বিদ্যুৎ বিল কমানোর উপায়: ঘরের খরচ কমাতে কার্যকর অভ্যাসগুলো
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
গ্রীষ্মের তিন-চার মাস এলেই অনেক পরিবারের বাজেটে বড় ধাক্কা দেয় বিদ্যুৎ বিল। অথচ ঘরে একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, খরচের বড় অংশ যায় অপচয়ে: অকারণে খোলা ফ্রিজের দরজা, সারা রাত ষোলো ডিগ্রিতে চলা এসি, দিনের পর দিন স্ট্যান্ডবাইয়ে থাকা টিভি। এই অপচয়গুলো বন্ধ করলেই বিল চোখে পড়ার মতো কমে।
বিজ্ঞাপন
বিদ্যুৎ বিল কমানোর উপায় খুঁজতে গেলে আগে বুঝতে হবে, বাংলাদেশে আবাসিক বিল ধাপভিত্তিক। মাসের ব্যবহার যত বাড়ে, শেষের ইউনিটগুলোর দাম তত চড়া। তাই প্রতি ইউনিট সাশ্রয় শুধু ওই ইউনিটের দাম বাঁচায় না, অনেক সময় আপনাকে উঁচু ধাপে ওঠা থেকেও রক্ষা করে।
সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ খায় এসি, ফ্রিজ, পানির পাম্প, ইস্ত্রি, পানি গরমের যন্ত্র আর রান্নার বৈদ্যুতিক চুলা। তাই এদের দিয়েই শুরু করা যাক।
এসি: বিলের সবচেয়ে বড় অংশ
১. তাপমাত্রা পঁচিশ-ছাব্বিশ ডিগ্রি: এসির তাপমাত্রা যত কম রাখবেন, কম্প্রেসর তত বেশি চলবে। সরকারও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে এসি পঁচিশ ডিগ্রি বা তার ওপরে রাখার পরামর্শ দিয়ে আসছে। সঙ্গে ফ্যান কম গতিতে চালালে কম তাপমাত্রা ছাড়াই আরাম পাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
২. ঘর বন্ধ রাখুন: দরজা-জানালার ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে গেলে এসি থামতেই পারে না। ভারী পর্দা দিয়ে দুপুরের রোদ আটকান।
৩. ফিল্টার পরিষ্কার: ধুলা জমা ফিল্টার বাতাস চলাচলে বাধা দেয়। গরমের মৌসুমে কয়েক সপ্তাহ পরপর ফিল্টার ধুয়ে নিন এবং বছরে অন্তত একবার পেশাদার সার্ভিসিং করান।
৪. টাইমার ব্যবহার: ঘুমানোর পর ঘর ঠান্ডা হয়ে গেলে সারা রাত এসি চালানোর দরকার পড়ে না। দুই-তিন ঘণ্টার টাইমার বা স্লিপ মোড দিন।
৫. কেনার সময় ভাবুন: নতুন এসি কিনলে ইনভার্টার প্রযুক্তি ও ভালো জ্বালানি দক্ষতার মডেল বেছে নিন। দাম কিছুটা বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে বিল কম আসে।
বিজ্ঞাপন
ফ্রিজের বিদ্যুৎ বিল কমানোর উপায়
ফ্রিজ সারা দিন সারা রাত চলে, তাই ছোট ভুলও মাস শেষে বড় অঙ্ক হয়ে দাঁড়ায়।
১. দেয়াল থেকে ফাঁক রাখুন: ফ্রিজের পেছনে ও দুই পাশে কয়েক ইঞ্চি ফাঁকা রাখুন, যাতে তাপ বেরিয়ে যেতে পারে। চুলা বা রোদের পাশে রাখবেন না।
২. বারবার দরজা খুলবেন না: কী নেবেন ঠিক করে তারপর দরজা খুলুন। প্রতিবার খুললে ভেতরের ঠান্ডা বেরিয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
৩. গরম খাবার ঠান্ডা করে রাখুন: চুলা থেকে নামানো গরম খাবার সরাসরি ফ্রিজে রাখলে কম্প্রেসরকে অনেকক্ষণ খাটতে হয়।
৪. দরজার রাবার পরীক্ষা: দরজার রাবার গ্যাসকেট আলগা বা ছেঁড়া হলে ঠান্ডা চুইয়ে বের হয়। একটি কাগজ দরজায় আটকে বন্ধ করুন, সহজে টেনে বের করা গেলে রাবার বদলানোর সময় হয়েছে।
৫. বরফ জমতে দেবেন না: পুরোনো ধরনের ফ্রিজে ফ্রিজারে মোটা বরফের স্তর জমলে নিয়মিত ডিফ্রস্ট করুন।
৬. তাপমাত্রা মাঝামাঝি: থার্মোস্ট্যাট সর্বোচ্চ ঠান্ডায় রাখার দরকার নেই। মাঝামাঝি সেটিংয়েই সাধারণত খাবার ভালো থাকে।
বিজ্ঞাপন
বাতি, পাখা ও ছোট যন্ত্র
১. এলইডি বাতি: পুরোনো টিউবলাইট ও সাধারণ বাল্ব বদলে এলইডি লাগান। একই আলো দিতে এলইডি অনেক কম বিদ্যুৎ খায় এবং টেকেও বেশি দিন।
২. দিনের আলো: দিনে পর্দা সরিয়ে প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করুন। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বাতি-পাখা বন্ধের অভ্যাস করুন।
৩. সাশ্রয়ী পাখা: পুরোনো পাখা বদলানোর সময় কম বিদ্যুৎ খরচের আধুনিক মডেল বিবেচনা করুন।
বিজ্ঞাপন
৪. স্ট্যান্ডবাই বন্ধ: টিভি, সেট-টপ বক্স, সাউন্ড সিস্টেম, মাইক্রোওয়েভ রিমোটে বন্ধ করলেও অল্প বিদ্যুৎ টানতে থাকে। সুইচ দেওয়া মাল্টিপ্লাগ ব্যবহার করে রাতে বা বাইরে যাওয়ার সময় পুরো লাইন বন্ধ করুন।
৫. চার্জার খুলে রাখুন: ফোন চার্জ হয়ে গেলে চার্জার সকেট থেকে খুলে ফেলুন।
পানির পাম্প, ইস্ত্রি ও ওয়াশিং মেশিন
পানির মোটর যত কম সময় চলবে, তত ভালো। ট্যাংকের পানি উপচে পড়ছে কি না খেয়াল রাখুন, প্রয়োজনে স্বয়ংক্রিয় সুইচ লাগান। কলের লিক সারান, কারণ নষ্ট হওয়া প্রতিটি লিটার পানি তোলার পেছনেও বিদ্যুৎ খরচ হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ইস্ত্রি গরম হতে অনেক বিদ্যুৎ লাগে। তাই প্রতিদিন একটি-দুটি কাপড় না করে সপ্তাহে এক-দুই দিন একসঙ্গে সব কাপড় ইস্ত্রি করুন। পাতলা কাপড়গুলো শেষে রাখুন, সুইচ বন্ধের পরও ইস্ত্রির জমা তাপে সেগুলো হয়ে যায়।
ওয়াশিং মেশিন পূর্ণ লোডে চালান এবং প্রয়োজন না হলে গরম পানির সেটিং ব্যবহার করবেন না। রোদে কাপড় শুকানো ড্রায়ারের চেয়ে অনেক সাশ্রয়ী।
মিটারে বিদ্যুৎ বিল কমানোর উপায়: বৈধ পথে
মিটার নিয়ে কারসাজি বা অবৈধ সংযোগের প্রস্তাব কেউ দিলে সোজা না বলুন। এটি আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ, জরিমানা ও মামলার ঝুঁকি আছে, আর ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগে আগুন লাগার আশঙ্কাও থাকে। তবে মিটার-সংক্রান্ত কিছু বৈধ পদক্ষেপ সত্যিই বিল কমাতে পারে।
বিজ্ঞাপন
১. রিডিং মিলিয়ে দেখুন: প্রতি মাসে মিটারের ছবি তুলে রাখুন এবং বিলের রিডিংয়ের সঙ্গে মেলান। আনুমানিক রিডিংয়ে বিল এলে বিতরণ অফিসে অভিযোগ করুন।
২. লিকেজ পরীক্ষা: ঘরের সব যন্ত্র ও বাতি বন্ধ করে মিটার দেখুন। তবুও মিটার চলতে থাকলে বা প্রিপেইড মিটারে টাকা কাটতে থাকলে ওয়্যারিংয়ে লিকেজ থাকতে পারে। লাইসেন্সধারী ইলেকট্রিশিয়ান দিয়ে পরীক্ষা করান।
৩. মিটার পরীক্ষার আবেদন: মিটার দ্রুত ঘুরছে সন্দেহ হলে বিতরণ সংস্থার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে মিটার পরীক্ষার আবেদন করুন।
৪. অনুমোদিত লোড ঠিক রাখুন: প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি লোড অনুমোদিত থাকলে ডিমান্ড চার্জ বেশি দিতে হয়। আবার বাস্তব লোড অনুমোদিত লোডের চেয়ে বেশি হলেও সমস্যা হতে পারে। বিতরণ অফিসে কথা বলে সঠিক লোড নির্ধারণ করুন।
বিজ্ঞাপন
মাসের ব্যবহার পরিকল্পনা করুন
যেহেতু বিল ধাপভিত্তিক, তাই মাসের মাঝামাঝি একবার মিটার দেখে নিন কত ইউনিট খরচ হলো। যদি দেখেন মাস শেষ হওয়ার আগেই পরের চড়া ধাপের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছেন, তাহলে বাকি দিনগুলোতে এসি ও অন্যান্য ভারী যন্ত্রের ব্যবহার কিছুটা কমিয়ে দিন। সন্ধ্যার পিক আওয়ারে ভারী যন্ত্র কম চালানো জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপও কমায়। ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বসানোর সুযোগ থাকলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।
পরিবারের সবাইকে এই চেষ্টায় যুক্ত করাও জরুরি। শিশুদের শেখান ঘর ছাড়ার আগে বাতি-পাখা বন্ধ করতে, ফ্রিজের দরজা খুলে দাঁড়িয়ে না থাকতে। মাস শেষে বিল কমলে সেই সাফল্যটা সবাইকে জানান, তাহলে অভ্যাসটা টিকে যায়। ছোট ছোট সাশ্রয় মিলেই বছরে বড় অঙ্কের টাকা বাঁচে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
বিদ্যুৎ বিল কম আসার উপায় হিসেবে কোন যন্ত্রে নজর দেব?
এসি, ফ্রিজ, পানির পাম্প, ইস্ত্রি ও বৈদ্যুতিক চুলায়। এগুলোর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করলেই সবচেয়ে বেশি সাশ্রয় হয়।
বারবার এসি বন্ধ-চালু করলে কি বিদ্যুৎ বাঁচে?
খুব ঘন ঘন বন্ধ-চালু না করে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় চালিয়ে টাইমার ব্যবহার করা বেশি কার্যকর। ঘর ছেড়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য বের হলে অবশ্যই বন্ধ করুন।
বিজ্ঞাপন
স্ট্যান্ডবাইতে থাকা যন্ত্র কি সত্যিই বিদ্যুৎ খায়?
হ্যাঁ, প্রতিটি অল্প করে খায়। কয়েকটি যন্ত্র মিলে সারা মাসে চোখে পড়ার মতো খরচ হয়।
পুরোনো ফ্রিজ কি বেশি বিদ্যুৎ খায়?
সাধারণত হ্যাঁ, বিশেষ করে দরজার রাবার নষ্ট বা কম্প্রেসর দুর্বল হলে। নতুন কেনার সময় জ্বালানি দক্ষতার মান দেখে কিনুন।