স্ত্রী কি তালাক দিতে পারে: খুলা ও তালাকে তাফউইজের বিধান
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
স্ত্রী কি স্বামীকে তালাক দিতে পারেন? প্রশ্নটির উত্তর শুধু হ্যাঁ বা না দিয়ে শেষ করা যায় না। ইসলামি শরিয়তে তালাক দেওয়ার মূল অধিকার স্বামীর। কিন্তু তার মানে এই নয় যে স্ত্রী অসহনীয় দাম্পত্যে আটকে থাকতে বাধ্য। শরিয়ত ও বাংলাদেশের আইন স্ত্রীর জন্য বিচ্ছেদের তিনটি স্বীকৃত পথ রেখেছে। তাই মেয়েরা কি তালাক দিতে পারে, এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর হলো: সরাসরি নিজের ইচ্ছায় নয়, তবে নির্দিষ্ট নিয়মে পারেন। স্ত্রী স্বামীকে তালাক দেওয়ার নিয়ম বলতে আসলে এই তিনটি পথকেই বোঝায়।
বিজ্ঞাপন
প্রথম পথ তালাকে তাফউইজ: বিয়ের সময় বা পরে স্বামী যদি স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা অর্পণ করেন, স্ত্রী সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজেকে তালাক দিতে পারেন। দ্বিতীয় পথ খুলা: স্ত্রী মোহর ফেরত বা ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে স্বামীর সম্মতিতে বিচ্ছেদ নেন। তৃতীয় পথ আদালত: স্বামীর নিখোঁজ থাকা, ভরণপোষণ না দেওয়া বা নির্যাতনের মতো নির্দিষ্ট কারণে পারিবারিক আদালত বিয়ে বিচ্ছেদের ডিক্রি দিতে পারেন।
বিচ্ছেদ জীবনের বড় সিদ্ধান্ত। নিজের পরিস্থিতিতে কোন পথ প্রযোজ্য, তা ঠিক করতে একজন মুফতি এবং পারিবারিক আইনে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
তালাকে তাফউইজ: কাবিনে দেওয়া তালাকের ক্ষমতা
তাফউইজ অর্থ অর্পণ করা। হানাফি মাজহাবে স্বামী তাঁর তালাক দেওয়ার অধিকার স্ত্রীকে অর্পণ করতে পারেন, শর্তসাপেক্ষে বা শর্ত ছাড়া। এভাবে অর্পিত ক্ষমতা ব্যবহার করে স্ত্রী নিজেকে তালাক দিলে তা শরিয়তে কার্যকর হয়। এখানে আসলে তালাক স্বামীর পক্ষ থেকেই হচ্ছে, স্ত্রী তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে প্রয়োগ করছেন।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের কাবিননামায় এ জন্য একটি নির্দিষ্ট ঘর থাকে, সাধারণত ১৮ নম্বর ঘর, যেখানে লেখা হয় স্বামী স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা দিয়েছেন কি না এবং দিলে কোন কোন শর্তে। অনেক সময় এ ঘরটি না পড়েই স্বাক্ষর করা হয়, বা কাজি নিজের মতো করে পূরণ করেন। বিয়ের আগে কনে ও তাঁর পরিবারের উচিত এ ঘরটি মনোযোগ দিয়ে পড়া এবং প্রয়োজনে স্পষ্ট শর্ত লিখিয়ে নেওয়া।
তাফউইজের ক্ষমতা থাকলে স্ত্রী তালাক দিতে চাইলে তাঁকে লিখিত তালাকনামা তৈরি করে আইন অনুযায়ী স্থানীয় সরকার প্রতিনিধির কাছে নোটিশ পাঠাতে হয় এবং স্বামীকে একটি কপি দিতে হয়। নোটিশের পর মীমাংসার চেষ্টা হয়, আর ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হয়। এ পথে তালাক দিলে স্ত্রী তাঁর দেনমোহরের পুরো অধিকার রাখেন।
খুলা তালাক: সমঝোতার মাধ্যমে বিচ্ছেদ
খুলার ভিত্তি কোরআনে আছে। সুরা বাকারার ২২৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যদি আশঙ্কা হয় যে স্বামী-স্ত্রী আল্লাহর সীমা রক্ষা করতে পারবে না, তাহলে স্ত্রী কিছু বিনিময় দিয়ে মুক্তি নিলে তাতে কারও গুনাহ নেই।
বিজ্ঞাপন
বুখারিতে বর্ণিত বিখ্যাত ঘটনাটি খুলার উদাহরণ। সাহাবি সাবিত ইবনে কায়েস (রা.)-এর স্ত্রী নবীজির কাছে এসে বললেন, আমি তাঁর চরিত্র বা দ্বীনদারি নিয়ে কোনো অভিযোগ করছি না, কিন্তু আমি তাঁর সঙ্গে থাকতে পারছি না এবং মুসলমান হয়ে অকৃতজ্ঞতায় জড়াতে চাই না। নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি তাঁর বাগানটি ফিরিয়ে দেবে, যা তিনি মোহর হিসেবে দিয়েছিলেন? তিনি রাজি হলেন। নবীজি সাবিতকে বাগান গ্রহণ করে স্ত্রীকে এক তালাক দিতে বললেন।
এ ঘটনা থেকে খুলার কয়েকটি নিয়ম পাওয়া যায়:
১. কারণ: স্বামীর দোষ না থাকলেও স্ত্রী যদি মনে করেন এই দাম্পত্যে থেকে তিনি আল্লাহর বিধান মেনে চলতে পারবেন না, তাহলে খুলা চাইতে পারেন।
২. বিনিময়: সাধারণত স্ত্রী মোহর ফেরত দেন বা অপরিশোধিত মোহর দাবি ছেড়ে দেন। হানাফি ফকিহরা বলেছেন, স্বামীর জন্য মোহরের বেশি নেওয়া অনুচিত, আর দোষ স্বামীর হলে কিছু নেওয়াই অনুচিত।
বিজ্ঞাপন
৩. স্বামীর সম্মতি: হানাফি মতে খুলা দুই পক্ষের সমঝোতা, তাই স্বামীর সম্মতি লাগে। স্বামী অন্যায়ভাবে রাজি না হলে স্ত্রী আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন।
৪. ফলাফল: হানাফি মাজহাবে খুলা এক তালাকে বায়েন হিসেবে গণ্য হয়। বিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে যায়, তবে স্ত্রীকে ইদ্দত পালন করতে হয়। পরে দুজন চাইলে নতুন বিয়ে করতে পারেন।
খুলার সমঝোতা লিখিত আকারে করে কাজির মাধ্যমে নিবন্ধন করে নেওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে মোহর, ভরণপোষণ বা সন্তানের বিষয়ে বিরোধ না হয়।
আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ: কোন কারণে আবেদন করা যায়
বিজ্ঞাপন
স্বামী তাফউইজ দেননি এবং খুলাতেও রাজি নন, অথচ দাম্পত্য জীবন অসম্ভব হয়ে পড়েছে, এমন ক্ষেত্রে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে বিয়ে বিচ্ছেদের মামলা করতে পারেন। হানাফি ফকিহরাও প্রয়োজনের ভিত্তিতে নিখোঁজ স্বামী বা গুরুতর ক্ষতির মতো ক্ষেত্রে বিচারকের মাধ্যমে বিচ্ছেদের সুযোগ স্বীকার করেছেন। বাংলাদেশে মুসলিম বিবাহবিচ্ছেদ আইনে এমন কিছু কারণ উল্লেখ আছে:
১. চার বছর ধরে স্বামীর কোনো খোঁজ না থাকা।
২. দুই বছর ধরে স্বামী ভরণপোষণ না দেওয়া বা অবহেলা করা।
৩. আইন অমান্য করে স্বামীর আরেকটি বিয়ে করা।
বিজ্ঞাপন
৪. স্বামীর সাত বছর বা তার বেশি মেয়াদের কারাদণ্ড।
৫. যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া তিন বছর ধরে দাম্পত্য দায়িত্ব পালন না করা।
৬. বিয়ের সময় থেকে স্বামীর পুরুষত্বহীনতা এবং তা বহাল থাকা।
৭. দুই বছর ধরে স্বামীর মানসিক অসুস্থতা বা নির্দিষ্ট কিছু গুরুতর সংক্রামক রোগ।
বিজ্ঞাপন
৮. শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, নিষ্ঠুর আচরণ, অনৈতিক জীবনে বাধ্য করার চেষ্টা বা স্ত্রীর সম্পদে অন্যায় হস্তক্ষেপ।
৯. নাবালিকা অবস্থায় অভিভাবক বিয়ে দিলে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেই বিয়ে প্রত্যাখ্যান করা, যদি দাম্পত্য সম্পর্ক না হয়ে থাকে।
আদালত প্রমাণ বিবেচনা করে বিচ্ছেদের ডিক্রি দেন। এর পরও নোটিশ ও নিবন্ধনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়।
ইদ্দত, মোহর ও সন্তানের বিষয়
বিজ্ঞাপন
যে পথেই বিচ্ছেদ হোক, সহবাস বা একান্ত সাক্ষাৎ হয়ে থাকলে স্ত্রীকে ইদ্দত পালন করতে হবে: নিয়মিত ঋতুস্রাব হলে তিন ঋতুস্রাব, না হলে তিন মাস, আর গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত। ইদ্দতকালে স্ত্রী অন্যত্র বিয়ে করতে পারবেন না।
মোহরের বিষয়ে পার্থক্য আছে। তাফউইজ বা আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদে স্ত্রী সাধারণত পুরো অপরিশোধিত মোহর পাওয়ার অধিকারী। খুলায় সমঝোতা অনুযায়ী মোহর ফেরত বা মাফ হয়। সন্তানের ভরণপোষণ সব ক্ষেত্রেই বাবার দায়িত্ব, আর ছোট সন্তানের লালন-পালনের অধিকার সাধারণত নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত মায়ের।
বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তের আগে
আবু দাউদ ও তিরমিজিতে বর্ণিত হাদিসে মহানবী (সা.) সতর্ক করেছেন, যে নারী কোনো সংগত কারণ ছাড়া স্বামীর কাছে তালাক চায়, তার জন্য জান্নাতের সুগন্ধও হারাম। আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন, এখানে 'কারণ ছাড়া' কথাটিই মূল। নির্যাতন, ভরণপোষণ না দেওয়া, দ্বীন পালনে বাধা বা সত্যিকার অর্থে একসঙ্গে থাকা অসম্ভব হলে বিচ্ছেদ চাওয়া স্ত্রীর বৈধ অধিকার।
বিজ্ঞাপন
শারীরিক নির্যাতনের শিকার হলে আগে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। জরুরি প্রয়োজনে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করা যায়, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সরকারি হেল্পলাইন ১০৯ থেকেও পরামর্শ পাওয়া যায়। সম্ভব হলে বিশ্বস্ত আত্মীয় ও আইনজীবীকে বিষয়টি জানান এবং কাবিননামা, মোহর ও যোগাযোগের প্রমাণ সংরক্ষণ করুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
কাবিনে ১৮ নম্বর ঘর পূরণ না থাকলে কি স্ত্রী তালাক দিতে পারবেন?
তাফউইজের ক্ষমতা না থাকলে স্ত্রী নিজে তালাক কার্যকর করতে পারবেন না। তখন খুলা বা আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদই পথ। বিয়ের পরও স্বামী লিখিতভাবে এ ক্ষমতা দিতে পারেন।
বিজ্ঞাপন
খুলা করলে কি পুরো মোহর ফেরত দিতে হয়?
খুলার বিনিময় দুই পক্ষের সমঝোতায় ঠিক হয়। সাধারণত মোহর ফেরত বা অপরিশোধিত মোহর মাফ করা হয়। হানাফি মতে স্বামীর জন্য মোহরের বেশি নেওয়া অনুচিত।
খুলার পর কি আবার একই স্বামীকে বিয়ে করা যায়?
যায়। খুলা এক তালাকে বায়েন, তাই আগে তিন তালাক পূর্ণ না হয়ে থাকলে দুজনের সম্মতিতে নতুন মোহরে নতুন বিয়ে করা যায়।
বিজ্ঞাপন
স্ত্রী মুখে তিনবার তালাক বললে কি তালাক হয়?
না। তাফউইজের ক্ষমতা ছাড়া স্ত্রীর মুখে তালাক শব্দ উচ্চারণে শরিয়তে তালাক হয় না। ক্ষমতা থাকলে তা প্রয়োগের সঠিক নিয়ম ও আইনি প্রক্রিয়া মানতে হয়।