সাদা চুল কালো করার প্রাকৃতিক উপায়: অকালে চুল পাকা রোধে করণীয়
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
পঁচিশ-ত্রিশ বছর বয়সেই আয়নায় কানের পাশে বা সিঁথিতে কয়েকটি সাদা চুল চোখে পড়লে অনেকেই চমকে ওঠেন। বন্ধুদের ঠাট্টা, আত্মীয়দের প্রশ্ন আর বাজারের 'সাদা চুল চিরতরে কালো' করার বিজ্ঞাপন, সব মিলিয়ে দুশ্চিন্তা আরও বাড়ে।
বিজ্ঞাপন
শুরুতেই একটা সত্য জেনে রাখা ভালো। চুলের রং আসে চুলের গোড়ায় থাকা মেলানিন তৈরির কোষ থেকে। বয়স বাড়লে বা বংশগত কারণে এই কোষগুলো কাজ কমিয়ে দেয়, তখন চুল সাদা হয়ে গজায়। একবার এভাবে চুল পেকে গেলে কোনো তেল, প্যাক বা খাবার দিয়ে সেই চুল আবার প্রাকৃতিকভাবে কালো করার নির্ভরযোগ্য উপায় নেই। তবে দুটি ভালো খবর আছে। প্রথমত, ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি বা থাইরয়েডের সমস্যার মতো কারণে চুল পাকলে চিকিৎসায় অনেক সময় চুল পাকা থামে, কিছু ক্ষেত্রে রং কিছুটা ফিরেও আসে। দ্বিতীয়ত, রাসায়নিক কলপ ছাড়াই মেহেদি ও নীল দিয়ে চুল গাঢ় বাদামি থেকে কালো রঙে রাঙানো সম্ভব।
নিচে অকালে চুল পাকার কারণ, প্রাকৃতিক রং ব্যবহারের নিয়ম আর চুল পাকা রোধে কী করা যায়, সেসব বিস্তারিত বলা হলো।
কখন চুল পাকাকে অকাল বলা হয়
বয়সের সঙ্গে চুল পাকা স্বাভাবিক। দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে সাধারণত পঁচিশ বছরের আগে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় চুল পাকলে তাকে অকালে চুল পাকা বলা হয়। শিশু বা কিশোর বয়সে দু-চারটি সাদা চুল অনেক সময় বংশগত কারণে দেখা দেয় এবং ক্ষতিকর নয়।
বিজ্ঞাপন
একটা প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, একটি পাকা চুল তুললে সেখানে কয়েকটি পাকা চুল গজায়। এটি সত্য নয়। তবে বারবার চুল টেনে তুললে গোড়ার ক্ষতি হয়ে সেখানে চুল গজানো বন্ধ হয়ে যেতে পারে, তাই কাঁচি দিয়ে কেটে ফেলাই ভালো।
অকালে চুল পাকার কারণ
১. বংশগত প্রবণতা: সবচেয়ে বড় কারণ। মা-বাবার অল্প বয়সে চুল পেকে থাকলে সন্তানেরও সেই সম্ভাবনা বেশি।
২. ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি: যাঁরা মাছ, মাংস, ডিম ও দুধ খুব কম খান, তাঁদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়। সঙ্গে ক্লান্তি, হাত-পা ঝিনঝিন করা বা রক্তস্বল্পতা থাকতে পারে।
বিজ্ঞাপন
৩. থাইরয়েডের সমস্যা: থাইরয়েড হরমোন বেশি বা কম, দুই অবস্থাতেই চুল পাকা ও চুল পড়া বাড়তে পারে।
৪. ধূমপান: গবেষণায় ধূমপায়ীদের মধ্যে অল্প বয়সে চুল পাকার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।
৫. মানসিক চাপ: দীর্ঘ চাপ চুল পাকার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে।
৬. কিছু অসুখ: শ্বেতী বা ভিটিলিগো রোগে চামড়ার পাশাপাশি সেই জায়গার চুলও সাদা হয়ে যায়। কিছু বিরল জিনগত রোগেও অল্প বয়সে চুল পাকে।
বিজ্ঞাপন
প্রাকৃতিক উপায়ে কি সাদা চুল কালো হয়
আমলকী, কারিপাতা, কালোজিরা তেল, পেঁয়াজের রস বা নারকেল তেলে নানা উপাদান মিশিয়ে লাগালে সাদা চুল কালো হয়ে যায়, এমন দাবি প্রায়ই শোনা যায়। এগুলোর কোনোটিই পাকা চুলকে আবার কালো করে, এমন নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। এসব তেল চুলকে নরম, ঝলমলে ও স্বাস্থ্যবান রাখতে পারে, সেটুকুই।
যেখানে সত্যিই উন্নতি সম্ভব, তা হলো কারণভিত্তিক চিকিৎসা। রক্ত পরীক্ষায় ভিটামিন বি১২ বা আয়রনের ঘাটতি, থাইরয়েডের সমস্যা ধরা পড়লে তার চিকিৎসা করালে নতুন চুল পাকার গতি কমে। তাই অল্প বয়সে হঠাৎ অনেক চুল পাকতে শুরু করলে একবার চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
কলপ ছাড়া চুল কালো করা: মেহেদি ও নীল
বিজ্ঞাপন
রাসায়নিক কলপে অনেকের মাথার ত্বকে চুলকানি, ফোসকা বা মুখ ফুলে যাওয়ার মতো অ্যালার্জি হয়। তাঁদের জন্য মেহেদি ও নীল গাছের পাতার গুঁড়া ভালো বিকল্প। শুধু মেহেদি দিলে পাকা চুল কমলা-লাল হয়, পরে নীল লাগালে রং গাঢ় বাদামি থেকে কালো হয়। এই পদ্ধতি দুই ধাপে করতে হয়।
১. মেহেদি প্রস্তুত: কাঁধ পর্যন্ত চুলের জন্য মোটামুটি ১০০ গ্রাম বিশুদ্ধ মেহেদি পাতার গুঁড়া কুসুম গরম পানি বা লিকার চায়ের সঙ্গে মিশিয়ে দইয়ের মতো ঘন পেস্ট বানান। ঢেকে চার-পাঁচ ঘণ্টা রেখে দিন, যাতে রং ছাড়ে।
২. মেহেদি লাগানো: পরিষ্কার, তেলমুক্ত চুলে গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত ভাগ ভাগ করে লাগান। এক থেকে দুই ঘণ্টা রেখে শুধু পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন, শ্যাম্পু করবেন না। চুল শুকিয়ে নিন।
৩. নীল প্রস্তুত: সমপরিমাণ নীল গুঁড়া কুসুম গরম পানিতে মিশিয়ে পেস্ট বানান। নীল মেশানোর পর বেশিক্ষণ রাখলে কার্যকারিতা কমে যায়, তাই সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার করুন।
বিজ্ঞাপন
৪. নীল লাগানো: মেহেদি দেওয়া চুলে নীলের পেস্ট একইভাবে লাগিয়ে এক থেকে দুই ঘণ্টা রাখুন, তারপর পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
৫. রং গাঢ় হওয়া: প্রথম দিন রং কিছুটা সবুজাভ বা হালকা মনে হতে পারে। দুই-তিন দিনের মধ্যে রং গাঢ় হয়। এই সময়ে শ্যাম্পু না করাই ভালো।
হাতে গ্লাভস পরুন, কপাল ও কানের ধারে একটু তেল বা ভেসলিন লাগিয়ে নিন যাতে ত্বকে দাগ না পড়ে। নতুন চুল গজালে চার-ছয় সপ্তাহ পর গোড়ায় আবার লাগাতে হয়।
সতর্কতা: বাজারে 'কালো মেহেদি' নামে বিক্রি হওয়া অনেক পণ্যে পিপিডি নামের রাসায়নিক মেশানো থাকে, যা তীব্র অ্যালার্জি ঘটাতে পারে। বিশুদ্ধ মেহেদি পাতার গুঁড়া কিনুন। যেকোনো রং প্রথমবার ব্যবহারের আগে কানের পেছনে অল্প লাগিয়ে ৪৮ ঘণ্টা অপেক্ষা করুন। আগে রাসায়নিক রং বা রিবন্ডিং করা চুলে মেহেদি দিলে অপ্রত্যাশিত রং আসতে পারে, তাই অল্প চুলে আগে পরীক্ষা করে নিন।
বিজ্ঞাপন
লিকার চা বা কফির ঘন লিকার শ্যাম্পুর পর চুলে ঢেলে কিছুক্ষণ রেখে ধুয়ে ফেললে হালকা পাকা চুলে সামান্য বাদামি আভা আসে। এটি খুবই অস্থায়ী, কয়েকবার ধোয়ার পর চলে যায়।
চুল পাকা রোধে করণীয়
সুষম খাবার: মাছ, ডিম, দুধ, মাংস থেকে ভিটামিন বি১২, শাক-ডাল-কলিজা থেকে আয়রন এবং বাদাম ও বীজ থেকে জিংক ও কপারের মতো উপাদান পান। নিরামিষভোজী হলে বি১২-এর ঘাটতি নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।
ধূমপান ছাড়ুন: চুল পাকা ছাড়াও এটি সারা শরীরের জন্য ক্ষতিকর।
বিজ্ঞাপন
চাপ সামলান: পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত হাঁটা ও ব্যায়াম মানসিক চাপ কমায়।
রোদ থেকে চুল রক্ষা: কড়া রোদে দীর্ঘক্ষণ থাকলে টুপি বা ছাতা ব্যবহার করুন। রোদের তাপ চুলকে শুষ্ক ও ভঙ্গুর করে তোলে।
কড়া রাসায়নিক কমান: ঘন ঘন ব্লিচ, কড়া রং বা তাপের ব্যবহার চুলের ক্ষতি করে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
কোন ভিটামিনের অভাবে চুল পাকে?
ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি অকালে চুল পাকার পরিচিত কারণ। আয়রন, কপার ও ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির সঙ্গেও সম্পর্ক পাওয়া গেছে। রক্ত পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়ে তবেই সাপ্লিমেন্ট খান।
মেহেদি কি চুলের ক্ষতি করে?
বিশুদ্ধ মেহেদি সাধারণত চুলের ক্ষতি করে না, বরং চুল কিছুটা মোটা ও ঝলমলে দেখায়। তবে কারও কারও চুল শুষ্ক লাগে, তখন পরে তেল বা কন্ডিশনার ব্যবহার করুন।
বিজ্ঞাপন
শিশুর চুল পেকে গেলে কী করব?
দু-একটি পাকা চুল হলে সাধারণত দুশ্চিন্তার কিছু নেই। অনেক চুল পাকলে বা সঙ্গে ত্বকে সাদা দাগ থাকলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ দেখান।
কলপ ব্যবহার কি নিরাপদ?
বেশির ভাগ মানুষ নিরাপদেই ব্যবহার করেন, তবে কলপে অ্যালার্জি বেশ সাধারণ। প্রতিবার ব্যবহারের আগে প্যাচ টেস্ট করুন, ভ্রু বা চোখের পাপড়িতে কখনো কলপ দেবেন না।