কাচ্চি বিরিয়ানি রেসিপি: ঘরেই দোকানের স্বাদের কাচ্চি রান্না
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
পুরান ঢাকার গলি থেকে শুরু করে বিয়েবাড়ির ভোজ, কাচ্চি বিরিয়ানি বাঙালির উৎসবের খাবারের তালিকায় সবার ওপরে। দোকানে খেতে যত সহজ, ঘরে রান্না করতে অনেকেই ততটা ভয় পান। কারণ কাচ্চিতে মাংস আলাদা রান্না হয় না, কাঁচা মাংসের ওপর চাল দিয়ে একসঙ্গে দমে রান্না হয়। ঠিকমতো না হলে মাংস শক্ত থেকে যায় অথবা চাল গলে যায়।
বিজ্ঞাপন
ভালো কাচ্চির জন্য চারটি বিষয় ঠিক রাখতে হয়: কচি খাসির মাংস, দীর্ঘ সময় মেরিনেট, চাল ঠিক মাপে আধা সেদ্ধ করা আর ভারী তলার হাঁড়িতে মুখ আটকে খুব অল্প আঁচে দীর্ঘ দম। মাংস যেহেতু চালের নিচে ভাপে সেদ্ধ হয়, তাই দমের সময় কমানো যাবে না। এই নিয়মগুলো মানলে ঘরেও দোকানের মতো সুগন্ধি, ঝরঝরে কাচ্চি রান্না সম্ভব।
নিচে এক কেজি খাসির মাংসের জন্য পূর্ণ রেসিপি দেওয়া হলো, যাতে সাত-আট জন খেতে পারবেন।
উপকরণ (৭-৮ জনের জন্য)
মাংস মেরিনেটের জন্য: কচি খাসির মাংস এক কেজি (বড় টুকরা), টক দই এক কাপ, আদা বাটা দুই টেবিল চামচ, রসুন বাটা এক টেবিল চামচ, কাঁচা পেঁপে বাটা দুই টেবিল চামচ, মরিচ গুঁড়া এক চা-চামচ, কাচ্চির মসলা দেড় টেবিল চামচ, লবণ দুই চা-চামচ, চিনি এক টেবিল চামচ, বেরেস্তা এক কাপ, ঘি সিকি কাপ, কাঁচা মরিচ আট-দশটি, আলুবোখারা আট-দশটি।
বিজ্ঞাপন
চালের জন্য: পোলাওয়ের চাল বা বাসমতী চাল আধা কেজি (মোটামুটি আড়াই কাপ), পানি তিন-চার লিটার, লবণ দুই টেবিল চামচ, এলাচ চারটি, দারুচিনি দুই টুকরা, তেজপাতা দুটি।
অন্যান্য: বড় আলু চারটি (অর্ধেক করে কাটা), সয়াবিন তেল আধা কাপ, ঘি আরও সিকি কাপ, বেরেস্তা আরও আধা কাপ, গরম দুধ সিকি কাপ, এক চিমটি জাফরান বা কয়েক ফোঁটা জর্দার রং, কেওড়া জল এক টেবিল চামচ, গোলাপ জল এক টেবিল চামচ, হাঁড়ির মুখ আটকানোর জন্য এক কাপ আটার খামির।
বেরেস্তার জন্য পাঁচ-ছয়টি বড় পেঁয়াজ পাতলা করে কেটে তেলে লালচে করে ভেজে নিন। এই তেলই পরে রান্নায় ব্যবহার করুন, এতে স্বাদ বাড়ে।
কাচ্চি বিরিয়ানির মসলা ঘরে তৈরি
বিজ্ঞাপন
বাজারের প্যাকেট মসলা ব্যবহার করা যায়, তবে ঘরে তৈরি মসলার ঘ্রাণ আলাদা। অল্প আঁচে শুকনো কড়াইয়ে নিচের উপকরণগুলো এক-দুই মিনিট টেলে ঠান্ডা করে মিহি গুঁড়া করুন:
১. জায়ফল ও জয়ত্রী: অর্ধেক জায়ফল ও এক চা-চামচ জয়ত্রী।
২. শাহি জিরা: এক চা-চামচ।
৩. এলাচ ও দারুচিনি: আট-দশটি সবুজ এলাচ, তিন টুকরা দারুচিনি।
বিজ্ঞাপন
৪. লবঙ্গ ও গোলমরিচ: ছয়টি লবঙ্গ, এক চা-চামচ গোলমরিচ।
৫. কাবাবচিনি: পাঁচ-ছয়টি (ঐচ্ছিক)।
এই পরিমাণ থেকে দেড় টেবিল চামচ মেরিনেটে ব্যবহার করুন, বাকিটা বায়ুরোধী বয়ামে রেখে দিন। জায়ফল বেশি দিলে তেতো লাগে, তাই পরিমাণ বাড়াবেন না।
মাংস মেরিনেট করার নিয়ম
বিজ্ঞাপন
মাংস ধুয়ে ঝাঁঝরিতে রেখে পানি একদম ঝরিয়ে নিন। বড় একটি পাত্রে মেরিনেটের সব উপকরণ, অর্থাৎ দই, আদা-রসুন বাটা, পেঁপে বাটা, মরিচ গুঁড়া, কাচ্চির মসলা, লবণ, চিনি, এক কাপ বেরেস্তা চটকে, সিকি কাপ ঘি, কাঁচা মরিচ ও আলুবোখারা দিয়ে মাংস ভালোভাবে মাখিয়ে নিন।
ঢেকে ফ্রিজে অন্তত চার থেকে ছয় ঘণ্টা রাখুন। আগের রাতে মেরিনেট করতে পারলে সবচেয়ে ভালো, তবে পেঁপে বাটা দিলে বেশি সময় রাখলে মাংস খুব নরম হয়ে ভেঙে যেতে পারে। রাতভর রাখতে চাইলে পেঁপের পরিমাণ এক টেবিল চামচে নামিয়ে আনুন। রান্নার এক ঘণ্টা আগে ফ্রিজ থেকে বের করে রাখুন।
চাল ও আলু প্রস্তুত করা
আলু: খোসা ছাড়ানো অর্ধেক আলুতে অল্প লবণ, হলুদ ও এক ফোঁটা জর্দার রং মাখিয়ে তেলে হালকা সোনালি করে ভেজে নিন। ভেতরে পুরো সেদ্ধ করার দরকার নেই, দমে বাকিটা হয়ে যাবে।
বিজ্ঞাপন
চাল: চাল কয়েকবার ধুয়ে আধা ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন। বড় হাঁড়িতে তিন-চার লিটার পানি ফুটিয়ে লবণ, এলাচ, দারুচিনি ও তেজপাতা দিন। পানি টগবগ করে ফুটলে চাল দিন। চাল প্রায় তিন ভাগের দুই ভাগ সেদ্ধ হলে, অর্থাৎ দানা ভাঙলে ভেতরে সাদা শক্ত অংশ দেখা গেলে, সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁঝরিতে ঢেলে পানি ঝরিয়ে নিন। পানিতে লবণ বেশি মনে হলেও ঠিক আছে, চালে সেটাই লবণের জোগান।
চাল বেশি সেদ্ধ হলে দমে গলে যাবে, আবার কম হলে শক্ত থেকে যাবে। তাই এই ধাপে চুলার পাশে থাকুন।
স্তর সাজানো ও দমে রান্না
১. হাঁড়ির তলা: ভারী তলার বড় ডেকচি বা হাঁড়ির তলায় আধা কাপ বেরেস্তার তেল ছড়িয়ে দিন।
বিজ্ঞাপন
২. মাংসের স্তর: মেরিনেট করা মাংস মসলাসহ তলায় সমান করে বিছিয়ে দিন। মাংসের ওপর ভাজা আলু সাজান।
৩. চালের স্তর: আধা সেদ্ধ চাল আলু ও মাংসের ওপর সমানভাবে ছড়িয়ে দিন, চেপে দেবেন না।
৪. ওপরের সাজ: চালের ওপর বাকি বেরেস্তা, ঘি, জাফরান ভেজানো দুধ, কেওড়া ও গোলাপ জল ছিটিয়ে দিন।
৫. মুখ আটকানো: আটার খামির লম্বা দড়ির মতো করে হাঁড়ির কিনারায় বসিয়ে ঢাকনা চেপে আটকে দিন, যাতে ভাপ বের হতে না পারে।
বিজ্ঞাপন
৬. দমের নিয়ম: প্রথমে মাঝারি থেকে বেশি আঁচে দশ-বারো মিনিট রাখুন, যাতে তলায় মাংসের রস ফুটতে শুরু করে। এরপর চুলার ওপর একটি তাওয়া বসিয়ে তার ওপর হাঁড়ি রাখুন এবং আঁচ একেবারে কমিয়ে দিন। এই অবস্থায় এক ঘণ্টা পনেরো মিনিট থেকে দেড় ঘণ্টা দমে রাখুন।
৭. বিশ্রাম: চুলা বন্ধের পর আরও পনেরো মিনিট মুখ না খুলে রেখে দিন। পরিবেশনের সময় পাশ থেকে বড় চামচ দিয়ে তলা থেকে মাংস ও চাল একসঙ্গে তুলুন, যাতে প্রতিটি প্লেটে সব স্তর থাকে।
কাচ্চি রান্নার টিপস ও সতর্কতা
মাংস কেনা: কচি খাসির মাংস ছাড়া কাচ্চি ভালো হয় না। বয়স্ক খাসি বা গরুর মাংসে কাচ্চি করতে চাইলে আলাদা করে আধা সেদ্ধ করে নিতে হয়, তখন সেটি আর প্রকৃত কাচ্চি থাকে না।
বিজ্ঞাপন
মাংস পুরো সেদ্ধ হয়েছে কি না: কাচ্চিতে কাঁচা মাংস চালের নিচে রান্না হয়, তাই পরিবেশনের আগে বড় একটি টুকরা কেটে দেখুন ভেতরে লালচে রস বা কাঁচা অংশ নেই। কম সেদ্ধ মাংস খাওয়া স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ। প্রয়োজনে মুখ আবার ঢেকে আরও কিছুক্ষণ দমে রাখুন।
হাঁড়ির মাপ: এক কেজি মাংসের জন্য অন্তত আট-দশ লিটারের ভারী হাঁড়ি নিন। ছোট বা পাতলা হাঁড়িতে তলা ধরে যায়।
অনুষ্ঠানের জন্য বেশি রান্না: পরিমাণ দ্বিগুণ করলে দমের সময়ও বাড়াতে হয়। প্রথমবার বড় অনুষ্ঠানের আগে অল্প পরিমাণে একবার রান্না করে হাত পাকিয়ে নিন।
সংরক্ষণ: বেঁচে যাওয়া কাচ্চি ঠান্ডা হলে দুই ঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজে তুলুন এবং এক-দুই দিনের মধ্যে ভালোভাবে গরম করে খান।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
কাচ্চি আর পাক্কি বিরিয়ানির পার্থক্য কী?
কাচ্চিতে কাঁচা মাংস মেরিনেট করে চালের সঙ্গে একসঙ্গে দমে রান্না হয়। পাক্কি বিরিয়ানিতে মাংস আগে আলাদা রান্না করে তারপর চালের সঙ্গে সাজানো হয়।
চিনিগুঁড়া চাল দিয়ে কি কাচ্চি হয়?
বিজ্ঞাপন
হয়, পুরান ঢাকার অনেক দোকানে ছোট দানার সুগন্ধি চালেই কাচ্চি হয়। তবে এই চাল তাড়াতাড়ি সেদ্ধ হয়, তাই আধা সেদ্ধ করার সময় আরও সাবধান থাকুন।
দই কি টক না মিষ্টি হবে?
টক দই ব্যবহার করুন। দই খুব পানসে হলে কাপড়ে বেঁধে কিছুক্ষণ ঝুলিয়ে পানি ঝরিয়ে নিন, নইলে মেরিনেট পাতলা হয়ে চাল গলে যেতে পারে।
তলা পুড়ে গেলে কী করব?
বিজ্ঞাপন
তলার পোড়া অংশ নাড়বেন না, ওপর থেকে সাবধানে তুলে নিন, তাহলে পোড়া গন্ধ কম ছড়াবে। পরেরবার তাওয়ার ওপর হাঁড়ি বসিয়ে আঁচ আরও কমিয়ে দম দিন।