কম খরচে কক্সবাজার ভ্রমণ: বাজেট পরিকল্পনা ও খরচ বাঁচানোর টিপস
ট্রাভেল ডেস্ক · কক্সবাজার
প্রকাশ:
কক্সবাজার যেতে অনেক টাকা লাগে, এই ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়। খরচ বাড়ে মূলত তিন কারণে: ভুল সময়ে যাওয়া, সৈকতের একেবারে সামনের দামি হোটেলে থাকা আর পর্যটকদের জন্য সাজানো রেস্তোরাঁয় খাওয়া। এই তিনটি জায়গায় একটু হিসাব করে চললে ঢাকা থেকে দুই রাত তিন দিনের একটি সুন্দর সফর জনপ্রতি আনুমানিক চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যেই সেরে আসা যায়।
বিজ্ঞাপন
কম খরচে কক্সবাজার ভ্রমণের মূল সূত্র সহজ। ভিড়ের মৌসুম ও সাপ্তাহিক ছুটি এড়িয়ে চলুন, ট্রেনের শোভন চেয়ার বা নন-এসি বাসে যান, চার-পাঁচজনের দল করে একটি কক্ষ বা ফ্ল্যাট ভাগ করুন, আর খাবার খান স্থানীয় মানুষের পছন্দের হোটেলে। সৈকত, সূর্যাস্ত আর সমুদ্রের বাতাস তো বিনা পয়সাতেই মেলে।
নিচে যাতায়াত, থাকা, খাওয়া আর ঘোরাঘুরির প্রতিটি খাতে কীভাবে টাকা বাঁচানো যায়, তা ধাপে ধাপে দেওয়া হলো। সব অঙ্কই আনুমানিক, মৌসুম ও চাহিদাভেদে বদলায়।
কখন গেলে খরচ কম
কক্সবাজারের ভরা মৌসুম মোটামুটি নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। এ সময় আবহাওয়া আরামদায়ক, সমুদ্রও শান্ত, কিন্তু হোটেলভাড়া সবচেয়ে বেশি। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ, ইংরেজি নববর্ষ, বিজয় দিবস আর ঈদের ছুটিতে ভাড়া কখনো কখনো দুই-তিন গুণ হয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
বাজেট ভ্রমণের জন্য ভালো সময় অক্টোবর এবং মার্চ-এপ্রিল। আবহাওয়া মোটামুটি ভালো থাকে, ভিড় কম, হোটেলে দরদামের সুযোগ বেশি। বর্ষায়, জুন থেকে আগস্ট, ভাড়া সবচেয়ে কম থাকে এবং মেঘলা সমুদ্রের আলাদা সৌন্দর্যও আছে, তবে সাগর উত্তাল থাকায় নামার সুযোগ সীমিত হয়।
সপ্তাহের হিসাবেও পার্থক্য বড়। বৃহস্পতিবার রাতে রওনা দিয়ে শনিবার ফেরার বদলে রোববার থেকে বুধবারের মধ্যে গেলে একই হোটেলের ভাড়া অনেক কম পাওয়া যায়।
যাতায়াতে খরচ বাঁচানো
ট্রেন: ঢাকা থেকে কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও পর্যটক এক্সপ্রেসের শোভন চেয়ারের ভাড়া আনুমানিক ৭০০ টাকার আশপাশে। রাতের ট্রেনে গেলে এক রাতের হোটেলভাড়াও বাঁচে। সমস্যা একটাই, টিকিট দ্রুত শেষ হয়, তাই অনলাইনে টিকিট ছাড়ার দিনেই কাটতে হয়।
বিজ্ঞাপন
নন-এসি বাস: সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, আরামবাগ ও কলাবাগান থেকে কক্সবাজারের নন-এসি বাসের ভাড়া আনুমানিক ৯০০ থেকে ১২০০ টাকা। রাতের বাসে দশ থেকে বারো ঘণ্টা লাগে।
এসি বাস ও বিমান: এসি বাসে আনুমানিক ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকা লাগে, বিমানে আরও বেশি। বাজেট ভ্রমণে এগুলো এড়ানোই ভালো, তবে আগেভাগে কাটলে কখনো কখনো বিমানের প্রচারমূলক ভাড়া পাওয়া যায়, যাচাই করে দেখতে পারেন।
শহরের ভেতরে: কলাতলী থেকে সুগন্ধা বা লাবণী পয়েন্টে হেঁটেই যাওয়া যায়। দূরে গেলে শেয়ারের ইজিবাইক বা অটোরিকশায় উঠুন, রিজার্ভ নেবেন না। হিমছড়ি বা ইনানী যেতে মেরিন ড্রাইভে শেয়ারে চলা সিএনজি বা লোকাল বাহন খুঁজুন। ছোট দলের জন্য পুরো জিপ রিজার্ভ নেওয়া খরচের দিক থেকে লাভজনক নয়।
কম ভাড়ার হোটেল খুঁজবেন কোথায়
বিজ্ঞাপন
কক্সবাজারের হোটেল এলাকা মূলত কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী পয়েন্টকে ঘিরে। সৈকতের একেবারে সামনের সারির হোটেলগুলোতে সমুদ্র দেখা যায়, ভাড়াও বেশি। এক-দুই গলি ভেতরে গেলে একই মানের কক্ষ অনেক কম ভাড়ায় পাওয়া যায়, আর সৈকতে হেঁটে যেতে লাগে মাত্র পাঁচ-দশ মিনিট।
বাজেট ভ্রমণকারীদের জন্য গেস্টহাউস, ছোট আবাসিক হোটেল আর পরিবারের জন্য ভাড়া দেওয়া ফ্ল্যাট ভালো বিকল্প। অফ-সিজনে সপ্তাহের মাঝের দিনে দুই শয্যার সাধারণ কক্ষ আনুমানিক ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকায় পাওয়া যায়। ভরা মৌসুমে একই কক্ষ আনুমানিক ২০০০ থেকে ৩৫০০ টাকা বা তার বেশি হতে পারে।
১. নিজে গিয়ে দেখে নিন: অফ-সিজনে আগে বুকিং না দিয়ে পৌঁছে দু-তিনটি হোটেল ঘুরে দেখলে ভালো দাম পাওয়া যায়। ভরা মৌসুমে অবশ্য আগাম বুকিং ছাড়া ঝুঁকি আছে।
২. ছবি নয়, কক্ষ দেখুন: পানি, এসি বা ফ্যান, শৌচাগার আর তালার অবস্থা নিজ চোখে দেখে নিন।
বিজ্ঞাপন
৩. অগ্রিম টাকায় সাবধান: সামাজিক মাধ্যমের অচেনা পেজে পুরো ভাড়া অগ্রিম পাঠাবেন না। প্রতারণার ঘটনা ঘটে।
৪. চেক-ইন ও চেক-আউটের সময়: ভোরে পৌঁছালে অনেক হোটেল দুপুরের আগে কক্ষ দেয় না, বাড়তি টাকা চায়। আগে থেকে সময় জেনে পরিকল্পনা করুন।
খাবারে খরচ কমানো
সৈকতের পাশের রেস্তোরাঁয় সাজিয়ে রাখা সামুদ্রিক মাছ দেখতে লোভনীয়, কিন্তু দাম না জেনে অর্ডার দিলে বিলে চমকে যেতে হয়। মাছ বাছাইয়ের আগে প্রতি কেজি বা প্রতি পিসের দাম আর রান্নার খরচ আলাদা কি না জেনে নিন।
বিজ্ঞাপন
বাজেটে খেতে চাইলে কলাতলী ও বাজারঘাটা এলাকার স্থানীয় ভাতের হোটেল বেছে নিন, যেখানে স্থানীয় মানুষ খান। ভাত, ডাল, ভর্তা আর রূপচাঁদা বা লইট্টা মাছের এক বেলার খাবার আনুমানিক ২০০ থেকে ৩৫০ টাকায় হয়ে যায়। সকালের নাশতায় পরোটা-ডিম বা খিচুড়ি সস্তা ও যথেষ্ট।
পানির বোতল দোকান থেকে বড় আকারে কিনে নিন, সৈকতে ছোট বোতলের দাম বেশি। ফল আর হালকা খাবার স্থানীয় বাজার থেকে কেনা সাশ্রয়ী।
বিনা পয়সায় বা কম খরচে যা করা যায়
ভোরে সৈকতে হাঁটা, সূর্যাস্ত দেখা আর রাতের সমুদ্রের শব্দ শোনা, কক্সবাজারের সেরা অভিজ্ঞতাগুলোর কোনোটার জন্যই টাকা লাগে না। লাবণী পয়েন্ট থেকে কলাতলী পর্যন্ত পুরো সৈকত হেঁটে ঘুরে দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
শেয়ারের বাহনে হিমছড়ি ও ইনানী, শহরের বার্মিজ মার্কেট, আর কাছের রামুর বৌদ্ধ বিহারগুলো কম খরচে ঘোরা যায়। সৈকতের ছাতা-চেয়ার ভাড়া নিতে চাইলে ঘণ্টাপ্রতি দাম আগে ঠিক করুন। ঘোড়া, বিচ বাইক বা ফটোগ্রাফারের সেবা নিলে দাম আগে মিটিয়ে নিন।
তিন দিনের একটি নমুনা বাজেট
চারজনের দলে দুই রাত তিন দিনের সফরে জনপ্রতি আনুমানিক হিসাব:
যাতায়াত: ট্রেনের শোভন চেয়ার বা নন-এসি বাসে যাওয়া-আসা ১৪০০ থেকে ২৪০০ টাকা।
বিজ্ঞাপন
থাকা: দুটি কক্ষে দুই রাত, ভাগ করলে জনপ্রতি ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা।
খাবার: তিন দিনের খাবার ৯০০ থেকে ১৫০০ টাকা।
স্থানীয় যাতায়াত ও টিকিট: শেয়ারের বাহন, হিমছড়ির টিকিট ও অন্যান্য ৪০০ থেকে ৭০০ টাকা।
সব মিলিয়ে জনপ্রতি আনুমানিক ৩৫০০ থেকে ৬০০০ টাকা। ভরা মৌসুমে বা ছুটির দিনে থাকার খরচ বাড়লে মোট অঙ্কও বাড়বে।
বিজ্ঞাপন
খরচ বাঁচাতে গিয়ে নিরাপত্তায় ছাড় দেবেন না। সমুদ্রে নামার আগে লাইফগার্ডের পতাকা ও নির্দেশনা দেখুন, লাল পতাকা থাকলে পানিতে নামবেন না, আর ভাটার সময় দূরে সাঁতার কাটবেন না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
কক্সবাজার ভ্রমণে সর্বনিম্ন কত খরচ হয়?
ঢাকা থেকে দলে গিয়ে ট্রেন বা নন-এসি বাস, ভাগাভাগি করে সাধারণ হোটেল আর স্থানীয় খাবারে দুই রাত তিন দিনে জনপ্রতি আনুমানিক সাড়ে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকায় ঘোরা সম্ভব।
বিজ্ঞাপন
কক্সবাজারে কম ভাড়ার হোটেল কোথায় পাওয়া যায়?
কলাতলী ও সুগন্ধা পয়েন্টের মূল সড়ক থেকে ভেতরের গলিগুলোতে অনেক গেস্টহাউস ও সাধারণ হোটেল আছে। সৈকতের সামনের সারির তুলনায় এসব জায়গায় ভাড়া কম।
কোন মাসে কক্সবাজার গেলে খরচ সবচেয়ে কম?
বর্ষাকালে, মোটামুটি জুন থেকে আগস্ট, হোটেলভাড়া সবচেয়ে কম থাকে। তবে তখন সাগর উত্তাল থাকে। আবহাওয়া ও খরচের ভারসাম্য চাইলে অক্টোবর বা মার্চ বেছে নিন।
বিজ্ঞাপন
একা গেলে কি খরচ বেশি পড়ে?
থাকার খরচ ভাগ করার কেউ না থাকায় একা গেলে খরচ কিছুটা বেশি পড়ে। ছোট গেস্টহাউস ও শেয়ারের বাহন ব্যবহার করলে তবু বাজেটের মধ্যে রাখা যায়।