চুল ঘন করার উপায়: পাতলা চুল ঘন দেখাতে ঘরোয়া যত্ন
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
আগে বেণি করলে হাতের মুঠো ভরে যেত, এখন সেই বেণি অর্ধেক। চিরুনিতে, বালিশে, গোসলখানার ড্রেনে চুলের গোছা দেখে মন খারাপ হয়। চুল পাতলা হয়ে যাওয়া নারী-পুরুষ সবার জন্যই দুশ্চিন্তার, আর এই দুশ্চিন্তাকে পুঁজি করে বাজারে বিক্রি হয় 'সাত দিনে ঘন চুল'-এর নানা তেল।
বিজ্ঞাপন
সত্যিটা হলো, মাথার ত্বকে চুলের গোড়া বা ফলিকলের সংখ্যা মূলত জন্মগতভাবে নির্ধারিত। কোনো তেল বা প্যাক রাতারাতি নতুন গোড়া তৈরি করতে পারে না। তবে চুল পাতলা হওয়ার পেছনে অনেক সময় এমন কারণ থাকে, যা সারানো যায়, যেমন আয়রন বা প্রোটিনের ঘাটতি, থাইরয়েডের সমস্যা, অসুখ বা প্রসবের পর সাময়িক চুল পড়া, কিংবা ভুল যত্নে চুল ভেঙে যাওয়া। কারণ ঠিক করলে নতুন চুল গজায় এবং চুল আবার আগের মতো ঘন হতে পারে।
তাই চুল ঘন করার উপায় দুই ভাগে ভাবুন: কারণ খুঁজে তার সমাধান আর চুলের ভাঙন কমিয়ে যতটা চুল আছে তাকে স্বাস্থ্যবান ও ঘন দেখানো।
চুল পাতলা হয় কেন
বংশগত টাক: পুরুষদের কপালের দুই পাশ ও মাথার তালুর চুল পাতলা হওয়া এবং নারীদের সিঁথি চওড়া হয়ে যাওয়া প্রায়ই বংশগত ও হরমোনজনিত। এটি ধীরে ধীরে বাড়ে।
বিজ্ঞাপন
সাময়িক চুল পড়া: বড় অসুখ, উচ্চ জ্বর, অস্ত্রোপচার, সন্তান প্রসব, হঠাৎ অনেক ওজন কমানো বা তীব্র মানসিক চাপের দুই-তিন মাস পর হঠাৎ অনেক চুল পড়তে পারে। সাধারণত ছয় থেকে বারো মাসের মধ্যে আবার স্বাভাবিক হয়।
পুষ্টির ঘাটতি: আয়রনের ঘাটতি, বিশেষ করে মাসিকে বেশি রক্তপাত হয় এমন নারীদের, এবং খাবারে প্রোটিন কম থাকা চুল পাতলা করে।
হরমোন ও অসুখ: থাইরয়েডের সমস্যা, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম এবং কিছু ওষুধ চুল পড়ার কারণ হতে পারে।
ভুল যত্ন: খুব টাইট করে চুল বাঁধা, ঘন ঘন স্ট্রেইটনার বা হেয়ার ড্রায়ারের তাপ, রিবন্ডিং, ব্লিচ ও কড়া রং চুল ভেঙে দেয়। টানা টাইট বেণি বা খোঁপায় কপালের চুল স্থায়ীভাবে কমে যেতে পারে।
বিজ্ঞাপন
খুশকি ও মাথার ত্বকের রোগ: মাথার ত্বকে চুলকানি, প্রদাহ বা ছত্রাকের সংক্রমণে চুল পড়ে।
খাবারে যা রাখবেন
চুল মূলত কেরাটিন নামের প্রোটিনে তৈরি। তাই প্রতিদিনের খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন রাখুন: ডিম, মাছ, মুরগি, ডাল, দুধ ও দই। আয়রনের জন্য কচুশাক, পালংশাক, কলিজা, মাংস ও ডাল খান, সঙ্গে লেবু বা পেয়ারার মতো ভিটামিন সি যুক্ত খাবার। বাদাম, বীজ ও ডিম থেকে জিংক এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপাদান পাওয়া যায়।
বায়োটিন বা 'হেয়ার ভিটামিন' সাপ্লিমেন্ট শুধু তাঁদের কাজে আসে, যাঁদের সত্যিই ঘাটতি আছে। অপ্রয়োজনে খেলে বাড়তি উপকার নেই, আর বায়োটিন কিছু রক্ত পরীক্ষার ফলাফলেও গোলমাল করতে পারে। আয়রন ট্যাবলেটও রক্ত পরীক্ষা করে ঘাটতি নিশ্চিত হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শে খাবেন।
বিজ্ঞাপন
কঠোর ডায়েট করে দ্রুত ওজন কমানো চুলের জন্য খুব ক্ষতিকর। ওজন কমাতে চাইলে ধীরে, সুষম খাবার খেয়ে কমান।
চুল ঘন করার তেল
নারকেল তেল: গবেষণায় দেখা গেছে, নারকেল তেল চুলের ভেতরে ঢুকে ধোয়ার সময় প্রোটিন ক্ষয় কিছুটা কমায়। ফলে চুল কম ভাঙে। শ্যাম্পুর এক-দুই ঘণ্টা আগে বা আগের রাতে চুলে লাগাতে পারেন।
সরিষার তেল ও তিলের তেল: দেশে বহুল ব্যবহৃত। মাথার ত্বক ও চুল আর্দ্র রাখে।
বিজ্ঞাপন
কালোজিরা, মেথি বা আমলকী মেশানো তেল: এক কাপ নারকেল তেলে এক টেবিল চামচ মেথি বা কয়েক টুকরা শুকনো আমলকী অল্প আঁচে কয়েক মিনিট গরম করে ছেঁকে রাখা যায়। এগুলো চুলকে নরম ও ঝলমলে করে, তবে নতুন চুল গজানোর প্রমাণ সীমিত।
মালিশের নিয়ম: আঙুলের ডগা দিয়ে মাথার ত্বকে পাঁচ মিনিট হালকা চাপ দিয়ে মালিশ করুন, নখ দিয়ে নয়। নিয়মিত মালিশ মাথার ত্বকে আরাম দেয়। খুব বেশি তেল দিয়ে সারা দিন মাথা চপচপে রাখলে খুশকি ও ব্রণ বাড়তে পারে, বিশেষ করে তৈলাক্ত মাথার ত্বকে।
চুল ঘন করার প্যাক
ডিম ও টক দই: একটি ডিমের সঙ্গে দুই টেবিল চামচ টক দই ফেটিয়ে চুলে লাগিয়ে ২০-৩০ মিনিট রাখুন। তারপর ঠান্ডা বা কুসুম গরম পানিতে শ্যাম্পু করুন, গরম পানিতে ডিম জমে চুলে আটকে যায়। চুল নরম ও ঝলমলে লাগে।
বিজ্ঞাপন
অ্যালোভেরা ও নারকেল তেল: দুই টেবিল চামচ তাজা অ্যালোভেরা জেলের সঙ্গে এক টেবিল চামচ নারকেল তেল মিশিয়ে মাথার ত্বক ও চুলে লাগান। আধা ঘণ্টা পর ধুয়ে ফেলুন। শুষ্ক, খসখসে চুলে আরাম দেয়।
মেথি ও দই: রাতভর ভেজানো দুই টেবিল চামচ মেথি বেটে দইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে লাগান। খুশকির চুলকানিতে অনেকে আরাম পান।
পেঁয়াজের রস নিয়ে কথা: পেঁয়াজের রস চুল গজাতে সাহায্য করে, এমন একটি ছোট গবেষণা আছে, কিন্তু প্রমাণ দুর্বল। এটি মাথার ত্বকে জ্বালা ও তীব্র গন্ধ তৈরি করে। ব্যবহার করতে চাইলে অল্প জায়গায় আগে পরীক্ষা করুন।
প্যাক সপ্তাহে একবারই যথেষ্ট। যেকোনো প্যাকে চুলকানি বা জ্বালা হলে ব্যবহার বন্ধ করুন।
বিজ্ঞাপন
প্রতিদিনের যত্ন আর ঘন দেখানোর কৌশল
চুল ভেজা অবস্থায় সবচেয়ে দুর্বল থাকে। তাই গামছা দিয়ে জোরে ঘষবেন না, আলতো চেপে পানি শুষে নিন। ভেজা চুলে মোটা দাঁতের চিরুনি ব্যবহার করুন, আগা থেকে জট ছাড়িয়ে ধীরে গোড়ার দিকে আসুন।
মৃদু শ্যাম্পু দিয়ে সপ্তাহে দুই-তিনবার চুল ধোয়া যথেষ্ট, ধোয়ার পর কন্ডিশনার শুধু চুলের মাঝ থেকে আগায় লাগান। চুল ঢিলা করে বাঁধুন, রাতে সুতি বা সিল্কের বালিশের কভার ব্যবহার করলে ঘষায় কম ভাঙে। প্রতি দুই-তিন মাসে আগা ছেঁটে দিন, ফাটা আগা ছাঁটলে চুল নিচের দিকে ঘন দেখায়।
চুল ঘন দেখাতে কিছু কৌশলও কাজে দেয়। কাঁধ পর্যন্ত বা তার চেয়ে ছোট লেয়ার কাট পাতলা চুলকে ভরাট দেখায়। সিঁথি মাঝে মাঝে বদলালে এক জায়গায় ফাঁকা দেখায় না। চুল শুকানোর সময় গোড়া থেকে উল্টো দিকে হালকা বাতাস দিলে চুল ফুলে থাকে।
বিজ্ঞাপন
কখন চিকিৎসক দেখাবেন
হঠাৎ গোছা গোছা চুল পড়লে, মাথায় গোল গোল টাক পড়লে, মাথার ত্বকে লালচে চাকা, আঁশ বা পুঁজ হলে, চুল পড়ার সঙ্গে ক্লান্তি, ওজনের পরিবর্তন বা অনিয়মিত মাসিক থাকলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ দেখান। চিকিৎসক প্রয়োজনে রক্তে আয়রন, থাইরয়েড ও অন্যান্য পরীক্ষা করবেন।
বংশগত চুল পাতলা হওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে কিছু ওষুধ ও চিকিৎসা আছে, যা শুরুতেই নিলে ভালো কাজ করে। এসব ওষুধ নিজে থেকে শুরু করবেন না, কারণ ভুল ব্যবহারে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
দিনে কতগুলো চুল পড়া স্বাভাবিক?
প্রতিদিন কিছু চুল পড়া স্বাভাবিক, সাধারণত ৫০ থেকে ১০০টি। গোসলের দিন বেশি মনে হতে পারে। সিঁথি চওড়া হওয়া বা গোছা ধরে পড়লে তবেই চিন্তার কারণ।
চুল কামালে কি ঘন হয়?
না। চুল কামালে বা ছেঁটে ফেললে গোড়ার সংখ্যা বাড়ে না। নতুন চুল ছোট ও শক্ত বলে ঘন মনে হয়, কিন্তু আসলে পার্থক্য হয় না।
বিজ্ঞাপন
কত দিনে চুল ঘন হওয়ার ফল পাব?
চুল মাসে মোটামুটি এক সেন্টিমিটার বাড়ে। তাই যত্ন বা চিকিৎসার ফল বুঝতে অন্তত তিন থেকে ছয় মাস ধৈর্য ধরে চালিয়ে যেতে হয়।
প্রসবের পর চুল পড়া কি স্থায়ী?
সাধারণত না। প্রসবের দুই-চার মাস পর চুল পড়া বাড়ে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এক বছরের মধ্যে আবার স্বাভাবিক হয়। সঙ্গে রক্তস্বল্পতা থাকলে চিকিৎসা নিন।