মেরিন ড্রাইভ কক্সবাজার: যাতায়াত, সেরা সময়, খরচ ও দেখার বিষয়
ট্রাভেল ডেস্ক · কক্সবাজার
প্রকাশ:
কলাতলী মোড় পেরিয়ে দক্ষিণে মোড় নিলেই রাস্তার চরিত্র বদলে যায়। ডান পাশে ঝাউবন আর তার ওপারে বঙ্গোপসাগর, বাঁ পাশে খাড়া সবুজ পাহাড়। কখনো রাস্তা সমুদ্রের এত কাছে চলে আসে যে গাড়ির জানালা দিয়ে ঢেউয়ের শব্দ শোনা যায়। এটিই মেরিন ড্রাইভ কক্সবাজার, দেশের সবচেয়ে সুন্দর সড়কপথগুলোর একটি।
বিজ্ঞাপন
মেরিন ড্রাইভ কক্সবাজার কোথায় অবস্থিত? কক্সবাজার শহরের কলাতলী থেকে শুরু হয়ে সমুদ্রের পাশ ঘেঁষে দক্ষিণে টেকনাফ পর্যন্ত গেছে সড়কটি, দৈর্ঘ্য প্রায় ৮০ কিলোমিটার। সেনাবাহিনীর প্রকৌশল শাখার তত্ত্বাবধানে পর্যায়ক্রমে এটি নির্মিত হয়। পথে কক্সবাজার সদর, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার উপকূল ছুঁয়ে যেতে হয়।
মেরিন ড্রাইভ নিজেই একটি গন্তব্য, তবে এর পাশে পরপর কয়েকটি দেখার জায়গাও আছে: দরিয়ানগর, হিমছড়ি, ইনানী, পাটোয়ারটেক, শামলাপুর আর শেষে টেকনাফ। শুধু ইনানী পর্যন্ত গেলে আধা দিন যথেষ্ট, টেকনাফ পর্যন্ত যেতে চাইলে পুরো দিন রাখুন।
পথে যা যা দেখবেন
১. দরিয়ানগর: কলাতলী থেকে অল্প দূরে। পাহাড়ের গায়ে একটি পুরোনো গুহাপথ আর সৈকতের জন্য পরিচিত। মৌসুমে এখানে প্যারাসেইলিংয়ের মতো কিছু অ্যাডভেঞ্চার কার্যক্রম চলে, অংশ নেওয়ার আগে নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও পরিচালনাকারীর অভিজ্ঞতা দেখে নিন।
বিজ্ঞাপন
২. হিমছড়ি: শহর থেকে আনুমানিক ১২ কিলোমিটার দূরে। পাহাড়চূড়ার ভিউ পয়েন্ট, বর্ষার ঝরনা আর নিরিবিলি সৈকত।
৩. ইনানী: উখিয়া উপজেলায়, শহর থেকে আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে। ভাটার সময় জেগে ওঠা পাথুরে সৈকত আর স্বচ্ছ পানির জন্য বিখ্যাত।
৪. পাটোয়ারটেক: ইনানীর কাছেই আরেকটি পাথুরে সৈকত, তুলনামূলক কম ভিড়ের। সূর্যাস্তের সময় এখানে আলো আর পাথরের দৃশ্য দেখার মতো।
৫. শামলাপুর ও বাহারছড়া: টেকনাফের পথে জেলেপল্লি আর লম্বা নির্জন সৈকত। ভোরে বা বিকেলে জেলেদের নৌকা ভেড়ানো আর মাছ নামানোর দৃশ্য দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
৬. টেকনাফ সমুদ্রসৈকত ও শহর: মেরিন ড্রাইভের শেষ প্রান্ত। টেকনাফ শহরে মাথিন কূপ নামে একটি ঐতিহাসিক কূপ আছে, যাকে ঘিরে একটি প্রেমকাহিনি প্রচলিত। টেকনাফ থেকেই নাফ নদীর ওপারে মিয়ানমারের পাহাড় দেখা যায়।
পথের যেকোনো নিরিবিলি জায়গায় থেমে ঝাউবনের ছায়ায় বসে থাকা, ডাব খাওয়া আর সমুদ্র দেখা, মেরিন ড্রাইভের আসল আনন্দ এটুকুই।
মেরিন ড্রাইভ কক্সবাজার যাওয়ার উপায়
ঢাকা থেকে প্রথমে কক্সবাজার পৌঁছাতে হবে: ট্রেনে কক্সবাজার এক্সপ্রেস বা পর্যটক এক্সপ্রেস, বাসে সায়েদাবাদ-ফকিরাপুল-আরামবাগ-কলাবাগান থেকে, অথবা বিমানে। কক্সবাজার শহরে পৌঁছে মেরিন ড্রাইভ ঘোরার কয়েকটি উপায়:
বিজ্ঞাপন
খোলা জিপ বা চাঁদের গাড়ি: বড় দলের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয়। খোলা গাড়িতে সমুদ্রের বাতাস গায়ে লাগিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আলাদা। কলাতলী এলাকায় জিপ ভাড়া পাওয়া যায়, সাধারণত রুটভিত্তিক প্যাকেজে।
সিএনজিচালিত অটোরিকশা: চার-পাঁচজনের দলের জন্য সাশ্রয়ী। ইনানী পর্যন্ত আধা দিনের রিজার্ভে সুবিধাজনক।
প্রাইভেট কার বা মাইক্রোবাস: পরিবার ও বয়স্ক সদস্য থাকলে আরামদায়ক, বিশেষ করে টেকনাফ পর্যন্ত লম্বা পথে।
লোকাল বাস ও শেয়ারের বাহন: কক্সবাজার থেকে টেকনাফগামী কিছু বাহন মেরিন ড্রাইভ ধরে চলে। খরচ খুব কম, তবে পছন্দমতো থামার সুযোগ থাকে না।
বিজ্ঞাপন
সাইকেল বা স্কুটার: কলাতলীতে কিছু জায়গায় ভাড়া পাওয়া যায়। মোটরচালিত বাহন চালাতে বৈধ লাইসেন্স ও হেলমেট বাধ্যতামূলক।
কখন যাবেন
নভেম্বর থেকে মার্চ মেরিন ড্রাইভ ভ্রমণের সেরা সময়। আকাশ পরিষ্কার, সমুদ্র শান্ত আর রোদের তেজও কম। বর্ষায় সবুজ পাহাড় আর মেঘলা সমুদ্রের রূপ সুন্দর, কিন্তু বৃষ্টিতে খোলা গাড়িতে যাওয়া কঠিন, সৈকতে নামাও ঝুঁকিপূর্ণ। এপ্রিল-মে মাসে গরম বেশি থাকে।
দিনের মধ্যে বিকেলটাই সবচেয়ে উপভোগ্য। দুপুরের পর রওনা দিলে পথে দুই-তিনটি জায়গায় থেমে সূর্যাস্তের সময় ইনানী বা পাটোয়ারটেকে পৌঁছানো যায়। টেকনাফ পর্যন্ত যেতে চাইলে সকালেই রওনা দিন।
বিজ্ঞাপন
এক দিনের একটি নমুনা পরিকল্পনা
টেকনাফ পর্যন্ত পুরো মেরিন ড্রাইভ এক দিনে দেখতে চাইলে নিচের ছকটি কাজে লাগতে পারে। দলের গতি ও আগ্রহ অনুযায়ী সময় বদলে নিন।
১. সকাল আটটা: কলাতলী থেকে রওনা। সকালের আলোয় দরিয়ানগর ও হিমছড়ির পাহাড়ে ছবি ভালো আসে, ভিড়ও কম থাকে।
২. সকাল দশটা থেকে দুপুর বারোটা: ইনানী ও পাটোয়ারটেক। ভাটা থাকলে পাথুরে সৈকতে হাঁটুন, না থাকলে ঝাউবনের ছায়ায় বিশ্রাম নিন।
বিজ্ঞাপন
৩. দুপুর একটা: পথের কোনো রেস্তোরাঁ বা রিসোর্টে দুপুরের খাবার। খাবারের দাম আগে জেনে নিন।
৪. বিকেল তিনটা: শামলাপুর হয়ে টেকনাফ। টেকনাফে মাথিন কূপ দেখে নাফ নদীর ধারে কিছুক্ষণ।
৫. সন্ধ্যার আগে ফেরা শুরু: ফেরার পথে কোনো নিরিবিলি সৈকতে থেমে সূর্যাস্ত দেখে রাতে কক্সবাজার শহরে ফেরা।
টেকনাফ থেকে কক্সবাজার ফেরার পথ মহাসড়ক ধরেও নেওয়া যায়, তাতে সময় কিছুটা কম লাগতে পারে। তবে মেরিন ড্রাইভের দৃশ্য চাইলে একই পথে ফিরুন।
বিজ্ঞাপন
মেরিন ড্রাইভ কক্সবাজার ভ্রমণ খরচ
নিচের সব অঙ্ক আনুমানিক, মৌসুম, দরদাম ও কতক্ষণ থাকবেন তার ওপর নির্ভর করে।
ইনানী পর্যন্ত জিপ: যাওয়া-আসা ও পথে কয়েকটি জায়গায় থামাসহ আনুমানিক ২৫০০ থেকে ৪০০০ টাকা।
টেকনাফ পর্যন্ত জিপ বা মাইক্রোবাস: পুরো দিনের জন্য আনুমানিক ৫০০০ থেকে ৮০০০ টাকা।
বিজ্ঞাপন
ইনানী পর্যন্ত সিএনজি: আনুমানিক ১২০০ থেকে ২০০০ টাকা।
প্রবেশ টিকিট ও খাবার: হিমছড়ির মতো কিছু জায়গায় সামান্য প্রবেশ ফি লাগে। পথের দোকানে ডাব, চা, ভাজা মাছ আর হালকা খাবার পাওয়া যায়।
আট-দশজনের দলে জিপ ভাগ করলে ইনানী পর্যন্ত জনপ্রতি আনুমানিক ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় মেরিন ড্রাইভ ঘোরা যায়। থাকার জন্য কক্সবাজার শহরের হোটেলই সুবিধাজনক, তবে মেরিন ড্রাইভের ধারে নানা মানের রিসোর্টও আছে।
সতর্কতা
বিজ্ঞাপন
গতি নিয়ন্ত্রণ: সড়কটি ফাঁকা ও সুন্দর বলে অনেক চালক দ্রুত চালান। বাঁক আর হঠাৎ রাস্তা পার হওয়া মানুষ ও গবাদিপশুর কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। চালককে ধীরে চালাতে বলুন।
খোলা গাড়িতে দাঁড়িয়ে নয়: জিপে দাঁড়িয়ে বা ছাদে বসে ছবি তোলা বিপজ্জনক।
রাস্তা পারাপার: গাড়ি থামিয়ে সৈকতে যাওয়ার সময় শিশুদের হাত ধরে রাখুন।
সৈকতে নামার আগে: মেরিন ড্রাইভের অনেক সৈকতে লাইফগার্ড থাকে না। জোয়ার-ভাটা না জেনে পানিতে নামবেন না।
বিজ্ঞাপন
টেকনাফ এলাকায়: সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় চেকপোস্টে পরিচয়পত্র দেখাতে হতে পারে। জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখুন, সন্ধ্যার পর দূরের নির্জন জায়গায় না থাকাই ভালো।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
মেরিন ড্রাইভ কত কিলোমিটার?
কক্সবাজারের কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮০ কিলোমিটার।
বিজ্ঞাপন
এক দিনে কি টেকনাফ পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ ঘোরা যায়?
হ্যাঁ, সকালে রওনা দিয়ে পথে কয়েকটি জায়গায় থেমে সন্ধ্যার মধ্যে ফেরা যায়। তবে ইনানী পর্যন্ত গিয়ে ফিরলে ভ্রমণ বেশি আরামদায়ক হয়।
মেরিন ড্রাইভ ঘোরার জন্য কোন বাহন ভালো?
বড় দলের জন্য খোলা জিপ, ছোট দলের জন্য সিএনজি আর পরিবারের জন্য প্রাইভেট কার বা মাইক্রোবাস। কম খরচে যেতে চাইলে লোকাল বাহন, তবে তাতে ইচ্ছামতো থামা যায় না।
বিজ্ঞাপন
মেরিন ড্রাইভে সূর্যাস্ত দেখার সেরা জায়গা কোনটি?
ইনানী ও পাটোয়ারটেকের পাথুরে সৈকত সূর্যাস্তের জন্য জনপ্রিয়। হিমছড়ির পাহাড়চূড়া থেকেও সূর্যাস্ত ভালো দেখা যায়।
মেরিন ড্রাইভে কি নিজের গাড়ি নিয়ে যাওয়া যায়?
যায়। সড়কটি সবার জন্য খোলা। তবে বাঁক ও হঠাৎ রাস্তা পার হওয়া মানুষের কারণে সাবধানে, নির্ধারিত গতিতে চালান এবং সৈকতের পাশে গাড়ি রাখার সময় রাস্তার কিনারা থেকে সরিয়ে রাখুন।