ঘরোয়া ফেসপ্যাক তৈরির নিয়ম: ত্বকের ধরন অনুযায়ী সেরা কয়েকটি প্যাক
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
রান্নাঘরের তাকে যে বেসন, মধু, দই, হলুদ আর পেঁপে থাকে, সেগুলো দিয়েই বানানো যায় চমৎকার ফেসপ্যাক। খরচ সামান্য, রাসায়নিকের ভয় কম, আর সপ্তাহে একদিন নিজের জন্য পনেরো মিনিট সময় দেওয়ার আনন্দ তো আছেই। কিন্তু সব প্যাক সবার ত্বকে মানায় না।
বিজ্ঞাপন
ঘরোয়া ফেসপ্যাক তৈরির প্রথম নিয়ম হলো নিজের ত্বকের ধরন জানা। তৈলাক্ত ত্বকে অতিরিক্ত তেল শুষে নেয় এমন উপাদান, যেমন মুলতানি মাটি ও বেসন কাজের। শুষ্ক ত্বকের দরকার আর্দ্রতা, তাই মধু, দই, দুধের সর ও পাকা কলা। সংবেদনশীল ত্বকে ওটস ও অ্যালোভেরার মতো কোমল উপাদান নিরাপদ। প্যাক সপ্তাহে এক-দুইবার দশ-পনেরো মিনিট রাখলেই যথেষ্ট, এর বেশি রাখলে উল্টো ত্বক শুকিয়ে যায় বা জ্বালা করে।
মনে রাখবেন, ঘরোয়া প্যাক ত্বক পরিষ্কার, কোমল ও সতেজ দেখাতে সাহায্য করে। এগুলো ত্বকের স্বাভাবিক রং বদলায় না, ব্রণ বা মেছতার চিকিৎসাও নয়।
ত্বকের ধরন বোঝা ও প্যাক লাগানোর নিয়ম
সকালে মুখ মৃদু ফেসওয়াশে ধুয়ে কিছু না লাগিয়ে এক ঘণ্টা অপেক্ষা করুন। তারপর একটি টিস্যু কপাল, নাক ও গালে চেপে ধরুন।
বিজ্ঞাপন
তৈলাক্ত ত্বক: পুরো মুখের তেল টিস্যুতে লাগে, মুখ চকচক করে, লোমকূপ বড় দেখায় এবং ব্রণের প্রবণতা থাকে।
শুষ্ক ত্বক: টিস্যুতে তেল লাগে না, ত্বক টানটান লাগে, শীতে খসখসে হয়ে চামড়া ওঠে।
মিশ্র ত্বক: কপাল, নাক ও থুতনিতে তেল, কিন্তু গাল স্বাভাবিক বা শুষ্ক।
সংবেদনশীল ত্বক: নতুন কিছু লাগালেই লালচে ভাব, জ্বালা বা চুলকানি হয়।
বিজ্ঞাপন
ধরন বুঝে প্যাক বেছে নেওয়ার পর লাগানোর সময় এই পাঁচটি নিয়ম মানুন।
১. প্যাচ টেস্ট: যেকোনো নতুন প্যাক প্রথমবার কানের পেছনে বা হাতের ভেতরের দিকে অল্প লাগিয়ে দেখুন। চব্বিশ ঘণ্টায় লালচে ভাব বা চুলকানি না হলে মুখে ব্যবহার করুন।
২. পরিষ্কার মুখে: মেকআপ তুলে মুখ ধুয়ে হালকা ভেজা অবস্থায় প্যাক লাগান। চোখের চারপাশ ও ঠোঁট বাদ দিন।
৩. পরিষ্কার পাত্র ও তাজা উপকরণ: প্রতিবার অল্প পরিমাণে নতুন করে বানান, বানানো প্যাক জমিয়ে রাখবেন না।
বিজ্ঞাপন
৪. সময়: দশ থেকে পনেরো মিনিট। মাটির প্যাক পুরো শুকিয়ে টানটান হওয়ার আগেই ধুয়ে ফেলুন।
৫. ধোয়া ও পরের যত্ন: কুসুম গরম পানি দিয়ে আলতো হাতে ধুয়ে নরম তোয়ালে চেপে মুছুন। এরপর ময়েশ্চারাইজার লাগান, দিনের বেলা হলে সানস্ক্রিনও।
তৈলাক্ত ত্বকের ফেসপ্যাক
মুলতানি মাটি ও গোলাপ জল: এক টেবিল চামচ মুলতানি মাটির সঙ্গে দেড়-দুই টেবিল চামচ গোলাপ জল মিশিয়ে মসৃণ পেস্ট বানান। দশ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন। অতিরিক্ত তেল কমায়, মুখ সতেজ লাগে। সপ্তাহে একবারের বেশি নয়।
বিজ্ঞাপন
বেসন ও টক দই: এক টেবিল চামচ বেসন, এক টেবিল চামচ টক দই আর এক চিমটি হলুদ মিশিয়ে লাগান। পনেরো মিনিট পর ভেজা হাতে আলতো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ধুয়ে ফেলুন, এতে হালকা পরিষ্কারকের কাজ হয়।
সক্রিয়, লাল ও পুঁজভরা ব্রণের ওপর কোনো প্যাক লাগাবেন না, ঘষাঘষি করবেন না। এতে সংক্রমণ ও দাগ বাড়ে।
শুষ্ক ত্বকের ফেসপ্যাক
মধু ও দই: এক টেবিল চামচ টক দইয়ের সঙ্গে এক চা-চামচ মধু মিশিয়ে পনেরো মিনিট লাগিয়ে রাখুন। মধু ত্বকে আর্দ্রতা টেনে রাখে, দই কোমল করে।
বিজ্ঞাপন
পাকা কলা ও মধু: অর্ধেক পাকা কলা চটকে এক চা-চামচ মধু মিশিয়ে লাগান। শীতের খসখসে ত্বকে খুব আরাম দেয়।
দুধের সর ও বেসন: এক টেবিল চামচ দুধের সরের সঙ্গে এক চা-চামচ বেসন মিশিয়ে লাগাতে পারেন। শুষ্ক ত্বকে বেসন একা ব্যবহার করলে আরও শুকনো লাগে, সরের সঙ্গে মেশালে ভারসাম্য থাকে।
সংবেদনশীল ও মিশ্র ত্বকের প্যাক
ওটস ও দই: দুই টেবিল চামচ ওটস মিহি গুঁড়া করে এক টেবিল চামচ দই বা অল্প দুধ মিশিয়ে পেস্ট করুন। ওটস ত্বকের জ্বালা কমাতে পরিচিত উপাদান। দশ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন।
বিজ্ঞাপন
অ্যালোভেরা জেল: তাজা অ্যালোভেরা পাতা কেটে হলুদ কষ ঝরিয়ে ভেতরের স্বচ্ছ জেল নিন। সরাসরি পাতলা করে লাগিয়ে দশ মিনিট রাখুন। রোদে পোড়া ত্বকে শীতল আরাম দেয়।
মিশ্র ত্বকে দুই প্যাক: কপাল-নাক-থুতনিতে মুলতানি মাটির প্যাক আর গালে মধু-দইয়ের প্যাক একসঙ্গে লাগাতে পারেন। একে অনেকে 'মাল্টি মাস্কিং' বলেন। এতে তেলতেলে অংশের তেল কমে, আবার শুষ্ক গালও টানটান হয়ে যায় না।
উজ্জ্বল ত্বকের ফেসপ্যাক
পাকা পেঁপে ও মধু: দুই টেবিল চামচ পাকা পেঁপে চটকে এক চা-চামচ মধু মিশিয়ে দশ-পনেরো মিনিট লাগান। পেঁপের এনজাইম মরা কোষ আলগা করে ত্বককে সতেজ দেখায়। সংবেদনশীল ত্বকে আগে পরীক্ষা করে নিন।
বিজ্ঞাপন
বেসন, হলুদ ও দুধ: এক টেবিল চামচ বেসন, এক চিমটি হলুদ আর প্রয়োজনমতো কাঁচা দুধ মিশিয়ে লাগান। হলুদ বেশি দিলে ত্বকে হলদে আভা থেকে যায়।
টমেটোর শাঁস: তৈলাক্ত ত্বকে টমেটোর শাঁস কয়েক মিনিট লাগিয়ে ধুয়ে ফেললে সতেজ লাগে। জ্বালা করলে সঙ্গে সঙ্গে ধুয়ে ফেলুন।
উজ্জ্বল ত্বকের আসল ভিত্তি অবশ্য প্যাক নয়: প্রতিদিন সানস্ক্রিন, পর্যাপ্ত ঘুম, পানি পান, শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়া এবং ধূমপান না করা।
যে উপাদান এড়িয়ে চলবেন, কখন চিকিৎসক
বিজ্ঞাপন
সরাসরি লেবুর রস মুখে লাগাবেন না, এটি ত্বকে জ্বালা করে এবং রোদে লাগলে পোড়া দাগ তৈরি করতে পারে। বেকিং সোডা, টুথপেস্ট, কাঁচা রসুন, ভিনেগার ও চিনির দানার মতো খরখরে স্ক্রাবও মুখের নরম ত্বকের জন্য ক্ষতিকর। একসঙ্গে অনেক উপাদান মিশিয়ে প্যাক বানালে কোনটিতে সমস্যা হলো বোঝা কঠিন হয়, তাই সহজ প্যাক বেছে নিন।
প্যাক লাগানোর পর ত্বক লাল হয়ে ফুলে গেলে, জ্বালা বা ফোসকা হলে সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা পানিতে ধুয়ে ফেলুন এবং কয়েক দিন কোনো প্যাক ব্যবহার করবেন না। সমস্যা না কমলে, কিংবা ব্রণ, মেছতা, একজিমা বা দীর্ঘদিনের দাগ থাকলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
প্রতিদিন ফেসপ্যাক লাগানো কি ভালো?
বিজ্ঞাপন
না। প্রতিদিন লাগালে ত্বকের স্বাভাবিক তেল ও সুরক্ষা স্তর নষ্ট হয়। সপ্তাহে এক-দুইবারই যথেষ্ট।
রাতে নাকি দিনে প্যাক লাগানো ভালো?
যেকোনো সময় লাগানো যায়। রাতে লাগালে পরে রোদে যাওয়ার ঝামেলা থাকে না, ত্বক বিশ্রামও পায়। দিনে লাগালে পরে অবশ্যই সানস্ক্রিন দিন।
ঘরোয়া প্যাকে কি ব্রণ সারে?
বিজ্ঞাপন
হালকা ব্রণে ত্বক পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু ব্রণের চিকিৎসা নয়। মাঝারি থেকে বেশি ব্রণ বা দাগ রেখে যাওয়া ব্রণে চিকিৎসক দেখান।
ফেসপ্যাক ফ্রিজে রেখে কয়েক দিন ব্যবহার করা যায়?
দই, ফল বা দুধ মেশানো প্যাক দ্রুত নষ্ট হয় এবং জীবাণু জন্মাতে পারে। তাই প্রতিবার অল্প পরিমাণে তাজা প্যাক বানিয়ে সেদিনই ব্যবহার করুন।
ছেলেরাও কি এসব প্যাক ব্যবহার করতে পারেন?
বিজ্ঞাপন
অবশ্যই। ত্বকের যত্নে নারী-পুরুষের পার্থক্য নেই, পার্থক্য শুধু ত্বকের ধরনে। ছেলেদের ত্বক সাধারণত কিছুটা বেশি তৈলাক্ত হয়, তাই মুলতানি মাটি বা বেসন-দইয়ের প্যাক বেশি মানানসই। দাড়ির জায়গায় প্যাক না লাগিয়ে কপাল, নাক ও গালে লাগান, আর শেভ করার দিন প্যাক এড়িয়ে চলুন, কারণ তখন ত্বক বেশি সংবেদনশীল থাকে।