সর্দি দূর করার ঘরোয়া উপায়: নাক বন্ধ আর হাঁচি থেকে দ্রুত আরাম
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
ঋতু বদলের সময় হঠাৎ একদিন সকালে উঠে দেখলেন গলা খুসখুস করছে, নাক দিয়ে পানি পড়ছে, একটু পরপর হাঁচি। দুপুরের মধ্যে নাক বন্ধ, মাথা ভার। সাধারণ সর্দি বা কমন কোল্ড বছরে কয়েকবার প্রায় সবারই হয়, শিশুদের আরও বেশি।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ সর্দি ভাইরাসজনিত, তাই অ্যান্টিবায়োটিকে এটি সারে না। শরীর নিজেই সাধারণত সাত থেকে দশ দিনের মধ্যে ভাইরাসকে হারিয়ে দেয়। এই সময়টায় কষ্ট কমানোই আসল কাজ, আর সেখানে ঘরোয়া উপায়গুলো সত্যিই কাজে আসে: বিশ্রাম, প্রচুর পানি ও গরম তরল, গরম পানির ভাপ, লবণ পানিতে নাক পরিষ্কার, মধু ও আদা চা।
তবে সব সর্দি সাধারণ সর্দি নয়। উচ্চ জ্বর, শ্বাসকষ্ট বা দীর্ঘদিন না সারা অন্য অসুখের লক্ষণ হতে পারে। কোন উপায়ে কীভাবে আরাম পাবেন আর কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে, নিচে বলা হলো।
সর্দি, ফ্লু নাকি অ্যালার্জি
সাধারণ সর্দি: ধীরে শুরু হয়। গলা খুসখুস, হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া ও নাক বন্ধ প্রধান লক্ষণ। জ্বর হলেও সাধারণত হালকা।
বিজ্ঞাপন
ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা: হঠাৎ শুরু হয়। বেশি জ্বর, তীব্র শরীর ব্যথা, প্রচণ্ড ক্লান্তি ও মাথাব্যথা থাকে। ফ্লুতে শরীর বেশি কাবু হয়, বয়স্ক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
অ্যালার্জি: ধুলা, ফুলের রেণু বা ঠান্ডা বাতাসে বারবার হাঁচি, নাক ও চোখ চুলকানো। জ্বর থাকে না এবং প্রতি বছর একই সময়ে বা নির্দিষ্ট পরিবেশে ফিরে আসে।
ডেঙ্গু বা কোভিডের মতো অসুখেও শুরুতে সর্দি-জ্বর থাকতে পারে। তাই জ্বর বেশি হলে বা অন্য উপসর্গ থাকলে পরীক্ষা করানো জরুরি।
সর্দি কমানোর উপায়: ঘরে যা করবেন
বিজ্ঞাপন
১. বিশ্রাম: শরীর ভাইরাসের সঙ্গে লড়তে শক্তি খরচ করে। প্রথম দুই-তিন দিন যতটা সম্ভব বিশ্রাম নিন, রাতে পর্যাপ্ত ঘুমান।
২. প্রচুর তরল: পানি, গরম স্যুপ, আদা চা, লেবু-পানি বা ডাবের পানি পান করুন। তরল শ্লেষ্মা পাতলা রাখে, ফলে নাক পরিষ্কার করা সহজ হয়। শিশুদেরও বারবার পানি ও তরল খাবার দিন।
৩. গরম পানির ভাপ: একটি গামলায় গরম পানি নিয়ে মাথায় তোয়ালে ঢেকে পাঁচ-দশ মিনিট ভাপ নিন। নাক বন্ধ ভাব কিছুক্ষণের জন্য অনেকটা কমে। ফুটন্ত পানির খুব কাছে মুখ নেবেন না, পোড়ার ঝুঁকি আছে। শিশুদের সরাসরি গামলার ভাপ না দিয়ে গোসলখানায় গরম পানি চালিয়ে কিছুক্ষণ বসিয়ে রাখা নিরাপদ।
৪. লবণ পানিতে নাক পরিষ্কার: এক কাপ ফুটিয়ে কুসুম গরম করা পানিতে সিকি চা-চামচ লবণ মিশিয়ে ড্রপার দিয়ে কয়েক ফোঁটা নাকে দিন, তারপর আলতো করে নাক ঝাড়ুন। ফার্মেসিতে তৈরি স্যালাইন নাকের ড্রপও পাওয়া যায়, যা শিশুদের জন্যও ব্যবহার করা যায়।
বিজ্ঞাপন
৫. মধু ও আদা: এক কাপ গরম পানিতে কয়েক টুকরা থেঁতো আদা ফুটিয়ে একটু ঠান্ডা হলে এক চা-চামচ মধু ও লেবুর রস মিশিয়ে পান করুন। গলা খুসখুসে ও কাশিতে আরাম দেয়। এক বছরের কম বয়সী শিশুকে মধু দেবেন না।
৬. লবণ পানিতে গার্গল: গলা ব্যথা থাকলে এক গ্লাস কুসুম গরম পানিতে আধা চা-চামচ লবণ মিশিয়ে দিনে কয়েকবার গার্গল করুন।
নাক বন্ধ হলে করণীয়
রাতে নাক বন্ধ থাকলে ঘুমের সমস্যা হয়। মাথার নিচে একটি বাড়তি বালিশ দিয়ে মাথা একটু উঁচু করে শুলে শ্বাস নিতে সুবিধা হয়। শোয়ার আগে ভাপ নেওয়া বা লবণ পানির ড্রপ দেওয়াও কাজে দেয়।
বিজ্ঞাপন
ঘরের বাতাস খুব শুকনো হলে নাক আরও শুকিয়ে বন্ধ হয়ে যায়। শীতকালে ঘরে এক বালতি পানি রাখলে বা ভেজা তোয়ালে মেলে দিলে বাতাসে কিছুটা আর্দ্রতা আসে।
বাজারের নাক খোলার স্প্রে বা ড্রপ দ্রুত আরাম দেয়, কিন্তু টানা কয়েক দিনের বেশি ব্যবহার করলে উল্টো নাক আরও বেশি বন্ধ হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। তাই এগুলো ফার্মাসিস্ট বা চিকিৎসকের পরামর্শে এবং নির্দেশিত সময়ের মধ্যেই ব্যবহার করুন। শিশুদের ক্ষেত্রে এ ধরনের ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দেবেন না।
নাক ঝাড়ার সময় দুই নাক একসঙ্গে জোরে না ঝেড়ে এক পাশ চেপে অন্য পাশ আলতো করে ঝাড়ুন। জোরে ঝাড়লে কানে চাপ লাগে।
ঠান্ডা লাগলে খাবার
বিজ্ঞাপন
গরম মুরগির স্যুপ বা সবজির স্যুপ শরীরে তরল জোগায়, নাক বন্ধ ভাবও কিছুটা কমায়। খিচুড়ি, ডাল-ভাত, ডিম, ফলমূল, বিশেষ করে লেবু, কমলা, পেয়ারা ও আমলকীর মতো ভিটামিন সি-যুক্ত ফল খান।
খিদে কম থাকলে জোর করে ভারী খাবার না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার খান। ঠান্ডা লাগলে বরফ দেওয়া পানীয় ও আইসক্রিম এড়িয়ে চলাই ভালো, যদিও এগুলো সর্দির কারণ নয়।
ভিটামিন সি বা জিংকের ট্যাবলেট সর্দির সময়কাল সামান্য কমাতে পারে বলে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, তবে সবার ক্ষেত্রে নয়। নিজে থেকে বেশি মাত্রায় সাপ্লিমেন্ট খাবেন না।
যা করবেন না
বিজ্ঞাপন
অ্যান্টিবায়োটিক নিজে থেকে নয়: সাধারণ সর্দি ভাইরাসজনিত, অ্যান্টিবায়োটিক এখানে কাজ করে না। অপ্রয়োজনে খেলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় এবং ভবিষ্যতে ওষুধের কার্যকারিতা কমে যায়।
শিশুকে কাশি-সর্দির ওষুধ নয়: ছোট শিশুদের জন্য বাজারের কাশি-সর্দির মিশ্র ওষুধ নিরাপদ নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব দেবেন না।
নাকে তেল বা সরিষার তেল নয়: শিশুর নাকে সরিষার তেল দেওয়ার প্রচলন আছে, এতে তেল শ্বাসনালিতে গিয়ে ক্ষতি করতে পারে।
ধূমপান: ধোঁয়া নাক ও গলার জ্বালা বাড়ায়, সেরে উঠতে দেরি হয়।
বিজ্ঞাপন
অসুস্থ অবস্থায় ভিড়ে যাওয়া: প্রথম দুই-তিন দিন সর্দি সবচেয়ে বেশি ছড়ায়। সম্ভব হলে এ সময় অফিস বা স্কুলে না গিয়ে বাসায় বিশ্রাম নিন, বের হতেই হলে মাস্ক পরুন। এতে আপনিও দ্রুত সেরে উঠবেন, অন্যরাও সংক্রমণ থেকে বাঁচবে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
তিন দিনের বেশি ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি জ্বর, শ্বাসকষ্ট বা বুকে শাঁ শাঁ শব্দ, দশ দিনের বেশি উপসর্গ থাকা বা ভালো হতে হতে আবার খারাপ হওয়া, তীব্র মাথাব্যথা বা মুখে-কপালে ব্যথা, কানে ব্যথা বা কান দিয়ে পানি পড়া, ঘন সবুজ-হলুদ কফের সঙ্গে জ্বর থাকলে চিকিৎসক দেখান।
তিন মাসের কম বয়সী শিশুর জ্বর, শিশু খেতে না চাইলে বা নিস্তেজ হয়ে পড়লে, দ্রুত শ্বাস নিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে নিন। বয়স্ক মানুষ, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং হাঁপানি, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগ আছে এমন মানুষ সর্দি-জ্বরে আগেভাগেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সর্দি কি ছোঁয়াচে?
হ্যাঁ। হাঁচি-কাশির ফোঁটা এবং হাতের মাধ্যমে ছড়ায়। প্রথম দুই-তিন দিন সবচেয়ে বেশি ছড়ায়। হাঁচি দেওয়ার সময় টিস্যু বা কনুই দিয়ে মুখ ঢাকুন, ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন।
গোসল করলে কি সর্দি বাড়ে?
বিজ্ঞাপন
না। কুসুম গরম পানিতে গোসল করলে বরং আরাম লাগে, ভাপে নাকও খুলতে পারে। গোসলের পর দ্রুত শরীর ও মাথা মুছে নিন।
ভাপের পানিতে কিছু মেশানো দরকার?
শুধু গরম পানিই যথেষ্ট। কেউ কেউ মেন্থল বা ইউক্যালিপটাস তেল দেন, তবে ছোট শিশুর ক্ষেত্রে এসব তেল ব্যবহার করবেন না।
বারবার সর্দি লাগে কেন?
বিজ্ঞাপন
শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠার সময় বছরে কয়েকবার সর্দি হওয়া স্বাভাবিক। বড়দের ঘন ঘন হলে অ্যালার্জি বা অন্য কারণ থাকতে পারে, চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।