ফেসবুক মনিটাইজেশনের নিয়ম: পেজ ও প্রোফাইল থেকে আয়ের শর্তগুলো
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
নিজের রান্নার ভিডিও, গ্রামের জীবনের গল্প কিংবা মোবাইল সারানোর টিপস দিয়ে ফেসবুকে লাখো ভিউ পাচ্ছেন অনেকে। প্রশ্ন জাগে, এই ভিউ থেকে কি টাকা আসে? আসে, তবে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে। শুধু ভিউ বা ফলোয়ার বেশি হলেই ফেসবুক আপনাকে টাকা দেবে না।
বিজ্ঞাপন
ফেসবুক মনিটাইজেশনের নিয়ম সংক্ষেপে এ রকম। প্রথমত, আয় করতে হয় একটি ফেসবুক পেজ বা পেশাদার মোড চালু থাকা প্রোফাইল থেকে। দ্বিতীয়ত, মেটার পার্টনার মনিটাইজেশন নীতিমালা ও কনটেন্ট মনিটাইজেশন নীতিমালা মেনে চলতে হয়। তৃতীয়ত, আপনাকে এমন দেশে থাকতে হবে যেখানে সংশ্লিষ্ট আয়ের সুবিধা চালু, এবং বয়স হতে হবে অন্তত আঠারো বছর। চতুর্থত, প্রতিটি আয়ের টুল, যেমন ভিডিওর বিজ্ঞাপন বা দর্শকের দেওয়া সমর্থন, তার নিজস্ব ফলোয়ার ও দেখার সময়ের মতো শর্ত পূরণ করতে হয়।
এসব শর্ত ও সুবিধা দেশভেদে আলাদা এবং মেটা প্রায়ই এগুলো বদলায়, একাধিক প্রোগ্রাম একীভূতও করে। তাই আপনার পেজ বা প্রোফাইল এখন কোন সুবিধার যোগ্য, তা জানার নির্ভরযোগ্য জায়গা একটিই: প্রফেশনাল ড্যাশবোর্ডের মনিটাইজেশন অংশ।
ফেসবুক কেন টাকা দেয়
ফেসবুকের আয়ের বড় উৎস বিজ্ঞাপন। মানুষ যত বেশি সময় ফেসবুকে থাকেন, তত বেশি বিজ্ঞাপন দেখানো যায়। আর মানুষকে ধরে রাখে মানসম্মত ভিডিও, রিলস ও পোস্ট। তাই যাঁরা এমন কনটেন্ট তৈরি করেন, তাঁদের ভিডিওতে দেখানো বিজ্ঞাপনের আয়ের একটি অংশ ফেসবুক ভাগ করে দেয়। এতে ক্রিয়েটর উৎসাহ পান, ফেসবুকও ভালো কনটেন্ট পায়। একই কারণে বিজ্ঞাপনদাতারা যেসব কনটেন্টের পাশে নিজেদের বিজ্ঞাপন দেখাতে চান না, যেমন সহিংস, বিভ্রান্তিকর বা চুরি করা কনটেন্ট, সেগুলো আয়ের যোগ্য হয় না।
বিজ্ঞাপন
ফেসবুকে আয়ের উপায়: প্রধান টুলগুলো
১. ভিডিও ও রিলসের বিজ্ঞাপন: লম্বা ভিডিওর মাঝে বা আগে এবং রিলসে দেখানো বিজ্ঞাপনের আয়ের ভাগ। এটিই সবচেয়ে পরিচিত পথ। এর জন্য সাধারণত একটি নির্দিষ্টসংখ্যক ফলোয়ার এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভিডিও দেখার মিনিট লাগে।
২. দর্শকের সমর্থন: কিছু অঞ্চলে দর্শকেরা লাইভ বা ভিডিও চলাকালে ভার্চুয়াল উপহার পাঠিয়ে ক্রিয়েটরকে সমর্থন জানাতে পারেন, যা পরে অর্থে রূপান্তরিত হয়।
৩. সাবস্ক্রিপশন: অনুগত দর্শকেরা মাসিক অর্থ দিয়ে বিশেষ কনটেন্ট ও সুবিধা পান।
বিজ্ঞাপন
৪. ব্র্যান্ডেড কনটেন্ট: কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে তাদের পণ্য বা সেবার প্রচার। এখানে টাকা দেয় প্রতিষ্ঠান, তবে ফেসবুকের ব্র্যান্ডেড কনটেন্ট নীতিমালা মেনে পোস্টে অংশীদারত্বের ট্যাগ দিতে হয়।
৫. আমন্ত্রণভিত্তিক প্রোগ্রাম: মেটা মাঝে মাঝে নির্দিষ্ট ক্রিয়েটরদের পারফরম্যান্সভিত্তিক বোনাস বা নতুন পরীক্ষামূলক আয়ের প্রোগ্রামে আমন্ত্রণ জানায়। এগুলোতে নিজে আবেদন করা যায় না।
ফেসবুক মনিটাইজেশন পাওয়ার উপায়: ধাপে ধাপে প্রস্তুতি
১. পেজ বা পেশাদার মোড: ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে আয় করতে চাইলে প্রোফাইলের মেনু থেকে পেশাদার মোড চালু করুন। আলাদা পরিচয়ে কাজ করতে চাইলে নতুন পেজ খুলুন। পেজের নাম ও বিষয় যেন কনটেন্টের সঙ্গে মেলে।
বিজ্ঞাপন
২. নিয়মিত মৌলিক কনটেন্ট: নিজের ধারণ করা, নিজের সম্পাদনা করা ভিডিও দিন। অন্যের ভিডিও নামিয়ে আবার আপলোড করা বা সামান্য কেটে নিজের বলে চালানো মনিটাইজেশনের সবচেয়ে বড় বাধা।
৩. দর্শক গড়ে তুলুন: নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করলে দর্শক ফিরে আসেন। কেনা ফলোয়ার বা লাইক বিনিময় গ্রুপ দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি করে।
৪. যোগ্যতা দেখুন: প্রফেশনাল ড্যাশবোর্ড বা মেটা বিজনেস সুইটে মনিটাইজেশন অংশে গেলে প্রতিটি টুলের পাশে আপনার অগ্রগতি ও বাকি শর্ত দেখা যায়।
৫. আবেদন ও অনবোর্ডিং: কোনো টুলের যোগ্য হলে সেখান থেকেই আবেদন শুরু করুন। শর্তাবলিতে সম্মতি দিয়ে পেআউট অ্যাকাউন্ট ও কর-সংক্রান্ত তথ্য দিন।
বিজ্ঞাপন
কনটেন্ট মনিটাইজেশন নীতিমালা: যেসব ভুলে আয় বন্ধ হয়
মেটা নীতিমালা না মানলে পুরো পেজের মনিটাইজেশন বন্ধ হতে পারে। বাংলাদেশি ক্রিয়েটরদের মধ্যে প্রচলিত কিছু ভুল নিচে দেওয়া হলো।
১. পুনর্ব্যবহৃত কনটেন্ট: টিভি নাটক, সিনেমা, খেলা বা অন্য ক্রিয়েটরের ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার।
২. স্থির ছবির ভিডিও: শুধু একটি ছবি বা লেখার ওপর গান বসিয়ে ভিডিও বানানো, যেখানে দেখার মতো কিছু নেই।
বিজ্ঞাপন
৩. বিভ্রান্তিকর শিরোনাম ও থাম্বনেইল: ভিডিওতে যা নেই, তা দেখিয়ে দর্শক টানা।
৪. এনগেজমেন্ট চাওয়া: শেয়ার না করলে বিপদ হবে বা লাইক দিলে দোয়া কবুল হবে, এ ধরনের কৌশলে লাইক-শেয়ার আদায়।
৫. সংবেদনশীল কনটেন্ট: সহিংসতা, দুর্ঘটনার রক্তাক্ত দৃশ্য, ভুয়া চিকিৎসা দাবি বা ঘৃণা ছড়ানো কনটেন্ট।
পেআউট: টাকা হাতে আসে যেভাবে
বিজ্ঞাপন
আয় জমা হয় আপনার পেআউট অ্যাকাউন্টে। সেখানে নিজের নামে থাকা ব্যাংক হিসাবের তথ্য দিতে হয়। ব্যাংক হিসাবের নাম, পেআউট অ্যাকাউন্টের নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম যেন মেলে, নইলে টাকা আটকে যেতে পারে। আয় একটি ন্যূনতম অঙ্ক পার হলে নির্ধারিত সময়ে পেমেন্ট পাঠানো হয়। বিদেশি আয় গ্রহণে ব্যাংক কোনো কাগজ চাইলে আগে থেকে শাখায় কথা বলে রাখুন। কর-সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হলে সঠিকভাবে পূরণ করুন।
যা প্রত্যাশা করবেন আর যা নয়
ফেসবুক থেকে আয় অনেক ওঠানামা করে। দর্শক কোন দেশের, ভিডিও কতক্ষণ দেখা হচ্ছে, বিজ্ঞাপনদাতার চাহিদা কেমন, এমনকি বছরের কোন মাস, সবই প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশি দর্শকের ভিউতে আয় তুলনামূলক কম হয়, এটাও মাথায় রাখা দরকার। তাই প্রতি হাজার ভিউতে নির্দিষ্ট অঙ্কের প্রতিশ্রুতি দেওয়া কোনো কোর্স বা গ্রুপকে বিশ্বাস করবেন না। পেজ মনিটাইজ করে দেওয়ার নামে টাকা নেওয়া, মনিটাইজড পেজ কেনাবেচা বা অন্যের নামে পেআউট নেওয়া নীতিমালা লঙ্ঘন এবং প্রতারণার ঝুঁকিপূর্ণ।
শুরুর দিকে আয়ের চেয়ে বেশি মনোযোগ দিন দর্শকের আস্থা অর্জনে। একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে নিয়মিত, পরিষ্কার শব্দ ও ভালো আলোয় তৈরি ভিডিও দিলে দর্শক ফিরে আসেন, আর দেখার সময় বাড়লে আয়ের শর্তও দ্রুত পূরণ হয়। মন্তব্যের উত্তর দেওয়া, দর্শকের প্রশ্ন থেকে নতুন ভিডিওর ধারণা নেওয়া এবং প্রফেশনাল ড্যাশবোর্ডের পরিসংখ্যান দেখে কোন ভিডিও ভালো চলছে বোঝা, এসব অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বেশি কাজে দেয়।
বিজ্ঞাপন
আয়ের পাশাপাশি পেজের নিরাপত্তাও জরুরি। অ্যাডমিনদের অ্যাকাউন্টে দুই ধাপের যাচাই চালু রাখুন। কপিরাইট বা নীতিমালা লঙ্ঘনের নোটিশের নামে আসা মেসেজের লিংকে লগইন করবেন না, এভাবেই বহু মনিটাইজড পেজ হাতছাড়া হয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে কি আয় করা যায়?
হ্যাঁ, পেশাদার মোড চালু করলে প্রোফাইলও আয়ের টুলের জন্য যোগ্য হতে পারে, শর্ত পূরণ সাপেক্ষে।
বিজ্ঞাপন
ফেসবুক মনিটাইজেশন নিয়ম কি সব দেশে এক?
না। কোন টুল কোন দেশে চালু এবং শর্ত কী, তা দেশভেদে আলাদা। আপনার জন্য প্রযোজ্য তথ্য প্রফেশনাল ড্যাশবোর্ডে দেখুন।
মনিটাইজেশন বন্ধ হলে কী করব?
ড্যাশবোর্ডে কারণ দেখুন, সমস্যাযুক্ত কনটেন্ট সরান এবং যেখানে সুযোগ আছে সেখানে পর্যালোচনার অনুরোধ করুন। নীতিমালা মেনে কিছু সময় কাজ করলে আবার যোগ্য হওয়ার সুযোগ থাকে।
বিজ্ঞাপন
গান ব্যবহার করলে কি আয় বন্ধ হয়?
অনুমতিহীন গান ব্যবহারে ভিডিও মিউট, সরানো বা আয় থেকে বাদ পড়তে পারে। ফেসবুকের নিজস্ব সংগীত সংগ্রহ থেকে অনুমোদিত গান ব্যবহার করুন।