বিদেশে গিয়ে কফিনবন্দী হয়ে ফিরলেন যুবক, ভেঙে গেল মা-বাবার স্বপ্ন
মালয়েশিয়া থেকে ফিরে আসা একমাত্র সন্তান কফিনবন্দি হয়ে পরিবারকে শোকের মধ্যে ফেলে
রংপুর জেলা প্রতিনিধি · পীরগঞ্জ, রংপুর
প্রকাশ:
২৪ বছর বয়সী মনিরুল ইসলাম (কফিনবন্দি) ১৫ অক্টোবর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে স্বজনদের হাতে লাশ গ্রহণের পর রায়পুর ইউনিয়নের কুমারগাড়ী চন্দ্রকোনা গ্রামে পৌঁছান; শুক্রবার সকালে তার মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালে মা‑বাবা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
বিজ্ঞাপন
মনিরুল রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের কুমারগাড়ী চন্দ্রকোনা গ্রামের ইয়াসিন আলীর ছেলে; এক ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে তিনি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তান ছিলেন। পরিবারের আর্থিক অনটন দূর করতে ২০২৩ সালের মার্চ মাসে ধার‑দেনা করে তাকে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়। এরপর তার পাঠানো সামান্য টাকায় চার সদস্যের পরিবার চালু থাকত, আর মা‑বাবার স্বপ্ন ছিল তার উপার্জন বাড়বে, বেশি টাকা পাঠাবে, সংসার সচ্ছল হবে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ১৫ অক্টোবর মালয়েশিয়া থেকে মনিরুলের মৃত্যুর খবর পেয়ে তারা শোকাহত হয়েছেন; তবে কীভাবে, কী কারণে তার মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য পাননি। স্বজনের মতে, রাতে ঘুমানোর পর সকালে আর ঘুম থেকে ওঠেননি মনিরুল; পরে তাকে সেখানকার হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে দিশাহারা বাবা ইয়াসিন আলী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম, অনেক আশা নিয়ে নিজে নিঃস্ব হয়ে। ভাবছিলাম, টাকা রোজগার করবে, যেন সংসারটা ভালোভাবে চলে। সব আশা-স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল। ও (মনিরুল) ছিল আমার সংসারের একমাত্র ভরসা। কপালপোড়া সংসার আমার। এখন কী হবে?’
একমাত্র ছেলে মনিরুলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে বিলাপ করছেন মা মনোয়ারা বেগম। মা বলেন, ‘বিদেশে যাওয়ার আগে ছেলে বলেছিল, “মা চিন্তা করিস না। বিদেশোত চাকরি করি টাকা পটাইম, তোরা খাইমেন। অভাব আর থাইকপ্যার নয়”।’ তিনি আরও বলেন, ‘আহা রে এত ভালো ছেলেটা আমাকে ছেড়ে চলে গেল! আমি টাকা চাই না বাবা, আমার বুকে ফিরে আয়।’
বিজ্ঞাপন
স্বজনেরা জানান, পরিবারের অভাব দূর করার পাশাপাশি মা‑বাবার মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন ছিল মনিরুলের; বিদেশে গিয়ে নিজের কষ্টের উপার্জন থেকে যা পাঠাতেন, তা দিয়ে চলত পরিবারের দৈনন্দিন খরচ। তার মৃত্যুর পর পরিবার কেবল একমাত্র সন্তানই নয়, সংসার চালানোর একমাত্র অবলম্বনও হারিয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাত পৌনে তিনটার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মনিরুলের লাশ গ্রহণ করেন স্বজনেরা; আজ সকালে মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে বাড়িতে ভিড় করেন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় লোকজন। জুমার নামাজের পর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
চাচা আলতাফ হোসেন বলেন, ‘অনেক আশা নিয়ে ভাতিজাকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম; কিন্তু সে ফিরল লাশ হয়ে। কীভাবে তার মৃত্যু হলো, সেটাও আমরা জানি না। ১৫ অক্টোবর আসলে কী ঘটেছিল, তা জানতে চাই। আমরা তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের জন্য সুষ্ঠু তদন্ত চাই।’