ইউটিউব মনিটাইজেশনের নিয়ম: শর্ত, আবেদন ও আয় শুরুর ধাপগুলো
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
ইউটিউবে ভিডিও দিয়ে আয়ের গল্প শুনে অনেকেই চ্যানেল খোলেন, কিন্তু প্রথম কয়েক মাস পর হতাশ হয়ে পড়েন, কারণ টাকা আসে না। আসল কথা হলো, শুধু চ্যানেল খুললেই বা ভিডিও দিলেই বিজ্ঞাপনের আয় শুরু হয় না। এর জন্য চ্যানেলকে ইউটিউব পার্টনার প্রোগ্রামে যুক্ত হতে হয়, যাকে সংক্ষেপে মনিটাইজেশন বলা হয়।
বিজ্ঞাপন
ইউটিউব মনিটাইজেশনের নিয়ম অনুযায়ী প্রচলিত শর্ত দুটি পথের যেকোনো একটি। প্রথম পথ: চ্যানেলে অন্তত এক হাজার সাবস্ক্রাইবার এবং গত বারো মাসে চার হাজার ঘণ্টা বৈধ পাবলিক ওয়াচ টাইম। দ্বিতীয় পথ: এক হাজার সাবস্ক্রাইবার এবং গত নব্বই দিনে এক কোটি বৈধ পাবলিক শর্টস ভিউ। এর সঙ্গে ইউটিউবের নীতিমালা মেনে চলা, অ্যাকাউন্টে দুই ধাপের যাচাই চালু রাখা, কোনো সক্রিয় কমিউনিটি গাইডলাইন স্ট্রাইক না থাকা এবং একটি অ্যাডসেন্স অ্যাকাউন্ট যুক্ত করা বাধ্যতামূলক।
ইউটিউব সময়ে সময়ে এসব শর্ত পর্যালোচনা ও পরিবর্তন করে। কিছু দেশে কম সাবস্ক্রাইবারে সীমিত আয়ের সুবিধাও চালু আছে। তাই আবেদনের আগে ইউটিউব স্টুডিওর আয় অংশে আপনার চ্যানেলের জন্য প্রযোজ্য সর্বশেষ শর্ত দেখে নিন।
ইউটিউব মনিটাইজেশন পাওয়ার উপায়: শর্তগুলো ভেঙে বোঝা
বৈধ ওয়াচ টাইম: শুধু পাবলিক ভিডিওর দেখার সময় গণনায় আসে। আনলিস্টেড, প্রাইভেট বা মুছে ফেলা ভিডিওর সময় গণনা হয় না। শর্টসের দেখার সময়ও লম্বা ভিডিওর ওয়াচ টাইমের হিসাবে ধরা হয় না, শর্টসের জন্য আলাদা হিসাব।
বিজ্ঞাপন
বৈধ ভিউ ও সাবস্ক্রাইবার: কেনা, বিনিময় করা বা স্বয়ংক্রিয় উপায়ে বাড়ানো ভিউ ও সাবস্ক্রাইবার ইউটিউব শনাক্ত করে বাদ দেয়। সাব ফর সাব জাতীয় বিনিময় গ্রুপে যুক্ত হলে বরং ক্ষতি হয়।
নীতিমালা মেনে চলা: সম্প্রদায়ের নির্দেশিকা, কপিরাইট নীতি, বিজ্ঞাপনদাতাবান্ধব কনটেন্টের নির্দেশিকা এবং চ্যানেল মনিটাইজেশন নীতিমালা, সবগুলো মানতে হয়।
বসবাসের দেশ: যেসব দেশে পার্টনার প্রোগ্রাম চালু, সেখানে থাকতে হয়। বাংলাদেশ এই তালিকায় আছে।
বয়স: অ্যাডসেন্স অ্যাকাউন্টের মালিককে আঠারো বছর বা তার বেশি বয়সী হতে হয়। কম বয়সী ক্রিয়েটর অভিভাবকের অ্যাডসেন্স অ্যাকাউন্ট যুক্ত করতে পারেন।
বিজ্ঞাপন
আবেদনের ধাপ
১. স্টুডিওর আয় অংশ: ইউটিউব স্টুডিও খুলে আয় বা আর্ন নামের অংশে যান। সেখানে আপনার চ্যানেল কতটা শর্ত পূরণ করেছে, তার অগ্রগতি দেখা যায়।
২. শর্তাবলিতে সম্মতি: যোগ্য হলে আবেদন শুরু করার বোতাম আসে। পার্টনার প্রোগ্রামের মূল শর্তাবলি পড়ে সম্মতি দিন।
৩. অ্যাডসেন্স যুক্ত করুন: নতুন অ্যাডসেন্স অ্যাকাউন্ট খুলুন অথবা আগের অ্যাকাউন্ট যুক্ত করুন। একজন মানুষের একটিই অ্যাডসেন্স অ্যাকাউন্ট থাকতে পারে, একাধিক চ্যানেল সেই একটিতেই যুক্ত হয়। নাম ও ঠিকানা যেন জাতীয় পরিচয়পত্র ও ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে মেলে।
বিজ্ঞাপন
৪. পর্যালোচনার অপেক্ষা: আবেদন জমার পর ইউটিউবের পর্যালোচকেরা চ্যানেলের মূল বিষয়, সবচেয়ে বেশি দেখা ভিডিও, সাম্প্রতিক ভিডিও ও চ্যানেলের বিবরণ দেখে সিদ্ধান্ত নেন। সাধারণত এক মাসের মতো সময় লাগে, কখনো বেশি।
৫. বিজ্ঞাপনের ধরন বেছে নিন: অনুমোদন পেলে স্টুডিওতে কোন ধরনের বিজ্ঞাপন দেখাবেন, তা নির্ধারণ করুন এবং প্রতিটি ভিডিওতে মনিটাইজেশন চালু আছে কি না দেখে নিন।
কেন আবেদন বাতিল হয়
সবচেয়ে বেশি বাতিল হয় পুনর্ব্যবহৃত কনটেন্টের কারণে। অন্যের ভিডিও, সিনেমা বা টিভির অংশ, অন্যদের ছবি জোড়া দিয়ে বানানো স্লাইডশো, যেখানে আপনার নিজস্ব মূল্য সংযোজন নেই, এমন চ্যানেল সাধারণত অনুমোদন পায় না। একই ধাঁচের স্বয়ংক্রিয় বা প্রায় একই রকম ভিডিও একের পর এক দেওয়াও সমস্যা তৈরি করে।
বিজ্ঞাপন
অন্যান্য কারণের মধ্যে আছে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর শিরোনাম ও থাম্বনেইল, অনুমতিহীন গান ব্যবহার এবং প্রাপ্তবয়স্ক বা সহিংস কনটেন্ট। বাতিল হলে সাধারণত নির্দিষ্ট সময় পর আবার আবেদন করা যায়। এর মধ্যে সমস্যাযুক্ত ভিডিও সরিয়ে বা সংশোধন করে চ্যানেলের মান বাড়ান।
ইউটিউব নগদীকরণের নিয়ম: আয়ের উৎস শুধু বিজ্ঞাপন নয়
পার্টনার প্রোগ্রামে যুক্ত হলে বিজ্ঞাপনের আয়ের বাইরেও কয়েকটি পথ খোলে, শর্ত পূরণ সাপেক্ষে।
১. ভিডিও ও শর্টসের বিজ্ঞাপন: লম্বা ভিডিওর আগে, মাঝে ও পাশে বিজ্ঞাপন, আর শর্টস ফিডের বিজ্ঞাপন আয়ের ভাগ।
বিজ্ঞাপন
২. চ্যানেল মেম্বারশিপ: দর্শকেরা মাসিক অর্থ দিয়ে বিশেষ সুবিধাসহ সদস্য হন।
৩. সুপার চ্যাট ও সুপার থ্যাংকস: লাইভ বা সাধারণ ভিডিওতে দর্শকের দেওয়া আর্থিক সমর্থন।
৪. প্রিমিয়াম আয়: ইউটিউবের সাবস্ক্রিপশন সেবার গ্রাহকেরা আপনার ভিডিও দেখলে তার একটি অংশ।
ইউটিউব পে নিয়ম: টাকা দেশে আসে যেভাবে
বিজ্ঞাপন
আয় জমা হয় অ্যাডসেন্স অ্যাকাউন্টে। প্রথমে আয় একটি নির্দিষ্ট অঙ্কে পৌঁছালে ঠিকানা যাচাইয়ের জন্য ডাকযোগে একটি পিন পাঠানো হয়। পিনটি অ্যাকাউন্টে বসিয়ে ঠিকানা নিশ্চিত করতে হয়। তাই ঠিকানা পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল দিন। ডাকে না এলে নির্দিষ্ট সময় পর আবার পিন চাওয়া বা বিকল্প যাচাইয়ের সুযোগ থাকে।
এরপর কর-সংক্রান্ত তথ্য জমা দিতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের দর্শকদের কাছ থেকে আসা আয়ের ওপর প্রযোজ্য করের জন্য নির্ধারিত ফরম পূরণ করতে হয়, না করলে বেশি হারে কর কেটে রাখা হতে পারে। পেমেন্ট পেতে অ্যাডসেন্সে নিজের ব্যাংক হিসাবের তথ্য দিন। মোট আয় নির্ধারিত সর্বনিম্ন সীমা পার হলে, প্রচলিত নিয়মে একশ মার্কিন ডলার, পরের মাসের নির্ধারিত সময়ে টাকা ব্যাংকে পাঠানো হয়। বিদেশি মুদ্রা গ্রহণ নিয়ে ব্যাংকের কোনো কাগজ লাগলে আগে থেকে নিজের ব্যাংকের শাখায় কথা বলে রাখুন।
মনিটাইজেশন পাওয়ার পর সাবধানতা
অনুমোদন পাওয়ার পরও নীতিমালা ভাঙলে মনিটাইজেশন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কপিরাইট দাবি এলে সেই ভিডিওর আয় দাবিদারের কাছে যেতে পারে। নিজের ক্লিকে নিজের বিজ্ঞাপন দেখা বা বন্ধুদের দিয়ে বিজ্ঞাপনে ক্লিক করানো অবৈধ কার্যক্রম, এতে অ্যাডসেন্স অ্যাকাউন্ট স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়।
বিজ্ঞাপন
চ্যানেল নিরাপদ রাখাও জরুরি। ভিডিও সম্পাদনার সফটওয়্যার, স্পনসরশিপ বা কপিরাইট নোটিশের নামে আসা ইমেইলের সংযুক্ত ফাইল না যাচাই করে খুলবেন না। এভাবেই অনেক মনিটাইজড চ্যানেল হ্যাক হয়। অ্যাকাউন্টে দুই ধাপের যাচাই সব সময় চালু রাখুন এবং চ্যানেলে অন্য কাউকে কাজ করতে দিতে হলে নিজের পাসওয়ার্ড না দিয়ে স্টুডিওর অনুমতি অংশ থেকে সীমিত ভূমিকায় যুক্ত করুন।
আয় একবার শুরু হলে বিশ্লেষণ অংশে নিয়মিত চোখ রাখুন। কোন ভিডিও বেশি দেখা হচ্ছে, দর্শক কতক্ষণ থাকছেন, কোন দেশ থেকে আসছেন, এসব তথ্য দেখে পরের ভিডিওর পরিকল্পনা করলে আয় ও দর্শক দুটোই বাড়ে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
চার হাজার ঘণ্টা পূরণে কত দিন লাগে?
বিজ্ঞাপন
নির্দিষ্ট সময় নেই। বিষয়, ভিডিওর মান ও নিয়মিত আপলোডের ওপর নির্ভর করে কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর লাগতে পারে।
শর্টস দিয়ে কি মনিটাইজেশন পাওয়া যায়?
হ্যাঁ, এক হাজার সাবস্ক্রাইবার ও নব্বই দিনে এক কোটি বৈধ শর্টস ভিউ পূরণ করলে আবেদন করা যায়।
প্রতি এক হাজার ভিউতে কত টাকা আসে?
বিজ্ঞাপন
কোনো নির্দিষ্ট হার নেই। দর্শকের দেশ, বিষয়, বিজ্ঞাপনদাতার চাহিদা ও মৌসুমভেদে আয় অনেক ওঠানামা করে।
একটি অ্যাডসেন্সে কি একাধিক চ্যানেল যুক্ত করা যায়?
হ্যাঁ, একজনের একটি অ্যাডসেন্স অ্যাকাউন্টে একাধিক চ্যানেল যুক্ত করা যায়, তবে প্রতিটি চ্যানেলকে আলাদাভাবে শর্ত পূরণ করতে হয়।