের দলের প্রধান ছিলেন শাহরিয়ার শাওন। প্রান্তিক মানুষের আশা–আকাঙ্ক্ষার বর্ণিল প্রকাশ ঘটেছে তাদের এসব শিল্পকর্মে। পদ্ধতিগত শিল্পকলা প্রদর্শনীর থেকে ব্যতিক্রমী এই আয়োজন দর্শকদের ভিন্ন ধরনের আনন্দ দেবে।