ঘরোয়া পদ্ধতিতে ফেসিয়াল করার নিয়ম: ধাপে ধাপে পার্লারের মতো যত্ন
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
পার্লারে গিয়ে ফেসিয়াল করানো সময়সাপেক্ষ, খরচও কম নয়। অথচ রান্নাঘরে থাকা কয়েকটি সাধারণ উপকরণ দিয়ে ঘরোয়া পদ্ধতিতে ফেসিয়াল করা যায়, আর ঠিকমতো করলে ফলও প্রায় কাছাকাছি। মূল কথা হলো ধাপগুলো ক্রমানুসারে করা: আগে মুখ পরিষ্কার, তারপর মৃত কোষ তোলা, ভাপ দিয়ে লোমকূপ নরম করা, ফেসপ্যাক লাগানো এবং শেষে ময়েশ্চারাইজার দিয়ে আর্দ্রতা ধরে রাখা।
বিজ্ঞাপন
পুরো কাজটি করতে ৪০ থেকে ৫০ মিনিট লাগে। সপ্তাহে একবার নয়, মাসে একবার বা বড়জোর তিন-চার সপ্তাহ পরপর করাই যথেষ্ট। বেশি ঘন ঘন স্ক্রাব আর ভাপ দিলে ত্বক উল্টো শুষ্ক ও সংবেদনশীল হয়ে পড়ে।
শুরুর আগে নিজের ত্বকের ধরন জেনে নিন। তৈলাক্ত, শুষ্ক, মিশ্র আর সংবেদনশীল ত্বকের জন্য উপকরণ কিছুটা আলাদা হয়। নিচে প্রতিটি ধাপ, উপকরণ আর সাবধানতা আলাদা করে দেওয়া হলো।
ফেসিয়ালের জন্য যা যা লাগবে
বাজার থেকে দামি কিছু কেনার দরকার নেই। হাতের কাছে রাখুন একটি মৃদু ফেসওয়াশ বা ক্লিনজার, কাঁচা দুধ, মিহি চিনি বা চালের গুঁড়া, মধু, টক দই, বেসন, অ্যালোভেরা জেল, একটি বড় বাটি, গরম পানি, পরিষ্কার নরম তোয়ালে আর তুলা। ত্বক শুষ্ক হলে নারকেল তেল বা বাদাম তেলের কয়েক ফোঁটা কাজে লাগবে। চুল যেন মুখে না পড়ে, সে জন্য একটি হেয়ারব্যান্ড রাখুন।
বিজ্ঞাপন
সব উপকরণ আগে থেকে গুছিয়ে নিলে মাঝপথে উঠতে হয় না। হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে নিন, কারণ ময়লা হাত থেকেই মুখে জীবাণু সবচেয়ে বেশি যায়।
ঘরে ফেসিয়াল করার উপায়: ধাপে ধাপে
১. মেকআপ তোলা ও ক্লিনজিং: মুখে মেকআপ বা সানস্ক্রিন থাকলে প্রথমে তুলায় কাঁচা দুধ বা মেকআপ রিমুভার নিয়ে আলতো করে মুছে ফেলুন। এরপর কুসুম গরম পানিতে মুখ ভিজিয়ে মৃদু ফেসওয়াশ দিয়ে এক মিনিট গোল গোল করে ম্যাসাজ করুন এবং ধুয়ে ফেলুন। কড়া সাবান ব্যবহার করবেন না, এতে ত্বক টান ধরে।
২. হালকা স্ক্রাব: এক চা-চামচ মিহি চিনি বা চালের গুঁড়ার সঙ্গে এক চা-চামচ মধু মিশিয়ে নিন। ভেজা মুখে আঙুলের ডগা দিয়ে খুব হালকা হাতে দুই থেকে তিন মিনিট ঘষুন, বিশেষ করে নাক আর থুতনিতে, যেখানে ব্ল্যাকহেডস বেশি থাকে। জোরে ঘষলে ত্বকে সূক্ষ্ম আঁচড় পড়ে, তাই চাপ দেবেন না। চোখের চারপাশ এড়িয়ে চলুন।
বিজ্ঞাপন
৩. ভাপ নেওয়া: একটি বাটিতে গরম পানি নিয়ে মাথায় তোয়ালে ঢেকে মুখ অন্তত এক বিঘত দূরে রাখুন। পাঁচ থেকে সাত মিনিট ভাপ নিলেই যথেষ্ট। ফুটন্ত পানির খুব কাছে মুখ নেবেন না, পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ভাপে লোমকূপ নরম হয়, ময়লা সহজে বের হয়।
৪. ব্ল্যাকহেডস পরিষ্কার: ভাপের পর নাকের পাশে নরম হয়ে আসা ব্ল্যাকহেডস পরিষ্কার টিস্যু জড়ানো আঙুলে খুব হালকা চাপ দিলে বের হতে পারে। না বের হলে জোর করবেন না। নখ দিয়ে খোঁটা বা ব্রণ চাপা একেবারেই নিষেধ, এতে দাগ আর সংক্রমণ হয়।
৫. ফেসপ্যাক: ত্বকের ধরন অনুযায়ী প্যাক বানিয়ে চোখ ও ঠোঁট বাদ দিয়ে পুরো মুখ আর গলায় লাগান। ১৫ থেকে ২০ মিনিট রাখুন, পুরোপুরি শুকিয়ে খটখটে হওয়ার আগেই ধুয়ে ফেলুন। প্যাক লাগিয়ে কথা বলা বা হাসা কমিয়ে দিন।
৬. টোনিং: প্যাক ধোয়ার পর তুলায় গোলাপজল বা ঠান্ডা পানি নিয়ে মুখে আলতো চাপ দিন। এতে ত্বক ঠান্ডা হয় এবং সতেজ লাগে।
বিজ্ঞাপন
৭. ময়েশ্চারাইজার: শেষ ধাপ বাদ দিলে আগের সব পরিশ্রম অনেকটাই বৃথা। ত্বক সামান্য ভেজা থাকতেই ময়েশ্চারাইজার বা অ্যালোভেরা জেল লাগান। দিনের বেলা হলে বাইরে যাওয়ার আগে সানস্ক্রিন দিন, কারণ স্ক্রাবের পর ত্বক রোদে বেশি সংবেদনশীল থাকে।
ত্বকের ধরন বুঝে ফেসপ্যাক বেছে নিন
তৈলাক্ত ত্বক: দুই চা-চামচ বেসন, এক চা-চামচ টক দই আর সামান্য গোলাপজল মিশিয়ে ঘন পেস্ট করুন। এটি বাড়তি তেল শুষে নিতে সাহায্য করে। মুলতানি মাটিও তৈলাক্ত ত্বকে ভালো, তবে সপ্তাহে একবারের বেশি নয়।
শুষ্ক ত্বক: এক টেবিল-চামচ পাকা কলা চটকে তাতে এক চা-চামচ মধু আর কয়েক ফোঁটা কাঁচা দুধ মেশান। মধু আর্দ্রতা ধরে রাখে, কলা ত্বক নরম করে।
বিজ্ঞাপন
মিশ্র ত্বক: টি-জোন অর্থাৎ কপাল, নাক আর থুতনিতে বেসন-দইয়ের প্যাক এবং গালে মধু-দুধের প্যাক আলাদা করে লাগাতে পারেন।
সংবেদনশীল ত্বক: শুধু অ্যালোভেরা জেল বা টক দই সবচেয়ে নিরাপদ। লেবু, টমেটো, দারুচিনি বা বেকিং সোডার মতো উপকরণ এড়িয়ে চলুন। এগুলো অনেকের ত্বকে জ্বালাপোড়া আর লালচে ভাব তৈরি করে।
যেকোনো নতুন উপকরণ মুখে দেওয়ার আগে কানের পেছনে বা কবজির ভেতরে অল্প লাগিয়ে ২৪ ঘণ্টা দেখে নিন। চুলকানি বা লাল হলে সেটি বাদ দিন।
যে ভুলগুলো ফেসিয়ালের ফল নষ্ট করে
বিজ্ঞাপন
অনেকে ভাবেন বেশি ঘষলে বেশি পরিষ্কার হবে। আসলে অতিরিক্ত স্ক্রাব ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষা স্তর নষ্ট করে, ফলে ত্বক লাল হয়, জ্বলে এবং আরও বেশি তেল তৈরি হয়।
সরাসরি লেবুর রস মুখে লাগানো আরেকটি প্রচলিত ভুল। লেবুর অম্লতা ত্বকে জ্বালা ধরাতে পারে, রোদে গেলে দাগও পড়তে পারে।
ফেসপ্যাক মুখে পুরোপুরি শুকিয়ে ফাটিয়ে ফেলা, একই তোয়ালে বারবার ব্যবহার করা, আর ফেসিয়ালের পরপরই ভারী মেকআপ করাও ঠিক নয়। ফেসিয়ালের পর অন্তত কয়েক ঘণ্টা ত্বককে বিশ্রাম দিন। সবচেয়ে ভালো হয় রাতে ঘুমানোর আগে ফেসিয়াল করলে।
কারা সাবধান থাকবেন
বিজ্ঞাপন
মুখে সক্রিয় ব্রণ, পুঁজভরা দানা, একজিমা, রোদে পোড়া ক্ষত বা কাটা জায়গা থাকলে স্ক্রাব আর ভাপ দুটোই বাদ দিন। এ অবস্থায় শুধু মৃদু ক্লিনজার আর ময়েশ্চারাইজারই যথেষ্ট।
যাঁদের হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে, তাঁরা ভাপ নেওয়ার সময় তোয়ালে পুরোপুরি ঢেকে রাখবেন না। মুখে বারবার ফুসকুড়ি ওঠা, দীর্ঘদিনের ব্রণ, হঠাৎ কালো দাগ বা চুলকানি হলে ঘরোয়া উপায়ে পরীক্ষা না করে একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
ফেসিয়ালের ফল ধরে রাখার অভ্যাস
একদিনের ফেসিয়াল ত্বককে সাময়িক উজ্জ্বল করে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ফল আসে প্রতিদিনের অভ্যাস থেকে। দিনে দুবার মুখ ধোয়া, পর্যাপ্ত পানি পান, রাতে সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুম, ফল ও শাকসবজি খাওয়া আর বাইরে গেলে সানস্ক্রিন ব্যবহার করলে ত্বক এমনিতেই ভালো থাকে।
বিজ্ঞাপন
বালিশের কভার সপ্তাহে অন্তত একবার বদলান। মোবাইল ফোনের স্ক্রিন মাঝে মাঝে মুছে নিন, কারণ এটি সারাক্ষণ গালের সংস্পর্শে আসে। মুখে বারবার হাত দেওয়ার অভ্যাসও কমান।
ঘরে বানানো ফেসপ্যাক একবারে যতটুকু লাগবে, ততটুকুই তৈরি করুন। দই, দুধ বা কলা মেশানো প্যাক ফ্রিজে রেখে পরের দিন ব্যবহার করা ঠিক নয়, এতে জীবাণু জন্মাতে পারে। মধু, বেসন বা মুলতানি মাটির মতো শুকনো উপকরণ মুখবন্ধ কৌটায় শুকনো জায়গায় রাখুন। ফেসিয়ালের বাটি আর তোয়ালে প্রতিবার ব্যবহারের পর ধুয়ে রোদে শুকিয়ে নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
কত দিন পরপর ঘরে ফেসিয়াল করা উচিত?
বিজ্ঞাপন
সাধারণভাবে তিন থেকে চার সপ্তাহ পরপর একবার পুরো ফেসিয়াল করাই যথেষ্ট। মাঝে সপ্তাহে একবার শুধু হালকা ফেসপ্যাক লাগাতে পারেন।
ভাপ নেওয়া কি সবার জন্য ভালো?
না। খুব সংবেদনশীল ত্বক, রোসেশিয়া বা সক্রিয় ব্রণ থাকলে ভাপে লালচে ভাব আর জ্বালা বাড়তে পারে। এমন ক্ষেত্রে ভাপের ধাপ বাদ দিন।
ফেসিয়ালের পর ব্রণ উঠলে কী করব?
বিজ্ঞাপন
অনেক সময় ভারী তেল বা নতুন উপকরণে ত্বক প্রতিক্রিয়া দেখায়। কয়েক দিন শুধু মৃদু ফেসওয়াশ আর হালকা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন। ব্রণ বাড়তে থাকলে বা ব্যথা হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান।
ছেলেরা কি একই নিয়মে ফেসিয়াল করতে পারেন?
হ্যাঁ, ধাপগুলো একই। শুধু শেভ করার দিনই স্ক্রাব করবেন না, কারণ তখন ত্বক এমনিতেই সংবেদনশীল থাকে।