নবদম্পতির জন্য বিয়ের দোয়া: বারাকাল্লাহু লাকা উচ্চারণ ও অর্থ
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
বিয়ের অনুষ্ঠানে নবদম্পতিকে কী বলে শুভেচ্ছা জানাবেন? আমাদের দেশে সাধারণত 'বিবাহিত জীবন সুখের হোক' বা ইংরেজিতে শুভকামনা জানানো হয়। এসব বলায় দোষ নেই, তবে মহানবী (সা.) নবদম্পতির জন্য একটি ছোট ও অর্থপূর্ণ দোয়া শিখিয়ে গেছেন, যা শুভেচ্ছাকে ইবাদতে রূপ দেয়।
বিজ্ঞাপন
দোয়াটি আবু দাউদ ও তিরমিজিতে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কেউ বিয়ে করলে মহানবী (সা.) তাকে অভিনন্দন জানিয়ে এই দোয়া পড়তেন। মাত্র এক লাইনের দোয়া, মুখস্থ করতে এক মিনিটও লাগে না, অথচ এতে দাম্পত্য জীবনের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় তিনটি চাওয়া আছে: বরকত, আল্লাহর রহমত এবং কল্যাণের মধ্যে দুজনের একসঙ্গে থাকা।
বিয়ের শুভেচ্ছার মাসনুন দোয়া
بَارَكَ اللَّهُ لَكَ وَبَارَكَ عَلَيْكَ وَجَمَعَ بَيْنَكُمَا فِي خَيْرٍ
উচ্চারণ: বারাকাল্লাহু লাকা ওয়া বারাকা আলাইকা ওয়া জামাআ বাইনাকুমা ফি খাইর।
বিজ্ঞাপন
অর্থ: আল্লাহ তোমার জন্য বরকত দিন, তোমার ওপর বরকত নাজিল করুন এবং তোমাদের দুজনকে কল্যাণের মধ্যে একত্র রাখুন।
দোয়ার প্রথম অংশ 'বারাকাল্লাহু লাকা' মানে আল্লাহ তোমার জন্য এই বিয়েতে বরকত দিন। দ্বিতীয় অংশ 'ওয়া বারাকা আলাইকা' মানে তোমার ওপরও বরকত নাজিল করুন, অর্থাৎ শুধু বিয়েতে নয়, তোমার জীবনেও। শেষ অংশ 'ওয়া জামাআ বাইনাকুমা ফি খাইর' দুজনের সম্পর্কের জন্য দোয়া: তারা যেন ভালোর মধ্যে, কল্যাণের পথে একসঙ্গে থাকে।
বর ও কনের জন্য শব্দের পরিবর্তন
আরবিতে পুরুষ ও নারীকে সম্বোধনের শব্দ আলাদা। তাই কাকে বলছেন, সে অনুযায়ী দোয়ার শব্দ একটু বদলে নেওয়া যায়:
বিজ্ঞাপন
১. বরকে বললে: বারাকাল্লাহু লাকা ওয়া বারাকা আলাইকা ওয়া জামাআ বাইনাকুমা ফি খাইর।
২. কনেকে বললে: বারাকাল্লাহু লাকি ওয়া বারাকা আলাইকি ওয়া জামাআ বাইনাকুমা ফি খাইর।
৩. দুজনকে একসঙ্গে বললে: বারাকাল্লাহু লাকুমা ওয়া বারাকা আলাইকুমা ওয়া জামাআ বাইনাকুমা ফি খাইর।
শব্দের এই পরিবর্তন আরবি ব্যাকরণের স্বাভাবিক নিয়ম। কেউ সব ক্ষেত্রে মূল হাদিসের শব্দ 'লাকা' ব্যবহার করলেও দোয়ার অর্থ ও উদ্দেশ্য ঠিক থাকে।
বিজ্ঞাপন
সংক্ষেপে শুধু 'বারাকাল্লাহু লাকা' বলাও সুন্নত। বুখারি ও মুসলিমে আছে, হজরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) বিয়ের খবর দিলে মহানবী (সা.) বলেছিলেন, বারাকাল্লাহু লাকা, আওলিম ওয়ালাও বিশাহ। অর্থ: আল্লাহ তোমার জন্য বরকত দিন, একটি ছাগল দিয়ে হলেও ওয়ালিমা করো।
বিয়েতে পড়ার আরও কিছু দোয়া
বুখারিতে হজরত আয়েশা (রা.) জানিয়েছেন, তাঁর বিয়ের দিন আনসারি নারীরা তাঁকে বলেছিলেন: আলাল খাইরি ওয়াল বারাকাহ, ওয়া আলা খাইরি তাইর। অর্থ: কল্যাণ ও বরকতের সঙ্গে এবং উত্তম সৌভাগ্যের সঙ্গে। কনেকে বরণ করার সময় নারীরা এ দোয়াটি বলতে পারেন।
নবদম্পতি নিজেরা বা পরিবারের মুরব্বিরা তাঁদের জন্য সুরা ফুরকানের ৭৪ নম্বর আয়াতের দোয়াটি পড়তে পারেন:
বিজ্ঞাপন
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
উচ্চারণ: রাব্বানা হাবলানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া জুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ'ইউনিও ওয়াজআলনা লিলমুত্তাকিনা ইমামা। অর্থ: হে আমাদের রব, আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের জন্য চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ বানান।
এ ছাড়া নিজের ভাষায় দোয়া করা যায়: আল্লাহ তোমাদের ঘরে শান্তি দিন, পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও সহনশীলতা দিন, নেক সন্তান দিন। আন্তরিক দোয়া যেকোনো ভাষায় গ্রহণযোগ্য।
কোরআনে বিয়ে ও দাম্পত্যের কথা
বিজ্ঞাপন
সুরা রুমের ২১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, তাঁর নিদর্শনগুলোর একটি হলো তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও, এবং তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। এই আয়াতটি বিয়ের খুতবা, কার্ড ও শুভেচ্ছাবার্তায় প্রায়ই উদ্ধৃত হয়।
আয়াতে তিনটি শব্দ লক্ষ করার মতো: প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়া। বিয়ের দোয়াগুলোতে মূলত এই তিনটিই চাওয়া হয়। ভালোবাসা সময়ের সঙ্গে কমতে-বাড়তে পারে, কিন্তু দয়া ও সহমর্মিতা থাকলে সম্পর্ক টিকে থাকে, আলেমরা আয়াতের ব্যাখ্যায় এ কথা প্রায়ই বলেন।
দোয়ার সঙ্গে যে সুন্নতগুলো মনে রাখবেন
বিয়ের দোয়া শুধু মুখের কথা হয়ে থাকলে তার সৌন্দর্য পুরোপুরি ফোটে না। মহানবী (সা.) নবদম্পতির জন্য দোয়ার পাশাপাশি কিছু আচরণও শিখিয়েছেন। আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.)-কে দেওয়া পরামর্শেই দেখা যায়, দোয়ার পরপরই তিনি ওয়ালিমার কথা বলেছেন। ওয়ালিমা মানে বিয়ের পর বরপক্ষের আয়োজনে আত্মীয়, প্রতিবেশী ও বন্ধুদের খাওয়ানো। সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট আয়োজনও যথেষ্ট; একটি ছাগল দিয়ে হলেও, এই কথাতেই বোঝা যায় ইসলাম বিয়ের খরচকে সহজ রাখতে চায়।
বিজ্ঞাপন
বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে আছে, সবচেয়ে নিকৃষ্ট খাবার সেই ওয়ালিমার খাবার, যেখানে ধনীদের দাওয়াত দেওয়া হয় আর গরিবদের বাদ রাখা হয়। তাই অতিথি তালিকায় অভাবী আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের রাখুন। দাওয়াত পেলে যথাসম্ভব উপস্থিত হওয়া, উপহার দিলে সামর্থ্য অনুযায়ী দেওয়া এবং নবদম্পতির ওপর বাড়তি খরচের চাপ তৈরি না করাও সুন্দর আদব।
বিয়ের পর নতুন সংসারে মানিয়ে নিতে বর-কনে দুজনেরই সময় লাগে। পরিবারের বড়দের দোয়ার পাশাপাশি সহযোগিতা, ধৈর্য ও অযথা হস্তক্ষেপ না করাও তাঁদের জন্য বড় উপহার।
শুভেচ্ছা জানানোর আদব ও যা এড়াবেন
নাসায়ির একটি বর্ণনায় আছে, জাহেলি যুগে বিয়েতে বলা হতো 'বির রিফাই ওয়াল বানিন', অর্থাৎ মিলমিশ ও ছেলেসন্তানসহ। এক সাহাবি বিয়ের পর লোকেরা এভাবে শুভেচ্ছা দিলে তিনি তাদের থামিয়ে বলেন, এভাবে বোলো না, বরং নবীজি যেভাবে শিখিয়েছেন, সেভাবে বরকতের দোয়া করো। আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন, শুধু ছেলেসন্তান কামনার মধ্যে মেয়েশিশুকে খাটো করার জাহেলি মানসিকতা ছিল।
বিজ্ঞাপন
এখনো বিয়েতে এমন কিছু কথা চলে, যা এড়িয়ে চলা উচিত। কনের গায়ের রং, উচ্চতা বা যৌতুক নিয়ে মন্তব্য, 'এবার ছেলে চাই' ধরনের চাপ, কিংবা নবদম্পতিকে অশ্লীল ঠাট্টা করা দোয়ার পরিবেশ নষ্ট করে। শুভেচ্ছা হোক সংক্ষিপ্ত, সম্মানজনক ও দোয়াপূর্ণ।
বিয়ের কার্ড, মোবাইল বার্তা বা সামাজিক মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানাতে চাইলে লিখতে পারেন: বারাকাল্লাহু লাকুমা ওয়া বারাকা আলাইকুমা ওয়া জামাআ বাইনাকুমা ফি খাইর। আল্লাহ তোমাদের নতুন জীবনে বরকত দিন, ভালোবাসা ও শান্তিতে একসঙ্গে রাখুন। আরবি উচ্চারণ লিখতে গিয়ে বানান ভুলের আশঙ্কা থাকলে শুধু বাংলা অর্থটুকু লিখলেও দোয়ার উদ্দেশ্য পূরণ হয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিয়ের দোয়া কখন পড়তে হয়?
বিজ্ঞাপন
বিয়ের আকদ সম্পন্ন হওয়ার পর বা নবদম্পতির সঙ্গে প্রথম দেখা হলে অভিনন্দন জানানোর সময় পড়া হয়। বিয়ের অনুষ্ঠান, ওয়ালিমা বা পরে দেখা হলেও পড়া যায়।
বর নিজে কি এই দোয়া পড়বেন?
এটি মূলত অন্যদের পক্ষ থেকে নবদম্পতির জন্য দোয়া। বর ও কনে নিজেদের জন্য সুরা ফুরকানের দোয়াসহ যেকোনো কল্যাণের দোয়া করতে পারেন। স্ত্রীর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের জন্য আলাদা একটি দোয়া হাদিসে আছে।
বাংলায় শুভেচ্ছা জানালে কি সুন্নত আদায় হবে?
বিজ্ঞাপন
সুন্নতের পূর্ণ অনুসরণ হলো হাদিসের শব্দে দোয়া করা। তবে বাংলায় বরকত ও কল্যাণের দোয়া করলেও তা উত্তম শুভেচ্ছা এবং দোয়া হিসেবে গণ্য।
বিয়ের শুভেচ্ছায় 'বারাকাল্লাহু ফিক' বলা যায়?
যায়। এর অর্থ আল্লাহ তোমার মধ্যে বরকত দিন। এটি সাধারণ দোয়া, যেকোনো ভালো খবরে বলা যায়। তবে বিয়ের জন্য হাদিসে বর্ণিত পূর্ণ দোয়াটি বলা উত্তম।