বিদ্যুৎ বিল হিসাব করার নিয়ম: ইউনিট থেকে টাকার অঙ্ক বুঝে নিন
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
মাস শেষে বিদ্যুৎ বিলের কাগজ হাতে পেয়ে অনেকেই অবাক হন: গত মাসের চেয়ে ব্যবহার তো খুব বেশি বাড়েনি, তবু বিল এত বেশি কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে বিলের হিসাবের পদ্ধতিতে। বাংলাদেশে আবাসিক বিদ্যুৎ বিল সমান হারে হয় না, হয় ধাপে ধাপে। যত বেশি ইউনিট ব্যবহার করবেন, ওপরের ধাপের ইউনিটগুলোর দাম তত বেশি পড়বে।
বিজ্ঞাপন
বিদ্যুৎ বিল হিসাব করার নিয়ম মোটামুটি চার ধাপের। প্রথমে চলতি মাসের মিটার রিডিং থেকে আগের মাসের রিডিং বাদ দিয়ে ব্যবহৃত ইউনিট বের করুন। দ্বিতীয়ত, সেই ইউনিটগুলো নির্ধারিত ধাপে ভাগ করে প্রতিটি ধাপের দরে গুণ করে যোগ করুন। এটি হলো এনার্জি চার্জ। তৃতীয়ত, অনুমোদিত লোডের ভিত্তিতে ডিমান্ড চার্জ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মিটার ভাড়ার মতো অন্যান্য চার্জ যোগ করুন। চতুর্থত, এর ওপর পাঁচ শতাংশ ভ্যাট যোগ করলে মোট বিল দাঁড়ায়।
প্রতি ইউনিটের দাম কত, তা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন নির্ধারণ করে এবং সময়ে সময়ে বদলায়। তাই এই লেখায় পদ্ধতিটি বোঝানো হয়েছে উদাহরণের সংখ্যা দিয়ে। আপনার এলাকার সর্বশেষ দর আপনার বিলের কাগজে বা বিতরণ সংস্থার ওয়েবসাইটে পাবেন।
ইউনিট আসলে কী
বিদ্যুতের এক ইউনিট মানে এক কিলোওয়াট-ঘণ্টা। অর্থাৎ এক হাজার ওয়াটের কোনো যন্ত্র এক ঘণ্টা চললে এক ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়। একইভাবে একশ ওয়াটের যন্ত্র দশ ঘণ্টা চললেও এক ইউনিট খরচ হয়।
বিজ্ঞাপন
নিজের মিটারের রিডিং দেখে রাখা সবচেয়ে ভালো অভ্যাস। প্রতি মাসের একটি নির্দিষ্ট তারিখে মিটারের সংখ্যাটি ছবি তুলে রাখুন। পরের মাসের একই দিনের সংখ্যা থেকে আগেরটি বাদ দিলেই ব্যবহৃত ইউনিট পাওয়া যায়। বিলের কাগজে মিটার রিডারের লেখা রিডিংয়ের সঙ্গে এটি মিলিয়ে দেখতে পারবেন।
বিদ্যুৎ বিল কিভাবে হিসাব করা হয়: ধাপ বা স্ল্যাব পদ্ধতি
আবাসিক গ্রাহকদের ব্যবহারকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করা হয়। প্রচলিত কাঠামোতে ধাপগুলো সাধারণত এ রকম।
১. লাইফলাইন: মাসে পঞ্চাশ ইউনিট পর্যন্ত। যাঁদের পুরো মাসের ব্যবহার পঞ্চাশ ইউনিটের মধ্যে, তাঁদের সব ইউনিট এই সবচেয়ে কম দরে হিসাব হয়।
বিজ্ঞাপন
২. প্রথম ধাপ: শূন্য থেকে পঁচাত্তর ইউনিট।
৩. দ্বিতীয় ধাপ: ছিয়াত্তর থেকে দুইশ ইউনিট।
৪. তৃতীয় ধাপ: দুইশ এক থেকে তিনশ ইউনিট।
৫. চতুর্থ ধাপ: তিনশ এক থেকে চারশ ইউনিট।
বিজ্ঞাপন
৬. পঞ্চম ধাপ: চারশ এক থেকে ছয়শ ইউনিট।
৭. ষষ্ঠ ধাপ: ছয়শ ইউনিটের বেশি।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুরো ইউনিটের ওপর সর্বোচ্চ ধাপের দর বসে না। প্রথম পঁচাত্তর ইউনিট প্রথম ধাপের দরে, পরের একশ পঁচিশ ইউনিট দ্বিতীয় ধাপের দরে, এভাবে প্রতিটি অংশ নিজ নিজ ধাপের দরে হিসাব হয়। তবে ওপরের ধাপগুলোর দর নিচের ধাপের চেয়ে অনেক বেশি, তাই চারশ বা ছয়শ ইউনিট পার হলেই বিল দ্রুত লাফিয়ে বাড়ে।
একটি উদাহরণ দিয়ে হিসাব
বিজ্ঞাপন
ধরা যাক, কোনো পরিবার এক মাসে আড়াইশ ইউনিট ব্যবহার করেছে। বোঝার সুবিধার জন্য দরগুলো কাল্পনিক ধরা হলো: প্রথম ধাপে প্রতি ইউনিট পাঁচ টাকা, দ্বিতীয় ধাপে সাত টাকা, তৃতীয় ধাপে সাড়ে সাত টাকা। আসল দর আপনার বিলের কাগজে দেখুন।
১. প্রথম পঁচাত্তর ইউনিট: ৭৫ গুণ ৫ টাকা, অর্থাৎ ৩৭৫ টাকা।
২. পরের একশ পঁচিশ ইউনিট: ১২৫ গুণ ৭ টাকা, অর্থাৎ ৮৭৫ টাকা।
৩. বাকি পঞ্চাশ ইউনিট: ৫০ গুণ সাড়ে সাত টাকা, অর্থাৎ ৩৭৫ টাকা।
বিজ্ঞাপন
৪. এনার্জি চার্জ: তিনটি যোগ করে ১,৬২৫ টাকা।
৫. ডিমান্ড চার্জ: অনুমোদিত লোড দুই কিলোওয়াট এবং প্রতি কিলোওয়াটের চার্জ কাল্পনিকভাবে ৪০ টাকা ধরলে ৮০ টাকা। মোট দাঁড়াল ১,৭০৫ টাকা।
৬. ভ্যাট: ১,৭০৫ টাকার পাঁচ শতাংশ প্রায় ৮৫ টাকা। সব মিলিয়ে বিল প্রায় ১,৭৯০ টাকা।
একই পরিবার যদি চারশ পঞ্চাশ ইউনিট ব্যবহার করত, তাহলে শেষ পঞ্চাশ ইউনিট পঞ্চম ধাপের বেশ চড়া দরে হিসাব হতো। এ কারণেই গরমের মাসে এসি চালালে বিল অনুপাতের চেয়েও বেশি বাড়ে।
বিজ্ঞাপন
বিলের অন্যান্য অংশ বুঝে নিন
ডিমান্ড চার্জ: আপনার সংযোগের অনুমোদিত লোড বা ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট একটি চার্জ। বিদ্যুৎ কম ব্যবহার করলেও এটি দিতে হয়।
মিটার ভাড়া: কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে প্রিপেইড মিটারে, মাসিক মিটার ভাড়া কাটা হয়।
ভ্যাট: বিদ্যুৎ বিলে পাঁচ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর যোগ হয়।
বিজ্ঞাপন
বিলম্ব মাশুল: নির্ধারিত তারিখের পর বিল দিলে বিলম্ব ফি যোগ হতে পারে। এটি এড়াতে মোবাইল আর্থিক সেবা বা ব্যাংকের মাধ্যমে সময়মতো বিল দিন।
প্রিপেইড মিটারে হিসাব কীভাবে চলে
প্রিপেইড মিটারে আগে টাকা রিচার্জ করতে হয়, তারপর সেই টাকা থেকে ব্যবহার অনুযায়ী কাটা হয়। এখানেও ধাপভিত্তিক দর প্রযোজ্য, তবে হিসাব হয় মাসের শুরু থেকে জমা হওয়া ব্যবহারের ভিত্তিতে। ফলে মাসের শেষ দিকে বেশি ব্যবহার করলে ইউনিটপ্রতি খরচ বেশি মনে হয়। ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া সাধারণত মাসের প্রথম রিচার্জ থেকে কেটে নেওয়া হয়। তাই মাসের প্রথম রিচার্জে টাকার তুলনায় কম ইউনিট আসা স্বাভাবিক। রিচার্জের রসিদে কোন খাতে কত কাটা হলো, তার বিবরণ থাকে।
ঘরের কোন যন্ত্র কত খায়, নিজে মাপুন
বিজ্ঞাপন
যন্ত্রের গায়ে বা বাক্সে ওয়াট লেখা থাকে। সূত্রটি সহজ: ওয়াট গুণ দৈনিক চলার ঘণ্টা, ভাগ এক হাজার, তাহলে দৈনিক ইউনিট। সেটিকে ত্রিশ দিয়ে গুণ করলে মাসিক ইউনিট।
১. সিলিং ফ্যান: আনুমানিক পঁচাত্তর ওয়াটের একটি ফ্যান দিনে দশ ঘণ্টা চললে দিনে পৌনে এক ইউনিট, মাসে প্রায় সাড়ে বাইশ ইউনিট।
২. এলইডি বাতি: দশ ওয়াটের একটি বাতি দিনে ছয় ঘণ্টা জ্বললে মাসে মাত্র প্রায় দুই ইউনিট।
৩. এসি: দেড় টনের একটি এসি মডেল ও তাপমাত্রা অনুযায়ী ঘণ্টায় আনুমানিক এক থেকে দেড় ইউনিট খেতে পারে। দিনে আট ঘণ্টা চালালে মাসে কয়েকশ ইউনিট যোগ হয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
এভাবে হিসাব করলে সহজেই বোঝা যায় কোন যন্ত্রটি বিল বাড়ানোর মূল কারণ।
একটি ছোট খাতায় বা ফোনের নোটে প্রতিটি বড় যন্ত্রের ওয়াট ও দৈনিক চলার আনুমানিক সময় লিখে মাসিক ইউনিটের একটি তালিকা বানিয়ে ফেলুন। মোট যোগফল যদি মিটারের ইউনিটের কাছাকাছি হয়, তাহলে হিসাব ঠিক আছে। আর মিটারের ইউনিট আপনার হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হলে ওয়্যারিংয়ে লিকেজ, নষ্ট যন্ত্র বা মিটারের ত্রুটির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা দরকার।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিদ্যুৎ বিলের ইউনিট কত টাকা করে?
বিজ্ঞাপন
দর নির্ভর করে আপনি কোন ধাপে আছেন তার ওপর এবং তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা সময়ে সময়ে পরিবর্তন করে। সর্বশেষ দর আপনার বিলের কাগজ বা বিতরণ সংস্থার ওয়েবসাইটে পাবেন।
বিল বেশি এলে কোথায় অভিযোগ করব?
মিটারের রিডিংয়ের ছবি ও বিলের কপি নিয়ে আপনার এলাকার বিদ্যুৎ বিতরণ অফিসে লিখিত অভিযোগ করুন। প্রয়োজনে মিটার পরীক্ষার আবেদনও করা যায়।
ব্যবহার না করলেও কেন বিল আসে?
বিজ্ঞাপন
ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া ও ভ্যাটের মতো স্থায়ী অংশ প্রতি মাসে দিতে হয়, ব্যবহার শূন্য হলেও।
এনার্জি চার্জ আর মোট বিল কি এক?
না। এনার্জি চার্জ শুধু ইউনিটের দাম। এর সঙ্গে ডিমান্ড চার্জ, প্রযোজ্য অন্যান্য চার্জ ও ভ্যাট যোগ করে মোট বিল হয়।