কবর জিয়ারতের নিয়ম ও দোয়া: হাদিস অনুযায়ী সঠিক পদ্ধতি
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
বাবা-মা, দাদা-দাদি বা প্রিয় কারও কবরের পাশে দাঁড়ালে মন আপনিই নরম হয়ে আসে। ইসলাম এই অনুভূতিকে সঠিক পথে ব্যবহার করতে শিখিয়েছে। কবর জিয়ারত মানে কবরের কাছে গিয়ে কবরবাসীকে সালাম দেওয়া, তাঁদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও রহমত চাওয়া এবং নিজের মৃত্যুর কথা স্মরণ করা।
বিজ্ঞাপন
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, আমি তোমাদের কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন জিয়ারত করো। তিরমিজির বর্ণনায় এর সঙ্গে যোগ হয়েছে, কারণ তা আখিরাতের কথা মনে করিয়ে দেয়। ইসলামের প্রথম যুগে মানুষ নতুন মুসলমান ছিল, কবরকেন্দ্রিক জাহেলি রীতির আশঙ্কা ছিল, তাই নিষেধ ছিল। ইমান দৃঢ় হওয়ার পর সেই নিষেধ উঠিয়ে নেওয়া হয়।
হানাফি মাজহাবে পুরুষদের জন্য কবর জিয়ারত মুস্তাহাব। পদ্ধতি খুব সহজ, কিন্তু কিছু কাজ আছে যা কবরের পাশে করা একেবারেই নিষেধ। নিচে দুটোই আলাদা করে দেওয়া হলো।
কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্য
হাদিসের আলোকে কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্য দুটি। প্রথমটি জিয়ারতকারীর নিজের জন্য: দুনিয়ার ব্যস্ততায় ডুবে থাকা মানুষ কবরের সামনে দাঁড়িয়ে মনে করে, একদিন তাকেও এখানে আসতে হবে। এই স্মরণ মানুষকে গুনাহ থেকে ফেরায়, নেক কাজে উৎসাহ দেয়।
বিজ্ঞাপন
দ্বিতীয় উদ্দেশ্য কবরবাসীর জন্য: তাঁদের সালাম দেওয়া এবং আল্লাহর কাছে তাঁদের জন্য ক্ষমা ও রহমত চাওয়া। জীবিত মানুষের দোয়া মৃতের উপকারে আসে, এ বিষয়ে আলেমরা একমত। সহিহ মুসলিমের হাদিসে আছে, মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তিনটি ছাড়া: সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা থেকে মানুষ উপকৃত হয় এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।
কবর জিয়ারতের কোনো নির্দিষ্ট দিন বা সময় শরিয়তে বাধ্যতামূলক করা হয়নি। সহিহ মুসলিমে আছে, মহানবী (সা.) রাতে জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে গিয়ে কবরবাসীদের জন্য দোয়া করেছেন। অনেকে শুক্রবার বা ঈদের দিনে জিয়ারত করেন; এটি সুবিধামতো করা যায়, তবে একে বাধ্যতামূলক মনে করার কারণ নেই।
কবর জিয়ারতের দোয়া: কবরস্থানে প্রবেশের সময়
কবরস্থানে প্রবেশ করে বা কবরের কাছে পৌঁছে প্রথমে কবরবাসীদের সালাম দেবেন। সহিহ মুসলিমে হজরত বুরাইদা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) সাহাবিদের এই দোয়া শিখিয়েছেন:
বিজ্ঞাপন
السَّلَامُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ، وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ لَلَاحِقُونَ، أَسْأَلُ اللَّهَ لَنَا وَلَكُمُ الْعَافِيَةَ
উচ্চারণ: আসসালামু আলাইকুম আহলাদ দিয়ারি মিনাল মুমিনিনা ওয়াল মুসলিমিন, ওয়া ইন্না ইনশাআল্লাহু লালাহিকুন, আসআলুল্লাহা লানা ওয়া লাকুমুল আফিয়াহ।
অর্থ: হে এই ঘরগুলোর বাসিন্দা মুমিন ও মুসলমানগণ, আপনাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ চাইলে আমরাও আপনাদের সঙ্গে মিলিত হব। আমি আল্লাহর কাছে আমাদের ও আপনাদের জন্য নিরাপত্তা ও কল্যাণ প্রার্থনা করছি।
দোয়াটি মুখস্থ না থাকলে শুধু 'আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর', অর্থাৎ হে কবরবাসীগণ, আপনাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক, বলে নিজের ভাষায় দোয়া করা যায়।
বিজ্ঞাপন
জিয়ারতের পদ্ধতি ধাপে ধাপে
১. নিয়ত ঠিক করা: জিয়ারতের উদ্দেশ্য হবে মৃতের জন্য দোয়া ও নিজের আখিরাত স্মরণ। কবর থেকে কিছু পাওয়া বা মনোবাসনা পূরণের নিয়তে যাওয়া যাবে না।
২. পরিচ্ছন্ন হয়ে যাওয়া: অজু করে পরিষ্কার পোশাকে যাওয়া উত্তম, যদিও অজু শর্ত নয়।
৩. সালাম দেওয়া: কবরস্থানে প্রবেশ করে উপরের দোয়াটি পড়ুন।
বিজ্ঞাপন
৪. কবরের পাশে দাঁড়ানো: নির্দিষ্ট কবরের কাছে গিয়ে মৃতের চেহারার দিকে মুখ করে দাঁড়ানো, অর্থাৎ কেবলার দিকে পিঠ রেখে দাঁড়ানোর কথা হানাফি ফকিহরা উল্লেখ করেছেন। কবরের ওপর পা রাখবেন না।
৫. কোরআন তিলাওয়াত: সুরা ফাতিহা, সুরা ইখলাস, আয়াতুল কুরসি বা যা সহজ, তা পড়ুন।
৬. দোয়া করা: মৃতের মাগফিরাত, কবরের প্রশস্ততা ও জান্নাতের জন্য দোয়া করুন। হাত তুলে দোয়া করতে চাইলে কেবলার দিকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া উত্তম, যাতে কবরের কাছে চাওয়ার মতো দেখায় না।
৭. শিক্ষা নিয়ে ফেরা: নিজের মৃত্যু, কবর ও হিসাবের কথা ভেবে নিজের জীবন শুধরে নেওয়ার প্রতিজ্ঞা নিয়ে ফিরুন।
বিজ্ঞাপন
মৃতের জন্য যা পড়বেন ও দোয়া করবেন
জানাজার নামাজের দোয়ায় সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি অংশ কবরের পাশেও পড়া যায়: আল্লাহুম্মাগফির লাহু ওয়ারহামহু ওয়া আফিহি ওয়া'ফু আনহু। অর্থ: হে আল্লাহ, তাঁকে ক্ষমা করুন, তাঁর প্রতি দয়া করুন, তাঁকে নিরাপত্তা দিন এবং তাঁকে মাফ করে দিন। নারীর কবর হলে 'লাহু'র জায়গায় 'লাহা' এবং 'আনহু'র জায়গায় 'আনহা' বলবেন।
বাবা-মায়ের কবরে সুরা বনি ইসরাইলের ২৪ নম্বর আয়াতের দোয়াটি পড়তে পারেন:
رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
বিজ্ঞাপন
উচ্চারণ: রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি সাগিরা। অর্থ: হে আমার রব, তাঁদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তাঁরা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।
কোরআন তিলাওয়াত করে তার সওয়াব মৃতের জন্য পাঠানো, যাকে ইসালে সওয়াব বলা হয়, হানাফি মাজহাবে জায়েজ। এ বিষয়ে অন্য কিছু মাজহাবে ভিন্নমত আছে। মৃতের পক্ষ থেকে সদকা করলে তার সওয়াব পৌঁছায়, এ ব্যাপারে বুখারি ও মুসলিমে স্পষ্ট হাদিস আছে। তাই কবরে গিয়ে দোয়ার পাশাপাশি মৃতের নামে কোনো গরিবকে সাহায্য করা, মসজিদে পানির ব্যবস্থা করা বা গাছ লাগানোর মতো কাজও করতে পারেন।
যেসব কাজ বর্জনীয়
১. কবরে সিজদা বা তাওয়াফ: সিজদা ও তাওয়াফ কেবল আল্লাহর জন্য নির্ধারিত ইবাদত। কবরে সিজদা করা বা কবরের চারপাশে ঘোরা গুরুতর গুনাহ।
বিজ্ঞাপন
২. মৃতের কাছে কিছু চাওয়া: সন্তান, চাকরি, রোগমুক্তি বা মনের বাসনা পূরণের জন্য কবরবাসীর কাছে প্রার্থনা করা শিরকের দিকে নিয়ে যায়। চাইতে হবে কেবল আল্লাহর কাছে।
৩. কবরের ওপর বসা ও হাঁটা: সহিহ মুসলিমের হাদিসে কবরের ওপর বসতে এবং কবরের দিকে ফিরে নামাজ পড়তে নিষেধ করা হয়েছে। কবরের মাঝখান দিয়ে চলার সময় ওপর দিয়ে পা না ফেলে পথ ধরে চলুন।
৪. কবর পাকা করা ও সাজানো: সহিহ মুসলিমে বর্ণিত, মহানবী (সা.) কবর চুনকাম করতে, এর ওপর বসতে এবং এর ওপর ঘর নির্মাণ করতে নিষেধ করেছেন। কবরে মোমবাতি জ্বালানো, চাদর বিছানো বা ফুল দিয়ে সাজানোকে আলেমরা অনুচিত বলেছেন।
৫. বিলাপ ও মাতম: উচ্চস্বরে কান্না, বুক চাপড়ানো বা আহাজারি করা নিষেধ। চোখের পানি আসা স্বাভাবিক, এতে দোষ নেই; নবীজিও প্রিয়জনের মৃত্যুতে কেঁদেছেন।
বিজ্ঞাপন
৬. কবরের মাটি বা জিনিস বরকতের জন্য নেওয়া: এর কোনো ভিত্তি নেই।
নারীদের কবর জিয়ারত
নারীদের কবর জিয়ারত নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। তিরমিজির একটি হাদিসে অধিক কবর জিয়ারতকারী নারীদের ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা এসেছে। এর ভিত্তিতে কিছু আলেম নারীদের কবরস্থানে যাওয়া নিরুৎসাহিত করেন। অন্যদিকে হানাফি মাজহাবের অনেক আলেম বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার হাদিসটি নারী-পুরুষ সবার জন্য প্রযোজ্য; তাই পর্দা রক্ষা করে, বিলাপ ও বেপর্দা অবস্থা এড়িয়ে, মাঝে মাঝে আপনজনের কবর জিয়ারত করা নারীদের জন্যও জায়েজ।
বাস্তবে অনেক নারী বাবা-মা বা সন্তানের কবরে যেতে চান। এমন ক্ষেত্রে মাহরাম পুরুষের সঙ্গে, ভিড়মুক্ত সময়ে গিয়ে সংক্ষেপে দোয়া করে আসা যায়। শোক সামলানো কঠিন মনে হলে ঘরে বসে দোয়া করাই ভালো, কারণ দোয়া যেকোনো জায়গা থেকেই মৃতের কাছে পৌঁছায়।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
কবর জিয়ারতের সময় কি জুতা খুলতে হয়?
কবরস্থানে চলাচলের সময় জুতা পরা নিয়ে আলেমদের কিছু আলোচনা আছে। জুতা পরিষ্কার থাকলে এবং কবরের ওপর পা না পড়লে সাধারণত সমস্যা নেই বলা হয়। কবরের ওপর দিয়ে হাঁটা খালি পায়েও নিষেধ।
কবরের পাশে কোরআন খতম করানো কি জরুরি?
বিজ্ঞাপন
জরুরি নয়। দোয়া ও তিলাওয়াত যেকোনো জায়গা থেকে করা যায়। টাকা দিয়ে নির্দিষ্ট দিনে কবরের পাশে খতম পড়ানোর প্রচলিত রীতি নিয়ে আলেমদের আপত্তি আছে।
কবর জিয়ারতে হাত তুলে মোনাজাত করা যায়?
যায়। দোয়ার সময় কেবলামুখী হয়ে হাত তোলা উত্তম, যাতে কবরবাসীর কাছে চাওয়ার মতো না দেখায়।
প্রতিদিন কবর জিয়ারত করা কি ঠিক?
বিজ্ঞাপন
জিয়ারতের নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। নিয়মিত যেতে পারেন, তবে শোক যেন জীবনের স্বাভাবিক দায়িত্ব থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়। মূল উদ্দেশ্য দোয়া ও আখিরাতের স্মরণ।