ইসলামে তালাকের নিয়ম: তালাকের প্রকার ও শরিয়তসম্মত পদ্ধতি
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
তালাক শব্দটি শুনলেই আমাদের সমাজে অনেকে ভাবেন, রাগের মাথায় তিনবার উচ্চারণ করলেই সব শেষ। ইসলামের শিক্ষা আসলে উল্টো। তালাককে রাখা হয়েছে শেষ উপায় হিসেবে, যখন মীমাংসার সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। আর তালাক দেওয়ার পদ্ধতিও এমনভাবে সাজানো, যাতে ফেরার পথ যতটা সম্ভব খোলা থাকে।
বিজ্ঞাপন
আবু দাউদে বর্ণিত একটি হাদিসে বলা হয়েছে, হালাল কাজের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হলো তালাক। হাদিসটির সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের আলোচনা আছে, তবে এর বক্তব্য কোরআন-হাদিসের সামগ্রিক শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই লেখায় হানাফি মাজহাব অনুযায়ী তালাকের নিয়ম, প্রকার, ইদ্দত এবং বাংলাদেশের আইনি প্রক্রিয়া তুলে ধরা হলো।
তালাক জীবনের একটি স্পর্শকাতর ও স্থায়ী সিদ্ধান্ত। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কী করণীয়, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একজন বিজ্ঞ মুফতি ও প্রয়োজনে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
তালাকের আগে করণীয়: মীমাংসার চেষ্টা
সুরা নিসার ৩৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা হলে স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিস নিযুক্ত করো। তারা মীমাংসা চাইলে আল্লাহ দুজনের মধ্যে মিল করে দেবেন।
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ ইসলামের প্রথম পরামর্শ হলো আলোচনা, দুই পরিবারের বিজ্ঞ মানুষের মধ্যস্থতা এবং ধৈর্য। এর আগে নিজেরা খোলামেলা কথা বলা, সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করা এবং প্রয়োজনে পারিবারিক পরামর্শকের সাহায্য নেওয়াও এই প্রচেষ্টার অংশ। রাগ, অভিমান বা তৃতীয় পক্ষের উসকানিতে তাৎক্ষণিক তালাক অনেক পরিবারকে সারা জীবনের অনুশোচনায় ফেলে।
তালাকের সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি
হানাফি ফকিহরা তালাক দেওয়ার পদ্ধতিকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন:
১. আহসান বা সর্বোত্তম পদ্ধতি: স্ত্রী যখন ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র এবং ওই পবিত্র অবস্থায় সহবাস হয়নি, তখন স্পষ্ট শব্দে মাত্র এক তালাক দেওয়া। এরপর আর কোনো তালাক না দিয়ে ইদ্দত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা। এ সময়ের মধ্যে মত বদলালে বিয়ে বহাল রাখা যায়; ইদ্দত শেষ হলে বিচ্ছেদ কার্যকর হয়, তবে দুজন চাইলে পরে নতুন বিয়ের মাধ্যমে আবার একসঙ্গে হতে পারেন।
বিজ্ঞাপন
২. হাসান বা উত্তম পদ্ধতি: তিনটি আলাদা পবিত্র অবস্থায়, প্রতিটিতে একটি করে তালাক দেওয়া। এতেও মাঝে চিন্তা ও ফেরার সুযোগ থাকে।
৩. বিদয়ি বা সুন্নাহবিরোধী পদ্ধতি: এক বৈঠকে বা এক বাক্যে তিন তালাক দেওয়া, কিংবা ঋতুস্রাবের সময় বা যে পবিত্র অবস্থায় সহবাস হয়েছে তখন তালাক দেওয়া। এভাবে তালাক দেওয়া গুনাহ, তবে হানাফিসহ অধিকাংশ ফকিহের মতে তালাক কার্যকর হয়ে যায়।
তালাকের প্রকার ও তিন তালাকের বিধান
তালাক কত প্রকার, এ প্রশ্নের উত্তরে ফলাফলের দিক থেকে তালাককে তিন ভাগে ভাগ করা হয়:
বিজ্ঞাপন
১. রজয়ি তালাক: স্পষ্ট শব্দে এক বা দুই তালাক দিলে তা রজয়ি হয়। ইদ্দতের মধ্যে স্বামী মুখে বা আচরণে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারেন, নতুন বিয়ের প্রয়োজন নেই। ফিরিয়ে নেওয়ার সময় দুজন সাক্ষী রাখা উত্তম।
২. বায়েন তালাক: ইঙ্গিতবাহী শব্দে বিচ্ছেদের নিয়তে তালাক দিলে, বা রজয়ি তালাকের পর ফিরিয়ে না নিয়ে ইদ্দত শেষ হলে, বিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে যায়। তিন তালাক পূর্ণ না হলে দুজনের সম্মতিতে নতুন মোহরে নতুন বিয়ে করে আবার সংসার করা যায়।
৩. মুগাল্লাযা বা তিন তালাক: তিন তালাক দেওয়া হলে স্ত্রী স্বামীর জন্য সম্পূর্ণ হারাম হয়ে যায়। সুরা বাকারার ২৩০ নম্বর আয়াত অনুযায়ী প্রথম স্বামীর সঙ্গে আবার বিয়ে হতে পারে কেবল তখন, যখন ওই নারী ইদ্দতের পর অন্য কাউকে স্বাভাবিক নিয়মে বিয়ে করেন, সেই স্বামীর সঙ্গে দাম্পত্য জীবন হয় এবং পরে সেই বিয়ে তালাক বা মৃত্যুর মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবে শেষ হয়।
এক বৈঠকে তিন তালাক দিলে তা তিন তালাক হিসেবে গণ্য হবে, এটি চার মাজহাবেরই মত। কিছু আলেম একে এক তালাক হিসেবে গণ্য করেন; বাংলাদেশে হানাফি মতই প্রচলিত। আর আগে থেকে চুক্তি করে শুধু আগের স্বামীর জন্য হালাল করার উদ্দেশ্যে লোক দেখানো বিয়ে, যা সমাজে 'হিল্লা বিয়ে' নামে পরিচিত, তার ব্যাপারে তিরমিজি ও আবু দাউদের হাদিসে কঠোর অভিশাপ এসেছে।
বিজ্ঞাপন
ঠাট্টা করে তালাক দিলেও তালাক হয়ে যায়। আবু দাউদ ও তিরমিজির হাদিসে বলা হয়েছে, বিয়ে, তালাক ও স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া, এই তিনটি বিষয়ে ইচ্ছা করে বলা আর ঠাট্টা করে বলা সমান। প্রচণ্ড রাগে বোধশক্তি হারিয়ে ফেলার অবস্থায় দেওয়া তালাক নিয়ে আলেমদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা আছে; এমন পরিস্থিতিতে মুফতির কাছে ঘটনা খুলে বলে ফতোয়া নিন।
ইদ্দত ও এ সময়ের অধিকার
তালাকের পর স্ত্রীকে নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করতে হয়, একে ইদ্দত বলে। সুরা বাকারার ২২৮ নম্বর আয়াত অনুযায়ী যাঁদের নিয়মিত ঋতুস্রাব হয়, তাঁদের ইদ্দত তিন ঋতুস্রাব। সুরা তালাকের ৪ নম্বর আয়াত অনুযায়ী যাঁদের ঋতুস্রাব হয় না, তাঁদের ইদ্দত তিন মাস, আর গর্ভবতীর ইদ্দত সন্তান প্রসব পর্যন্ত। সহবাস বা নির্জন সাক্ষাতের আগে তালাক হলে ইদ্দত নেই, যা সুরা আহজাবের ৪৯ নম্বর আয়াতে এসেছে।
ইদ্দতের সময় স্ত্রী অন্য কোথাও বিয়ে করতে পারেন না। সুরা তালাকের প্রথম আয়াতে তালাকপ্রাপ্তাদের ঘর থেকে বের করে দিতে নিষেধ করা হয়েছে। হানাফি মতে ইদ্দতকালে স্ত্রীর থাকা-খাওয়ার খরচ স্বামীর দায়িত্ব। সন্তান থাকলে তাদের ভরণপোষণও বাবার দায়িত্ব, তালাকের পরও।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের আইনে তালাকের প্রক্রিয়া
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ অনুযায়ী তালাক দিতে চাইলে স্বামীকে লিখিত নোটিশ দিতে হয় সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা পৌরসভার মেয়র কিংবা সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের কাছে, আর এর একটি কপি স্ত্রীকে দিতে হয়। নোটিশ পাওয়ার পর সালিসি পরিষদ গঠন করে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়। নোটিশ দেওয়ার ৯০ দিন পর তালাক আইনত কার্যকর হয়; স্ত্রী গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব বা ৯০ দিন, যেটি পরে হয়।
নোটিশ না দিয়ে তালাক দেওয়া আইনে দণ্ডনীয়। তালাকের পর কাজির কাছে নিবন্ধন করতে হয়। লক্ষ রাখুন, শরিয়ত ও দেশের আইনের মধ্যে কিছু বিষয়ে, যেমন তালাক কার্যকরের সময় ও তিন তালাকের পর পুনর্বিবাহের ক্ষেত্রে পার্থক্য আছে। তাই ধর্মীয় ও আইনি, দুই দিকের পরামর্শ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
লিখিত বা মোবাইল বার্তায় তালাক দিলে কি তালাক হয়?
স্বামী নিজে লিখে বা পাঠিয়ে তালাক দিলে শরিয়তে সাধারণত তা কার্যকর হয় বলে আলেমরা বলেছেন। তবে বার্তা আসলেই স্বামীর কি না এবং কী শব্দে লেখা, এসব খতিয়ে দেখতে হয়। আইনি প্রক্রিয়াও আলাদাভাবে সম্পন্ন করতে হবে।
এক তালাক দেওয়ার পর কি স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া যায়?
স্পষ্ট শব্দে এক বা দুই তালাক দিলে ইদ্দতের মধ্যে নতুন বিয়ে ছাড়াই ফিরিয়ে নেওয়া যায়। ইদ্দত শেষ হয়ে গেলে নতুন মোহরে নতুন বিয়ে লাগবে।
বিজ্ঞাপন
গর্ভাবস্থায় তালাক দিলে কি হয়?
শরিয়তে গর্ভাবস্থায় তালাক কার্যকর হয় এবং ইদ্দত চলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত। বাংলাদেশের আইনে প্রসব বা ৯০ দিনের মধ্যে যেটি পরে, তখন তালাক কার্যকর হয়।
তালাকের পর সন্তান কার কাছে থাকবে?
হানাফি মতে ছোট সন্তানের লালন-পালনের অধিকার সাধারণত মায়ের, নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত। ভরণপোষণের দায়িত্ব বাবার। বিরোধ হলে পারিবারিক আদালত সন্তানের কল্যাণ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দেন।