গলা ব্যথা কমানোর ঘরোয়া উপায়: লবণ পানি, মধু আর ভাপের যত্ন
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
ঢোক গিলতে গেলেই কাঁটার মতো লাগে, কথা বলতে কষ্ট, গলার ভেতরটা শুকনো আর জ্বালাপোড়া। গলা ব্যথা এমন এক কষ্ট, যা খুব বড় অসুখ না হলেও পুরো দিনটাই মাটি করে দেয়। ঋতু বদলের সময়, ঠান্ডা পানীয় বা ধুলাবালির পর অথবা সর্দি লাগার শুরুতে এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
বড়দের গলা ব্যথার বেশির ভাগই ভাইরাসের কারণে হয় এবং চার-পাঁচ দিন থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে নিজে থেকে সেরে যায়। এ সময় ঘরোয়া যত্ন সত্যিই আরাম দেয়: দিনে কয়েকবার কুসুম গরম লবণ পানিতে গার্গল, আদা চা বা স্যুপের মতো গরম তরল, এক চামচ মধু, গরম পানির ভাপ আর কণ্ঠকে বিশ্রাম। কিছু গলা ব্যথা অবশ্য ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়, যার জন্য চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ লাগে।
কোন উপায় কীভাবে করবেন, গলা খুসখুস বা কফ জমলে কী করবেন এবং কোন লক্ষণে দেরি করা যাবে না, তা জেনে নিন।
গলা ব্যথা কেন হয়
ভাইরাস সংক্রমণ: সর্দি-কাশি, ফ্লু ইত্যাদির সঙ্গে গলা ব্যথা সবচেয়ে সাধারণ। সঙ্গে নাক দিয়ে পানি পড়া, হাঁচি ও কাশি থাকে।
বিজ্ঞাপন
ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ: স্ট্রেপটোকক্কাস নামের ব্যাকটেরিয়া থেকে হওয়া গলার সংক্রমণে হঠাৎ তীব্র ব্যথা, জ্বর, টনসিল ফুলে লাল হওয়া বা সাদা দাগ এবং ঘাড়ের গ্রন্থি ফুলে ব্যথা হতে পারে। সাধারণত কাশি থাকে না। শিশু ও কিশোরদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়।
শুষ্ক বাতাস ও ধুলা: শীতের শুকনো বাতাস, এসির ঘর, ধুলাবালি ও ধোঁয়া গলার ভেতরের আবরণ শুকিয়ে জ্বালা তৈরি করে।
কণ্ঠের অতিরিক্ত ব্যবহার: শিক্ষক, বক্তা বা যাঁরা জোরে কথা বলেন বা গান করেন, তাঁদের গলা ব্যথা ও স্বর ভেঙে যাওয়া হয়।
অ্যাসিড রিফ্লাক্স: পাকস্থলীর অ্যাসিড ওপরে উঠে এলে সকালে গলা জ্বালা ও খুসখুসে ভাব হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
অ্যালার্জি ও ধূমপান: নাক থেকে গলায় শ্লেষ্মা নামা এবং সিগারেটের ধোঁয়া গলায় দীর্ঘস্থায়ী জ্বালা তৈরি করে।
গলা ব্যথা কমানোর ঘরোয়া উপায়
১. লবণ পানিতে গার্গল: এক গ্লাস (প্রায় ২৫০ মিলিলিটার) কুসুম গরম পানিতে আধা চা-চামচ লবণ মিশিয়ে নিন। মুখে নিয়ে মাথা পেছনে হেলিয়ে ২০-৩০ সেকেন্ড গার্গল করে ফেলে দিন, গিলবেন না। দিনে তিন-চারবার করুন। এটি গলার ফোলা ও জ্বালা সাময়িক কমায়, শ্লেষ্মাও আলগা করে।
২. গরম তরল: আদা চা, লেবু-মধু মেশানো কুসুম গরম পানি, তুলসী পাতা ফোটানো পানি, পাতলা ডাল বা মুরগির স্যুপ গলায় আরাম দেয় এবং শরীরে পানির জোগান রাখে। খুব গরম পানীয় নয়, সহনীয় উষ্ণ খান।
বিজ্ঞাপন
৩. মধু: এক চা-চামচ মধু সরাসরি বা গরম পানীয়তে মিশিয়ে খেলে গলার খুসখুসে ভাব ও কাশি কমে। এক বছরের কম বয়সী শিশুকে মধু দেবেন না।
৪. ভাপ নেওয়া: গামলায় গরম পানি নিয়ে তোয়ালে মাথায় ঢেকে কয়েক মিনিট ভাপ নিলে শুকনো গলা ও নাক আর্দ্র হয়। পোড়া থেকে সাবধান থাকুন।
৫. কণ্ঠের বিশ্রাম: যতটা সম্ভব কম কথা বলুন। ফিসফিস করে কথা বলাও কণ্ঠনালিতে চাপ ফেলে, তাই স্বাভাবিক নিচু স্বরে অল্প কথা বলুন।
৬. নরম খাবার: খিচুড়ি, জাউ ভাত, দই, কলা, ডিম সেদ্ধ বা স্যুপ সহজে গেলা যায়। ঝাল, টক, ভাজাপোড়া ও খুব শক্ত খাবার কয়েক দিন এড়িয়ে চলুন।
বিজ্ঞাপন
৭. লজেন্স: ফার্মেসির গলা ব্যথার লজেন্স চুষলে লালা বেশি তৈরি হয়ে গলা ভেজা থাকে। ছোট শিশুকে লজেন্স দেবেন না, গলায় আটকে যাওয়ার ঝুঁকি আছে।
ব্যথা বা জ্বর বেশি হলে প্যারাসিটামলের মতো সাধারণ ব্যথানাশক প্যাকেটের নির্দেশনা বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাওয়া যায়।
গলা খুসখুস করলে করণীয়
গলা খুসখুস করা, বারবার গলা পরিষ্কার করার ইচ্ছা আর শুকনো কাশি, এগুলো প্রায়ই শুষ্ক বাতাস, ধুলা বা নাক থেকে গলায় শ্লেষ্মা নামার কারণে হয়।
বিজ্ঞাপন
দিনভর অল্প অল্প করে পানি পান করুন যাতে গলা শুকিয়ে না যায়। শোয়ার ঘরে খুব শুকনো বাতাস থাকলে এক বালতি পানি রাখুন বা হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করুন। রাতে খুসখুসে কাশি বাড়লে শোয়ার আগে এক চামচ মধু খান এবং মাথা একটু উঁচু করে শোন।
বারবার জোরে গলা খাঁকারি দেওয়ার অভ্যাস থাকলে কমানোর চেষ্টা করুন, এতে জ্বালা আরও বাড়ে। খাঁকারির বদলে এক চুমুক পানি খেয়ে নিন। রাতে ভারী খাবার খেয়েই শুয়ে পড়লে যাঁদের সকালে গলা জ্বালা হয়, তাঁরা রাতের খাবার শোয়ার অন্তত দুই-তিন ঘণ্টা আগে সেরে নিন।
গলায় কফ জমলে করণীয়
কফ পাতলা করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো প্রচুর পানি ও গরম তরল পান করা। ভাপ নেওয়া এবং লবণ পানির গার্গলও কফ আলগা করে, ফলে সহজে কেশে বের করা যায়।
বিজ্ঞাপন
কফ গিলে না ফেলে বের করে দিন এবং টিস্যুতে ফেলে ঢাকনাওয়ালা ঝুড়িতে ফেলুন। শোয়ার সময় একটি বাড়তি বালিশ নিলে রাতে কফ গলায় নেমে কাশি কম হয়।
কফের রং নিয়ে অনেকেই দুশ্চিন্তা করেন। হলুদ বা সবুজ কফ মানেই ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ, এমন নয়, ভাইরাসেও এমন হতে পারে। তবে কফের সঙ্গে রক্ত, তিন সপ্তাহের বেশি কাশি, জ্বর ও বুকে ব্যথা বা শ্বাসকষ্ট থাকলে দ্রুত চিকিৎসক দেখান এবং প্রয়োজনে বুকের এক্স-রে বা কফ পরীক্ষা করান।
শিশুর গলা ব্যথায় যত্ন
শিশুরা অনেক সময় গলা ব্যথার কথা বলতে পারে না, খেতে না চাওয়া, খাবার মুখে নিয়ে কান্না বা লালা বেশি পড়া দেখে বোঝা যায়। শিশুকে ঘন ঘন পানি, তরল ও নরম খাবার দিন। বুকের দুধ খাওয়া শিশুকে বারবার বুকের দুধ দিন। বড় শিশুরা গার্গল করতে পারলে লবণ পানিতে গার্গল করাতে পারেন।
বিজ্ঞাপন
শিশুকে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বা কাশির মিশ্র সিরাপ দেবেন না। শিশুর গলা ব্যথার সঙ্গে জ্বর থাকলে, বিশেষ করে টনসিলে সাদা দাগ দেখা গেলে, শিশু বিশেষজ্ঞ দেখান। ব্যাকটেরিয়াজনিত গলার সংক্রমণে পুরো কোর্স অ্যান্টিবায়োটিক না খেলে পরে বাতজ্বরের মতো জটিলতা হতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
দেরি না করে হাসপাতালে যান যদি শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, মুখ খুলতে বা ঢোক গিলতে খুব কষ্ট হয়, লালা গিলতে না পেরে মুখ দিয়ে পড়তে থাকে, গলা বা ঘাড় এক পাশে খুব ফুলে যায় অথবা কণ্ঠস্বর বদলে গিয়ে অস্পষ্ট শোনায়।
এ ছাড়া এক সপ্তাহের বেশি গলা ব্যথা থাকলে, ১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি জ্বর থাকলে, টনসিলে সাদা দাগ বা পুঁজ দেখা গেলে, শরীরে র্যাশ উঠলে, বছরে বারবার টনসিলের সংক্রমণ হলে কিংবা দুই সপ্তাহের বেশি স্বর ভাঙা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ধূমপায়ীদের দীর্ঘদিনের স্বর ভাঙা বা গলা ব্যথা অবহেলা করা ঠিক নয়।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
লবণ পানিতে দিনে কতবার গার্গল করা যায়?
দিনে তিন-চারবার করলেই যথেষ্ট। পানিতে বেশি লবণ দেবেন না, এতে গলা আরও শুকিয়ে যেতে পারে।
গলা ব্যথায় কি ঠান্ডা খাবার একেবারে নিষেধ?
বিজ্ঞাপন
সাধারণ গলা ব্যথা ঠান্ডা খাবারে হয় না। কারও কারও ঠান্ডা পানীয়ে বরং আরাম লাগে। তবে যার ঠান্ডায় অস্বস্তি বাড়ে, তিনি কুসুম গরম পানীয় বেছে নিন।
গলা ব্যথা হলেই কি অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হয়?
না। বেশির ভাগ গলা ব্যথা ভাইরাসজনিত, অ্যান্টিবায়োটিক এতে কাজ করে না। ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হলে চিকিৎসক প্রয়োজন বুঝে তা দেবেন।
আদা-লবঙ্গ চিবালে কি উপকার হয়?
বিজ্ঞাপন
আদা বা লবঙ্গ চিবালে অনেকের গলায় সাময়িক আরাম লাগে, তবে বেশি চিবালে মুখে জ্বালা হতে পারে। এগুলো মূল চিকিৎসা নয়, সহায়ক উপায় মাত্র।