বিয়ের প্রথম রাতের দোয়া: নবদম্পতির সুন্নাহসম্মত আমল
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
বিয়ের দিনটা যত আনুষ্ঠানিকতায় ভরা থাকে, রাতটা ততটাই ব্যক্তিগত। নতুন দুজন মানুষ একসঙ্গে নতুন জীবন শুরু করছেন; সংকোচ, আনন্দ, উদ্বেগ সব মিলেমিশে থাকে। ইসলাম এই মুহূর্তটিকেও আল্লাহর স্মরণ দিয়ে শুরু করতে শিখিয়েছে, যাতে সম্পর্কের ভিত হয় বরকত ও পারস্পরিক সম্মানের ওপর।
বিজ্ঞাপন
প্রথম রাতের জন্য হাদিসে তিনটি আমল পাওয়া যায়। প্রথমত, স্ত্রীর কপালে বা মাথার সামনের অংশে হাত রেখে তাঁর কল্যাণের জন্য দোয়া করা। দ্বিতীয়ত, কয়েকজন সাহাবির আমল অনুযায়ী দুজনে মিলে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে দোয়া করা। তৃতীয়ত, শারীরিক ঘনিষ্ঠতার আগে শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়ার দোয়া পড়া। এর বাইরে বাকিটা কোমলতা, ধৈর্য ও সুন্দর আচরণের বিষয়।
স্ত্রীর কপালে হাত রেখে দোয়া
আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহতে বর্ণিত হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ বিয়ে করলে সে যেন স্ত্রীর কপালের ওপরের অংশে হাত রেখে আল্লাহর নাম নেয়, বরকতের দোয়া করে এবং এই দোয়া পড়ে:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا وَخَيْرَ مَا جَبَلْتَهَا عَلَيْهِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَمِنْ شَرِّ مَا جَبَلْتَهَا عَلَيْهِ
বিজ্ঞাপন
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা খাইরাহা ওয়া খাইরা মা জাবালতাহা আলাইহি, ওয়া আউজু বিকা মিন শাররিহা ওয়া মিন শাররি মা জাবালতাহা আলাইহি।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে তার কল্যাণ এবং যে স্বভাব-প্রকৃতির ওপর আপনি তাকে সৃষ্টি করেছেন, তার কল্যাণ প্রার্থনা করছি। আর তার অনিষ্ট এবং যে স্বভাবের ওপর আপনি তাকে সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় চাইছি।
দোয়াটি শুরুর আগে 'বিসমিল্লাহ' বলে নিন। স্ত্রী অস্বস্তি বোধ করতে পারেন, তাই আগে কথা বলে, আন্তরিকভাবে জানিয়ে নিন আপনি কী করছেন এবং কেন। দোয়াটি নিচু স্বরে পড়া যায়। আলেমরা বলেছেন, স্ত্রীও চাইলে নিজের ভাষায় স্বামীর কল্যাণ ও সংসারে বরকতের জন্য দোয়া করতে পারেন।
দুই রাকাত নামাজ: যা জানা দরকার
বিজ্ঞাপন
বাসর রাতের নামাজ নামে নির্দিষ্ট কোনো নামাজ সরাসরি মহানবী (সা.) থেকে বর্ণিত নয়। তবে মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবার মতো হাদিসগ্রন্থে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)সহ কয়েকজন সাহাবি থেকে বর্ণিত আছে, তাঁরা নবদম্পতিকে প্রথম সাক্ষাতে দুই রাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এর ভিত্তিতে আলেমরা এই আমলকে উত্তম বলেছেন।
পদ্ধতি সাধারণ নফল নামাজের মতোই। দুজনেই অজু করে নেবেন। স্বামী সামনে দাঁড়াবেন, স্ত্রী তাঁর পেছনে। নিয়ত মনে মনে করবেন যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ছি। সুরা ফাতিহার পর যেকোনো সুরা পড়া যায়। নামাজ শেষে দুজনে মিলে সংসারে বরকত, পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও নেক সন্তানের জন্য দোয়া করবেন।
এ নামাজ ফরজ বা ওয়াজিব নয়। ক্লান্তি, অসুস্থতা বা স্ত্রীর ঋতুস্রাবের কারণে পড়া সম্ভব না হলে কোনো গুনাহ নেই। মাকরুহ সময় হলে তা পার হওয়ার পর পড়বেন।
ঘনিষ্ঠ হওয়ার আগের দোয়া
বিজ্ঞাপন
বুখারি ও মুসলিমে হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ স্ত্রীর কাছে যাওয়ার সময় যদি এই দোয়া পড়ে, তারপর তাদের মধ্যে কোনো সন্তান নির্ধারিত হয়, শয়তান কখনো তার ক্ষতি করতে পারবে না:
بِسْمِ اللَّهِ، اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ، وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহ, আল্লাহুম্মা জান্নিবনাশ শাইতানা ওয়া জান্নিবিশ শাইতানা মা রাজাকতানা।
অর্থ: আল্লাহর নামে। হে আল্লাহ, আমাদের শয়তান থেকে দূরে রাখুন এবং আমাদের আপনি যা দান করবেন, তা থেকেও শয়তানকে দূরে রাখুন।
বিজ্ঞাপন
এ দোয়া শুধু প্রথম রাতের জন্য নয়, দাম্পত্য জীবনের প্রতিবারের জন্যই সুন্নত। মনে না থাকলে অন্তত বিসমিল্লাহ বলুন।
প্রথম রাতের আচরণ: কোমলতা ও সম্মান
তিরমিজির হাদিসে মহানবী (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। প্রথম রাতের আচরণ এই হাদিসের প্রথম পরীক্ষা। বিশেষ করে পারিবারিকভাবে ঠিক হওয়া বিয়েতে দুজন হয়তো আগে খুব কম কথা বলেছেন। তাই তাড়াহুড়া না করে পরিচয়, গল্প, পরিবার ও স্বপ্ন নিয়ে কথা বলুন। সারা দিনের ক্লান্তির পর একটু হালকা খাবার, পানি বা দুধ ভাগ করে নেওয়ার মতো ছোট আন্তরিকতা দূরত্ব কমায়।
শারীরিক ঘনিষ্ঠতার ব্যাপারে দুজনের মানসিক প্রস্তুতি জরুরি। প্রথম রাতেই সব হতে হবে, এমন কোনো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নেই। স্ত্রী ভয় বা সংকোচে থাকলে ধৈর্য ধরুন, তাঁর অনুভূতিকে সম্মান করুন। জোর-জবরদস্তি ইসলামের শিক্ষা ও স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের সৌন্দর্য, দুটোরই পরিপন্থী।
বিজ্ঞাপন
দেনমোহরের নগদ অংশ এখনো পরিশোধ না হলে প্রথম সাক্ষাতেই তা দিয়ে দেওয়া বা অন্তত স্পষ্ট আলোচনা করা ভালো। মোহর স্ত্রীর অধিকার, অনুগ্রহ নয়।
গোসল, নামাজ ও গোপনীয়তা
স্বামী-স্ত্রীর মিলনের পর দুজনের ওপর ফরজ গোসল আবশ্যক হয়। সঙ্গে সঙ্গে গোসল না করে ঘুমাতে চাইলে অজু করে ঘুমানো সুন্নত, বুখারি ও মুসলিমে নবীজির এমন আমলের কথা এসেছে। তবে ফজরের নামাজের আগে অবশ্যই গোসল করে নিতে হবে; বিয়ের রাতের ক্লান্তিতে ফজর কাজা হয়ে যাওয়া একটি সাধারণ ভুল।
দাম্পত্য জীবনের গোপন বিষয় বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয়দের কাছে বলে বেড়ানোর ব্যাপারে সহিহ মুসলিমে কঠোর সতর্কতা এসেছে। কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে নিকৃষ্টতম মানুষদের একজন বলা হয়েছে তাকে, যে স্ত্রীর সঙ্গে একান্ত হওয়ার পর তার গোপন কথা প্রকাশ করে দেয়। পরদিন সকালে আত্মীয়দের কৌতূহলী প্রশ্নের জবাবে চুপ থাকা বা প্রসঙ্গ বদলানোই শালীনতা।
বিজ্ঞাপন
প্রচলিত ভুল ধারণা ও কুসংস্কার
১. রক্ত দেখে সতীত্ব প্রমাণ: প্রথম মিলনে রক্তপাত না হওয়া চরিত্রের প্রমাণ নয়; চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী নানা স্বাভাবিক কারণে এমন হতে পারে। এ নিয়ে স্ত্রীকে সন্দেহ বা অপমান করা গুরুতর অন্যায়।
২. নির্দিষ্ট দোয়া না পড়লে বিয়ে অশুভ: দোয়াগুলো সুন্নত ও বরকতের মাধ্যম, কিন্তু ভুলে গেলে বিয়ে অশুভ হয়ে যায় না।
৩. ঘর আটকে টাকা আদায়: আনন্দের নামে বরের কাছ থেকে জোর করে টাকা আদায় বা বিব্রতকর ঠাট্টা ইসলামি আদবের সঙ্গে যায় না।
বিজ্ঞাপন
৪. বিশেষ খাবার বা তাবিজ: প্রথম রাতে নির্দিষ্ট খাবার খাওয়া বা তাবিজ বাঁধার কোনো ধর্মীয় ভিত্তি নেই।
শারীরিক সমস্যা, ব্যথা বা অস্বস্তি থাকলে লজ্জা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এটি স্বাস্থ্যের বিষয়, শরিয়ত এতে বাধা দেয় না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বাসর রাতের নামাজ কি সুন্নত?
বিজ্ঞাপন
সরাসরি নবীজি থেকে নির্দিষ্ট নামাজ বর্ণিত নয়, তবে কয়েকজন সাহাবি নবদম্পতিকে দুই রাকাত নামাজের পরামর্শ দিয়েছেন। তাই এটি উত্তম আমল, বাধ্যতামূলক নয়।
স্ত্রীর কপালে হাত রেখে দোয়া কখন পড়তে হয়?
বিয়ের পর স্ত্রীর সঙ্গে প্রথম একান্ত সাক্ষাতের সময়, মাথার সামনের অংশে হাত রেখে বিসমিল্লাহ বলে দোয়াটি পড়বেন।
প্রথম রাতে স্ত্রীর ঋতুস্রাব চললে কী করবেন?
বিজ্ঞাপন
এ সময় শারীরিক মিলন হারাম, তবে একসঙ্গে থাকা, কথা বলা ও দোয়া করায় বাধা নেই। নামাজ পড়া যাবে না, তাই দুই রাকাতের আমল পরে করা যায়।
দোয়াগুলো বাংলায় পড়লে কি হবে?
হাদিসের আরবি শব্দে পড়াই উত্তম। মুখস্থ না থাকলে অর্থ মনে রেখে নিজের ভাষায় একই দোয়া করলেও আল্লাহ শোনেন। ধীরে ধীরে আরবিটি মুখস্থ করে নেওয়ার চেষ্টা করুন।