উচ্চতা বাড়ানোর উপায়: খাবার, ঘুম আর ব্যায়ামের ভূমিকা কতটা
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
ক্লাসে সবার পেছনের সারিতে দাঁড়াতে হয় না সামনের সারিতে, এ নিয়ে কিশোর-কিশোরীদের মনে চাপা দুশ্চিন্তা থাকে। মা-বাবারাও সন্তানের উচ্চতা নিয়ে চিন্তিত হন, আর সেই সুযোগে বাজারে বিক্রি হয় 'লম্বা হওয়ার' পাউডার, ক্যাপসুল আর নানা যন্ত্র। তাই শুরুতেই বাস্তব চিত্রটা জানা দরকার।
বিজ্ঞাপন
একজন মানুষ কতটা লম্বা হবেন, তার বেশির ভাগই ঠিক হয় বংশগতভাবে, মা-বাবার জিন থেকে। বাকি অংশে প্রভাব ফেলে শৈশব ও কৈশোরের পুষ্টি, ঘুম, শারীরিক সক্রিয়তা ও সার্বিক স্বাস্থ্য। হাড়ের দুই প্রান্তে থাকা বৃদ্ধির অংশ বা গ্রোথ প্লেট বয়ঃসন্ধির শেষে বন্ধ হয়ে যায়। মেয়েদের ক্ষেত্রে সাধারণত ১৪ থেকে ১৬ বছর এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে ১৬ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে উচ্চতা বৃদ্ধি প্রায় থেমে যায়। এরপর খাবার, ব্যায়াম বা ওষুধে আর লম্বা হওয়া যায় না।
অর্থাৎ শিশু ও কিশোর বয়সে সঠিক যত্ন নিলে তাদের জিনগত সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগানো যায়। আর বড়রা ভঙ্গি ঠিক রেখে নিজের উচ্চতাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেন। নিচে বিস্তারিত।
উচ্চতা কীভাবে বাড়ে
জন্মের পর প্রথম দুই বছর শিশু সবচেয়ে দ্রুত লম্বা হয়। এরপর শৈশবে বছরে মোটামুটি স্থির গতিতে বাড়ে। বয়ঃসন্ধিতে আবার হঠাৎ দ্রুত বৃদ্ধির একটি পর্ব আসে, যাকে গ্রোথ স্পার্ট বলা হয়। মেয়েদের এই পর্ব সাধারণত ছেলেদের চেয়ে দুই বছর আগে শুরু হয়, তাই ১১-১২ বছর বয়সে অনেক মেয়ে সমবয়সী ছেলেদের চেয়ে লম্বা থাকে, পরে ছেলেরা এগিয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
শিশুর উচ্চতা নিয়মিত মাপুন, বছরে অন্তত দুবার। একই দেয়ালে, জুতা ছাড়া, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মাপ নিয়ে তারিখসহ লিখে রাখুন। এক বছরে কতটা বাড়ল, সেটাই আসল সূচক। শিশু সমবয়সীদের তুলনায় অনেক খাটো হলেও বছরে নিয়মিত বাড়তে থাকলে সাধারণত দুশ্চিন্তার কিছু নেই।
কী খেলে লম্বা হওয়া যায়
কোনো একটি খাবার উচ্চতা বাড়ায় না। তবে অপুষ্টি বৃদ্ধি থামিয়ে দিতে পারে। আমাদের দেশে খর্বকায় শিশুর একটি বড় কারণই দীর্ঘদিনের অপুষ্টি ও বারবার সংক্রমণ। বৃদ্ধির বয়সে যেসব পুষ্টি উপাদান বিশেষভাবে দরকার:
১. প্রোটিন: হাড় ও পেশি গড়তে প্রোটিন লাগে। ডিম, মাছ, মুরগি, ডাল, দুধ ও দই প্রতিদিনের খাবারে রাখুন। দিনে অন্তত একটি ডিম শিশু-কিশোরের জন্য সহজ ও সাশ্রয়ী উৎস।
বিজ্ঞাপন
২. ক্যালসিয়াম: দুধ, দই, পনির, কাঁটাসহ খাওয়া যায় এমন ছোট মাছ (মলা, ঢেলা, কাচকি), সবুজ শাক ও তিল হাড়ের জন্য জরুরি।
৩. ভিটামিন ডি: ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে। সকালের রোদে কিছুক্ষণ খেলাধুলা, ডিমের কুসুম ও তৈলাক্ত মাছ এর উৎস।
৪. আয়রন ও জিংক: কলিজা, মাংস, ডাল, শাক, বাদাম ও বীজে পাওয়া যায়। এগুলোর ঘাটতি বৃদ্ধি ধীর করে দিতে পারে।
৫. শাকসবজি ও ফল: ভিটামিন ও খনিজের জোগান দেয়।
বিজ্ঞাপন
শিশুকে চিপস, কোমল পানীয় আর ফাস্টফুডে পেট ভরাতে দেবেন না, এতে আসল পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার জায়গা থাকে না। বড়দের ক্ষেত্রে এসব খাবার উচ্চতা বাড়াবে না, তবে হাড় মজবুত রাখবে।
ঘুমের ভূমিকা
বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় গ্রোথ হরমোনের বড় অংশ নিঃসৃত হয় গভীর ঘুমের সময়। তাই বৃদ্ধির বয়সে পর্যাপ্ত ঘুম জরুরি। স্কুলপড়ুয়া শিশুদের রাতে সাধারণত নয় থেকে বারো ঘণ্টা এবং কিশোরদের আট থেকে দশ ঘণ্টা ঘুম দরকার।
রাত জেগে মোবাইল বা ভিডিও গেম খেলার অভ্যাস ঘুম কমিয়ে দেয়। ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে স্ক্রিন বন্ধ রাখার নিয়ম করুন এবং প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
বিজ্ঞাপন
লম্বা হওয়ার ব্যায়াম: সত্যি কতটা কাজ করে
ঝুলে থাকা, দড়িলাফ, সাঁতার বা বাস্কেটবল খেললে লম্বা হওয়া যায়, এমন কথা খুব প্রচলিত। বাস্তবে কোনো ব্যায়াম হাড়কে লম্বা করে না, আর বাস্কেটবল খেলোয়াড়েরা লম্বা হন কারণ লম্বারাই সেই খেলায় বেশি সুযোগ পান।
তবে বৃদ্ধির বয়সে খেলাধুলা ও ব্যায়ামের অনেক উপকার আছে। দৌড়ানো, লাফানো, সাইকেল চালানো, সাঁতার ও দলগত খেলা হাড়কে ঘন ও মজবুত করে, পেশি গড়ে, ক্ষুধা ও ঘুম ভালো করে এবং অতিরিক্ত ওজন ঠেকায়। এর সবই সুস্থ বৃদ্ধির জন্য সহায়ক। শিশু-কিশোরদের প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা সক্রিয় খেলাধুলা করা উচিত।
হালকা ওজন নিয়ে বয়স উপযোগী ব্যায়াম উচ্চতা কমিয়ে দেয়, এই ধারণার পক্ষে প্রমাণ নেই। তবে কিশোর বয়সে ভারী ওজন তোলার ব্যায়াম প্রশিক্ষকের তত্ত্বাবধানে সঠিক ভঙ্গিতে করতে হবে, যাতে চোট না লাগে।
বিজ্ঞাপন
বড়দের জন্য: ভঙ্গি ঠিক রেখে লম্বা দেখানো
গ্রোথ প্লেট বন্ধ হওয়ার পর আর উচ্চতা বাড়ে না, কিন্তু কুঁজো হয়ে বসা-দাঁড়ানোর কারণে অনেকে নিজের প্রকৃত উচ্চতার চেয়ে খাটো দেখান। ভঙ্গি ঠিক করলে লম্বা ও আত্মবিশ্বাসী দেখায়।
দাঁড়ানোর ভঙ্গি: কাঁধ পেছনে ও নিচে, চিবুক মাটির সমান্তরাল, পেট হালকা ভেতরে, শরীরের ভার দুই পায়ে সমানভাবে।
বসার ভঙ্গি: কম্পিউটার বা মোবাইল চোখের সমান উচ্চতায় রাখুন, পিঠ চেয়ারে ঠেকিয়ে বসুন। দীর্ঘক্ষণ মাথা নিচু করে মোবাইল দেখা ঘাড় ও পিঠকে সামনে ঝুঁকিয়ে দেয়।
বিজ্ঞাপন
সহায়ক ব্যায়াম: প্ল্যাংক, পিঠের পেশি শক্ত করার ব্যায়াম, বুক টানটান করার স্ট্রেচ এবং ইয়োগার কিছু ভঙ্গি পিঠ সোজা রাখতে সাহায্য করে।
পোশাকেও কিছু কৌশল আছে। এক রঙের বা কাছাকাছি রঙের পোশাক, লম্বালম্বি দাগের কাপড় এবং ঠিক মাপের প্যান্ট শরীরকে লম্বা দেখায়।
ওষুধ ও বিজ্ঞাপন থেকে সাবধান, কখন চিকিৎসক দেখাবেন
'লম্বা হওয়ার ওষুধ', হারবাল পাউডার বা শরীর টানার যন্ত্র বড়দের উচ্চতা বাড়াতে পারে না। কিছু পণ্যে অজানা হরমোন বা ক্ষতিকর উপাদান থাকতে পারে। গ্রোথ হরমোন একটি চিকিৎসা, যা শুধু নির্দিষ্ট রোগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পরীক্ষা করে দেন, নিজে থেকে নেওয়ার জিনিস নয়।
বিজ্ঞাপন
শিশুর ক্ষেত্রে চিকিৎসক দেখান যদি সে সমবয়সীদের তুলনায় অনেক বেশি খাটো হয়, এক বছরে খুব কম বাড়ে বা বৃদ্ধি থেমে যায়, মা-বাবার উচ্চতার তুলনায় অস্বাভাবিক খাটো হয়, অনেক আগে বা অনেক দেরিতে বয়ঃসন্ধির লক্ষণ দেখা দেয়, অথবা সঙ্গে ক্লান্তি, ঘন ঘন পেটের সমস্যা বা ওজন না বাড়ার মতো উপসর্গ থাকে। থাইরয়েড, গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি বা অন্ত্রের রোগের মতো কারণ সময়মতো ধরা পড়লে চিকিৎসায় ভালো ফল মেলে। শিশু বিশেষজ্ঞ প্রয়োজনে হাতের এক্স-রে করে হাড়ের বয়স দেখে বৃদ্ধির সম্ভাবনা বোঝেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
২০ বছর বয়সের পর কি লম্বা হওয়া যায়?
সাধারণত না। বেশির ভাগ মানুষের গ্রোথ প্লেট এর আগেই বন্ধ হয়ে যায়। তবে ভঙ্গি ঠিক করলে কিছুটা লম্বা দেখানো সম্ভব।
বিজ্ঞাপন
দুধ খেলে কি লম্বা হওয়া যায়?
দুধ প্রোটিন ও ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস, বৃদ্ধির বয়সে সুষম খাবারের অংশ হিসেবে উপকারী। কিন্তু শুধু দুধ খেলে জিনগত সীমার বেশি লম্বা হওয়া যায় না।
মা-বাবা খাটো হলে কি সন্তানও খাটো হবে?
সন্তানের উচ্চতা মা-বাবার উচ্চতার কাছাকাছি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে ভালো পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের কারণে অনেক সময় সন্তান মা-বাবার চেয়ে কিছুটা লম্বা হয়।
বিজ্ঞাপন
ঝুলে থাকলে কি উচ্চতা বাড়ে?
না। ঝুলে থাকলে মেরুদণ্ড সাময়িক সামান্য প্রসারিত হয়, কিছুক্ষণ পরই আগের অবস্থায় ফিরে আসে। এটি কাঁধ ও হাতের পেশির জন্য ভালো ব্যায়াম, উচ্চতা বাড়ানোর উপায় নয়।