ইসলামে দেনমোহরের নিয়ম: পরিমাণ, পরিশোধ ও স্ত্রীর অধিকার
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
বিয়ের আলোচনায় দেনমোহর নিয়ে প্রায়ই দুই ধরনের প্রান্তিকতা দেখা যায়। এক পক্ষ মোহরকে সামাজিক মর্যাদার প্রতীক বানিয়ে সামর্থ্যের বহু গুণ বেশি অঙ্ক লিখিয়ে নেয়, অন্য পক্ষ লিখে দিয়ে সারা জীবন পরিশোধের কথা ভুলে থাকে। অথচ ইসলামে দেনমোহর কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, স্ত্রীর ন্যায্য অধিকার, যা পরিশোধ করা স্বামীর ওপর ফরজ।
বিজ্ঞাপন
সুরা নিসার ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, তোমরা স্ত্রীদের তাদের মোহর সন্তুষ্টচিত্তে দিয়ে দাও। তবে তারা যদি খুশি হয়ে এর কিছু অংশ ছেড়ে দেয়, তাহলে তা তোমরা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ করতে পারো। এ আয়াত থেকে মোহরের তিনটি মূলনীতি পাওয়া যায়: মোহর দিতে হবে, খুশিমনে দিতে হবে এবং তা স্ত্রীর মালিকানা, তিনি চাইলে স্বেচ্ছায় ছাড় দিতে পারেন।
দেনমোহর কেন দেওয়া হয়
দেনমোহর বিয়ের মাধ্যমে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর সম্মান ও দায়িত্বের স্বীকৃতি। এটি কনের দাম নয়, আবার পরিবারের পাওনাও নয়; মোহরের পুরো মালিক স্ত্রী নিজে। বাবা, ভাই বা শ্বশুরবাড়ির কেউ এ টাকা নিজের কাজে নিতে পারেন না, স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া।
মোহর স্ত্রীর আর্থিক নিরাপত্তারও একটি মাধ্যম। বিয়ের পর অনেক নারী নিজের উপার্জন ছেড়ে সংসারে মনোযোগ দেন। মোহরের অর্থ তাঁর নিজস্ব সম্পদ হিসেবে থাকে, যা তিনি সঞ্চয়, বিনিয়োগ বা নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারেন। তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর মতো কঠিন পরিস্থিতিতে বাকি মোহর তাঁর আইনি পাওনা হিসেবে আদায়যোগ্য।
বিজ্ঞাপন
মোহরের পরিমাণ: সর্বনিম্ন ও মোহরে ফাতেমি
হানাফি মাজহাবে মোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ দশ দিরহাম রুপা, যা প্রায় ৩০.৬ গ্রাম রুপার সমান, অর্থাৎ আনুমানিক আড়াই তোলার কিছু বেশি। এর কম মোহর নির্ধারণ করলেও স্ত্রী দশ দিরহামের মূল্য পাওয়ার অধিকারী হবেন। অন্য কিছু মাজহাবে সর্বনিম্ন পরিমাণ নিয়ে ভিন্নমত আছে; বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত একটি ঘটনায় এক দরিদ্র সাহাবির বিয়েতে কোরআনের কিছু অংশ শেখানোকে মোহর হিসেবে ধরা হয়েছিল, যার ব্যাখ্যায় ফকিহদের মধ্যে আলোচনা আছে।
মোহরের সর্বোচ্চ কোনো সীমা শরিয়ত নির্ধারণ করেনি। তবে অতিরিক্ত মোহর নির্ধারণ নিরুৎসাহিত। তিরমিজিতে হজরত উমর (রা.)-এর বক্তব্য বর্ণিত আছে, তোমরা নারীদের মোহরে বাড়াবাড়ি কোরো না; এটি যদি দুনিয়ায় সম্মান বা আল্লাহর কাছে তাকওয়ার বিষয় হতো, তাহলে নবীজিই এর সবচেয়ে বেশি হকদার হতেন।
বাংলাদেশে 'মোহরে ফাতেমি' কথাটি বেশ প্রচলিত। প্রচলিত হিসাবে এর পরিমাণ ৫০০ দিরহাম রুপা, যা প্রায় ১৫৩০ গ্রাম বা আনুমানিক ১৩১ তোলা রুপার সমান। সহিহ মুসলিমে হজরত আয়েশা (রা.) জানিয়েছেন, নবীজির স্ত্রীদের মোহর ছিল সাড়ে বারো উকিয়া, অর্থাৎ ৫০০ দিরহাম। হজরত ফাতিমা (রা.)-এর মোহরের পরিমাণ নিয়ে বর্ণনায় কিছু ভিন্নতা আছে, তবে কাছাকাছি অঙ্কটিই মোহরে ফাতেমি হিসেবে পরিচিত। টাকায় এর মূল্য রুপার বাজারদরের ওপর নির্ভর করে, তাই বিয়ের সময়কার দর অনুযায়ী হিসাব করতে হয়।
বিজ্ঞাপন
মোহরে ফাতেমি রাখা বাধ্যতামূলক নয়, আবার এর চেয়ে কম বা বেশি রাখাও নিষেধ নয়। মূল কথা হলো, বর যতটুকু পরিশোধ করতে সক্ষম এবং কনেপক্ষ যতটুকুতে সন্তুষ্ট, সেই অঙ্ক নির্ধারণ করা।
মোহরের প্রকার: নগদ ও বাকি
পরিশোধের সময় অনুযায়ী মোহর দুই ভাগে ভাগ হয়:
১. মুআজ্জাল বা নগদ মোহর: বিয়ের সময় বা স্ত্রী চাওয়ামাত্র পরিশোধযোগ্য। হানাফি মতে নগদ মোহর পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে বসবাস শুরু করতে অস্বীকার করার অধিকার রাখেন।
বিজ্ঞাপন
২. মুওয়াজ্জাল বা বাকি মোহর: নির্দিষ্ট সময় পরে বা নির্দিষ্ট ঘটনায় পরিশোধযোগ্য। তবে বাকি মানে মাফ নয়; স্বামী যত দ্রুত সম্ভব এটি পরিশোধ করবেন। তালাক বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে বাকি মোহর তাৎক্ষণিক পাওনা হয়ে যায়।
বিয়েতে দেওয়া সোনার গয়না মোহরের অংশ কি না, তা বিয়ের সময় স্পষ্ট করা জরুরি। কাবিননামায় গয়নাকে উসুল, অর্থাৎ পরিশোধিত মোহর হিসেবে লেখা হলে সেটি মোহর হিসেবে গণ্য হবে এবং গয়নার মালিক হবেন স্ত্রী। শুধু উপহার হিসেবে দিলে তা মোহরের হিসাবে আসবে না।
বিশেষ পরিস্থিতিতে মোহরের বিধান
১. সহবাসের আগে তালাক: সুরা বাকারার ২৩৭ নম্বর আয়াত অনুযায়ী নির্ধারিত মোহরের অর্ধেক দিতে হবে। হানাফি মতে স্বামী-স্ত্রী একান্তে নির্জনে মিলিত হওয়ার সুযোগ পেলে পুরো মোহর দিতে হয়।
বিজ্ঞাপন
২. সহবাসের পর তালাক: পুরো মোহর পরিশোধ করতে হবে, বাকি থাকলে তা তাৎক্ষণিক পাওনা।
৩. স্বামীর মৃত্যু: অপরিশোধিত মোহর স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে ঋণ হিসেবে আগে পরিশোধ করতে হবে, তারপর উত্তরাধিকার বণ্টন। এর পাশাপাশি স্ত্রী উত্তরাধিকারের নিজস্ব অংশও পাবেন।
৪. স্ত্রীর স্বেচ্ছায় ছাড়: স্ত্রী খুশিমনে মোহরের পুরো বা আংশিক অংশ মাফ করতে পারেন। তবে চাপ দিয়ে, লজ্জায় ফেলে বা মৃত্যুশয্যায় 'মাফ করিয়ে নেওয়া' আসল সম্মতি নয়, এমন ছাড় নিয়ে আলেমরা সতর্ক করেছেন।
৫. খুলা: স্ত্রী নিজে বিচ্ছেদ চাইলে পারস্পরিক সমঝোতায় মোহর ফেরত বা ছেড়ে দেওয়ার শর্তে খুলা হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
কাবিননামা ও বাংলাদেশের আইন
বাংলাদেশে বিয়ের নিবন্ধনের সময় কাবিননামায় মোহরের মোট অঙ্ক, নগদ ও বাকি অংশ এবং বিয়ের সময় পরিশোধিত বা উসুল অংশ আলাদা করে লিখতে হয়। স্বাক্ষরের আগে প্রতিটি ঘর পড়ে নিন এবং মৌখিক কথার সঙ্গে লেখা মিলিয়ে দেখুন।
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ অনুযায়ী কাবিননামায় মোহর পরিশোধের পদ্ধতি নির্দিষ্ট না থাকলে পুরো মোহর চাওয়ামাত্র পরিশোধযোগ্য বলে ধরা হয়। মোহর আদায় না হলে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে মামলা করতে পারেন। তাই কাবিননামা নিরাপদে সংরক্ষণ করুন এবং সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করে রাখুন।
সমাজে প্রচলিত কিছু ভুল
বিজ্ঞাপন
লোকলজ্জার ভয়ে সামর্থ্যের বাইরে বড় অঙ্কের মোহর লেখা, আর মনে মনে ধরে নেওয়া যে কোনো দিন দিতে হবে না, ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর অন্যায়। আলেমরা বলেছেন, পরিশোধের নিয়ত ছাড়া মোহর নির্ধারণ প্রতারণার শামিল। আবার কনেপক্ষের পক্ষ থেকে বরপক্ষের কাছে যৌতুক দাবি করা বা বরপক্ষের কনেপক্ষের কাছে যৌতুক চাওয়া, দুটিই বাংলাদেশের আইনে অপরাধ এবং শরিয়তেও নিন্দনীয়। মোহর দেবেন স্বামী, স্ত্রী নন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
মোহরে ফাতেমি কত টাকা?
প্রচলিত হিসাবে ৫০০ দিরহাম রুপা, অর্থাৎ প্রায় ১৫৩০ গ্রাম রুপার মূল্য। টাকার অঙ্ক নির্ভর করে বিয়ের সময়কার রুপার বাজারদরের ওপর, তাই নির্দিষ্ট দিনের দর দেখে হিসাব করুন।
বিজ্ঞাপন
বিয়ের পর কি কিস্তিতে মোহর পরিশোধ করা যায়?
যায়। বাকি মোহর সুবিধামতো কিস্তিতে পরিশোধ করা যায়। প্রতিটি পরিশোধ লিখে রাখুন, যাতে পরে হিসাব নিয়ে বিভ্রান্তি না হয়।
স্ত্রী মারা গেলে বাকি মোহরের কী হবে?
স্ত্রীর অপরিশোধিত মোহর তাঁর সম্পদ হিসেবে গণ্য হয় এবং তাঁর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন হয়। স্বামী নিজেও উত্তরাধিকারী হিসেবে নির্দিষ্ট অংশ পান, বাকিটা অন্য ওয়ারিশদের দিতে হয়।
বিজ্ঞাপন
মোহর ছাড়া কি বিয়ে হয়?
বিয়ের সময় মোহর উল্লেখ না করলেও বিয়ে শুদ্ধ হয়, তবে স্ত্রী তাঁর পরিবারের সমপর্যায়ের নারীদের প্রচলিত মোহর পাওয়ার অধিকারী হন। মোহর একেবারে না দেওয়ার শর্ত করলে সেই শর্ত বাতিল।