কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার উপায়: খাবার, পানি আর অভ্যাসে পরিবর্তন
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
সকালে টয়লেটে অনেকক্ষণ বসে থাকা, জোর দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া, তারপরও পেট পরিষ্কার না হওয়ার অস্বস্তি নিয়ে সারা দিন কাটানো। কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ে অনেকে খোলাখুলি কথা বলতে লজ্জা পান, অথচ এটি খুবই সাধারণ সমস্যা, বিশেষ করে বয়স্ক, অন্তঃসত্ত্বা নারী আর যাঁরা দিনের বেশির ভাগ সময় বসে কাজ করেন তাঁদের মধ্যে।
বিজ্ঞাপন
বেশির ভাগ কোষ্ঠকাঠিন্যের পেছনে থাকে তিনটি কারণ: খাবারে আঁশের অভাব, কম পানি পান আর নড়াচড়া কম। তাই কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার প্রথম উপায়ও এই তিন জায়গায় পরিবর্তন আনা। শাকসবজি, ফল, ডাল ও লাল চাল-আটার খাবার বাড়ানো, দিনে আট-দশ গ্লাস পানি পান, প্রতিদিন আধা ঘণ্টা হাঁটা এবং টয়লেটের বেগ এলে চেপে না রাখা। এতে কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অনেকেরই পায়খানা নিয়মিত হয়।
খাবারে যথেষ্ট আঁশ না পেলে ইসবগুলের ভুসি সহায়ক হতে পারে, তবে খাওয়ার ভুল নিয়মে উল্টো সমস্যা হয়। নিচে বিস্তারিত বলা হলো।
কখন একে কোষ্ঠকাঠিন্য বলা হয়
প্রতিদিন পায়খানা না হলেই কোষ্ঠকাঠিন্য, এমন নয়। কারও দিনে দুবার, কারও দুই দিনে একবার পায়খানা হয়, দুটোই স্বাভাবিক হতে পারে। সাধারণত সপ্তাহে তিনবারের কম পায়খানা হলে, মল শক্ত ও দলা দলা হলে, অনেক জোর দিতে হলে বা পেট পুরো পরিষ্কার না হওয়ার অনুভূতি থাকলে তাকে কোষ্ঠকাঠিন্য বলা হয়।
বিজ্ঞাপন
কোষ্ঠকাঠিন্যের সাধারণ কারণ
১. আঁশের অভাব: সাদা ভাত, ময়দার রুটি, বিস্কুট, ফাস্টফুড বেশি আর সবজি-ফল কম খেলে মল শক্ত হয়।
২. কম পানি পান: গরমে ঘাম বেশি হলে বা সারা দিন অফিসে পানি কম খেলে অন্ত্র মল থেকে পানি শুষে নেয়।
৩. বসে থাকা জীবন: নড়াচড়া কম হলে অন্ত্রের স্বাভাবিক গতিও ধীর হয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
৪. বেগ চেপে রাখা: অফিস, স্কুল বা ভ্রমণে টয়লেট এড়িয়ে চললে ধীরে ধীরে বেগ আসার সংকেত দুর্বল হয়ে যায়।
৫. কিছু ওষুধ: আয়রন ট্যাবলেট, কিছু ব্যথানাশক, অ্যান্টাসিড, রক্তচাপ ও মানসিক রোগের কিছু ওষুধ কোষ্ঠকাঠিন্য ঘটাতে পারে। ওষুধ বন্ধ না করে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।
৬. গর্ভাবস্থা ও অন্যান্য অবস্থা: গর্ভাবস্থার হরমোন, থাইরয়েড হরমোন কম থাকা, ডায়াবেটিস ও খিটখিটে অন্ত্রের সমস্যাতেও কোষ্ঠকাঠিন্য হয়।
কী খেলে পায়খানা নরম হয়
বিজ্ঞাপন
শাকসবজি: প্রতিদিন দুই বেলা ভাতের থালার অর্ধেকটা সবজি দিয়ে ভরানোর চেষ্টা করুন। পুঁইশাক, লালশাক, ঢেঁড়স, পেঁপে, লাউ, মিষ্টিকুমড়া, শিম ও বরবটি সহজলভ্য আঁশের উৎস।
ফল: পাকা পেঁপে, পেয়ারা, পাকা বেল, আপেল খোসাসহ, নাশপাতি, কমলা ও শুকনো আলুবোখারা অন্ত্রের জন্য উপকারী। দিনে অন্তত দুটি ফল খান। জুসের চেয়ে আস্ত ফল ভালো, কারণ জুসে আঁশ থাকে না।
ডাল ও শস্য: মসুর, মুগ, ছোলা ও রাজমা আঁশসমৃদ্ধ। সাদা চালের বদলে মাঝেমধ্যে লাল চাল আর ময়দার বদলে লাল আটার রুটি খান। সকালে ওটস বা চিড়াও ভালো বিকল্প।
পানি: আঁশ কাজ করে পানি টেনে নিয়ে। তাই আঁশ বাড়ালে পানিও বাড়াতে হবে, নইলে উল্টো পেট ফেঁপে কোষ্ঠকাঠিন্য বাড়তে পারে। দিনে মোটামুটি দুই থেকে আড়াই লিটার পানি পান করুন, গরমে আরও বেশি। কিডনি বা হৃদরোগের কারণে পানি সীমিত রাখতে বলা হলে চিকিৎসকের নির্দেশনা মানুন।
বিজ্ঞাপন
আঁশ হঠাৎ অনেক না বাড়িয়ে এক-দুই সপ্তাহ ধরে ধীরে বাড়ান, তাহলে গ্যাস ও পেট ফাঁপা কম হবে।
ইসবগুলের ভুসি খাওয়ার নিয়ম
ইসবগুলের ভুসি পানিতে ফুলে জেলের মতো হয়ে মলকে নরম ও ভারী করে, ফলে সহজে বের হয়। খাদ্য আঁশের এটি একটি ভালো সম্পূরক।
১. পরিমাণ: বড়দের ক্ষেত্রে সাধারণত এক থেকে দুই চা-চামচ ভুসি দিয়ে শুরু করা হয়। প্যাকেটের নির্দেশনা দেখে নিন।
বিজ্ঞাপন
২. পানি: এক গ্লাস (২০০-২৫০ মিলিলিটার) পানিতে ভুসি মিশিয়ে সঙ্গে সঙ্গে পান করুন, জমে যাওয়ার আগে। এরপর আরও এক গ্লাস পানি পান করুন।
৩. শুকনো নয়: শুকনো ভুসি মুখে দিয়ে পানি খাওয়া বা কম পানিতে খাওয়া বিপজ্জনক, এটি গলা বা অন্ত্রে আটকে যেতে পারে।
৪. সময়: রাতে খাওয়ার পর বা সকালে খাওয়া যায়। শোয়ার ঠিক আগে না খেয়ে কিছুক্ষণ আগে খান।
৫. ওষুধের সঙ্গে ব্যবধান: অন্য ওষুধ খেলে ইসবগুলের সঙ্গে অন্তত দুই ঘণ্টার ব্যবধান রাখুন, কারণ এটি ওষুধের শোষণ কমাতে পারে।
বিজ্ঞাপন
ফল পেতে দুই-তিন দিন লাগতে পারে। প্রথম দিকে পেট ফাঁপা লাগা স্বাভাবিক। ঢোক গিলতে সমস্যা আছে এমন মানুষ, অন্ত্রে বাধা বা আগে অন্ত্রের অস্ত্রোপচার হয়েছে এমন রোগী এবং শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ইসবগুল দেবেন না।
অভ্যাসে যে পরিবর্তন জরুরি
নির্দিষ্ট সময়: খাওয়ার পর অন্ত্র স্বাভাবিকভাবে বেশি সক্রিয় হয়। তাই সকালের নাশতার পর দশ-পনেরো মিনিট টয়লেটে বসার অভ্যাস করুন, তাড়াহুড়া না করে।
বসার ভঙ্গি: কমোড ব্যবহার করলে পায়ের নিচে একটি ছোট টুল বা পিঁড়ি রাখুন, যাতে হাঁটু নিতম্বের চেয়ে একটু উঁচু থাকে। এই ভঙ্গিতে মল বের হওয়া সহজ হয়। প্যান বা দেশি টয়লেটে স্বাভাবিকভাবেই এই ভঙ্গি তৈরি হয়।
বিজ্ঞাপন
বেগ চেপে রাখবেন না: বেগ এলে যত দ্রুত সম্ভব টয়লেটে যান।
হাঁটা ও ব্যায়াম: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটুন। দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করলে প্রতি ঘণ্টায় একবার উঠে কয়েক মিনিট হাঁটুন।
টয়লেটে মোবাইল নয়: অনেকক্ষণ বসে জোর দিলে পাইলস ও ফিশারের ঝুঁকি বাড়ে।
নিজে থেকে নিয়মিত জোলাপ বা পায়খানা নরম করার ওষুধ খাওয়া ঠিক নয়। কিছু জোলাপ দীর্ঘদিন খেলে অন্ত্র এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শে স্বল্প সময়ের জন্য ব্যবহার করুন।
বিজ্ঞাপন
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
মলের সঙ্গে রক্ত বা কালো আলকাতরার মতো মল, কারণ ছাড়া ওজন কমে যাওয়া, পঞ্চাশ বছরের পর হঠাৎ পায়খানার অভ্যাস বদলে যাওয়া, তীব্র পেট ব্যথা ও পেট ফুলে যাওয়ার সঙ্গে বমি এবং বায়ু বের না হওয়া, পরিবারে অন্ত্রের ক্যানসারের ইতিহাস থাকা, কিংবা তিন সপ্তাহের বেশি খাবার ও অভ্যাস বদলেও উন্নতি না হলে দেরি না করে চিকিৎসক দেখান।
শিশুর ক্ষেত্রে জন্মের পর থেকেই কোষ্ঠকাঠিন্য, পেট ফুলে থাকা, বমি বা ওজন না বাড়লে শিশু বিশেষজ্ঞ দেখাতে হবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
সকালে খালি পেটে গরম পানি খেলে কি কোষ্ঠকাঠিন্য কমে?
সকালে এক-দুই গ্লাস পানি পান করলে অনেকের অন্ত্র সক্রিয় হয় এবং বেগ আসে। পানি গরম না সাধারণ, তাতে বড় পার্থক্য নেই, যেটা আরামদায়ক সেটাই খান।
পাকা কলা খেলে কি কোষ্ঠকাঠিন্য বাড়ে?
পাকা কলা সাধারণত পায়খানা নরম করতে সহায়ক। কাঁচা বা আধাপাকা কলা কারও কারও কোষ্ঠকাঠিন্য বাড়াতে পারে।
বিজ্ঞাপন
গর্ভাবস্থায় কোষ্ঠকাঠিন্য হলে কী করব?
আঁশযুক্ত খাবার, পর্যাপ্ত পানি ও হালকা হাঁটা প্রথম উপায়। আয়রন ট্যাবলেটের কারণে হলে বন্ধ না করে চিকিৎসককে জানান। কোনো জোলাপ বা ভুসি শুরুর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
প্রতিদিন ইসবগুল খাওয়া কি নিরাপদ?
পর্যাপ্ত পানির সঙ্গে নিয়ম মেনে খেলে অনেকের জন্য দীর্ঘদিন খাওয়া নিরাপদ। তবে খাবারে আঁশ বাড়ানোই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত, আর দীর্ঘদিন প্রয়োজন হলে একবার চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে নিন।