হিমছড়ি ভ্রমণ গাইড: যাতায়াত, সেরা সময়, খরচ ও দেখার বিষয়
ট্রাভেল ডেস্ক · কক্সবাজার
প্রকাশ:
কক্সবাজারে গিয়ে যদি শুধু একটি জায়গা শহরের বাইরে দেখার সময় থাকে, তাহলে অনেকেই হিমছড়িকে বেছে নেন। কারণটা সহজ: কাছে, খরচ কম, আর এক জায়গাতেই পাহাড়, ঝরনা ও সমুদ্র তিনটিই মেলে। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে নিচে তাকালে একদিকে মেরিন ড্রাইভের আঁকাবাঁকা রাস্তা, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের দিগন্তছোঁয়া নীল।
বিজ্ঞাপন
হিমছড়ি কোথায় অবস্থিত? কক্সবাজার জেলায়, শহরের কলাতলী মোড় থেকে মেরিন ড্রাইভ ধরে আনুমানিক ১২ কিলোমিটার দক্ষিণে। পাহাড়ি এলাকাটি হিমছড়ি জাতীয় উদ্যানের অংশ, যেখানে চিরসবুজ ও আধা-চিরসবুজ বনের গাছপালা দেখা যায়। রাস্তার পূর্ব পাশে পাহাড় ও ঝরনা, পশ্চিম পাশে সৈকত।
কলাতলী থেকে ইজিবাইক, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা খোলা জিপে আধা ঘণ্টার মতো লাগে। দুই-তিন ঘণ্টা হাতে রাখলেই হিমছড়ি ঘুরে শহরে ফেরা যায়। চাইলে একই যাত্রায় আরও দক্ষিণে ইনানী পর্যন্ত যাওয়া যায়।
হিমছড়িতে কী দেখবেন
পাহাড়চূড়ার ভিউ পয়েন্ট: হিমছড়ির প্রধান আকর্ষণ। প্রবেশপথ থেকে কয়েক শ সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়ের ওপরে উঠতে হয়। মাঝপথে কয়েকটি বিশ্রামের জায়গা আছে। চূড়া থেকে সমুদ্র, সৈকত আর সবুজ পাহাড়ের সারি একসঙ্গে দেখা যায়। পরিষ্কার দিনে বহুদূর পর্যন্ত সৈকতরেখা চোখে পড়ে।
বিজ্ঞাপন
ঝরনা: পাহাড় থেকে নেমে আসা ছোট একটি ঝরনা। বর্ষা ও বর্ষার পরপর এতে পানি থাকে, শীত ও গ্রীষ্মে পানি অনেক কমে যায় বা প্রায় শুকিয়ে যায়। তাই শুকনো মৌসুমে গিয়ে বড় ঝরনা আশা করলে হতাশ হতে পারেন।
হিমছড়ি সৈকত: রাস্তার অন্য পাশে সৈকত, যা কক্সবাজারের মূল সৈকতের চেয়ে নিরিবিলি। পাহাড় থেকে নেমে কিছুক্ষণ এখানে হাঁটা যায়। এখানকার ঢেউও কোথাও কোথাও প্রবল, তাই পানিতে নামতে সতর্ক থাকুন।
বনের পথ: জাতীয় উদ্যানের ভেতরে কিছু হাঁটার পথ আছে। পাখি, প্রজাপতি আর নানা গাছ দেখতে ভালো লাগে। তবে নির্ধারিত পথের বাইরে একা যাবেন না।
মেরিন ড্রাইভের দৃশ্য: হিমছড়ি যাওয়ার পথটাই দেখার মতো। এক পাশে পাহাড়ের দেয়াল, অন্য পাশে ঝাউবন আর সমুদ্র।
বিজ্ঞাপন
হিমছড়ির বন: একটু পেছনের কথা
হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান কক্সবাজার উপকূলের পাহাড়ি বনাঞ্চলের একটি সংরক্ষিত অংশ। একসময় এই বনে হাতিসহ নানা বন্যপ্রাণীর অবাধ চলাচল ছিল। জনবসতি, রাস্তা আর বন উজাড়ের চাপে সেই বন এখন অনেকটাই সংকুচিত। তবু উদ্যানের ভেতরে গর্জন, বৈলাম, চাপালিশের মতো বড় গাছ, লতাগুল্ম আর নানা প্রজাতির পাখি দেখা যায়।
পর্যটকদের চাপ সামাল দিতে বন বিভাগ এখানে প্রবেশ টিকিট, সিঁড়ি, বিশ্রামের ছাউনি ও নির্ধারিত পথ তৈরি করেছে। উদ্যানের নিয়ম মেনে চলা মানে শুধু নিজের নিরাপত্তা নয়, বনের এই ছোট অংশটিকে টিকিয়ে রাখাও।
ভিউ পয়েন্টে ওঠার আগে প্রবেশপথে লাগানো মানচিত্র ও নির্দেশনা একবার দেখে নিন। কোন পথে উঠবেন, কোন পথে নামবেন আর কোথায় বিশ্রামের জায়গা, তা জানা থাকলে বয়স্ক ও শিশুদের নিয়ে ঘোরা সহজ হয়।
বিজ্ঞাপন
হিমছড়ি যাওয়ার উপায়
প্রথমে ঢাকা থেকে কক্সবাজার পৌঁছাতে হবে। ঢাকা থেকে কক্সবাজার এক্সপ্রেস বা পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনে, সায়েদাবাদ-ফকিরাপুল-আরামবাগ-কলাবাগান থেকে বাসে, অথবা বিমানে যাওয়া যায়। ট্রেনে আট-নয় ঘণ্টা, বাসে দশ-বারো ঘণ্টা আর আকাশপথে এক ঘণ্টার মতো লাগে।
কক্সবাজার শহর থেকে হিমছড়ি যাওয়ার কয়েকটি উপায়:
১. ইজিবাইক বা অটোরিকশা: কলাতলী মোড় থেকে সহজে পাওয়া যায়। দুই-তিনজনের জন্য সাশ্রয়ী। শেয়ারে গেলে জনপ্রতি খরচ আরও কম। রিজার্ভ নিলে যাওয়া-আসা ও অপেক্ষার সময় মিলিয়ে ভাড়া আগেই ঠিক করুন।
বিজ্ঞাপন
২. সিএনজিচালিত অটোরিকশা: চার-পাঁচজনের দলের জন্য উপযুক্ত। হিমছড়ি আর ইনানী একসঙ্গে ঘুরতে চাইলে পুরো দিনের জন্য রিজার্ভ নেওয়া যায়।
৩. খোলা জিপ বা চাঁদের গাড়ি: বড় দলের জন্য। মেরিন ড্রাইভে খোলা গাড়িতে যাওয়ার আনন্দ আলাদা। তবে ছোট দলের জন্য খরচ বেশি পড়ে।
৪. সাইকেল বা ভাড়ার স্কুটার: কলাতলী এলাকায় কিছু জায়গায় ভাড়া পাওয়া যায়। লাইসেন্স ও হেলমেট ছাড়া মোটরচালিত বাহন চালাবেন না।
কখন যাবেন
বিজ্ঞাপন
ঝরনায় পানি দেখতে চাইলে বর্ষা ও বর্ষার পরপর, মোটামুটি জুলাই থেকে অক্টোবর। তবে ভারী বৃষ্টির দিনে পাহাড়ের সিঁড়ি পিচ্ছিল হয়, পাহাড়ধসের ঝুঁকিও থাকে।
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি আবহাওয়া আরামদায়ক, সিঁড়ি বেয়ে ওঠাও কম কষ্টের। ঝরনায় পানি কম থাকলেও চূড়া থেকে আকাশ পরিষ্কার পাওয়া যায়। দিনের হিসাবে সকাল বা বিকেল ভালো। দুপুরে রোদ চড়া থাকে, আর বিকেলে গেলে ফেরার পথে মেরিন ড্রাইভে সূর্যাস্ত দেখা যায়। ছুটির দিনে দুপুরের পর ভিড় অনেক বাড়ে।
হিমছড়ি ভ্রমণ খরচ
হিমছড়ি কক্সবাজারের সবচেয়ে কম খরচের ভ্রমণগুলোর একটি। নিচের অঙ্কগুলো আনুমানিক, মৌসুম ও দরদামভেদে বদলায়।
বিজ্ঞাপন
যাতায়াত: কলাতলী থেকে ইজিবাইক রিজার্ভে যাওয়া-আসা আনুমানিক ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা। সিএনজিতে আনুমানিক ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা। ইনানী পর্যন্ত পুরো দিনের রিজার্ভে খরচ বেশি।
প্রবেশ টিকিট: জাতীয় উদ্যান ও ঝরনা এলাকায় প্রবেশের জন্য জনপ্রতি টিকিট লাগে, অঙ্ক সাধারণত কম। গাড়ির পার্কিং ফি আলাদা হতে পারে।
খাবার: প্রবেশপথের আশপাশে ডাব, চা, ভাজাপোড়া আর হালকা খাবারের দোকান আছে। ভারী খাবার শহরে ফিরে খাওয়াই ভালো।
দুজন মিলে গেলে জনপ্রতি আনুমানিক ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় হিমছড়ি ঘুরে আসা যায়। কোথায় থাকবেন, সেই প্রশ্নে হিমছড়ির জন্য আলাদা করে ভাবতে হয় না। বেশির ভাগ পর্যটক কক্সবাজারের কলাতলী, সুগন্ধা বা লাবণী এলাকার হোটেলে থেকে হিমছড়ি ঘুরে আসেন। মেরিন ড্রাইভের ধারে কিছু রিসোর্টও আছে, তবে খরচ বেশি।
বিজ্ঞাপন
সতর্কতা
১. সিঁড়ি: পাহাড়ের সিঁড়ি খাড়া। হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট বা হাঁটুর সমস্যা থাকলে পুরো চূড়ায় ওঠার চেষ্টা করবেন না। মাঝপথে বিশ্রাম নিন, পানি সঙ্গে রাখুন।
২. রেলিং ও কিনারা: ছবি তুলতে গিয়ে রেলিং টপকে বা পাহাড়ের কিনারে যাবেন না। বর্ষায় মাটি নরম থাকে।
৩. সৈকতে নামার আগে: হিমছড়ির সৈকতে সব জায়গায় লাইফগার্ড থাকে না। জোয়ার-ভাটার সময় জেনে নিন, ভাটার টানে দূরে সাঁতার কাটবেন না।
বিজ্ঞাপন
৪. রাস্তা পারাপার: মেরিন ড্রাইভে গাড়ি দ্রুতগতিতে চলে। পাহাড় থেকে সৈকতে যেতে রাস্তা পার হওয়ার সময় শিশুদের হাত ধরে রাখুন।
৫. পরিবেশ রক্ষা: জাতীয় উদ্যানে প্লাস্টিক ও খাবারের প্যাকেট ফেলবেন না, গাছের ডাল ভাঙবেন না।
৬. ফেরার সময়: সন্ধ্যার পর মেরিন ড্রাইভে বাহন কমে যায়। রিজার্ভ না নিলে অন্ধকার নামার আগে ফেরার বাহন ধরুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
হিমছড়ি কোথায় অবস্থিত?
কক্সবাজার শহরের কলাতলী থেকে মেরিন ড্রাইভ ধরে আনুমানিক ১২ কিলোমিটার দক্ষিণে, হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান এলাকায়।
হিমছড়ির ঝরনায় কি সারা বছর পানি থাকে?
না। বর্ষা ও বর্ষার পরপর পানি থাকে, শুকনো মৌসুমে পানি খুব কমে যায়।
বিজ্ঞাপন
হিমছড়ি আর ইনানী কি একদিনে ঘোরা যায়?
হ্যাঁ। সকালে বা দুপুরের পর বেরিয়ে প্রথমে হিমছড়ি, তারপর ইনানী ঘুরে সূর্যাস্তের পর শহরে ফেরা যায়। পুরো দিনের জন্য একটি বাহন রিজার্ভ নিলে সুবিধা হয়।
শিশুদের নিয়ে কি হিমছড়ির চূড়ায় ওঠা যায়?
ওঠা যায়, তবে সিঁড়ি খাড়া বলে ধীরে ধীরে উঠুন এবং শিশুদের সব সময় হাত ধরে রাখুন। ছোট শিশুদের জন্য মাঝপথের বিশ্রামের জায়গা পর্যন্ত যাওয়াই যথেষ্ট হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
হিমছড়ি ঘুরতে মোট কত সময় লাগে?
কলাতলী থেকে যাওয়া-আসা, চূড়ায় ওঠা-নামা, ঝরনা ও সৈকত মিলিয়ে সাধারণত আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। ছবি তোলা আর বিশ্রাম নিলে আরও কিছু সময় যোগ করুন।